বাংলা ভাষার উদ্ভব কেমন করে ?

আমরা একটি কৌতুহুলি বালকের গল্প শুনব। বালক সবেমাত্র বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়েছে।নিজের মত করে বানান করে পড়ে।স্বর-আ “ম” আম।তাকে অনেক কিছুই আবার বর্ণমালা দিয়ে সাজিয়ে লিখতেও হয়।মাস্টার মশাই তাকে ফলের নাম,ফুলের নাম,পাখির নাম ইত্যাদি অনেক কিছুই লিখতে দেন।সে এক সময় মাস্টার মশাইয়ের দেয়া কাজগুলি সবই পারতে শুরু করল।এবং একদিন বিকেলে,পাখির বাসা খুজতে খুজতে যখন হয়রান,তখন আনমনে ভাবতেছিল,আচ্ছা বর্ণমালা দিয়ে কি সবই লেখা যায়?তারপর তার চারপাশে যা চোখে পড়ল পাখি,পাখির বাসা,ডিম,হাত,মাটি,গাছ,এমনকি পৃথিবী বা সূর্য সবকিছুই বানান করে দেখল,লেখা যায় কিনা?এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল,যে মামুলি বর্ণমালা সে সে তার মাস্টার মশাই আর তার মায়ের কাছে অল্প কয়েকদিন ধরে শিখেছে,তাতে সে তার দেখা, এমনকি কল্পনার সবকিছুই লিখে ফেলতে পারছে।সে অনেক আশ্চর্য জিনিস কল্পনা করতে চেষ্টা করল।এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল,এই বর্ণমালা দ্বারাই সে সব কিছু লিখতে পারছে।

ঐদিনের পর থেকে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন।কে বানাল এই জাদুকরি বর্ণমালা?কেউ তো একজন বানিয়েছেই, নাকি ?আর আরেকটা ব্যাপার সে লক্ষ করল।সে যা ভাবছে তার সবই যেন তার মাথার মধ্যে বলা হয়ে যাচ্ছে।কি অদ্ভুত!সে তার নিজের মাথার ভিতর এই না বলা ছাড়া যেন কিছুই ভাবতেও পারছে না।আর মাথার ভিতর যা বলা হয়ে যাচ্ছে তার সবই সে বর্ণমালা দিয়ে লিখে ফেলতে পারবে।সত্যিই অবাক।
এরপর থেকে সে অনেকের কাছেই জানতে চেয়েছে, আচ্ছা বলতো, কে বানাল এই বর্ণমালা? আর কবেই বা বানাল? তার আগে মানুষ কিভাবেই বা লিখত?

কৌতুহুলি বালক কিন্তু সেদিন কারও কাছ থকেই তার মনের মত উত্তর পায় নি।
আর যে জিনিসটি তার বলা হয়নি,সেটি হল ,মাথার ভিতর কথা না বলে কেন ভাবা যায় না?
কিন্তু বালক মনের উপলব্ধি আসলে কতটুকু ঠিক?

সত্যি কথা বলতে কি, বালকের উপলব্ধির অনেকটাই ঠিক!মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তনের ফলে আজকে কোন কিছু ভাবার জন্য আমরা ভাষাকে ব্যবহার করি।আর তাই মানুষ যখন ভাষার ব্যাবহার ভাল মত জানত না তখন সভ্যতার অগ্রগতিও হয়েছে অনেক ধীরে-ধীরে।সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন যে, নতুন ভাষা শিখলে আমাদের মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।একদল শিশুর উপর গবেষণা করে জানা গেছে, কম বয়সে যারা একাধিক ভাষা শিখে তাদের মানসিক দক্ষতা, শুধু ১ টি ভাষা জানা শিশুর থেকে অনেকখানি বেশি ।এর সবচেয়ে বড় কারন হল, কোন কিছু ভাবার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক ভাষাকে ব্যাবহার করে।এমনকি কল্পনা করার বাপারেও ভাষার ব্যাবহার আছে।তাই মানুষের সংস্কৃতি আর তার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে তার মুখের ভাষা।

তাই আমরা বলতে পারি একটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সত্ত্বার প্রধান বাহক হল তার মুখে বলার ভাষা।আর এই মুখে বলার ভাষাই এক সময় লেখ্য রুপ নেয়(দু একটি ক্ষেত্রে অবশ্য বাতিক্রম হয়,তবে খুব কম)।বাঙালি জাতির মুখে বলার ভাষা হল বাংলা ভাষা।

আজকের দিনের এই বাংলা ভাষা কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হয় নি। এই জাতি তার ইতিহাসের হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে আজকের এই বাংলা ভাষা। হাজার বছর আগে বাংলা ভাষা শুনতে আজকের মতো ছিল না।এর বর্ণমালাও এ রকম ছিল না।শত-শত বছর ধরে একটু একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে আজকের বাংলায় পরিনত হয়েছে। যদি আমরা বাংলা ভাষার একেবারে শুরুর দিক থেকে আজকের পর্যন্ত পথ পরিক্রমা জানতে চাই,তাহলে আমাদের আজ থেকে প্রায় ৭০০০ বছর পিছনে ফিরে যেতে হবে।তখন এই এশিয়া-ইউরোপ আর ভারতবর্ষ জুড়ে একটিমাত্র মূলভাষা ছিল।তার নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা।এই মূলভাষার বাইরে যে কোন ভাষাই ছিল না, তা না।এই মূলভাষার বাইরেও কিছু ভাষা ছিল।তবে সেসব ভাষাভাষী লোকগুলো সভ্যতার মূলস্রোতে ছিল না।এরা মূল ভুখন্ডের সভ্যতা-গুলোর বাইরে পাহাড়ি বা ঘন জঙ্গলের মধ্যে থাকত।আসলে এসব ক্ষুদ্র বর্বর জনগোষ্ঠীর ভাষার বিকাশ তখনো শুরু হয়নি। এমনকি সেগুলোকে ভাষা বলাটাও বোধ হয় ঠিক হবে না।লক্ষ করলে দেখা যায়, আফ্রিকার কিছু কিছু উপজাতিদের ভাষা এখনো আধুনিক ভাষার মত বিকশিত হয় নি।এদের কিছু ভাষার বর্ণমালাও নেই। যাই হোক, সভ্যতা তৈরি করা মানুষগুলোর সাথে এসব ক্ষুদ্র বর্বর জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে।অবশ্য বেচে থাকার তাগিদে তাদের কখনো কখনো ঐসব অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা খুবই কম ঘটেছে।আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা সমভূমিতে নেমে আসলেও কিছুদিনের মধ্যেই সভ্যতায় এগিয়ে থাকা লোকজনের ভাষাকেই গ্রহন করেছে।তাই আমরা মূল ভাষাগোষ্ঠীর বাইরের লোকজনকে আলোচনায় আনব না।কারন এইসব ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষাগুলো বর্তমানের প্রধান ভাষাগুলোর বিবর্তনে কোন ভুমিকা রাখে নি।

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের চাহিদা বাড়ে।আর তারা ভাল খাবার আর উন্নত বাসস্থানের খোজে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।এর ফলে ৭০০০ বছর পূর্বের ইন্দোইউরোপীয় মূল ভাষা ভেঙ্গে দুটি ভাষাগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়।কারন ঐ সময়টায় সভ্যতা কেবল মেসোপটেমিয়া ও এশিয়ার মাইনরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে নি।সময়টা আরও ১৫০০ বছর পর।মানে আজ থকে ৫৫০০ বছর আগের।এই সময়টায় সভ্যতার চাকা যেন একটু দ্রুত চলতে থাকে।এর কাছাকাছি সময়টাতেই মিশরের রাজবংশ গঠিত হয়,সুমেরীয় সভ্যতা সহ আরও কিছু মেসোপটেমিয় সভ্যতার সুচনা ঘটে,সেমেটিক জাতীভুক্ত এসেরিয় সভ্যতা দানা বাধতে শুরু করে,প্রাক সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ হয়ে সিন্ধু সভ্যতার শুরু হবার কাজ চলতে থাকে।ঠিক এই সময়টায়ই মানে আজ থেকে প্রায় ৫৫০০ বছর আগে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।এদের একটির নাম শতম আরেকটির নাম কেস্তম।কেস্তম শাখা হতে বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে পরে ইতালীয়, ফরাসি ,স্প্যানিশ,ইংলিশ,জার্মান ইত্যাদি ভাষার উৎপত্তি হয়।কিন্তু এই ভাষা গোষ্ঠীর সাথে আমাদের বাংলা ভাষার কোন যোগ নেই।বাংলা ভাষার সাথে যোগ হল শতম শাখার।সভ্যতার অগ্রগতি আর জীবিকার তাগিদে মানুষ নতুন সভ্যতা গড়তে থাকে।আর মানুষের দলগুলো আরও ছড়িয়ে পড়তে থাকে।যার ফলে ভাষার রুপও বদলে যায়।শতম ভাষাগোষ্ঠী সৃষ্টি হবার প্রায় ১০০০ বছর পরে মানে আজ থেকে প্রায় ৪৫০০ বছর আগে এই ভাষাগোষ্ঠীটি ৪ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।এদের এক দল ইরান,আফগানিস্তান হয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে।এই দল যে ভাষায় কথা বলত তার নাম ইন্দো-আর্য ভাষা।এরা ইরান, তুরান,কাশ্মীর সহ ভারত উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পরে।এরা সবাই ইন্দো-আর্য ভাষায় কথা বলত।কিন্তু ইরান, তুরান ও ভারতবর্ষে ছরিয়ে পরার পর ভূমিরূপ ও অঞ্চলের বিভিন্নতার ফলে এদের ভাষায়ও বিভিন্নতা দেখা দেয়।এদের মধ্যে যারা ভারত উপমহাদেশে রয়ে যায় তাদের ভাষার নাম প্রাচীন ভারতীয় ভাষা।এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে , তাহলে ইরান আফগানিস্তান হয়ে লোকগুলো ঢোকার আগে কি ভারতবর্ষে মানুষ ছিল না?আসলে বাপারটা সে রকম না।এরা ঢোকার আগেও এই উপমহাদেশে মানুষের বসতি এমনকি সভ্যতার বিকাশও হয়েছিল।তাদের নিজস্ব ভাষাও ছিল।সিন্ধু সভ্যতার সিন্ধু লিপি এ ধরনের ভাষার প্রমান।কিন্তু ইন্দো-আর্য ভাষাভাষী লোকজন প্রবেশ করার ফলে তাদের ভাষা আর এদেশের ভাষা মিলেমিশে এক নতুন ভাষার সৃষ্টি করে।কিন্তু এই ভাষার মধ্যে ইন্দো-আর্য প্রভাব বেশি।কারন সে সময় এরা রাজশক্তি হিসেবে আসে। মানে তারা যুদ্ধ করে রাজ্য জয় করে বসবাস করা শুরু করে।পাশাপাশি তাদের ভাষাও ছিল এদের থেকে কিছুটা উন্নত।তবে এই ভাষা যে ইন্দো-আর্য ভাষা আর এই উপমহাদেশের ভাষার মিশ্রন তার পক্ষে সম্প্রতি বড় কিছু প্রমান মিলেছে।সিন্ধু লিপি নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবত গবেষণা করছেন।এর মধ্যে একটি প্রজেক্টে, সফটওয়ারের সাহায্যে সিন্ধু লিপি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়।যদিও সিন্ধু লিপির পাঠউদ্ধার করা সম্ভব হয় নি,কিন্তু কম্পিউটার পোগ্রাম বলছে এই লিপির sufix(প্রত্যয়) এর ব্যবহার, উপমহাদেশের দ্রাবির ভাষার সাথে হুবহু মিল।তাহলে দেখা যাচ্ছে সিন্ধু লিপির ভাষা ব্যাকরণ সুগঠিত একটি ভাষা।যেহেতু আর্যরা আসার আগেও এখানে উন্নত ভাষার বিকাশ ঘটেছিল তার মানে প্রাচীন ভারতীয় ভাষা হল ইন্দো-আর্য ভাষা আর উপমহাদেশীয় ভাষার মিশনের ফল।এবং তা ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে অনেকটাই আলাদা।এই ভাষার জন্মের সময়কাল প্রায় খ্রিঃপুঃ ১৪০০ সাল ।এই প্রাচীন ভারতীয় ভাষার আবার দুইটি ভাগ ছিল।

১. বৈদিক
২.প্রাচীন প্রাচ্য ভারতীয় আর্য

এক নম্বরে যে বৈদিক ভাষার কথা বলা হয়েছে ,প্রথম দিকে সে ভাষার কোন লেখ্য রুপ ছিল না।এ ভাষায়ই বেদ রচনা করা হয়।প্রথম দিকে বেদের লিখিতরুপ ছিল না।গুরুর কাছ থেকে শিষ্যরা শুনে শুনে বেদকে মনে রাখত।তাই বেদের আরেক নাম শ্রুতি।পরবর্তীতে বেদকে সংকলন করার জন্য বৈদিক ভাষার একটি লিখিত রুপ তৈরি করা হয়।এই ভাষা-ই সংস্কৃত।বেদ সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়।তাই সংস্কৃত ভাষার আরেক নাম বৈদিক ভাষা।মুলত ঋকবেদের শ্লোকগুলো সংরক্ষন করার জন্য ঋষিরা বৈদিক ভাষার একটি লিখিত রুপের প্রয়োজন বোধ করে।এভাবেই সংস্কৃত ভাষার জন্ম।

দুই নম্বরে যে ভাষাগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে তার নাম প্রাচীন প্রাচ্য ভারতীয় আর্য।এই ভাষার সময়কাল খ্রিঃপুঃ ১০০০ বা তারও কিছু আগে।এই ভাষার থেকেই পরবর্তীতে প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষার উদ্ভব হয়।বাংলা ভাষার উদ্ভব জানতে হলে এই ভাষাগোষ্ঠীকে খুব গুরুত্ব সহকারে জানা দরকার।কারন এই প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষার শাখা-প্রশাখা হতেই আমাদের বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়।এখানে কিছু কথা বলে নেয়া ভাল,আগে মনে করা হত সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা এখন জানি যে সংস্কৃত থেকে বাংলার উৎপত্তি হওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না।এই রকম ধারনা করার কারন হল, প্রাচীন কালে বাংলা ভাষায় ব্যাকরণবিদের অভাব।সংস্কৃত পণ্ডিতরা একসময় বলেছিলেন বাংলা হল সংস্কৃতের মেয়ে।মানে মা থেকে যেমন মেয়ের জন্ম হয়, ঠিক তেমনি সংস্কৃত থেকে বাংলার জন্ম হয়েছে।পরবর্তীতে স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন ও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন যে বাংলার উৎপত্তি কোনভাবেই সংস্কৃত থেকে নয় বরং প্রাকৃত থেকে।এই প্রাকৃত ভাষা মুলত প্রাচীন কথ্য ভারতিয় আর্য ভাষারই শাখা। ড. চট্টোপাধ্যায় তার The Origin and Development of Bengali Language বইতে প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তির মতকে সমর্থন করেছেন।ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমান করে দেখিয়েছেন যে সংস্কৃত হতে বাংলা উৎপন্ন হতে পারেনা ।তিনি যুক্তির সাহায্যে দেখিয়েছেন যে সংস্কৃত থেকে বাংলার জন্ম হয়নি কারন-

1. ব্রাহ্মণ্য সমাজ ব্যাতিত সমাজের কোন শ্রেণীর মধ্যেই সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল না।জনসাধারণ কথা বলত প্রাকৃত ভাষায়।আর ভাষাগুলো সাধারণত মানুষের মুখের কথ্যরূপ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমেই গঠিত হয়।তাই সংস্কৃত থেকে বাংলা উৎপন্ন হতে পারেনা।
2. সংস্কৃত হল প্রাকৃত যুগের একটি সমসাময়িক ভাষা।তাই সংস্কৃত যুগ বলে আমরা পৃথক কোন যুগ কল্পনা করতে পারিনা।বাংলার পূর্বে ছিল অপভ্রুংশ যুগ,তার আগে প্রাকৃত যুগ।আর প্রাকৃত যেহেতু সংস্কৃতের একটি সমসাময়িক ভাষা তাই সংস্কৃত হতে বাংলা উৎপন্ন হতে পারে না।

আসলে সংস্কৃত ভাষা মুলত তৈরি হয়েছিল বেদকে লিপিবদ্ধ করার জন্য।মানুষের কথ্য ভাষা হিসেবে এর ব্যবহার ছিল না।শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা দু এক খানা শ্লোক রচনা করার জন্য এটির ব্যবহার করত।
বেদ যেহেতু ব্রাহ্মণ্য সমাজের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং এটি যেহেতু সংস্কৃত ভাষায়ই তৈরি,তাই ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য এ ভাষার আর তেমন পরিবর্তন হয়নি। এটি সংস্কৃত আকারেই রয়ে যায়।যাই হোক প্রসঙ্গে আসি,বলা হচ্ছিল প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষার শাখা প্রশাখা হতেই আমাদের বাংলা ভাষার উৎপত্তি।এই ভাষার জন্মকাল ৮০০ খ্রিঃপুঃ বা তারও কিছুকাল আগে।এ সময়ের ভাষার লেখ্য রুপের মধ্যে আছে অশোকের লিপির ভাষা ও প্রাচীন পালি সাহিত্যের ভাষা।পরবর্তীতে এই ভাষাগোষ্ঠী মুলত তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়।যার একটির নাম প্রাচীন প্রাচ্য।এখান থেকেই মুলত প্রাকৃত যুগের সুচনা।তখনকার দিনে প্রাকৃত ভাষাই ছিল সবার মুখের ভাষা।প্রাচীন প্রাচ্য থেকে পরে অনেক গুলো প্রাকৃত ভাষা উৎপন্ন হয়।সবথেকে বেশি প্রচলিত প্রাকৃতের মধ্যে মহারাষ্ট্র প্রাকৃত,মাগধী প্রাকৃত,অর্ধমাগধী প্রাকৃত,গৌড়ী প্রাকৃত উল্লেখযোগ্য।এসব প্রাকৃত ভাষা মানুষের মুখে মুখে বিকৃত আর বিবর্তিত হয়ে যে ভাষার জন্ম হয় তাদের বলা হয় অপভ্রুংশ।এরকম কোন প্রাকৃত ভাষার অপভ্রুংশ থেকেই বাংলার জন্ম হয়েছে।কিন্তু কোন অপভ্রুংশ থেকে বাংলার জন্ম হয়েছে তা নিয়ে ভাষাবিদ ও পণ্ডিতদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে।স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন দেখান যে পূর্ব মাগধী(মাগধী প্রাকৃতের একটি শাখা) প্রাকৃতের অপভ্রুংশ থেকে বাংলার জন্ম।ড. চট্টোপাধ্যায় তার The Origin and Development of Bengali Language বইতে এ মত সমর্থন করেছেন।কিন্তু ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বাংলার জন্ম গৌড়ি প্রাকৃতের অপভ্রুংশ থেকে ।আমরা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতকে সমর্থন করব।কারন তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের সাহায্যে দেখিয়েছেন পূর্ব মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলার জন্ম হতে পারে না।তিনি দেখান যে, গৌড়ি প্রাকৃতের অপভ্রুংশ থেকে বাংলার জন্ম হয়েছে।গৌড়ী প্রাকৃতের আবার তিনটি মূলধারা আছে।এগুলো হল বিহারী,প্রাচীন উড়িয়া ও বঙ্গ-কামরূপী।বঙ্গ-কামরূপী থেকে পরবর্তীতে বাংলা ও আসামি এই দুটি ভাষার জন্ম হয়।তাই বাংলা ও আসামী ভাষাকে সহোদরা ভাষা বলা হয়।যেহেতু আসামী ও বাংলা একই ভাষা থেকে জন্ম নিয়েছে তাই এই দুই ভাষায় অনেক মিল পাওয়া যায়।আর আসামের ধুবগুরি সহ তিনটি জেলার মাতৃভাষাও কিন্তু বাংলা।
এ পর্যন্ত আমরা জানলাম মুল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে আমাদের বাংলা ভাষার উৎপত্তির পর্যায়গুলো।এখন হয়ত অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে,সেই প্রাচীন কালে আজকের বাংলা দেখতে কেমন ছিল? ব্রাগম্যান(Brugmann) সহ অনেক ভাষাতত্ত্ববিদরা মুল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ধ্বনি,শব্দ ও ব্যাকরণ নিয়ে অনেক বড় বড় বই লিখেছেন।তাথেকে আমরা সেই আদিকালের ভাষাগুলো কেমন ছিল তা দেখার সুযোগ পাব।অনেক প্রাচীন কালে ভাষার রূপ সত্যিই অনেক অদ্ভুত ছিল।

এখানে বর্তমান মুল ভাষা “তুমি ঘোড়া দেখ ” এর বিভিন্ন কালের রূপটি দেওয়া হলঃ

বর্তমান কাল(১৮৬০ খ্রিঃ হতে) তুমি ঘোড়া দ্যাখো।
নব্যযুগ (১৮০০খ্রিঃ হতে) তুমি ঘোড়া দেখ।
মধ্যযুগ(১৩৫০-১৮০০ খ্রিঃ ) তুমহি্ ঘোড়া দেখহ।
সন্ধিযুগ(১২০০-১৩৫০ খ্রিঃ ) তুমহে্ ঘোড়া দেখহ।
প্রাচীন যুগ(৬৫০-১২০০ খ্রিঃ )
গৌড় অপভ্রুংশ(৪৫০-৬৫০ খ্রিঃ ) তুমহে ঘোড়অ দেকখহ।
গৌড়ী প্রাকৃত (২০০-৪৫০খ্রিঃ ) তুমহে ঘোড়অং দেকখহ।
প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত( খ্রিঃ পুঃ ৫০০-২০০খ্রিঃ ) এবং পালি তুমহে ঘোটকং দেকখথ।
আদিম প্রাকৃত (৮০০-৫০০ খ্রিঃ পুঃ ) তুম্মে ঘোটকং দৃক্ষথ।
[ সংস্কৃত — য়ুয়ং ঘোটকং(অশ্বং) পশ্যথ ]
প্রাচীন ভারতিয় আর্য(১৪০০-৮০০ খ্রিঃ পুঃ ) য়ুয়মশ্বং স্পশ্যথ।
[ বৈদিক — য়ুয়মশ্বং পশ্যথ। ]
আর্য (২০০০-১৪০০ খ্রিঃ পুঃ) য়ুস অশ্বম্ স্পশ্যথ ।
শতম(২৫০০-২০০০ খ্রিঃ পুঃ) য়ুস এশ্বোম্ স্পেশিএথে।
ইন্দো-ইউরোপিয়ান(৩৫০০-২৫০০ খ্রিঃ পুঃ) য়ুস এক্কোম্ স্পেকি্এথে।

আমরা দেখলাম মুল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে কিভাবে যুগ যুগের বিবর্তনের ফলে আমাদের আজকের বাংলার পরিনত হল।কিন্তু আমাদের একটা জিনিস খুব ভালমতো জানা দরকার যে, কিভাবে প্রাকৃত ভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে আজকের বাংলায় পরিনত হল।কারন প্রাকৃত ভাষার পরবর্তী স্তর থকেই কিন্তু বাংলা ভাষা তার নিজস্বতা পেতে শুরু করে।আর ১৮৬০ সালের পরে এই নিজস্বতা পরিপূর্ণতা পায়।তাই এই ভাষার জন্মের ইতিহাস মূলত প্রাকৃত ভাষার পরবর্তী স্তরগুলো থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত।আমরা এবার দেখব প্রাকৃত ভাষা থেকে কিভাবে আজকের বাংলা আসলো।(বিস্তারিত নিচের পুস্তক দ্রষ্টব্য)।

তথ্যসুত্রঃ প্রাচীন বাঙলার অজানা গল্প, হিমাংশু কর। তাম্রলিপি প্রকাশনী।
রকমারি লিঙ্কঃ http://rokomari.com/book/76510
ই-বুক লিংকঃ http://goo.gl/XFXk6u

৩৩ thoughts on “বাংলা ভাষার উদ্ভব কেমন করে ?

        1. আসলে আমাদের ভাষা সম্পর্কে
          আসলে আমাদের ভাষা সম্পর্কে আমাদের আরও সচেতন হওয়া উচিত। পোস্ট পড়ে কেউ সামান্য কিছু নতুন জানলেও লেখা সার্থক।

          /……………………………………………………………/

  1. সরাসরি প্রিয়তে…
    সরাসরি প্রিয়তে… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:
    বাঙলা ভাষা সংক্রান্ত অসাধারণ একটা তথ্যবহুল ব্লগ পোস্ট।।

  2. দুর্দান্ত কাজ করেছেন।
    চমৎকার

    দুর্দান্ত কাজ করেছেন।
    চমৎকার তথ্যপূর্ণ পোস্ট। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আপনাকে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ……… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

  3. চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট ! আরও
    চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট ! আরও দুবার পড়তে হবে – তাই প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম ! ধন্যবাদ আপনাকে !
    :ফুল:

  4. চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট। সেই
    চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট। সেই সাথে দেখছি নাম মাত্র মূল্যে ই-বুক সাইটেও পাওয়া যাচ্ছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই কিনে নিয়ে পুরোটা পড়ে নিতে পারবো।
    বাঙালী জাতি, বাঙলা ভাষা ও বাংলাদেশের উদ্ভব | হিমাংশু কর

    1. উৎসাহ দেবার জন্য ধন্যবাদ। আমি
      উৎসাহ দেবার জন্য ধন্যবাদ। আমি ভয়ে ছিলাম বইয়ের লিঙ্ক দেওয়াতে কেউ আবার কবি স্যার শফিকুল ইসলাম বলে না বসেন !!! :হাসি: :হাসি: :হাসি:
      ================================================

  5. তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হার্ড
    তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হার্ড বুক এবং ইস্টিশন ই-বুক কর্ণারে একই বইয়ের ই-বুকটি পড়া উচিত সবার। লেখক নতুন হলেও ভাল লিখেছেন। ই-বুকটি ক্রয় করে পড়তে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *