নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি কেন?

যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীনতা পেল এই দেশের মানুষ। যে মহানের একটি মাত্র আহবানে (মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদ দিয়ে) সাত কোটি মানুষ জীবন মরণ লড়াইয়ে নেমে পড়ল, যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনল স্বাধীন মানচিত্র ও পতাকা, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক বছর পরই কেন সে দলটির প্রতি এ দেশের মোট জনগণের বিরাট একটা অংশ বিরাগভাজন হয়ে ওঠল? এই যে বিপুল সংখ্যক লোক আজ বিএনপি জাতীয় পার্টিসহ(জামাতের কথা এখানে বলব না, কারণ শুরু থেকেই ঐ দলের সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ) বিভিন্ন দল করে, কেন এবং এরা কারা? আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানাবিধ কুত্সা রটানোসহ চত্রান্ত ষড়যন্ত্র ছাড়াও যে বিষযটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে তা হল, আওয়ামীলীগেরই কিছু লোকের আচার আচরণ। উপজেলা নির্বাচনেগুলোতে আওয়ামীলীগের প্রার্থীদের এমন ভরাডুবির কারণ কি শুধু বিদ্রোহীপ্রার্থী? এছাড়া আর কি কোনো কারণ নেই?

যে বিষয়টি স্বয়ং আওয়ামীলীগও কখনো উপলব্ধি করতে পারে নি বা করে নি। এই উপলব্ধি না করার পেছনেও দুইটা বিষয় কাজ করেছে। ১, যাদের কারণে দল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বা হচ্ছে ঘুরে ফিরে তাদের অনেকেই দলের হর্তাকর্তা ছিল এবং আছে!
২, আওয়ামীলীগের নেতাদের দাম্ভিক মনোভাব ও বৃটিশ এবং পাকিস্তান আমল থেকে গ্রহণ করা উপনৈবেশিক শিক্ষা!
অর্থাত দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে আওয়ামীলীগ ছিল তার কিছু লোক বাদে বাকী সবার মনোভাবটা (যা এখনো অনেকের ভেতর পরিলক্ষিত হয়) ছিল এ রকম, দেশ স্বাধীন করেছি আমরা এবং এই দেশে আমরা যা খুশি তাই করবো। লুটে পুটে খাবো, আমাদেরকে কে বাধাঁ দেয়? যার ফলে ৭৪-এর দুর্ভিক্ষসহ এবং দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুকে নানাবিধ জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়ে এবং বিপদকালে পুরানো আপনজনদের প্রায় সবাই তাকে একা করে পিছটান মারে। বঙ্গভবণ থেকে শুরু করে ক্যানটমেন্টসহ প্রাশসনের সর্বত্র ছিল এইসব সুবিধাবাদীদের দৌড়াত্ব এবং তারা এতটাই শিয়াল চক্ষুর অধিকারী ও স্বভোজন ভরায় প্রোতসাহহীন ছিল যে তাদের পথে যে-ই বাধাঁ হয়ে দাড়িয়েছে, তাকে সরে যেতে হয়েছে। প্রথম শিকারটি হয়ে ছিলেন তাজ উদ্দিন আহমেদ, এভাবে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুও তাদের বলির শিকার!

সব মু্ক্তিযোদ্ধাই যে অসাম্প্রায়ািক বা বাঙালী আদর্শের উপর দাড়িয়ে দেশ প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধার আচরণ থেকেই তা প্রতিয়মান হয়েছে। আমি এমন এমন যুক্তিযোদ্ধাকে চিনি যারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অস্ত্র জমা না দিয়ে ঐ অস্ত্র দিয়েই ডাকাতি করেছে, মানুষের বাড়িঘর লুটেছে! আমার চোখের সামনে পুলিশ ঐসব মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির আঙ্গিনা ও ঘরের মেঝ খোঁদাই করে অস্ত্র উদ্ধার করেছে এবং কোমরে দড়ি বেধে থানায় নিয়ে গেছে! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই মুক্তিযোদ্ধাদের একজন স্বাধীন দেশে এলাকায় ডাকাত নামে কু-খ্যাত ছিল এবং পরবর্তীতে নামের পাশে মোল্লা টাইটেল বসিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারও নির্বাচিত হয়ে ছিল ও এলাকায় আওয়ামীলীগের নেতা। যদি আরো বড় আকারে বলতে যাই তাহলে পিরোজপুরের ডাঃ আনোয়ার হোসেনের কথা বলা যায়। যে কিনা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও এলাকায় ত্রাস হওয়ার পরও আওয়ামীলীগের টিকেটে এমপি হয়ে ছিলেন। টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনীর কথা বলা যায়। বঙ্গবীর খ্যাত এই মুক্তিযোদ্ধার(তার ভাইযেরাসহ) লোকেরা সদ্য স্বাধীন দেশে কালিহাতির ভন্ডেশহর ও তার আশপাশ এলাকায় কী ত্রাস যে চালিয়েছে তা অবর্ণনীয়! কত মানুষকে বাড়ি থেকে ধরে ধরে এনে হত্যা ও নির্যাতন করেছে, সেই খবর সারা বাংলাদেশের কয়জনাই বা জানে? এ রকম লোক আওযামীলীগে আরো অনেক আছে। এইসব সুবিধাবাদীরা ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশে যেসব অপকর্ম করেছে, তার বেশির ভাগই আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙ্গিয়ে করেছে! এবং আজও এই সিস্টেম চালু আছে! এক অংশ বাহুজোর ও ক্ষমতা অপব্যাবহারের মাধ্যমে নিজ উদর ভরে, আরেক অংশ গালাগালি করে ও আরেক অংশ সবকিছু জেনে শুনে চুপ থেকে আওয়ামীলীগের ক্ষতি করছে এবং তিন অংশের কেউ কম ক্ষতিকারক নয়! এই যে আওয়ামীলীগের অনেক নেতা থেকে শুরু করে যেসব (সাবেক ও বর্তমান) সাংসদ ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে গা শিউরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ শুনা যাচ্ছে, তারা কারা? তারা কি আদো আওয়ামীলীগের আদর্শকে বুকে লালন করে বা এর দাইড়ার ভেতরে পড়ে?

সেই ১৯৭১ থেকে শুরু করে ২০১৪ সময়টা অনেক লম্বা হলেও, আওয়ামীলীগকে অনেক মাসূল দিতে হলেও, পরিতাপের বিষয় হল, দলে আজও সুবিধাবাদীদের আধিপাত্য ও দৌড়াত্ব বেড়েছে বৈ কমে নি। এসব নিয়ে আওয়ামীলীগকে বিশেষ করে সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক বেশি ভাবতে হবে এবং সুবিধাবাদীরা যাতে তার বা পরিবারের কারো নাম ভাঙ্গিয়ে অথবা স্নেহের পাত্র হয়ে উপরে পানি ঢেলে নিচ দিয়ে গাছ কাটার সুযোগ না পায়। আজ যারা বিএনপিসহ করে অন্যান্য(আওয়ামীলীগ ব্যাতীত) দল করে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাদের বেশির ভাগই আওয়ামীলীগের (সুবিধাবাদীদের) লোকের দ্বারা লাঞ্চিত, প্রতারিত, বঞ্চিত, সর্বপরি ক্ষতিগ্রস্থ। হতে পারে তা আর্থিক, শারীরিক বা মানসিক। নইলে এত কাজ করার পরও, এত কিছু করার পরও সাধারণ মানুষের বিরা়ট একটা অংশ আওয়ামীলীগের প্রার্থীদৈরকে কেন ভোট দিবে না ? আগামীতে দলের ভরাডুবি ঠেকাতে হলে, বিষয়টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশদ ভাবে ক্ষতিয়ে দেখা দরকার।

৪ thoughts on “নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি কেন?

  1. বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লিগের নাম
    বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লিগের নাম ভাঙ্গিয়ে সেই সুবিধাবাদীরা আগে ও যেমন সুযোগ নিতো,এখনো নেয় ।সত্যিই দুঃখজনক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *