বাংলা গানের ইতিহাস (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

চর্যাপদ নয়,সেকালে বঙ্গে আরও অনেকেই গান বা ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করতেন ।এমনকি সঙ্গীত বিরোধী ইসলাম ধর্মেও ধর্মীয় শ্লোক সুর করে গাইবার রীতির মতো তেমন কোনো সঙ্গীতাবস্থা তখনকার সময়ে তৈরী হয়নি ।

দেবতা স্থুতি বা দেবতার অনুগ্রহ কামনা করে রচিত বেশিরভাগ সঙ্গীত গুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে “গীতগোবিন্দ” । জয়দেব কর্তৃক রচিত এ গ্রন্থটির নাম দেখে বোঝা যায় এটি আসলে কবিতা ছিলনা ,ছিলো সুর করে গাইবার মতো পদ্য বা পালাগান ।

“গীতগোবিন্দ ” মুলত সংস্কৃত ভাষায় হলেও বঙ্গে এ গানই তখন সর্বাধিক গাওয়া হত ।

চর্যাপদ নয়,সেকালে বঙ্গে আরও অনেকেই গান বা ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করতেন ।এমনকি সঙ্গীত বিরোধী ইসলাম ধর্মেও ধর্মীয় শ্লোক সুর করে গাইবার রীতির মতো তেমন কোনো সঙ্গীতাবস্থা তখনকার সময়ে তৈরী হয়নি ।

দেবতা স্থুতি বা দেবতার অনুগ্রহ কামনা করে রচিত বেশিরভাগ সঙ্গীত গুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে “গীতগোবিন্দ” । জয়দেব কর্তৃক রচিত এ গ্রন্থটির নাম দেখে বোঝা যায় এটি আসলে কবিতা ছিলনা ,ছিলো সুর করে গাইবার মতো পদ্য বা পালাগান ।

“গীতগোবিন্দ ” মুলত সংস্কৃত ভাষায় হলেও বঙ্গে এ গানই তখন সর্বাধিক গাওয়া হত ।
চর্যাপদের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে গীতগোবিন্দে সর্বভারতীয় রাগ রাগিনীর ব্যবহার অনেক বেশি এবং প্রায় বারোটি ।প্রতিটি পদে তালের উল্লেখ আছে ।যেমন ,একতাল,অষ্টতাল,যতি,রূপক,নিঃসার । এবং চর্যাপদের রাগিনীর সাথে চারটি রাগিনীর মিল পাওয়া যায় ,গুর্জরী(গুঞ্জরী),দেশাখ,বরাড়ী এবং ভৈরবী ।
বাংলা গানের ইতিহাসে এরপরের লিখিত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো বড়ু চন্ডীদাসের “শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন” । যা রচিত হয়েছিলো “গীতগোবিন্দ” লেখারও প্রায় আড়াই থেকে তিনশো বছর পরে । বর্তমান কালের শিল্পবিচারে একে বলা যায় “নাট্যগীতি” বা “Musical”। রাধা ,কৃষ্ণ এবং বড়ায়ির আলাপ পালাগানের আদলে লেখা । এতেও চর্যাপদ ও গীতগবিন্দের মতো রাগিনীর উল্লেখ আছে ।এতে মালব,দেশবড়াড়ী,রামকিরি,বসন্ত্‌বিভাস,নামক রাগিনীর মিল থাকলেও “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন”এ কেদার,কোড়া,বানুষী,আহের,ললিত,গৌরী,শ্রী,পাহাড়ী,বেলাবেলী সহ নতুন কিছু তালের সংযোজন লক্ষ্য করা যায় ।

পনেরো শতকের আগেই বঙ্গদেশে বাংলা ভাষায় সুবদ্ধ সঙ্গীত বেশ দাঁড়িয়ে যায় ।তবে লোক সঙ্গীত কতটা বিকশিত হয়েছিলো তা বলা না গেলেও এক হাজার বছর যে “ভাটিয়ালী” রাগিনীর কথা চর্যাপদে উল্লেখ্য ছিলো ,তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে ।এরপর বিভিন্ন সঙ্গীতজ্ঞের কাছে পড়ে দুই ধরণের বিদগ্ধ রূপ ধারণ করে । উত্তর ভারতে সুবদ্ধ সঙ্গীতে প্রচলিত একটির রূপ বাউল সুরের মতো হলেও অপরটির সাথে বাংলাদেশের ভাটিয়ালী সুরের কোনো মিল পাওয়া যায় না ।

ষোলো শতকের দিকে “কীর্তন” একটি বিদগ্ধ এবং সুবদ্ধ সঙ্গীতের চেহারা নেয় । শ্রীচৈতন্য ধর্ম প্রচার করেন বাংলা ভাষায় এবং তাঁর ধর্মে শাস্ত্রের কথা যৎসামান্য । বরং জীবে দয়া এবং নামে রূচি/জপের কথা যেনো আবেগের সাথে এজন্য তিনি নামকীর্তন প্রচার করেন । কোনো জটিল সুরের আশ্রয় না দিয়ে গাওয়া এ কীর্তনের দলে পরবর্তীতে কিছু গান জানা লোক জুটে যান এবং এই কীর্তনের মধ্যেই রাগ-রাগিনীর ব্যবহার করতে শুরু করেন । কীর্তনের এই প্রামাণ্য রূপটা মূলত বঙ্গীয় এবং এই রূপকেই বিকশিত করার জন্য নরোত্তম ঠাকুরকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায় অবতীর্ণ করানো যায় । ১৫৮৫ সালে রাজশাহীর “খেতরি”তে, বঙ্গ এবং বঙ্গের বাইরের থেকে আগত বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞের সম্মেলনে কীর্তনের একটা প্রামাণ্যরূপ দেয়ার প্রস্তাব করা হয় । আলোচনা এবং মতানৈক্য থাকা সত্বেও অল্পদিনের মধ্যে কীর্তন গানে অন্তত পাঁচটি ঘরানা প্রস্তুত হয় । এগুলি হলো নরোত্তম ঠাকুরের প্রবর্তিত “গরাণহাটি ঘরানা” , জ্ঞানদাস মনোহরের “মনোহরশাহী ঘরানা”,বিপ্রদাস ঘোষের “রানিহাটি ঘরানা” এবং সরকার মন্দারনের নামানুসারে “মন্দারনী ঘরানা”।

আঠারো শতকে একটি সরলীকৃত কীর্তনের ধারা গড়ে উঠে । কীর্তন হলো প্রথম সত্যিকারের বঙ্গীয় গান । কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে তার মূলধারা অব্যাহত থাকেনি । তা পরিবর্তিত হয়ে একটি সরলীকরণ রূপ গড়ে উঠে ,যার নাম “ঢপ কীর্তন” ।এতে তখনকার সময়ের পাঁচালী,কথকতা এবং বাউল গানের প্রভাব পড়েছিলো ।এদিকে বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্মের দিকে মানুষের ঝোঁক বেড়েছে । বহু দেবতারদিকে হাত জোড় করে কচকচানি করার বিশ্বাস ছেড়ে অনেকেই এ পন্থার দিকে ঝুঁকছে । এরপর পরই যে বিপ্লব ঘটে তা হলো পালা কীর্তনের হাত ধরে । যেমন “নৌকা বিলাস” ,“নিমাই সন্ন্যাস ” জাতীয় পালাগান গুলো যেগুলো আদতে গাওয়া হত “ঢপ কীর্তন” এর ঢং য়ে,তাতে যোগ হতে লাগলো নতুন নতুন মিশ্রণ ।

“বিদায় দাওগো শচীমাতা
আমি সন্ন্যাসেতে যাই”
-নিমাই সন্ন্যাস

কিংবা,

“ফুলে কালো ভ্রমর বসেছে
রাধে আমার মান করেছে”
-নৌকা বিলাস

এরই মধ্যে “পাঁচালী গান” নামের একটি গান বেশ জনপ্রিয়তা পায় । রাগ ও তালের বিচারে কীর্তনকে বিদগ্ধ সঙ্গীত বলা হলে পাঁচালীকে বলা হবে লৌকিক সঙ্গীত । এ ধারাটিতে নাটকীয়তা আনয়ন করে কথকতা,আবৃত্তি,সুরারোপিত শ্লোক ব্যবহার করে দর্শকের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করা হতো । পালাগানের আদলে রচিত এ গানে যেমন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়ের কাহিনী থাকত তেমনি রামায়ন বা মহাভারত কিংবা বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীও রসালোভাবে পরিবেশন করা হত ।
বৈষ্ণব ধর্মের প্রচলন ও জনপ্রিয়তার ফলে শাক্ত ধর্মের মলিনতার দ্বন্দে আমরা বাংলা ভাষার গানের জগতে আরেকটি নতুনত্বের দ্বার খুলে গিয়েছে বলে লক্ষ্য করি ।শাক্ত ধর্ম প্রাচীন হলেও চৈতন্য দেবের আভির্ভাবে বৈষ্ণব ধর্ম জনপ্রিয়তা পাওয়ার ফলে আঠারো শতকের নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বেশ সাড়ম্বরের সঙ্গে কালীপূজার প্রচলন করেন (মনে করা হয় আর্যরা ছিলো মাতৃতান্ত্রিক,কেননা তাদের দেবতার চেয়ে দেবীর সংখ্যাই বেশি)। তখন অন্তত দুজন বিখ্যাত শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতার আভির্ভাব ঘটে । একজন রামপ্রসাদ সেন ও অন্যজন শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্তী । মূলত দুইজনেরই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভালো দখল থাকলেও রামপ্রসাদের গানে যে লোক সঙ্গীতের প্রভাব পড়েছিলো, তা কমলাকান্তর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো । যেমন,
“সকলি তোমারই ইচ্ছা
ইচ্ছাময়ী তারা (কালী) তুমি
তোমার কর্ম তুমি করো মা
লোকে বলে করি আমি।”
(রামপ্রসাদী শ্যামা সঙ্গীত)

শাক্তদের এ গানের জগতে একটা সম্প্রদায় আলাদা মত পোষন করে বিভক্ত হয়ে গেলো । যারা তন্ত্রে বিশ্বাস করে তারা সরাসরি শাক্ত না হয়ে একটা ভিন্ন সম্প্রদায় গঠন করলো ।এঁরা “বাউল সম্প্রদায়” নামে পরিচিতি পেলো ।বাউলেরা বিশ্বাস করে মানব দেহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক ।“যা আছে ভাণ্ডে,তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে”, তারই মধ্যে মনের মানুষ বিরাজ করেন এবং এই মনের মানুষকে তাঁরা পেতে চান দেহ এবং প্রেমের সাধনার মাধ্যমে ।

তথ্যের উপর নির্ভর করে বলা যায় আমাদের সামনে যে “বাউল” বা “বাউল” শব্দ দিয়ে যা বোঝায় তার আবির্ভাব পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে । “বাউল”মতের উদ্ভব নিয়ে যেমন চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যায় না তেমনি “বাউল” শব্দটির উদ্ভব নিয়ে রয়েছে নানা মুনীর নানা মত । কোন কোন গবেষকের মতে সংস্কৃত ‘ব্যাকুল’ বা ‘বাতুল’ শব্দ হতে “বাউল” শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ হলো উন্মাদ, পাগল। আবার কারো কারো মত হিন্দি ‘বাউর’ শব্দ থেকে “বাউল” শব্দটি বাংলায় এসেছে¬ যার অর্থ হলো পাগল ।
ড. এস এম লুৎফর রহমান “বাউল” শব্দের উদ্ভবের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে তিনি চর্যাগীতি ও সমালোচনা রচনার কথা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে “বাউল” শব্দটি একটা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান আকারে এসেছে । তিনি মনে করেন বাজির,বাজ্জিল, বাজুল এগুলি “বাউল” শব্দের আদিরূপ । তার মতে “বাউল” শব্দটির বিবর্তনের ক্রমপর্যায় এমন-বাজ্রী-বাজ্জির-বাজির-বাজ্জিল-বাজিল-বাজুল-”বাউল”। বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে শব্দটির রূপ ভিন্ন হলেও এর অর্থের কোন হেরফের হয়নি । এক্ষেত্রেও “বাউল” বলতে ভাবের উন্মাদ বা পাগলকেই বোঝানো হত । কিছু কিছু পণ্ডিতের মতে “বাউল” শব্দটি উৎপত্তিগতভাবে “বাংলা”। অর্থাৎ বাংলা-বাঙল-বায়োঁল-বাউল ,অর্থাৎ “বাউল” শব্দের উৎপত্তি।

ড. আহমদ শরীফেরও মত হিন্দি ‘ব্যাকুল’ বা ‘বাতুল’ থেকেই ‘“বাউল”’ শব্দের উদ্ভব । তিনি অনুমান করেন, ‘ব্যাকুল’ বা ‘বাতুল’ থেকেই ‘বাউল’নামের উদ্ভব । কিন্তু ড. শরীফ তার এই সিদ্ধান্তেও অটল থাকতে পারেননি । তিনি অন্যত্র বলেছেন,
‘চর্যাগীতির’ ‘বজ্রকুল’ থেকেই কালে “বাউল” শব্দের উদ্ভব ।
ড. আনোয়ারুল করিমও তাঁর সিদ্ধান্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষণে ক্ষণে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন । তিনি প্রথম দিকে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তার “বাউল” কবি লালন শাহ বইতে ফারসি ভাষা থেকে “বাউল” শব্দের উদ্ভবের কথা বললেও পরে মত পাল্টিয়ে বলেন, ফারসি নয় বরং আরবি শব্দ আউলিয়া শব্দ থেকে “বাউল” শব্দের উদ্ভবের সম্ভাবনাই বেশি । তিনি বলেন “আউলিয়া” শব্দের অপভ্রংশে “আউল” এবং পরে “বি”অনুকার অব্যয় সংযোগে “বাউল” শব্দের উদ্ভব । তিনি “বাউল” শব্দের ব্যুৎপত্তির ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে সেমেটিক ধর্মীয় গ্রন্থ তৌরাত, জাবুর, ইঞ্জিল এবং কোরানে উল্লেখিত প্রাচীন প্যালেস্টাইনের “বা’আল” সমপ্রদায়ের উল্লেকপূর্বক “বা’আল” শব্দ থেকেই “বাউল” শব্দের উৎপত্তির কথা বলেছেন ।
“বাউল” শব্দের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস যা-ই হোক সর্বক্ষেত্রেই এটা একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। অর্থাৎ “বাউল” বলতে এমন একব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টিকে বুঝায় সমাজের চোখে যারা অত্যন্তনীচ, নিঃস্ব এবং পাগল। তাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, বিষয়-সম্পত্তি বা সামাজিক প্রতিপত্তি বলতে কোনো কিছুই নেই। তাদেরকোনো স্থায়ী বসতবাড়ি নেই। তারা একস্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং পরান্নে জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকে। “বাউল” সে যে সমাজেরই হোক তার বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন প্রণালি, সমাজে তার সামাজিক অবস্থান একই।

তবে এর আগেও “চর্যাপদ” এ বাউল প্রভাব পাওয়া গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে উদ্ভব হয় ষোড়শ শতকে । আর বাংলা গানের ইতিহাসে এই বাউল যুগটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তারকারী । ইতিহাস থেকে জানা যায় মাধব বিবি ও আউল চাঁদ নামক দুই জনের নাম । আউল চাঁদকে অনেক “কর্তাভজা” সম্প্রদায়ের আদি গুরু বলে থাকেন ,এই হিসাবে মাধব বিবির হাতেই বাউল সম্প্রদায় দিক পায় । মাধব বিবি আউল চাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করলেও তিনি গুরুর মতবাদ অনুসরণ না করে নিজে একটা মতবাদ প্রবর্তন করেন । শ্রীচৈতন্য সহচর শ্রী নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র মুসলমান মাধব বিবির নিকট দীক্ষা গ্রহণ করে এই মতবাদকে জনপ্রিয় করেন । পরবর্তীতে তা লালন শাহের হাতে পড়ে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় ।
লালন শাহের শিষ্য দুদ্দু শাহ তাঁর এক গানে বলেন,
“দরবেশী বাউলের ক্রিয়া,
বীরভদ্র জানে সেই ধারা,
দরবেশ লালন সাঁইয়ের কথায়
দুদ্দু জানায় তাই ।।“
এরপর সিরাজ শাহ এর কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন লালন শাহ ।তার গানে উঠে আসে বঞ্চনা, শোষন, আধ্যাত্মিকতা, নবী তত্ত্ব, শ্রীকৃষ্ণ-রাধার প্রেম, নিমাই পালা, এবং সর্বোপরি জাত-পাতের কথা ।

যেমন,

“জাত গেলো জাত গেলো বলে
একি আজব কারখানা” -জাতিভেদ

“নবী না মানে যারা
মোহাহেদ কাফের তারা এই দুনিয়ায়
এ কথা লালন কয়না কোরানে কয়” –নবী তত্ত্ব

“এক কানা কয় আরেক কানারে
চলো এবার ভবপারে
নিজে কানা পথ চেনেনা
পরকে ডাকে বারংবার” – আঁধার ভেঙে বেড়িয়ে আসার জন্য ।

“করিয়ে পাগল পারা তারাই নিলো সব লুটে
শহরের ষোলো জনা বোম্বেটে” -লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে ।

তাঁর এই গান নিরক্ষর মানুষের কাছে পৌঁছানো শুরু করলে বাউল গানের ধারার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে । এমনকি “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা”র প্রচারক কাঙাল হরিনাথ “ফিকির চাঁদের বাউল দল” নামে একটি বাউল দল গঠন করে গ্রামে শহরে বাউল গান বিশেষ করে লালনের গানকে প্রচার করেন ।লালন শাহ এর আরেকটি বড় কৃতিত্ব হলো তিনি গানে গানে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখিয়ে গিয়েছেন । তিনি “মানবতা” মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন গানের মাধ্যমে,
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
মানুষ ছাড়া ক্ষেপারে তুই মূল হারাবি”

“ ভজো মানুষের চরণ দুটি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি”

“ সেকি অন্য তত্ত্ব মানে ?
মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে”
সহ অসংখ্য মানবতাবাদী গানের স্রষ্টা তিনি ।

এরপর প্রচলিত বাউল ,ভাওয়াইয়া ,লোক ইত্যাদির সম্মিলনে আরেকটি বড় ধরণের লোক গানের জায়গা পাওয়া যায় যা “মৈমনসিংহ গীতিকা” নামে পরিচিতি পায় । মূলত এটি ছিলো বঙ্গদেশের মৌলিক এবং মানবীয় প্রেম কাহিনী নির্ভর । এটি “পালাগান” ধরণের । এর বিখ্যাত দুটি পালা “মহুয়া” ও “মলুয়া” ছাড়াও, “কমলার বনবাস” ও “রহিম-রূপবান” সমান সমাদৃত ।
সহজ কথা ও সহজ প্রাণছোঁয়া লোক সুরে করা গান গুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায় ।যেমন,
“জল ভরিতে আইছ কন্যা,জলে দিছ ঢেউ
আমার সাথে কথা কওনা,সঙ্গে নাইতো কেউ”
– মহুয়া গীতিকা

এরপর ১৮০০ সালের দিকে আরেকটি শেকল ছেঁড়া ধারা নিয়ে আসেন নিধুবাবু ওরফে রামনিধি মজুমদার ।পাঞ্জাবী “টপ্পা”র ক্ষিপ্র গলার কাজকে অলংকারিক ভাবে মন্থর করে বাংলা গানের উপযোগী করে তোলেন ,যা “নিধুবাবুর টপ্পা গান” নামে পরিচিতি পায় ।
পরবর্তীতে কালিদাস চট্টোপাধ্যায় বা কালী মীর্জা, শ্রীধরকথক, গোপাল উড়ে প্রমুখ টপ্পার চালে কীর্তন এবং শ্যামা সঙ্গীত প্রচলন করেন ।
এরপরই বাংলা গানের জগতে ধ্রুপদী গানের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় । উনিশ শতকের কলকাতায় বাংলা গান ছড়িয়ে পড়ার এবং এর মান উন্নত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইউরোপীয় প্রভাব ।ইংরেজদের রাজত্বকালে কলকাতায় যে থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে যে গান ব্যবহার করা হতো তা ছিলো নাটকীয় গুন সম্পন্ন ।এ “পারফর্মিং আর্ট (Performing Art)” জাতীয় গান গুলো সাধারণ গান গুলো থেকে আলাদা হয়ে যায় ।
রবীন্দ্রনাথ ও তার সমসাময়িক কয়েকজনের জন্মের পরপরই বাংলা গানের ইতিহাস চিরদিনের জন্য পালটে যায় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১),দ্বিজেন্দ্রলাল রায়(১৮৬৩),রজনীকান্ত সেন(১৮৬৫) এবং অতুল প্রসাদ সেন(১৮৭১) ছিলেন একাধারে গীতিকার,সুরকার,গায়ক । এঁদের অবদান খুব অল্প সময়ে বাংলা গানকে আমূল পালটে দেয় ।
রবীন্দ্রনাথকে বলা যায় বাংলা গানের প্রবাদ পুরুষ । নিজের দেশের গান নিয়ে গবেষনার পাশাপাশি অন্যান্য দেশ (যেমন স্পেন,ইতালি,ফ্রান্স) ইত্যাদি দেশের সুর অনুসরন করেছেন ।যেমন,
“ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়” -স্প্যানিশ
এছাড়া তিনি বাউল গানেও প্রভাবিত ছিলেন । বিশেষ করে লালন শাহ’র । তিনি বাউল প্রভাবে লেখেন,
“আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি সকল খানে ”
দ্বিজেন্দ্রলাল বাংলা গানকে একটা রীতিতে নিয়ে এসেছিলেন,যে রীতিতে গান লিখেছিলেন তা হলো স্বাদে রূচিতে আলাদা ।খেয়াল বা টপ্পা গান শিখলেও ধ্রুপদাঙ্গ ছাড়া কোনো রাগের প্রভাব তার গানে পড়েনি ।আবার শাস্ত্রীয় দোষও কাটাতে পারেননি ।যেমন,
“ধনধান্যে পুষ্পে ভরা ,আমাদেরই বসুন্ধরা তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা”
বাংলার বাইরের গান দিয়ে গানের ধারাকে সমৃদ্ধ করেন অতুলপ্রসাদ সেন ।তাঁর গানে বিরহ-যাতনায় অধীরতা বোঝালেও দেশাত্মবোধক গান তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো ।যেমন,
“মোদের গরব মোদের আশা ,আ-মরি বাংলা ভাষা”
মাত্র শ’দুয়েক গান লিখলেও তাঁর বৈশিষ্ট্যমন্ডিত গানের জন্য আজও সমাদৃত ।
রজনীকান্ত সেনও বাংলা গানে একটা আলাদা ধারা তৈরী করেন ।সরলতা এবং ভক্তিমাধুর্য্যতার জন্য তাঁর গান বিশেষ সমাদৃত হয় ।প্রথম দিকে সাধারন বাংলা,বিষন্নতায় মোড়া গান লিখলেও শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথের মত রাগ নির্ভর গান লেখা শুরু করেন।
এরপর বাংলা গানের জগতে নজরুল ইসলামের আভির্ভাব অনেকটা অনেকটা অনাকাঙ্খিত ধুমকেতু । দারিদ্র,দুঃখ,অভাব আর কষ্টের মাঝে জ্বলতে থাকা এ প্রদীপ নিজের একটা আলাদা গানের ভুবন তৈরী করে নেন । আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত শেখা ছাড়াই এতবড় সঙ্গীতজ্ঞ হওয়া নজরুল,শেখা গানের পথে না হেঁটে নিজ গুনে নিজের পথে চলতে শিখেছিলেন । নজরুলের গান শেখার সুযোগ হয়েছে খুবই কম ।তারপরও তিনি ঠুংরী,টপ্পা আর খেয়াল দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন ।কথার চেয়ে সুর সৃষ্টির দিকেই ঝোঁক ছিলো তাঁর । যেমন,
“আলগা করগো খোঁপার বাঁধন,দিলও হি মেরা ফাস্‌ গেয়ি” – টপ্পা গানের ক্ষিপ্রতা ।
আবার শ্যামা সঙ্গীত লিখে তিনি মুসলমানদের বিষচোখে আসলে ইসলামী সঙ্গীত লেখা শুরু করেন । যেমন,
“তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে”- গজল ঘরানা ।
তাছাড়া তাঁর বিদ্রোহ দাবানলের মত ছড়িয়ে গিয়েছিলো সারা ভারত বর্ষে ।ফলে ব্রিটিশদের চক্ষুশুলে পরিণত হন ।তাঁর বেশ কিছু গান অ কবিতার বই বাজেয়াপ্ত করা হয় ।যেমন,
“কারার ঐ লৌহ কপাট,ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী”
এরপর বাংলা গানের ইতিহাসে তেমন কোনো প্রতিভাবান আসেননি ।বিশেষ করে ১৯৪০ সালের দিকে শৈলেন রায়,অজয় ভট্টাচার্য,বাণী কুমার,সুবোধ কুমার পুরকায়স্থ,প্রণব রায়েরা গীতিকার হিসাবে আসলে সুরকার হিসাবে দিলীপ কুমার রায়,রাইচাঁদ বড়াল,কৃষ্ণচন্দ্র দে,শচীন দেব বর্মন,কমল দাশ গুপ্ত,সুধীরলাল চক্রবর্তী,হিমাংশু দত্ত,অনীল বাগচি,অনুপম ঘটকেরা এগিয়ে আসেন । আর এই ত্রিবিভক্ত(গীতিকার,সুরকার,গায়ক) ধারায় শিল্পী ছিলেন কুন্দ লাল,সায়গল,কানন দেবী,কমলা ঝরিয়া,ইন্দু বালা,আঙুর বালা,জগন্ময় মিত্র শৈল দেবীর মতো লোকেরা ।
এরপর পরই আসেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়,মান্না দে,জগজিৎ সিং,ভূপেন হাজারিকা’র মত মায়াবী কণ্ঠের গায়কেরা । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গাওয়া সলিল চৌধুরীর সুরে “রানার” কিংবা “গাঁয়ের বধু ”,গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সাথে জুটি বাঁধা মান্না দে’র “কফি হাউসের সে আড্ডাটা” কিংবা ভূপেন হাজারিকা’র “মানুষ মানুষের জন্যে” আজও মানুষকে আবেগে ভাসায় ।
১৯৫০ এর দশকে সিনেমা জগতে নতুণ সাড়া লক্ষ্য করা যায় ।সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়,সতীনাথ মুখোপাধ্যায়,শ্যামল মিত্র,ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য,মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,সত্যজিৎ রায় ও রবিশংকর জুটি’র মতো শিল্পীরা বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেন ।
সত্তুরের দশকে আসে যুদ্ধের জাগরনী ও দেশাত্মবোধক গান । এগুলোর প্রভাবব্যাপ্তি এত যে এই আলোচনায় আর সম্ভব নয় । আশির দশকে পপ গুরু আজম খানের হাত ধরে যে ব্যান্ডের বা পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের যে ধারাটা আসে তা পরিবর্তিত হয়ে পুরোপুরি পাশ্চাত্যের ধারার দিকে যাচ্ছে ।পালটে যাচ্ছে চিরপরিচিত ফোক (Folk) বা পল্লী গীতি এর ধরন ।সে আলোচনা অন্য একদিন ।

কিন্তু এই আগ্রাসী বিশ্বায়নের আকাশ সংস্কৃতির যুগে গানের আসল ধারা টিকিয়ে রাখা যতটুকু না কষ্টসাধ্য,তার চেয়ে বেশি কষ্ট হলো তার স্বত্তাকে হৃদয়ে ধারণ করা । গান আত্মার খোরাক ,গান প্রানের খোরাক । সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আনন্দ –কান্না যে কোনো অনুভুতি প্রকাশ পায় গানে ।গানে জেগে ওঠে হৃদয় ,গানে জেগে ওঠে ভালোবাসা ।আর কিছু না থাক যদ্দিন কথা আছে ,ভাষা আছে, অনুভূতি আছে থাকবে সুর, থাকবে গানের প্লাবন ।

আলেক সাঁই ।

৩ thoughts on “বাংলা গানের ইতিহাস (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

  1. একটা লেখা লিখেই আড়ালে চলে
    একটা লেখা লিখেই আড়ালে চলে গিয়েছিলাম,দুর্ভাগ্যবশত আইডিও হারিয়ে ফেলেছিলাম।কিন্তু গতকাল পুরানা বাতিল কাগজের মধ্যে আইডি সহ পাসওয়ার্ড জ্বলজ্বল করে উঠলো দেখে মন্টা খুশি লাগলো ।এই লেখাটায় চেষ্টা করা হয়েছে পরিচিত গানগুলো উদাহরণ হিসাবে টানার জন্য । আর আমার লেখার ধারাবাহিকতা,তথ্যের কোনো প্রকার অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়লে জানাবেন ।আমি সংশোধন করার নেবো ।
    ভালো থাকবেন সবাই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *