ধ্যান (অতীন্দ্রিয় গল্প)

১.
নাওয়া-খাওয়া ভুলে তিন্নি লেগে রইল ধ্যানের পিছনে। ওর রুমমেট হিসেবে তেমন অবাক হলাম না আমি। কারণ আমি জানি তিন্নি খ্যাপাটে। কোন কিছু একবার মাথায় ঢুকলে তার শেষ না দেখে ছাড়ে না ও।
এখন ঢুকেছে ধ্যান।
কোত্থেকে এক ইংরেজি বই পেয়েছে ও… ওখানে নাকি লেখা আছে, “কোন জিনিস বা ব্যক্তিকে যদি কেউ একাগ্রচিত্তে চায়, সে সেটা পায়।” তিন্নি পরীক্ষা করে দেখবে ব্যাপারটা সত্যি কিনা। ওর কারণে আমাকেও পড়ে দেখতে হল বইটা।


১.
নাওয়া-খাওয়া ভুলে তিন্নি লেগে রইল ধ্যানের পিছনে। ওর রুমমেট হিসেবে তেমন অবাক হলাম না আমি। কারণ আমি জানি তিন্নি খ্যাপাটে। কোন কিছু একবার মাথায় ঢুকলে তার শেষ না দেখে ছাড়ে না ও।
এখন ঢুকেছে ধ্যান।
কোত্থেকে এক ইংরেজি বই পেয়েছে ও… ওখানে নাকি লেখা আছে, “কোন জিনিস বা ব্যক্তিকে যদি কেউ একাগ্রচিত্তে চায়, সে সেটা পায়।” তিন্নি পরীক্ষা করে দেখবে ব্যাপারটা সত্যি কিনা। ওর কারণে আমাকেও পড়ে দেখতে হল বইটা।

তেমন কোন কঠিন নিয়ম নয় ধ্যানের। চোখ খোলা বা বন্ধ রাখা কোন ব্যাপার নয়। ব্যাপার হল, যাকে বা যে জিনিসকে চাওয়া হচ্ছে, শুধু তাকে বা ওই জিনিসকে নিয়েই ভাবতে হবে। অন্য কিছুই মাথায় আনা চলবে না। মনে মনে নিজের উদ্দেশ্য আওড়াতে হবে। আওড়ানো চলবে অবিরাম…যতক্ষণ সন্ন্যাসীর ইচ্ছে!

মজা করে তিন্নিকে আমি এই নামেই ডাকা শুরু করলাম।

দেখে বোঝার উপায় নেই তিন্নি কখন ধ্যান করছে কারণ সবকিছু আগের মতই আছে। শুধু কথাবার্তা একদম বন্ধ আমার সাথে। কারণ সব কাজ করার সাথেসাথেই ও ওর উদ্দেশ্য বলে যাচ্ছে মনে মনে। কিন্তু কারো সাথে কথা বলার সময় মনযোগ ওই ব্যক্তির দিকে রাখতে হয় বলে তিন্নি সম্পূর্ণ মনযোগ দিয়ে আওড়াতে পারে না ওর উদ্দেশ্য।

ওর এই পাগলামি দিনকে দিন বিরক্তিকর হয়ে উঠলো আমার কাছে। যার সাথে একই রুমে থাকি, তার সাথে যদি কথা না বলি, কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়।
আমরা থাকি এক কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে। চাকরি করি একই জায়গায়। তবে আলাদা ডিপার্টমেন্টে।

২.
চাকরি করতে গিয়েই তিন্নির সাথে পরিচয় আমার। আমরা দুজনেই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছি এবং দুজনেই হোস্টেলে থাকতাম বলে চিন্তা করলাম, এক হোস্টেলেই থাকি না কেন?
সে অনুযায়ী তিন্নি এল আমার কাছে।

আমাদের দুইজনের সময় খুব মজায় কাটত। অফিসে যেতাম একসাথে, আসতাম একসাথে আর আসার পর দুজনের ডিপার্টমেন্টের গল্প করতে করতে বেশ কেটে যেত সময়। তখনি এল এই ধ্যান।

তিন্নির কাছে সময় না পেয়ে বড্ড একা হয়ে গেলাম আমি। অফিস শেষে হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ছয়টা। এরপর বিশাল একটা সময় হয় বই পড়ে কাটাই, না হয় অন্য রুমে গিয়ে গল্প করি। কিন্তু কতদিন আর অন্যদের বিরক্ত করা যায়?

দিন দিন মেজাজ খিঁচড়ে যেতে লাগল।

৩.
এমনই এক বিরক্তিকর দিনে অপ্রত্যাশিত এক ফোন এল আমার।
অভিষেকের কাছ থেকে!

দুই বছর আগে ওর সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল আমার। অনেক চেষ্টা করেও সম্পর্কটা আর জোড়া দিতে পারি নি। সুপার গ্লু, ফেভিকল কিছুতেই কাজ হয় নি। কাজ না হলেও আমার মন এখনও অভিষেকের কাছেই পড়ে আছে। শুনেছি, অভিষেক নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছে। কিন্তু তাতে কী? নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দেই এই বলে – আমি ছিলাম ওর জীবনের প্রথম ভালোবাসা। আমার মত করে কি আর কাউকে ভালবাসতে পারবে ও?

সেই অভিষেক আমার সাথে দেখা করতে চায়। যত দ্রুত সম্ভব। কী এক ঝামেলায় নাকি পড়েছে! দেখা হলে সব বলবে।

তিন্নিকে বললাম অভিষেকের সাথে দেখা করার কথা। তিন্নি ভীষণ অবাক হয়ে তাকালো। ওর বড় বড় চোখ দেখে আমি হাসি চাপাতে পারলাম না। কথায় কথায় জানালাম, ওর চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি আমি। কারণ দীর্ঘ দুই বছর আমার সাহায্য ছাড়া চলতে পারলেও এখন কী এমন ঝামেলা হল যার কারণে আমার কাছে আসার প্রয়োজন পড়ল জনাবের?

নির্দিষ্ট দিনে বান্ধবীকে ছাড়াই অফিস থেকে বের হলাম আমি। কাছেরই একটা রেস্তোরাঁয় মোলাকাত হবে স্বপ্নের রাজকুমারের সাথে।

গিয়ে দেখি সাহেব কুলকুল করে ঘামছেন। আমি আসব কী না, এই দুশ্চিন্তায়।

আবারো চমকালাম। প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিয়ে এত আবেগ ভাবনার বিষয় বটে!
যা হোক, এ কথা সে কথার পর হঠাৎ অভিষেক বলে বসল, “তুমি আবার আমার কাছে চলে এসো!”
আমিও মনে মনে চাচ্ছিলাম অভিষেক এই কথাটা বলুক।

তিন্নির ধ্যানকে তেমন পাত্তা না দিলেও অভিষেকের ফোনটা আসার পর থেকে আমিও আওড়াচ্ছিলাম, “অভিষেক যেন আমার কাছে ফিরে আসে… ফিরে আসে… ফিরে আসে…!” কিন্তু বাস্তবেও যে ধ্যান সত্যি হয়ে ধরা দেবে, ভাবিনি। তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম অভিষেকের দিকে।

এও কি সম্ভব?
বইয়ের কথাটা কি তাহলে সত্যিই সত্যি??

তিন্নির কাছে বেমালুম চেপে গেলাম ব্যাপারটা। এমনিতেই নাচুনি বুড়ি। তার উপর ঢোলের বাড়ি পড়লে তো কথাই নেই। আমাকেও ওর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধ্যানে বসিয়ে দেবে। তাছাড়া আমি নিজেও সন্দিহান এই বিষয়ে। আমি চেয়েছি বলেই হয়েছে – এমনটা ভাবা বোকামি। কারণ অভিষেক আগে থেকেই ঠিক করে এসেছিল এই কথাটা বলবে। এমন নয় যে আমার চাওয়ার কারণেই রেস্তোরাঁয় বসে ওর মন পরিবর্তন করে কথাটা বলেছে।

৫.
আমার দৈনন্দিন রুটিন পালটে গেল। অভিষেকর পুনরাগমনের পর থেকে প্রায়ই তিন্নিকে একা একা ফিরতে হয়। আগে তিন্নি কথা বলার সময় পেত না ধ্যান করতে করতে আর এখন আমি ওর সাথে কথা বলার সময় পাই না অভিষেকর সাথে মোবাইলে কথা বলতে বলতে!

তবে এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তিন্নির সাথে মুড়ি মাখানো খেতে খেতে আর আড্ডা দিতে দিতে বলেই ফেললাম অভিষেকের সাথে দিন কেমন কাটছে, ডেটিংয়ের সময় আমরা কী করি, কোথায় যাই এসব। তিন্নি অনেক আগ্রহ নিয়ে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “অভিষেক কেন আবার তোমার কাছে ফিরে এসেছে?”
মুড়ি চিবোতে চিবোতে উত্তর দিলাম, “ও নাকি কয়েকদিন ধরে আমাকে খুব মিস করছিল! আর ওর গার্লফ্রেন্ডের সাথেও দিনকাল ভাল যাচ্ছিল না।”

৬.
তিন্নির মন-মেজাজ ইদানিং খুব খারাপ দেখছি। কয়েকবার জানতে চেয়েছি কী হয়েছে। কোন উত্তর নেই। তবে ওর ডিপার্টমেন্টের একজনের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, এইবারের প্রমোশন লিস্টে নাকি তিন্নির নাম নেই!

তিন্নিকে ওর বস খুবই পছন্দ করেন। গত দেড় বছরে দুইবার পদোন্নতি হয়েছে ওর। ঠিক কী কারণে এইবার হবে না, বুঝলাম না।

৭.
একদিন সন্ধ্যায় শুয়ে আছি রুমে, ঝড়ের গতিতে ঢুকল তিন্নি। ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বিছানায়। চমকে উঠে বসলাম আমি। কারণ হাউমাউ করে কান্না শুরু করেছে তিন্নি। হতভম্ব আমি কী রেখে কী করব বুঝতে পারলাম না। একটু শান্ত হওয়ার পর তিন্নি যা বলল, তা হল এই – তিন্নি এতদিন ধরে ডাবল প্রমোশন পাওয়ার জন্য ধ্যান করে যাচ্ছিল। ও চেয়েছিল, এই বছরই ইমন আর নোমানকে ডিঙ্গিয়ে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজারের পদটা পেতে। সেজন্য নিজের সাউথ আমেরিকান “রাফ অ্যান্ড টাফ” বসের মনকে প্রভাবিত করার জন্য গত ছয় মাস ধরে ধ্যান করে যাচ্ছিল বেচারা। কিন্তু আজকে এই বস তাঁর ঘরে তিন্নিকে ডেকে নিয়ে বলেছেন, “তিন্নি, তুমি একটা ভুল করেছ। খুব বড় একটা ভুল চাল চেলেছ। বোকা মেয়ে… তুমি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছ!”

তিন্নি বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল।
বস কীভাবে জানলেন ব্যাপারটা?

“আপনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন মি. কার্লো? আমি বুঝতে পারছি না!”

মি. কার্লো বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন, “যৌবনে আমিও বিভিন্ন অতীন্দ্রিয় কাজ-কর্মে আগ্রহী ছিলাম। তোমার মত আমিও মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করার পদ্ধতি প্র্যাকটিস করেছিলাম। কিন্তু পরে ট্র্যাক পরিবর্তন করে চলে এলাম মানুষের মনের কথা বুঝতে পারার ব্যাপারে। জানই তো, এই ব্যাপারটা আর সবকিছুর চেয়ে তোমাকে সাহায্য করবে বেশি!”

তিন্নির পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।

কার্লো বলে চললেন, “প্রকৃতি মানুষকে যতটুকু দিয়েছে, ততটুকু নিয়েই মানুষের সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তোমার-আমার মত বেশি চাহিদাওয়ালারা কখনই সুখী হতে পারে না ইয়াং লেডি! আমি ইচ্ছা করলেই যে কাউকে নিয়ে ধ্যান করে তার মনের কথাগুলো জানতে পারি যদিও এটি বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। বয়স হয়েছে বলে আর আগের মত পারি না। তবে তোমাকে আমি অত্যন্ত বেশি পছন্দ করতাম বলে তোমাকে অনুসরণ করেছি আর দেখেছি, আমাকে দিয়ে তুমি তোমার স্বার্থ হাসিল করতে চাও।”

তিন্নি কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল সামনে রাখা চেয়ারটায়।

কার্লো মুচকি হেসে বললেন, “এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তোমাকে আমি বড় কোন শাস্তি দিতে যাচ্ছি না। শুধু ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আগামি মাসে তুমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে দিও।”

পরিশেষে…
তিন্নি ওর বান্ধবীকে যা বলে নি তা হল, মি. কার্লোর অফিস থেকে বের হয়ে আসার সময় কার্লো জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তোমার ওই বান্ধবী কেমন আছে? ওর প্রেমিককে ফিরিয়ে আনার জন্যই তো তুমি ধ্যান শুরু করেছিলে, তাই না? সেখানে সফল হয়ে ভেবেছ আমাকেও বাগে আনতে পারবে! হা হা হা…!”

১৭ thoughts on “ধ্যান (অতীন্দ্রিয় গল্প)

      1. স্বপ্নচারী দাপু
        স্বপ্নচারী দাপু :খাইছে: :খাইছে: :খাইছে: :-B :-B :-B :-B
        খেলুম না। :কথাইবলমুনা: :কথাইবলমুনা: :কথাইবলমুনা:

        1. স্বপ্নচারী দাপু
          মাইরালা, ইয়ে

          স্বপ্নচারী দাপু

          মাইরালা, ইয়ে তুম ক্যায়া কিয়া, রুথ আফা… :শয়তান: :শয়তান: :মাথানষ্ট: পুলাপাইনরে এভাবে উস্কানি দেওয়ার তেব্র নেন্দা গানাই… :কল্কি: 😀 😀

  1. দুবার গল্পটা পড়ে ঠিক বুঝতে
    দুবার গল্পটা পড়ে ঠিক বুঝতে পারছি না গল্পটার ‘মোরাল” কি? হয়তো গল্পকার কি বোঝাতে চেয়েছেন তা বুঝতে পারিনি অল্পবোধ্যা হিসেবে। ধন্যবাদ ‘কলাকৈবল্যবাদি’ গল্পের জন্য।

    1. গল্পের মরাল বা নীতিকথা নিয়ে
      গল্পের মরাল বা নীতিকথা নিয়ে তো আমিও মাথা ঘামাই নি লজিক দা! তবে সারমর্ম জানতে চাইলে বলতে পারি 😀

    1. নাভিদ ভাই হেলপ করেন না দাদা
      নাভিদ ভাই হেলপ করেন না দাদা বোঝার বিষয়ে! ছাগু হইলাম নাকি দাদা? :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:

    2. ধন্যবাদ নাভিদ ভাই
      এই ধরণের

      ধন্যবাদ নাভিদ ভাই 🙂
      এই ধরণের প্লট বলেই আমি অনেক যত্নশীল ছিলাম গল্পটা খাপছাড়া না লাগার ব্যাপারে। তাও লেগে গেলো 🙁 :কানতেছি:

      1. ব্যাপার না। আমারও এমন
        ব্যাপার না। আমারও এমন হয়।
        ধ্যানের মাধ্যমে কিভাবে আরেকজনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটা নিয়ে আরও একটু লিখলে ব্যাপারটা সহজবোধ্য হতো। তাছাড়া একটা প্যারানরমাল গল্পে প্যারানরমাল পরিবেশ তৈরি করার জন্য খানিকটা সময় নিয়ে নিতে হয়। যেটা আপনি নেন নি। এতে করে গল্পটায় ওই অনুভূতিটুকু আসেনি। ওইটুকুই খাপছাড়া, আর কিছু না। আপনার লেখার স্টাইল ভালো। তবে আরও লিখতে হবে। সময় নিয়ে লিখতে হবে।

  2. আমার কাছে ভালো লেগেছে।বিশেষ
    আমার কাছে ভালো লেগেছে।বিশেষ করে ফিনিশিংটায় বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল।রুথের গল্প লেখার হাত ভাল,নিয়মিত চালিয়ে গেলে আরো ভাল হবে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *