লজ্জা

রোজ রাতে খাবার পরে ওরা একটা দল বেড়িয়ে পরে ,কোনো কাজে না ,একান্তই ঘোরাঘুরি। ক্যাম্পাসের সবাই বিশেষ করে নৈসপ্রহরীরা এদের ভালো চেনে। সবাই ছাত্র,থাকে পাশাপাশি হল গুলোতে। এই হাফপ্যান্ট পড়া ছেলেগুলো সরকারী ছাত্রসংগঠন করে। সবার পরনে শর্টস আর নানা রঙের টিশার্ট।
সন্ধা থেকেই আবহাওয়া একটু মেঘলা ছিল ,বৃষ্টি না হলেও ঠান্ডা বাতাস বইছিল জোরে ,বাতাসে নেশা ধরানো একটা পাগলকরা সুবাস।
বট তলায় বসে বাতাসের স্নিগ্ধতা শরীর পেতে উপভোগ করলেও বাতাসের সুগন্ধটুকু ওরা কেউ সেদিন পায়নি।

রোজ রাতে খাবার পরে ওরা একটা দল বেড়িয়ে পরে ,কোনো কাজে না ,একান্তই ঘোরাঘুরি। ক্যাম্পাসের সবাই বিশেষ করে নৈসপ্রহরীরা এদের ভালো চেনে। সবাই ছাত্র,থাকে পাশাপাশি হল গুলোতে। এই হাফপ্যান্ট পড়া ছেলেগুলো সরকারী ছাত্রসংগঠন করে। সবার পরনে শর্টস আর নানা রঙের টিশার্ট।
সন্ধা থেকেই আবহাওয়া একটু মেঘলা ছিল ,বৃষ্টি না হলেও ঠান্ডা বাতাস বইছিল জোরে ,বাতাসে নেশা ধরানো একটা পাগলকরা সুবাস।
বট তলায় বসে বাতাসের স্নিগ্ধতা শরীর পেতে উপভোগ করলেও বাতাসের সুগন্ধটুকু ওরা কেউ সেদিন পায়নি।
পাতলা অন্ধকারে বারবার একটা ছোট আগুন বুকসমান উচ্চতায় জ্বলে জ্বলে উঠছিল। একজন জোর গলায় বলে উঠলো,’যে বলে গাঞ্জাখোর ,তার মায়ে খানকি বাপে চোর –ব্যোম শংকর ব্যোম শংকর’ বলে বিরাট লম্বা এক টান দিয়ে কল্কিটা পরের জনের হাতে দেয়।খুশিখুশি মুখে শিবনেত্র হয়ে টান লাগায় – একটা চটুল কন্ঠ টানের সময় উত্সাহ দেয়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠে ,’লে বেটা লে চুসসে লে — লিয়ে লে বেটা — খুব লিলি বে ‘ বলতে বলতে বক্তা নিজেই কল্কিটা নিয়ে সেবা শুরু করে।
এটা ওদের দৈনন্দিন রুটিন।
ওদের নেতাও সাথেই বসে ছিল,বিরক্ত মুখে সঙ্গীদের কথার মারপ্যাচ উপভোগ করছিল। কনিষ্ঠতম সদস্য হঠাত তারপাশে উঠে গিয়ে বলল ,

:’ভাই ,আগেরবার কথা দিছিলা শটগান কিন্যা দিবা ,বিএলআরআই এর টেন্ডার এর কামটা করতে গিয়া মামলাও খাইলাম ,দিলা না তো’ ।

বিরক্তি চেপে হাসি মুখে ছেলেটার কাঁধে হাত রাখল নেতা,কাছে টানলো,বলল

:তোর মামলা উঠাইতে মন্ত্রীর পিএস রে কত দিছি জানস ?তরা ৩১টা খোর সকালে উইঠা প্রতিদিন একেকজনে ১০০০ কইরা লস ,না দিলে নওশের পুন্গিরপুতে আমার …..গায় পুরা ক্যাম্পাসটা ভইরা দিলেও তো কেউ চোখে দেখবিনা। দিমুনা কইছি?দিমু অবশ্যই দিমু,আর তরে না দিলে দিমু কারে ?একটা ভালো দান মারতে দে ……

হ্যাংলা পাতলা মাথায় হালকা চুল বহিরাগত ছেলেটা কোমর থেকে একটা ফেন্সির বোতল বেরকরে খুব ঝাঁকায় ,বাড়িয়ে দিয়ে নেতাকে বলে ,লও ভাই,মন্দির মাল ,বড় মুক্খা ,নয়ারহাটে মাল খাইতে গেছিলাম দুপুরে,আওলাদ খানকির পোলায় আবার স্পট চালু করছে। ওরে কইয়া আইছি তোমার লগে দেখা কইরা যাইতে। চুদিরপুতে ডরাইছে বহুত ,৫টা মাল দিয়া কইলো ,’ভাইরে সালাম দিবেন,আমি অবসর পাইলেই দেখা করমু নে।

বোতলটা গলায় উপুর করে বলে উঠলো,আইজকা যতগুলা খাওয়াইলি ,মুতলেও ডাইল বাইরাইবো।

সম্মিলিত উচ্চকন্ঠে হাসির আওয়াজটা চাপা পরে গেল একটা ট্রাকের ইঞ্জিনের গর্জনে।
পাশেই ফাঁকা জায়গাতে নতুন হলের কাজ শুরু হবে,কাঁচামাল আসা শুরু করেছে মাত্র ,বঙ্গবন্ধু হল হবে।

আবছা অন্ধকার পেরিয়ে কনসট্রাকশন সাইটের অল্প ওয়াটের নোংরা আলোর রেখায় ট্রাকের ডালা খুলে কিছু নামানো শুরু করলো কয়েকটা শ্রমিক,সুপারভাইজ করছে ভদ্রস্থ জামা কাপড় পরা একজন।

অন্ধকার ফুঁড়ে ১০/১২টা ছেলেকে একদম পাশে দেখে ভড়কে গেল ভদ্র পোশাকের লোকটা ,হাফপ্যান্ট পরা কাউকে সালাম দিতেও বাঁধছিল।

নেতা জানতে চাইল ,তুই কে ?
এখানে কি করস?
বালু ফালাস ক্যান ?
লোকটা সামলে নিয়ে সালাম দিল,বলল,’আমি সাব কন্ট্রাকটর।

– তোর কন্ট্রাকটর কই ?বালু ফালাস যে ,কারে কইসস?

রাত তখন প্রায় একটা ,লোকটা ভয়ে ভয়ে বসকে কল দিয়ে নেতাকে ধরিয়ে দেয়.
প্রথমবার রিং হয়ে কেটে যায়,দ্বিতীয় চেষ্টায় একটা ঘুমজড়িত কন্ঠ সাড়া দেয় –

-হ্যালো ,এত রাত্রে ফোন করছ কেন ?
নেতা ভারী গলায় নিজের নাম বলে জানতে চায় কত টাকার কাজ পেয়েছে।
-জ্বী ২৯ লক্ষ্য টাকার বালির কাজ শুধু ,
বলে যোগ করে,আমি তো নাজির ভাইয়ের সাথে দেখা করে তাকে সম্মান করে আসছি।
লোকটা জানে না এই ক্যাম্পাসে দুইটা গ্রুপ সরকারী দলে ,এই ছেলেগুলো নাজির অর্থাত দলীয় সভাপতির বিপক্ষ।
– নাজির কে ? চিনলাম না তো। ওরে টাকা দিচ্ছেন তাইলে ওই বানচোদরে আইসা বালু আনলোড কইরা দিতে কন’…. খেঁকিয়ে ওঠে নেতা।
-ওরে কত দিছেন?
-জ্বি ৬০০০০ টাকা দিছি।
সম্মিলিত খ্যাক খ্যাক হাসিতে চমকে যায় কন্ট্রাকটর।
-নাজিররা হালায় ইদানিং খুচরা পয়সা ভিক্ষাও করা ধরছে ?
যাউক গিয়া ,আপনার নাম কি ?
-জ্বি আজহারুল আমিন
-হ্যা আজহারুল আমিন সাহেব,আপনার কাছে কিছু পাওনা ছিল,কবে আসবেন ?
লোকটা ভড়কে গিয়ে তোতলাতে থাকলো খানিকটা ,সামলে নিয়ে বলল ,
-জ্বি কিসের পাওনা বাবা ?
নিচু স্বরে হেসে উঠলো নেতা,বলল ,
-চাঁদা চাইছি বুঝতে পারেন নাই ?

একমুহূর্ত চুপ থেকে কন্ট্রাকটর ছেলেটার সাথে তার নিজের ভাষাগত সাযুজ্য খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলো ,তোমার বাড়ি কই বাবা ?
-কেন ? বাড়ি দিয়ে কি করবেন ? আমার বাড়ি ……….,উত্তর জনপদের একটা জেলার নাম বলল।
-বল কি বাবা ,আমার বাড়ি তো ………….. একই জেলার একটা থানার নাম বলে উচ্ছাসে আবার প্রশ্ন করে বসে ,
-তুমি কার ছেলে বাবা ?
কন্ঠে রাগের ঝাঁঝ ঢেলে খেকিয়ে উঠে নেতা ,
-বাপ মায়ের নাম কি করবেন? যান , আমার নাম ………,হলের রূম নম্বর ,ডিপার্টমেন্ট ,রোল সব এক নিশ্বাসে বলে যোগ করে ,
-যান আমার নাম বাংলাদেশের যেই থানায় পারেন জননিরাপত্তা মামলা করেন ,টাকা আপনার দেওয়াই লাগবে।

পরেরদিন দুপুরে খেতে বসেছে নিজের রুমেই ,এসময় দরজায় নক হলো ,
-খোলা আছে ,আয়।
দরজা ঠেলে একজন অপরিচিত সুবেশ বয়স্ক লোক ঢুকে বলল,
-আমি আজহারুল আমিন ,বঙ্গবন্ধু হলের বালির কাজটা পাইছি।
পকেট থেকে একটা বাদামী বড় খামে মোড়া একটা প্যাকেট রাখে টেবিলে।
-এখানে ১লাখ আছে।
-ছেলেটা বাম হাতে প্যাকেট খুলে ১০হাজার আলাদা করে অনেক কসরৎ করে,হাসিমুখে লোকটাকে বসতে বলে.
-এত দিলে তো আপনার কিছুই থাকবে না ,ব্যবসা করেন,চ্যারিটি তো না। এই ১০হাজার রাখেন ,বাসায় মিষ্টি নিয়া যাবেন।
লোকটা হচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে ,এই পরিবর্তিত আচরণ বোধগম্য হয়না।
-ক্যাম্পাসে সবাইকে বলে দিব আপনি আমার মামা ,বাড়িও একই জায়গায় ,কেউ ডিস্টার্ব দিবেনা আপনারে। সমস্যা করলে জানাবেন ,পুইতা ফেলবো এক্কেরে ,আপনি নিজের সিকিউরিটি কিনছেন। আপনারা ব্যবসায়ীরা এই রকম কেন?একাই পুরা মাছটা খাইতে চান ? একটু ঝুটা কাঁটা তো আশপাশে ছড়াবেন। সবারই হক থাকে,ঠিক কিনা ?
লোকটা একটু সামলে নিয়ে বসলো।
-শুনেন এইভাবে হলে দেখা করবেন না ,লোকে খারাপ বলে। রাজনীতি করি ,ইমেজ ঠিক রাখতে হয়। এরকম করলে তো সবাই চাঁদাবাজ ভাববে আমাকে।
মেয়েদের হলের পাশের রাস্তা মেরামতের টেন্ডার আছে নেক্সট উইকে ,ওতে পার্টিসিপেট করেন। আমি বলে দিব ,আমাদের সাথে সম্পর্ক মেইনটেইন করেন,নিজেও ভালো থাকেন সবাই ভালো থাকুক। এরপরে আসলে মেইন গেট থেকে ফোন দিবেন।
লোকটা বেরিয়ে যায় এবং ঠিক ছয় দিনের মাথায় আবার কল করে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
ছেলেটা মোটর সাইকেল থেকে নেমে হ্যান্ড শেক করলে লোকটা একটু আড়ালে ব্যস্ত ভঙ্গিতে টেনে নিয়ে হাতে একই রকম আরেকটা বাদামী খাম দেয়।
-এখানে ৫০ আছে ,মেয়েদের হলের রাস্তার মেরামতের কাজটা পাইছি ১৪লাখ ৮০ হাজার টাকার কাজ। নাজিরকে কিন্তু কিছুই দেই নাই ,ডিস্টার্ব করবেনা তো ?
-আরে আপনি সবসময় এত বেশী বেশী দেন কেন ?
তাড়াতাড়ি ৫০০০ বের করে লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে চওড়া হাসি হেসে বলল ,
-বাসায় মিষ্টি নিয়ে যাবেন।
এই হ্যান্ডসাম সুভাষী ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরা ছেলেটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে মনে মনে অবাক হন,কি যেন একটা অসামঞ্জস্য কিন্তু ধরা পরেনা।

পরের কয়েকটা মাস জাতীয় নির্বাচনের তোরে দ্রুত কেটে গেল। সরকারী দল বিরোধী দল হয়ে গেল।
ছেলেটা তার শিষ্য সামন্ত বহিরাগত নিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া অনেকদিন।
কোনভাবেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ সন্তোষজনক পর্যায়ে আনতে না পেরে বাড়িতে গিয়ে বসে বসে কাটাতে লাগলো পরিকল্পনা করে আর আরেকটু ভালো সময়ের অপেক্ষায়।

সেদিন দুপুরে কোর্টের বারান্দায় চা খেয়ে সিগারেটটা মাত্র জ্বালাবে ,এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে একটা হাস্যজ্জ্বল মুখের বয়স্ক লোককে দেখে সিগারেটটা না জ্বালিয়ে পকেটে ভরে রেখে সালাম দিল।
ছেলেটার মৃত শিক্ষক বাবার প্রিয় বন্ধুদের একজন লোকটা-নোমান চাচা ।
বাবার মুখে শুনেছে তারা ৪জন সেরা বন্ধু ছিলেন ,খালেক চাচা,নোমান চাচা দুজনকে আশৈশব দেখে এসেছে,কখনো দেখেনি আমিন চাচাকে ,উনি বরাবরই ঢাকায় থাকতেন।

নোমান চাচা উজ্জ্বল হাসি হেসে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন,অধৈর্য হয়ে জোরগলায় ডাকলেন , এই ……………. বাবা ,নাম ধরে দেকে হাত ধরলেন ,মাথায় শৈশবের মত হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন ,
-কবে আসলি রে বাবা ?
-এইত চাচা সপ্তাহ খানেক
-থাকবি কয়দিন ?
-জ্বি চাচা জানিনা এখনো ,কয়দিন থাকব বোধহয়।
-থাক থাক তোর মা একা থাকে,সুযোগ পাইলেই আসবি ,মার সাথে থাকবি।
নোমান চাচার দিকে পিছন ফিরে এক কোট প্যান্ট পড়া লোক উকিলের সাথে কথা বলছিল।
চাচা অধৈর্য ভঙ্গিতে তার কাঁধ খামচে ধরে টেনে ঘুরিয়ে নিজের দিকে এনে ছেলেটার হাতটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল ,
-আমিন এইটা আমাদের রফিকের ছেলে।
নবাগতের চেহারায় উচ্ছ্বাস জ্বলে উঠতে নিয়েই ছেলেটার চেহারায় চোখ পড়তেই নিভে গেল।
অপ্রস্তুত ছেলেটা একটা সালামের ভঙ্গি করলেও অস্ফুট স্বর ফুট্লনা।

নোমান চাচার দিগ্বিজয়ী হাসির সামনে মুখ কালো করে এক দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন আজহারুল আমিন সাহেব ,বুকে একটা চিনচিনে কষ্টের অনুভুতি নিয়ে।

ছেলেটা চোখে চোখ পড়ার পর সেই যে চোখ নিচু করেছিল,সেই চোখ তুলে আর তাকাতে পারেনি। :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *