মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বিতর্ক : আমাদের ট্রাইবুনাল ভার্সাস ওদের ট্রাইবুনাল (পর্ব ১)

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সবচেয়ে হটকেক তথা চমকপ্রদ ইস্যু হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী তথা রাজাকারদের বিচার। যে দাবীতে গত বছর থেকে অদ্যাবধি দেশের তরুণ সমাজ এক আলোকজ্জ্বল প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে রেখেছে শাহবাগ চত্বরে, যার নাম স্বাধীনতার প্রজন্ম চত্বর। আন্তজার্তিক অঙ্গণ ছাড়াও পুরো বাংলাদেশই এখন এ আন্দোলনে পুরোপুরি সম্পৃক্ত। কিন্তু শুরু থেকেই এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি মহল বলার চেষ্টা করছে ট্রাইবুনালটি আন্তর্জাতিক মানের নয়, তা ছাড়া তারা বিচারের স্বচ্ছতা নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন দেশে বিদেশে সর্বত্র। আজকের নিবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করবো বিশ্বের অন্যান্য ট্রাইবুনালের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে।



পর্ব : ১

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সবচেয়ে হটকেক তথা চমকপ্রদ ইস্যু হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী তথা রাজাকারদের বিচার। যে দাবীতে গত বছর থেকে অদ্যাবধি দেশের তরুণ সমাজ এক আলোকজ্জ্বল প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে রেখেছে শাহবাগ চত্বরে, যার নাম স্বাধীনতার প্রজন্ম চত্বর। আন্তজার্তিক অঙ্গণ ছাড়াও পুরো বাংলাদেশই এখন এ আন্দোলনে পুরোপুরি সম্পৃক্ত। কিন্তু শুরু থেকেই এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি মহল বলার চেষ্টা করছে ট্রাইবুনালটি আন্তর্জাতিক মানের নয়, তা ছাড়া তারা বিচারের স্বচ্ছতা নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন দেশে বিদেশে সর্বত্র। আজকের নিবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করবো বিশ্বের অন্যান্য ট্রাইবুনালের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা গ্রীক পুরানেও উল্লেখ আছে। ১৪৭৪ সালে হাগেনবাখের স্যার পিটারকে যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। প্রাচীন সকল যুদ্ধেই যুদ্ধে পরাজিত পক্ষকে হত্যা কিংবা কৃতদাস হিসেবে বন্দী ও বিক্রি করা হতো। যুদ্ধে পরাজিত নেপলিয়নকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করে ১৮১৫ সালে বৃটেনের কাছে তুলে দেয় ‘ভিয়েনা কনগ্রেস’। যার ধারাবাহিকতায় তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে জীবন কাটান। ১৯২০ সালে ৪৫টি যুদ্ধাপরাধ মামলায় ১২ জনের বিচার করে জার্মানি। এ বিচার ‘‘লাইপজিগ ট্রায়াল’’ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। নাৎসী যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ১৯৪৫ সনে ইন্টা. মিলিটারী ট্রাইবুনাল গঠিত হয়, যা বিশ্বে নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল নামে বেশী পরিচিত। জাপানী যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইবুনালের নাম ছিল টোকিও ট্রাইবুনাল। হিটলারের সহযোগি আইখম্যানকে ১৯৬২ সনে আর্জেটিনায় বিচার করা হয়। ১৯৯০ সনে বসনিয়া, ক্রোসিয়া ও কসোভায় গণহত্যার জন্য মিলেসোভিচকে ২০০২ সনে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে বিচার করা হয়।

বাংলাদেশ ছাড়াও কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ট্রাইবু্ন্যাল হচ্ছে যথাক্রমে : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল ফর রুয়ান্ডা, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল ফর দ্যা ফরমাল যুগোসস্নাভিয়া, সিয়েরালিওনের বিশেষ কোর্ট (এসসিএসএল), কম্বোডিয়ার বিশেষ চেম্বার কোর্ট। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল ফর দ্যা ফরমাল যুগোসস্নাভিয়া হচ্ছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত প্রথম যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুনাল। অন্যগুলোও আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল। ১৯৯৩ সনে জাতিসংঘ চ্যাপ্টার ৭ অনুযায়ী ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল ফর দ্যা ফরমাল যুগোসস্নাভিয়া গঠিত হয়। বর্ণিত ট্রাইবুনালের প্রত্যেকটি ট্রায়ালে ৩-জন বিচারপতি ও সর্বোচ্চ ৬-বিচারক থাকার রীতি প্রণয়ন করা হয়। এ আদালতে ভিকটিম ও স্বাক্ষিদের অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আপিল চেম্বারে ৭ জন বিচারকের ৫-জন একমত হলেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারতো।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল ফর রুয়ান্ডা ১৯৯৪ সনের ৮ নবেম্বর গঠিত হয়। ১৯৯৪ সনে রুয়ান্ডায় সংগঠিত গণহত্যার জন্য এ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। এটি জাতিসংঘের ৯৫৫ রেজুলেশন অনুসারে তৈরী কর হয়েছিল। এ ট্রাইবুনালের ৩টি অঙ্গ হচ্ছে যথাক্রমে চেম্বার, আপীল চেম্বার ও প্রসিকিউটর অফিস। এটি তানজানিয়ার আরোশায় অবস্থিত।

কম্বোডিয়ার বিশেষ চেম্বার কোর্ট (ইসিসিসি) : ১৯৭৫-১৯৭৯ সন পর্যন্ত শাসক খোমার রুজি রিজমির শাসনামলের যুদ্ধের অপরাধের জন্যে এ কোর্ট গঠিত কম্বোডিয়ার সংসদে পাসকৃত আইনের দ্বারা। এর বিচারক ৩ জন। রয়েছে প্রি ট্রায়াল চেম্বার, ট্রায়াল চেম্বার ও সুপ্রিমকোর্ট চেম্বার। ফর দ্যা ফরমাল যুগোসস্নাভিয়া হচ্ছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত প্রথম যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুনাল। ১৯৯২-৯৫ সন পর্যন্ত এক তরফা যুদ্ধে বসনিয়ার ২৫,৬০৯ জন মুসলিম নিহত হয়। সার্ব ও ক্রোয়েট বাহিনী এ যুদ্ধে বর্বরভাবে মানুষ হত্যা করে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট শ্লোভোদান মিলোসোভিচ ও বসনিয়ার রাদোভান করাদিভ এ বিচারের আওতায় আসে। এ ট্রাইবুনাল হেগ শহরে তাদের কাজ শুরু করে। এ পর্যন্ত ১৬১ জন পলাতককে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।

প্যালেস অব জাস্টিম নামে খ্যাত নুরেমবার্গ নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত শ্রেষ্ঠ ট্রাইবুনাল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বৃটিশ বিচারক নরম্যান বারকেন ছিলেন এ কোর্টের বিচারপতি। এ কোর্টে ১৯৪৫-৪৬ সনে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। মোট ২৩ রাজনীতিকের বিচার করে সাজা দেয়ার পূর্বেই অভিযুক্ত রবার্ট লে ও গোয়েবলস আত্মহত্যা করেন। ১৯৪৫ সনে প্রতিষ্ঠিত লন্ডন চার্টারের ভিত্তিতে এ ট্রাইবুনালের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়। ১৬০০ সামরিক ব্যক্তি ছাড়াও ২০০ জার্মানকেও অভিযুক্ত করা হয়। বিচারক ছিলেন ৭ জন ও প্রসিকিউটর ৪জন। জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় স্থাপিত কম্বোডিয়া ট্রায়ালে খরচ হয় ১৭০ মিলিয়ন ডলার, সিয়েরা লিওনে ১৪৯ মিলিয়ন ডলার, ইয়াগোসস্নাভিয়া ট্রায়ালে ৩০৬ মিলিয়ন ও রুয়ান্ডা ট্রায়ালে ৬১৫ মিলিয়ন ডলার।

এর পর ২য়/শেষ পর্ব আগামিকাল

লেখকের ফেসবুক ঠিকানা [ধর্মান্ধতামুক্ত যুক্তিবাদিদের ফ্রেন্ডভুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই ] : https://www.facebook.com/logicalbengali

৪ thoughts on “মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বিতর্ক : আমাদের ট্রাইবুনাল ভার্সাস ওদের ট্রাইবুনাল (পর্ব ১)

  1. চলুক পর্বটি… খুবই কার্যকরী
    চলুক পর্বটি… খুবই কার্যকরী কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে… :ফুল: :ফুল: অন্তর থেকে সাধুবাদ বাঙ্গালী ভাইয়ের প্রচেষ্টাকে… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *