পুরুষের ছলাকলায় নারীর মুক্তি:মানবজাতির স্বার্থে!

এক.
পাশাপাশি দু’টো খবর টেবিলে। কোনটা কতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করবেন তা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়ে গেছেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। একটা খবরের শিরোনাম ‘আজ বিশ্ব নারী দিবস’। আর একটা খবরের শিরোনাম ‘স্বামী পুলিশ, তাই নির্যাতনের বিচার পাচ্ছেন না আয়শা’। বিশ্ব নারী দিবসের দিনে প্রথম পাতায় এ ধরনের একটা নেগেটিভ খবর? নাহ! সারা বছর এত নেগেটিভ খবর, আজ নারী দিবসে না হয় পজিটিভ কিছু যাক। নারী নেত্রীদের অসাধারন কিছু মন্তব্য, বক্তব্য আর নারীর সাফল্য গাঁথা, চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর অনবদ্য দক্ষতারন খবর সবকিছু দিয়ে ভরে গেল প্রথম পাতা। নারীকে অভিনন্দন জানিয়ে রঙ ফর্সা করা ক্রীম আর গুঁড়ো মসলার বিজ্ঞাপনও প্রথম পাতায় ভাল মানিয়ে গেল। অসহায় আয়শা’র নির্যাতনের খবর মফস্বল খবরের জন্য বরাদ্দ পাতার একেবারে নীচে সিঙ্গেল কলামে দেওয়া হল। না দিলেই নয়, তাই আর কি!



এক.
পাশাপাশি দু’টো খবর টেবিলে। কোনটা কতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করবেন তা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়ে গেছেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। একটা খবরের শিরোনাম ‘আজ বিশ্ব নারী দিবস’। আর একটা খবরের শিরোনাম ‘স্বামী পুলিশ, তাই নির্যাতনের বিচার পাচ্ছেন না আয়শা’। বিশ্ব নারী দিবসের দিনে প্রথম পাতায় এ ধরনের একটা নেগেটিভ খবর? নাহ! সারা বছর এত নেগেটিভ খবর, আজ নারী দিবসে না হয় পজিটিভ কিছু যাক। নারী নেত্রীদের অসাধারন কিছু মন্তব্য, বক্তব্য আর নারীর সাফল্য গাঁথা, চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর অনবদ্য দক্ষতারন খবর সবকিছু দিয়ে ভরে গেল প্রথম পাতা। নারীকে অভিনন্দন জানিয়ে রঙ ফর্সা করা ক্রীম আর গুঁড়ো মসলার বিজ্ঞাপনও প্রথম পাতায় ভাল মানিয়ে গেল। অসহায় আয়শা’র নির্যাতনের খবর মফস্বল খবরের জন্য বরাদ্দ পাতার একেবারে নীচে সিঙ্গেল কলামে দেওয়া হল। না দিলেই নয়, তাই আর কি! ঢাকা এবং মফস্বলে যে অধিকাংশ দৈনিকের চেহারার দিকে তাকালে এই চিত্র দেখা যাবে। ইস! নারী দিবস না হলে অন্তত, আয়শার খবরটা প্রথম পাতা না হোক শেষের পাতা কিংবা ভেতরের পাতায় ছাপা হলেও বড় হেডিংএ ছাপা হত। নারী দিবসের শুভেচ্ছায়, আয়শা’র খবরটি’র এটুকু অবহেলা হাসিমুখেই মেনে নেওয়া উচিত। যেমন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নারী দিবসের বিশেষ আয়োজনের ভিড়ে মূল খবর ৪৫ মিনিট থেকে কমিয়ে মাত্র ১৫ মিনিট করা হয়েছে। এর মধ্যে আয়শা-ফায়শা’র খবর নিয়ে একটা উভ কিংবা ইনভিশনও রান ডাউনে রাখা সম্ভব নয়, প্লিজ এটা নিয়ে অন্তত, আজকের দিনে আর কিছু বলবেন না! সত্যিই উৎসবের অনেক আয়োজনে মেঝের অনেক গর্ত সুন্দর কার্পেটে ঢাকতেই হয়। ইঁদুর, সাপ-খোপ সহ গর্ত খোঁড়া আর গর্তে লুকিয়ে থাকার মত অসংখ্য ইতর প্রাণীর বিচরণ ভূমি এই জগতে মেঝেতে গর্ত-ফর্ত হবেই, সুন্দর কার্পেটও লাগবেই!
আসলে আয়শার ঘটনাটা ছিল দিনাজপুরের। কোতয়ালী থানার কনস্টেবল আবুল বাশার তার স্ত্রী আয়শাকে মাঝে মধ্যেই নির্যাতন করত যৌতুকের দাবিতে। এ নিয়ে আয়শা একবার দিনাজপুরের এসপিকে’ও নালিশ করেছিলেন। এসপি বাশারকে ডেকে ¯েœহের সুরে ধমকে দিয়েছিলেন। নারী দিবসের একদিন আগে গত ৪ মার্চ বাশারের নির্যাতনের মাত্রা ছিল ভয়াবহ । কোমড়ের বেল্ট খুলে এলোপাথারি মেরে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় তার স্ত্রী আয়শা কে। এক পর্যায়ে কাঠের টুল ছুঁড়ে মারলে গুরুতর আহত হয় আয়শা। প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার দিনই আয়শার বড় ভাই আবু হিয়া থানায় এ নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে ওসি আলতাফ হোসেন মামলা না নিয়ে তাকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন। তিন দিন দিনাজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ৭ মার্চ আয়শা নিজেই থানায় মামলা করতে গেলেও ওসি আলতাফ হোসেন মামলা নিয়ে তাকে ঘরে ফিরে যেতে বলেন। বাধ্য হয়ে আয়শা ঘটনাটটি সাংবাদিকদের জানান। ৭ মার্চ খবরটা এক দু’টি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে আসলে অনেকের নজরে আসে। মজার বিষয় হচ্ছে, ওসি আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি আয়শাকে মামলা সঠিকভাবে লিখে আনতে বলেছেন, আর আয়শার চিকিৎসার স্বার্থে তার নির্যাতক স্বামী কনস্টেবল আবুল বাশারকে সাত দিনের ছুটি দিয়েছেন। পুরুষ আদর করে নারীকে ছলনাময়ী বলে। আসলে পুরুষ যত চলা কলা জানে, নারী তার এক ভাগও জানে না। দেখলেণ, কত সুন্দর ছলা-কলা দেখালেন ওসি আলতাফ হোসেন! পুরুষ যদি পুলিশ হয় তখন সে হয়ে যায় ছলা-কলার দেবতা, দেবতাদের অপরাধের কথা মুখেও আনতে নেই, মামলা তো দূরের কথা!
দুই.
শুধু পুলিশ কেন, ক্ষমতাতন্ত্রের যে যতগুলো মন্ত্র আছে তার প্রতিটিতেই পুরুষের ছলা-কলার মায়া। পুরুষ হাতে ক্ষমতা পেলে প্রদর্শনের একটা উপায় খোঁজে। এখনও নানা রকম কঠিন আইন হওয়ার পরও নারীকে ক্ষমতা ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নারীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগের চেয়ে পুরুষের কাছে আনন্দের আর কি আছে?
পুঁজিতন্ত্রে ব্যবসাই মূলমন্ত্র, আর ব্যবসার জন্য অবধারিতভাবে দরকার পুঁজি। নারীর শরীর আর সোন্দর্যের চেয়ে বড় পুঁজি আর কি আছে? উন্নত পুঁজিবাদের দেশে নারী সংক্রান্ত সকল সংস্কারের জাল ছিন্ন করার দারুন ফর্মূলা তারা দেখিয়েছেন। প্রথমত, নারী সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে পুরুষের সমানে সমান। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সহ ক্ষমতা কাঠামোর নানা স্তরে নারীর অবস্থান সিঁড়ির উপরে নীচে। নারী সিঁড়ির শেষ ধাপের আগের ধাপ পর্যন্ত যায়, শেষ ধাপে যেতে পারে না বললেই চলে। উন্নত দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান কিংবা রাজ্য প্রধানের উদাহরণ খুবই কম। বরং দক্ষিণ এশিয়ার অনুন্নত দেশে নারী ক্ষমতার সব ক্ষেত্রেই শীর্ষে গেছে। কিন্তু এরও একটা উল্টোপিঠ আছে।
প্রাচীণ ভারতবর্ষ সহ প্রাচ্যের পৌরণিত ইতিহাস মাতৃতন্ত্রের। এখানে মায়ের নামে দেবতার পুজো হয়। ইন্দোচীন, আরব অঞ্চলের সনাতন ধর্ম বিশ্বাসেও মায়ের নামে পুজো হত। কারন এখানে পরিবারগুলো ছিল মাতৃ প্রধান। অবশ্য পৌরণিক কাহিনীগুলোতে দেবতা নারীদের উপরে ভগবান বা সর্বেশ্বর হিসেবে যাকে দেখানো হয়েছে তার সত্তা পুরুষ। যেমন, সনাতন ধর্মের পৌরণিক কাহিনীতে দূর্গা সকল মঙ্গলের প্রতীক হলেও তার স্বামী শিবের কর্তৃত্ব সর্বত্র স্পষ্ট, এখনও সনাতন ধর্মের কুমারী নারীরা শিবপূজো করে ভাল একটা বরের প্রার্থনা করে শিবরাত্রিতে। বিশ্বাসীরা শিবের বহুনারী গমন এবং যৌন উন্মাদনাকেও পূজা-অর্চণায় শ্রদ্ধা ভরেই স্মরণ করে। ভিন্নমতের গবেষকরা এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন। সমাজ মাতৃতান্ত্রিক হলেও পৌরণিক নানা ঘটনা প্রবাহ কাহিনী আকারে সাজিয়ে রেখে গেছেন পুরুষ কবি-মহাকবিরা। বিশেষ করে যখন এই মহাকবিরা পৌরণিক ঘটনাবলী লিখছেন, ততদিনে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বদলে সমাজ পুরোদস্তুর পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বদলে গেছে। অতএব, পিতৃতন্ত্রের চোখ দিয়ে দেখতে গিয়ে নারীকে শেষ পর্যন্ত পুরুষের কামনার যন্ত্রণায় পিষ্ট করবেন, এটাই স্বাভাবিক! এটা একেবারেই বিতর্ক, এর কোন স্থির সিদ্ধান্ত নেই। সাধু, সন্তু, ধর্ম প্রচারকদের বেশীরভাগের জীবন চরিতেই স্ত্রী কিংবা দাসীর পরিচয়ে একাধিক নারী সম্ভোগের ঘটনা আছে। তবে তাদের জীবন-যাপন কে সমালোচনার উর্ধ্বে রাখা হয়েছে, যেহেতু তারা স্বর্গীয় পুরুষ। স্বর্গে আমাদেরও যেতেই হবে, কারন সেখানে নারী সম্ভোগ আর ভোগ-বিলাসের বিপুল আয়োজন, অতএব স্বর্গীয় পুরুষদের নিয়ে কোন আলোচনা-সমালোচনা আমাদেরও করা উচিত নয়।
তিন.
এতদিনে মানবজাতির স্বার্থে কসমেটিক কোম্পানিগুলো সোচ্চার হয়েছে। ওয়াইল্ড স্টোন ট্যালক আবার সাবান পুরুষের জন্য। অতএব দুনিয়ার পুরুষ সকল এখন থেকেই ওয়াইল্ড স্টোন সাবান ব্যবহার না করলে পুরুষের স্বভঅব নারীর মত হয়ে যেতে পারে, আর এতে পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা হারাতে পারে বলেও ওয়াল্ড স্টোনের মহা ধড়িবাজ বিজ্ঞাপন দাতারা আবিস্কার করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার যুগে এ ধরনের নোংরার বিজ্ঞাপন প্রচার অস্বাভাবিক নয়, কারন কসমেটিক কোম্পানিগুলো কাজ করছে পুরুষতন্ত্রের স্বার্থে, আর ক্ষমতা কাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণেও আছে পুরুষ।
একটার কথা অনেকেই বলেন। ভাই নারী-পুরুষ নিয়ে এত চর্চা কিসের। নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভেতরে যৌতনা চিরন্তন, যৌনতা আছে বলেই মানুষ শুধু নয়, দুনিয়ার সব প্রাণী, উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে, প্রজান্মন্তর ঘটছে। অতএব যৌনতাকে এত সমালোচনা করার দরকার কি? মেয়েরা কসমেটিক ব্যবহার করে নরম-কোমল হতে পারলে কেন পুরুষ কসমেটিক ব্যবহার করে যৌন আবেদনে আকর্ষণীয় হবেন না? কসমেটিকস তাদেরও দরকার তাদের চামড়ার উপযোগিতা অনুযায়ী। এত দিন নারী-পুরুষের চামড়ার এই গূঢ় পার্থক্য বোঝা যায়নি যে সাবানেও নারী-পুরুষ ভেদ থাকবে, এখন কসমেটিক কোম্পানিগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে, ‘একেবারে ম্যাগনেট অ্যাকসন’ সহ। যৌনতাই যে অর্থনীতির বড় পুঁজি, সেখানে স্বাভাবিক যৌন আচরণের বাইরে বিকৃতি না হলে জমবে কেন?
চার.
সহজ কথা হচ্ছে, নারী-পুরুষের সমতার সমাজ বলে যেটার কথা প্রতি নারী দিবসে বলা হয়, সেটা বাস্তবে নেই। আর পুঁজিতন্ত্র এবং পুঁজিতন্ত্রের রক্ষাকবচ ধর্ম বিশ্বাসের আধিপত্যের ভেতর সেই সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এখানে নারী তার বিশ্বাস থেকেই পুরুষের পায়ের নীচে অবস্থানে সুখ লাভ করে, সেই সুখ যেন নারী না ভোলে তার জন্যই এত বিজ্ঞাপন, এত আয়োজন। একা ডিওডেরান্টের গন্ধ শুঁকে এক পুরুষেল পেছনে এক দল নারী কিভাবে ছুটে যাচ্ছে, টিভি বিজ্ঞাপনে কি অশ্লীল ভাবেই না দেখানো হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপন দাতারাই এখন নারী দিবসের আয়োজনের প্রধান স্পন্সর। অতএব, নারী দিবসে নারী আরও লাস্যময়ী নারী হবে, এটাই সহজ সমীকরণ।
পাঁচ.
বিশ্ব নারী দিবস কেন পালন করা হয়, সবাই জানি। মেরি ক্লারা জেটকিন নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহনের লড়াইটাকে তীব্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গ্রহনযোগ্য করেছিলেন, নারী দিবস তার স্মরণেই। আমাদের দেশে বেগম রোকেয়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শত বাধাকে উপড়ে ফেলে নারীকে আধুনিক শিক্ষার পথ দেখিয়েছিলেন। এখন সে ইতিহাস আবারও হারিয়ে যাওয়ার পথে। একদিকে পুঁজিতন্ত্রের সোন্দর্য চর্চার বিকৃতির আগ্রাসনের শিকার নারী, অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদের নতুন তের-চৌদ্দ দফায় নারীকে আবারও শৃংখলিত করার দাবি। এই দাবিকে যখন সমাজের একদল তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ সমর্থন দিয়ে বসে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লড়াই এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, ঝুঁকি তখনই বাড়ে। নারীকে এগিয়ে নিতে হলে এই নেতা-নেত্রী নয়, ক্লারা জেটকিন, বেগম রোকেয়ার সংগ্রামী পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *