যৌনকর্মীর নিজস্ব শ্রেণি অবস্থানঃ

একঃ
সমাজে অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশে দুই ধরনের যৌন কর্মী বর্তমান। একদল বাস করে সমাজের বাইরে, আরেক দলের অবস্থান আবশ্যিকভাবে সমাজের অভ্যন্তরেই। সমাজের বাইরে বসবাসকারীদের মধ্যে আছে আবার তিনটি ভাগ। একটি ভাগ বিভিন্ন জেলা শহরগুলোতে অবস্থিত যৌনপল্লীতে বসবাস করে এবং তাদের কাজও সেখানেই। যৌনপল্লী বা পতিতালয়ে বসবাসকারী যৌনকর্মীরা পুরোপুরি পেশাদার, মানে তাদের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবেই যৌনকর্মের উপর নির্ভর করে। সমাজের ভেতরে তাদের কোন ধরনের অবস্থান যেমন নেই তেমনি যৌনকর্মী বাদে তাদের আর কোন পরিচয়ও থাকেনা, থাকেনা তাদের সামান্য নিজস্বতাও। কারন এদের সবাইকে পল্লীর সর্দারনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এদের শরীর ও মনের মালিক ঐ সর্দারনী, সে তাদের শরীরকে খদ্দেরদের কাছে ভাড়া খাটায় ও মনটাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। শরীর-মনের মালিক অন্য কেউ হওয়ায়, এদেরকে যৌনদাসী বলা যেতে পারে।

একঃ
সমাজে অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশে দুই ধরনের যৌন কর্মী বর্তমান। একদল বাস করে সমাজের বাইরে, আরেক দলের অবস্থান আবশ্যিকভাবে সমাজের অভ্যন্তরেই। সমাজের বাইরে বসবাসকারীদের মধ্যে আছে আবার তিনটি ভাগ। একটি ভাগ বিভিন্ন জেলা শহরগুলোতে অবস্থিত যৌনপল্লীতে বসবাস করে এবং তাদের কাজও সেখানেই। যৌনপল্লী বা পতিতালয়ে বসবাসকারী যৌনকর্মীরা পুরোপুরি পেশাদার, মানে তাদের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবেই যৌনকর্মের উপর নির্ভর করে। সমাজের ভেতরে তাদের কোন ধরনের অবস্থান যেমন নেই তেমনি যৌনকর্মী বাদে তাদের আর কোন পরিচয়ও থাকেনা, থাকেনা তাদের সামান্য নিজস্বতাও। কারন এদের সবাইকে পল্লীর সর্দারনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এদের শরীর ও মনের মালিক ঐ সর্দারনী, সে তাদের শরীরকে খদ্দেরদের কাছে ভাড়া খাটায় ও মনটাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। শরীর-মনের মালিক অন্য কেউ হওয়ায়, এদেরকে যৌনদাসী বলা যেতে পারে।

সমাজ বহির্ভূত আরেক শ্রেণির যৌনকর্মী- যারা সাধারণত বড় বড় শহরের বিভিন্ন রাস্তা, অলিগলি, নানা ধরনের উদ্যান, লেকের ধার, বিভিন্ন রকম জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে খদ্দের সংগ্রহ করে থাকে। যৌনকর্মীদের মধ্যে এরাই সবচেয়ে নিম্নশ্রেণির। এদের শরীরমূল্যও সবচেয়ে কম। এই ভ্রাম্যমান যৌনকর্মীরা হাতে করে সবসময় পেতে দেওয়ার মত কিছু বহন করে। খদ্দের সংগ্রহ করার পর খানিকটা আড়ালে গিয়ে অথবা অনেকটা জনসম্মুখেই বা অন্যান্য খদ্দেরদের সামনেই তার নিজস্ব খদ্দেরের সাথে মিলিত হয়। এদের অনেকেরই আগমন বিভিন্ন যৌনপল্লী থেকে। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন যখন যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা না করেই বিভিন্ন পল্লী ভেঙ্গে দেয় তখন তারা অসহায় অবস্থায় শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার উঠে আসে শহরের বিভিন্ন বস্তি থেকে। বস্তির মেয়েরা- যাদের স্বামীরা অগোপান্ড কিছু সন্তানের জন্ম দিয়ে চলে গিয়েছে অন্য কোন সুন্দরী নারীর কাছে, দারিদ্রের কষাঘাতে যাদের চেহারা বা শরীর-স্বাস্থ্য পুরোপুরি বা অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, ক্ষুধার নিদারুণ তাড়নায় তারা এসে ভিড় জমায় শহরের বিভিন্ন জংগলাকীর্ণ জায়গায়। বস্তি থেকে আগতদের শারীরিক সম্ভ্রম প্রথমে কিভাবে হারালো সেই কথা বলতে যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যাদের জীবন-যাপনে ন্যূনতম কোন সম্ভ্রম নেই তাদের আবার শারীরিক সম্ভ্রম! শারীরিক সম্ভ্রমের কথা সাধারণত আসে মধ্যবিত্তদের বেলায়। আর উচ্চবিত্তদের বিলাসী জীবন-যাপনে সম্ভ্রম এতো বেশী যে তাদের আলাদা করে শারীরিক সম্ভ্রমের কোন ধরনের প্রয়োজন পড়েনা।

এর বাইরেও ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে আবাসিক হোটেল ব্যবসার বরাত দিয়ে চলে জমজমাট দেহ ব্যবসা। এই আবাসিক হোটেলগুলোতে অবস্থানকারী যৌনকর্মীদের প্রায় প্রত্যেকেই প্রথমদিকে ভিন্ন কোন নিম্ন মানের পেশার সাথে জড়িত থাকে এবং তাদের ঐ ভিন্ন পেশার আড়ালে তাদের যৌনকর্মী পরিচয় অনেকসময় লুকায়িত থাকে। ফলে যৌনকর্মী হিসেবে তাদের পরিচয় উন্মোচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সমাজের ভেতরে বসবাস করার সুযোগ পায় এবং ভোগ করে থাকে সমাজের কিছু সুযোগ সুবিধাও। তারপরেও এদেরকে সমাজের বাইরে বলছি এই কারনে যে, যদি কোনভাবে তাদের এই যৌনকর্মী পরিচয়টি প্রকাশ হয়ে যায় তাহলে তারা আর সমাজের ভেতরে অবস্থান করতে সক্ষম হয় না, আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ হয়। তখন তারা বাধ্য হয় অন্য পেশাটি ছেড়ে দিতে এবং ধীরে ধীরে যৌনকর্মী পরিচয়টি তাদের একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠে। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে উঠে আসা গার্মেন্টস কর্মী বা শহরের বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমে নিযুক্ত মেয়ে। যৌন কর্ম করার জন্য সাধারণত এদেরকে কেউ পতিতালয়ে অবস্থানকারীদের মত সরাসরি বাধ্য করতে না পারলেও তারা পরোক্ষভাবে সমাজের দ্বারাই বাধ্য হয় এই পেশায় নামতে। গার্মেন্টসে বা বিভিন্ন কলকারখানায় যারা কাজ করে তারা সাধারণত যে বেতন-ভ্রাতা পায় তা দিয়ে তাদের শহুরে জীবন নির্বাহ করা অনেক বেশী কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বয়স্ক মা-বাবা, ছোট ছোট ভাই-বোন ও অন্যান্য পরিজনের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর দায়িত্বও থাকে তাদের ঘাড়ে। মাস শেষ হলেই পরিবারের লোকজন তার দিকে চাতক পাখির মতই তাকিয়ে থাকে। গ্রাম থেকে শহরে তাদের উঠে আসার সাথে সাথেই তারা তাদের পুরুষ সহকর্মী, সুপারভাইজার, ম্যানেজার এবং বস্তি এলাকার চিছকে গুন্ডা মাস্তানদের হাতে তাদের শারীরিক সম্ভ্রম হারাতে বাধ্য হয়। এদের মধ্যে আবার অনেকেই তাদের শরীরের সম্ভ্রমটুকু নিজ পরিবার বা গ্রামেই হারিয়ে আসে। কেউ কেউ তাদের ভন্ড প্রেমিক, চাচাতো, ফুপাতো ভাই, দুঃসম্পর্কের আত্মীয় এবং অনেকেই এলাকার মাতব্বরদের ছেলের কাছে ধর্ষিত হয়। তাদের এই ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাটি প্রকাশিত হয়ে পড়লে যেহেতু এই ফতোয়াবাজ সমাজ সবটুকু দোষ তাদের ঘাড়ের উপরই ঢেলে দেবে এবং সমাজে তার পরিচয় হবে নষ্ট মেয়ে বলে তাই তারা ঘটনাগুলোকে গোপন অসুখের মত বুকের ভেতর চেপে রাখে। শহরে এসে আস্তানা গড়ার পর তারা পুরোপুরি উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয় যে শরীরটা সে নিজে ধারণ করে আছে সেটি তার ভোগের জন্য নয়, শরীরে যখন থেকে যৌবন এসেছে তখন থেকেই এটি পুরোপুরি ভাবে অন্যের ভোগের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে এবং থাকবে যতদিন যৌবন বেঁচে আছে। এখানে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন ধরনের মূল্য নেই। টাকার গায়ে যেমন লেখা থাকে চাহিবা মাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবেন, তেমনি যেকোন পুরুষ চাহিবামত্র যেন সে তার শরীরটাকে খুলে দিতে বাধ্য! যে যখন তার শরীর প্রত্যাশা করবে সেই নির্দ্ধিধায় ভোগ করে চলে যেতে পারবে। তখন তারা চিন্তা করে শরীরটা যেহেতু অন্যের ভোগের জন্য পুরোপুরি নির্দিষ্টই হয়ে গেছে তাহলে এর মাধ্যমে যদি বাড়তি কিছু টাকা আসে, সেটা নেহাত মন্দ কি! এভাবেই তারা ধীরে ধীরে যৌনকর্মীর খাতায় নিজেদের নাম অজান্তেই লিখিয়ে ফেলে। কারখানার পাশের বিবর্ণ বস্তি থেকে একে একে উঠে আসতে থাকে বিভন্ন আবাসিক হোটেলের সাদামাটা ভ্যাঁপসা কামরাগুলোতে। এই আবাসিক হোটেলগুলোতে উঠে আসা মেয়েদের মধ্যে যাদের চেহারা এবং স্বাস্থ্য বেশ ভালো, খদ্দেরদের মধ্যে তাদের চাহিদা যায় বেশ বেড়ে। তারা মোটামুটি টাকা-পয়সার মুখ দেখতে থাকে এবং শহুরে স্রোতে গা ভাসিয়ে কিছুটা বিলাসী জীবনেও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। গার্মেন্টস কারখানায় তাদের পাওয়া বেতন তখন খুব গৌণ হয়ে যায়। এভাবেই তারা ধীরে ধীরে পেশাদার যৌনকর্মীর কাতারে উঠে আসে এবং সমাজ সংসার থেকে চ্যুত হয়ে পড়ে ধীরে। সমাজের বাহিরে অবস্থানকারী যৌন কর্মীদের মধ্যে এদের অবস্থান অনেকটা উপরিভাগে।

সমাজের অভ্যন্তরে অবস্থিত যৌনকর্মীরা সাধারণত দুই ধরনের হয়। শহুরে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত থেকে উঠে আসা মেয়েরা (ছাত্রী, চাকুরীজীবী,গৃহবধূ) যারা দেহব্যবসার সাথে জড়িত হয় তাদেরকে সাধারণত কল গার্ল হিসেবে সম্বোধন করা হয়। প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে অধ্যুষিত হয়ে ইতিমধ্যেই বহুগামীতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠা শহুরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত মেয়েদের মধ্যে যারা যৌনকর্মী হিসেবে নাম লেখায় তারা সাধারণত ভোগবিলাসী জীবনের চরম তাড়না থেকেই দেহ ব্যাবসার সাথে জড়িত হয়। তাদের বিলাসী জীবনের সম্ভ্রমের কাছে খুবই তুচ্ছ মনে হতে থাকে শারীরিক সম্ভ্রম। তাদের মনের কথাটা অনেকটা এরকমঃ আমি তো এখানে চুরি করছিনা, এটা কোন ধরনের ডাকাতিও নয়, দুর্নীতির প্রশ্রয় থেকেও দূরে, ঘুষও নেই না কারো নিকট থেকে- সমাজের অন্যান্য আর আট-দশটা স্বাভাবিক কাজের মত সার্ভিস দিচ্ছি টাকা নিচ্ছি। ব্যস চুকে গেলো, এ নিয়ে সমাজের মাতামাতি করার তো কিছু নেই। এদের এই শহুরে সমাজ ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশী গোল পাকায় না, কেউ কেউ কথা বলতে চাইলেও ওরা সেটাকে কোন ধরনের পাত্তাই দেয়না।

চলচ্চিত্র- টিভি নায়িকা, বিভিন্ন শ্রেণির মডেল, গায়িকা বা টেলিভিশনের সংবাদ পাঠিকাদের মধ্যে যারা যৌনকর্মের সাথে যুক্ত তারা আমাদের সমাজের সবচেয়ে উচ্চ শ্রেণির যৌনকর্মী। এরা শুধুমাত্র টাকার কারনেই নয়, অনেক সময় বহুল বাজেটের কোন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেতে বা বড় ধরনের কোন সামাজিক পদমর্যাদার, বা তাকে খ্যাতিমান করে তুলবে এমন কোন কাজের পাওয়ার লোভে, প্রত্যাশায় ক্ষমতাধর উচ্চ অবস্থানের পুরুষের কাছে মানবিক সম্পর্কের কোন ধরনের আদান-প্রদান ব্যতিরেকেই দৈহিক সম্পর্কে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সিমন দ্যা বেভোয়ার তার বই “দ্বিতীয় লিঙ্গ”(second sex) তে এদের সমন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। লেখিকা তার বইয়ে এদেরকে সম্বোধন করেছেন “হিথেইরা” নামে।

দুইঃ
সমাজের ভিতরে ও বাইরে অবস্থানকারী যৌনকর্মীদের মধ্যে পেশাগত ধরনে বেশ কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সমাজের বাইরে অবস্থানকারী পল্লীর এবং ভ্রাম্যমান যৌনকর্মীদের খদ্দেররা হয় সাধারণত নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন। যৌনকাজে এই শ্রেণির যৌনকর্মীরা সময় দেয় খুব কম-নেহাত যেটুকু না হলেই নয়। এই কম সময় দেওয়ার পিছনে আবশ্যিকভাবে জড়িত হয়ে আছে অর্থনৈতিক কারন। এদের শরীরের দাম হয় খুব কম কারন নিম্নশ্রেণি থেকে উঠে আসা খদ্দেরদের পক্ষে বেশী দামে তাদের শরীর ভাড়া করা সম্ভব হয় না। আবার ওদিকে যৌনকর্মীদেরকেও তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে যে টাকার দরকার হয় তা যেহেতু এই শরীরের ভাড়া থেকেই তুলতে হবে বা পতিতালয়ে অবস্থানরত মেয়েদের- প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট পরিমানের টাকা আয় করতে না পারলে- সর্দানীর হাতে হতে হবে নির্মম অত্যাচারের শিকার। ভ্রাম্যমান পতিতাদেরও খুব কম আয়ের একটা বড় অংশই অনিবার্যভাবে চলে যায় পুলিশের হাতে। কনস্টেবলরা এদের এবং এদের খদ্দেরদের পেছনে সবসময় ফেউ এর মত লেগে থাকে। যৌনকর্ম চালানোর সময় লাঠি হাতে তাড়া করে- হাতে দুমড়ানো-মোচড়ানো কিছু টাকা পেলে হাতের লাঠিটি ঘুরাতে ঘুরাতে চলে যায়। ফলে তারা বাধ্য হয় প্রত্যেকদিন অনেকজন খদ্দেরের সাথে মিলিত হতে। এই যৌনকর্মীদের মধ্যে যাদের চেহারা-সুরত এবং শরীর স্বাস্থ্য তুলনামূলক অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভালো তাদের যদিও খদ্দেরের অভাব এই যৌনপ্রণয় নিষিদ্ধ সমাজে খুব একটা বেশী পোহাতে হয়না। কিন্তু সমস্যা চরমমাত্রায় ঘনীভূত হয়ে উঠে তাদের বেলায় যারা দেখতে আবেদনময়ী না বা যাদের শরীরের কাঠামো- শরীর ভাড়া খাটাতে খাটাতেই অল্প বয়সেই শরীরের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে- অনেকটাই ভেঙ্গে গেছে বা বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েছে। তারা খদ্দেরদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার তাগিদে বিভিন্ন রকম আবেদনময়ী ভঙ্গিতে শরীরের নানা স্থান অনাবৃত রেখে কাপড়-চোপড় পরিধান করে, মুখের মধ্যে নানা ধরনের সস্তা মেক আপ লাগায়, যৌন উস্কানীমূলক কথা-বার্তা বলে, খদ্দেরদের সার্ট প্যান্ট লুঙ্গিতে টেনে ধরে। প্রথম আসা খদ্দেরদের অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের যৌনউত্তেজক ও আবেগাপ্লুত কথা-বার্তা বলে নিজেদের কক্ষে নিয়ে আসার অবিরাম চেষ্টা চালায়। অনেক সময় কাতর স্বরে তাদের শরীরের সস্তা মূল্য এবং যৌনকাজে আতিথেয়তার কথা ঘোষণা করতে দেখা যায়, তখন তাদের চোখে মুখে ফুটে থাকে এক ধরনের করুণার ছাপ। যৌনকর্মবৃত্তি এবং ভিক্ষাবৃত্তি যেন তাদের চোখেমুখে মিলেমিশে অবস্থান করতে থাকে। এই বিষয়গুলো প্রকট আকারে দেখা যায়- যৌনপল্লীগুলোর অভ্যন্তরে। আরেকটা ভয়ানক বিষয় হল, নিম্নবিত্ত খদ্দেররা যেহেতু নিজেদের শরীর কঙ্কালসার-জরাজীর্ণ হওয়ার কারনে মেদবহুল মেয়েদের সাথে যৌনকাজে মিলিত হত বেশী পছন্দ করে, তাই সর্দারনীর কড়া নির্দেশে পল্লীর মেয়েদের নিয়মিত ভাবে খেতে গবাদী-পশু মোটাতাজাকরনের পিল(যেহেতু এই পিলটি খুব সস্তায় পাওয়া যায়)। পল্লীর মেয়েদের নিয়মিতভাবে এই পিল সেবন করার কারনে তাদের শরীরে অচিরেই নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়।

আবাসিক হোটেলগুলোতে অবস্থানকারী যৌনকর্মীরা পল্লীর এবং ভ্রাম্যমান পতিতাদের তুলনায় অনেকবেশী ভদ্র ব্যবহার করে থাকে তাদের খদ্দেরদের সাথে এবং সময়ও একটু বেশী দেয়। আবাসিক হোটেলগুলোতে কোন খদ্দেরের আগমন হলে হোটেলের ভেতরে অবস্থানকারী দালাল শ্রেণির কেউ খদ্দেরটিকে নিয়ে প্রথমে যেকোন একটি খালি কামরায় বসায়। তারপর বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরা কিছু মেয়ে সাথে করে নিয়ে আসে। কামরায় এসেই মেয়েরা ভেতরের চৌকিতে সার বেঁধে বসে যায়- কেউ কেউ অবশ্য দাঁড়িয়েও থাকে। মেয়েগুলো কামরায় আসার পরপরই খদ্দেরটিকে তার নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আবেদনময়ী মুখভঙ্গি করে বা শারিরীক ভাষায় শুরু করে দেয় মৌন আহ্বান। খদ্দেরটি মেয়েগুলোর মুখ ও শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকার মুহূর্তে ভাবতে থাকে কোন মেয়েটির শরীর ভাড়া করলে পকেটের টাকাগুলো অন্তত উসুল হবে। খদ্দেরটির যে মেয়েটিকে ভালো লাগে সেই মেয়ের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করার সাথে সাথে ঐ আঙ্গুলের ইশারায় নির্দিষ্ট করা মেয়েটি বাদে বাকী মেয়েগুলো ধীরে ধীরে কামরা ছেড়ে চলে যায়। এদের শরীরের মূল্য পল্লীতে অবস্থিত মেয়েদের চাইতে খানিকটা বেশী হওয়ার কারনে খদ্দেরদের এরা বেশ খানিকটা সময় দেয়। এদের খদ্দেররা একটু উঁচু শ্রেণির- সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সরকারী অফিসের কেরানী।
সমাজের ভেতরে অবস্থানকারী শহুরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা যৌনকর্মী যাদেরকে সাধারণত কল গার্ল বলে ডাকা হয় তাদের খদ্দেররা হয় সাধারণত বড় বড় ব্যবসায়ী, বহুজাতিক প্রতিষ্টানগুলোতে মোটা বেতনের চাকুরী জীবী। এই কল গার্লদের শরীর মূল্য অনেক বেশী, ফলে এদেরকে অন্যান্য নিম্নশ্রেণির যৌনকর্মীদের মত অনেকবেশী খদ্দেরের সাথে মিলিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এদের অনেককেই খদ্দেরের রক্ষিতা বা উপপত্নীতে পরিণত হতে দেখা যায়। এরা খদ্দেরদের সময় দেয় অনেকবেশী- একরাত-দু রাত। মাঝে মাঝে এরা আবার খদ্দেরদের সাথে সপ্তাহ পনের দিনের জন্য দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বা বিদেশের মাটিতে ঘুরতেও যায়।

“হিথেইরা”রা সাধারণ মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে সবসময়। এদের খদ্দেররা আসে সমাজের সবচেয়ে উঁচু শ্রেণি থেকে। শিল্পপতি, বড় বড় রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। এদের প্রত্যেকেরই থাকে তারকা খ্যাতি। অবশ্য যখন এদের তারকা খ্যাতি আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে বা অভিনয় জগতে এদের পসার কমে যায় তখন তারা কল গার্লদের স্তরে নেমে আসে। এবং যৌনকর্মী পেশাটাই তাদের একমাত্র পেশা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান যুগের আকাশে এরাই সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা। রুপালী পর্দায় এবং টিভি স্ক্রীনে এদের সবসময় দেখা যায় বলে এদের প্রতি মানুষের অন্যরকম একটা মোহ থাকে। এবং এই কারনেই তাদের যৌন-আবেদনময়ীতা অন্যান্য সাধারণ মেয়েদের থেকে অনেকবেশী মনে হয়। এদের যৌনকর্মী পেশাটা যদিও গোপন থাকে তবুও এদের বিষয়টা এই সময়ে এসে অনেকটাই ওপেন সিক্রেট ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজের বাইরে অবস্থানকারী যৌনকর্মীদের সাধারণত পতিতা বলে ডাকা হয়। এদের আরো বেশ কিছু নাম আছে যেগুলো সাধারণত সমাজে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়- বেশ্যা, মাগী, খানকি, নটি ইত্যাদি বিভিন্ন গালিতে তাদের সম্বোধন। এবং এই পেশায় জড়িত থাকতে থাকতে এদের চেহারায় সাধারণত এমন একটি ছাপ পড়ে যায়, যা দেখেই যে কেউ বলে দিতে পারে এই মেয়ে একজন যৌনকর্মী। এর ফলেই সমাজে ভেতরে প্রবেশ এদের পক্ষে অসাধ্য হয়ে পড়ে। অসুস্থ মাকে দেখতে আসতে হলেও গভীর রাতে নিজেকে আপাদমস্তক হিজাবে ঢেকে আসতে হয় এবং রাত পোহানোর পূর্বেই ত্যাগ করে যেতে হয় সমাজের আঙ্গিনা। তাদের এই যৌনকর্মী নামটি একটি প্রশাসনিক নাম। সরকারী বা বেসরকারী বিভিন্ন নথিপত্রে এদের কথা উল্লেখ করতে হলে সাধারণত যৌনকর্মী শব্দটি ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। অনেক বুদ্ধিজীবী বা কিছু কিছু সাহিত্যিক সাধারণত এদেরকে তাদের নিবন্ধেও যৌনকর্মী বলে উল্লেখ করে। কিন্তু সমাজের সাধারণ ভদ্রগোছের মনুষরাও এখনও এদের কথা উল্লেখ করতে হলে পতিতা শব্দটিই ব্যবহার করে থাকে। কেন এদের পতিতা বলা হয়? কারন এরা সমাজ থেকে পতিত, এই যৌনকর্মী পরিচয়ে সমাজে এদের কোন স্থান নেই। কিন্তু টাকার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে বলে শুধু মাত্র এরা পতিতা নয়। এরা পতিতা কারন এরা নিম্নশ্রেণি থেকে উঠে আসা যৌনকর্মী। উচ্চ শ্রেণির যারা টাকার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে তাদেরকে তো পতিতা বলে সম্বোধন করা হয় না-এরা সমাজ থেকে পতিত নয় বরঞ্চ এদের অনেকে সামাজিক পদমর্যাদার বিনিময় শরীর বিক্রি করে। সমাজে তাদের অবস্থান অনেক উঁচুতে। যৌনকর্মীদের এক অংশ সমাজ থেকে পতিত হওয়ার এবং তাদের পতিতা বলে সম্বোধন করার একমাত্র কারন তাদের শ্রেণি অবস্থান। সমাজের কোন স্তর থেকে এসেছে এটাই একমাত্র বিবেচ্যবিষয়। একই পেশায় নিযুক্ত থেকেও এই যৌনকর্মীরা শুধুমাত্র তাদের শ্রেণিগত অবস্থানের কারনে কেউ কেউ স্থান পায় সমাজের সবচেয়ে উঁচু শ্রেণিতে, তরুন-যুব সমাজের স্বপ্ন আঙ্গিনায় উজ্জ্বল তারা হয়ে জ্বলতে থাকে অবিরাম। আর সমাজের সবচেয়ে নিচের তলাতেও আরেকদলের কোন স্থান হয়না। আমাদের এই শ্রেণিভিত্তিক প্রহসনমূলক সমাজে বেঁচে থাকার জন্য একমুঠো অন্ন যোগাড়ের কারনে দেহ ভাড়া খাটানোর কারনে কেউ কেউ সমাজ থেকে বিচ্যুত হয় আবার কেউ কেউ দেহ ভাড়া খাটায় সামাজিক উচ্চপদমর্যাদার আশায়! অদ্ভুত!!!

১ thought on “যৌনকর্মীর নিজস্ব শ্রেণি অবস্থানঃ

  1. সাধারণত পাবলিক

    সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সরকারী অফিসের কেরানী।

    উচ্চবিত্ত সমাজের কলগার্লদের কাছে যায় সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর অনেকেই। শুধু শুধু সরকারী কর্মচারী আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ট্যাগ দেওয়ার কারনটা পরিস্কার হইল না… :কনফিউজড: :কনফিউজড: :থাম্বসডাউন: :মানেকি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *