তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-৬

নানামুখি চক্রান্ত আর দেশি শত্রুদের প্রচারনা ও প্ররোচনায় রায় উল্টে যায়। কাদের মোল্লার রায়ে বিস্মিত হয় দেশবাসী। একটা বিজয়সুচক ভি চিহ্ন জানিয়ে দ্যায় আমরা আজো রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হইনি। হাজার হাজার মুক্তি যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম, হাজার হাজার ইতিহাস ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের বই, অনলাইনে হাজার হাজার মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ওয়েবসাইট, লক্ষ লক্ষ এক্তিভিস্তের দিনরাত প্রচারণার ঘাড়ে তীব্র একটা গরম নিঃশ্বাস ফেলে কাদের মোল্লা যখন একটা পৈশাচিক অট্টহাসি হেসে ভি চিহ্ন নাড়লেন ততাক্ষনাত একটা তীব্র দ্রোহের আগুন এক ফুঁৎকারে জ্বলে উঠল। ওইটাই রাজাকার-জুদ্ধাপরাধিদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রথম গনজাগরন।

জ্বালামুখে জমা দীর্ঘদিনের জঞ্জাল যখন কোন এক কারনে মুহূর্তে সরে যায় তখন যেমন ভু-অভ্যন্তরের লাভাকে নোটিশ দিয়ে জাগানোর প্রয়োজন হয়না তেমনি করে শাহাবাগের আন্দলনেও কাউকে নোটিশ দিয়ে ডেকে এনে জড় করার প্রয়োজন হয়নি। মাত্র কয়েকটি অকুতোভয় লড়াকু ছেলে যখন একটি মাত্র আহবান জানিয়েছে, তক্ষনি সারাবাংলার সমস্ত যুব সমাজ সে ডাকে সাড়া দিয়ে লাভা স্রোতের মতো শাহাবাগে এসে মিলিত হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে এ ঘটনা খুব বেশি নয়!

কে ডাক দিয়েছিল এটা কি খুব মুখ্য প্রশ্ন? আমার ধারনা, যে কেউ দাঁড়িয়ে যদি একটি বার সাহস করে “জয় বাংলা” বলে দাঁড়িয়ে যেত তবুও এ আন্দোলনের পরিনতি একই হতো। তথাপিও যে বা যারা এই ডাক দিয়ে মানুষকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল তাদেরকে পাশ কাটিয়ে অন্য কারো নাম প্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টা দুঃখজনক এবং ঘৃণ্য-ও বটে।

যা হোক, শাহাবাগে যে তরুন প্রানের মিলন মেলা বসল দেশের টানে, সেটাতে প্রথম দাঁত বসালেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী। তিনি ঘোষণা দিলেন, শাহবাগে যারা গেছে তারা নাস্তিক। সুযোগটি হাত ছাড়া করা যায় না, সংসদে বসে শাহাবাগের কাছে “মন” পাঠিয়ে দিলেন শেখ হাসিনা। সমস্ত ধরনের সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখলেন জনতার মঞ্চ বা শাহাবাগ চত্বর। পর্দার অন্তরালে মুচকি হেসে জামাতে ইসলাম বসল অন্য ছক কাটতে। দুম করে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি অচেনা কাক কা কা করতে শুরু করল সাড়া দেশময়। ইসলাম গেল গেল বলে ঝড় শুরু হল, সেটা থামাতে মতিঝিল না গেলেই নয়!

হেফাজতের দেওয়া “মতিঝিল অবস্থান” কর্মসূচিতে পূর্বের দেওয়া সরকার পতনের আটচল্লিশ ঘণ্টার আল্টিমেটাম কমিয়ে চব্বিশ ঘণ্টার আল্টিমেটামের ঘোষণা দেন বেগম খালেদা জিয়া, অর্থাৎ পরদিন হেফাজতের মিটিং শেষে সরকার উচ্ছেদ করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে দিলেন তিনি। পরদিন বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে শেষ হল হেফাজতের মিটিং, ঘোষণা করা হল অবস্থান কর্মসূচির। শেষরাতের অভিযানে নামে সরকারী আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপে সে যাত্রা মুক্ত হয় শাপলা চত্বর, মতিঝিলের রাস্তাঘাটে রয়ে যায় ইসলামী চেতনার প্রতিচ্ছবি।

এরপর ক্রমান্বয়ে পট পরিবর্তনের খেলা, হেফাজতের ১৩ দফা, জামাতে ইসলামের বীভৎস কর্মকাণ্ড, বি এন পিঁর অনমনীয় মনোভাব, কিছু কিছু মিডিয়ার মিথ্যা প্রচারনা ও জঙ্গি গোষ্ঠীর নির্লজ্জ দালালী, সুশীল শ্রেণীর একচোখা পক্ষপাতিত্ব সরকারকে মারাত্মক রকম বিপর্যস্ত করে তোলে। গনজাগরন মঞ্চ থেকে ক্রমাগত দাবী উঠতে থাকে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দিতে, আদালত তার রায় পুনর্বিবেচনা করে ফাঁসির আদেশ প্রদান করেন। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে সাড়া দেশ, গনজাগরন মঞ্চের প্রথম দাবী বাস্তবায়নের সাথে সাথে সারাদেশে জামাত বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে ওঠে। গনজাগরন মঞ্চ পাকিস্তানী পণ্য বর্জন, পাকিস্তানী টি ভি চ্যানেল বর্জন, জামাতে ইসলামী পরিচালিত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বর্জন সহ যাবতীয় জামাতি কর্মকাণ্ড বর্জনের ডাক দিলে দেশের মানুষ সেটার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে। এভাবেই সুক্ষ এবং সুস্পষ্টভাবে একটা জামাত বিরোধী বলয় গড়ে ওঠে।

এখানে একটি প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভাল, গনজাগরন মঞ্চের পক্ষ থেকে কাদের মোল্লার ফাঁসির যে দাবী করা হয়েছিল সেটা কোন অবস্থাতেই সরকার বিরোধী আন্দোলন বা আদালতের প্রতি বিদ্বেষ বা অনাস্থাপ্রসুত ছিল না । একবার ভাবুন, কোন কারনে পিতার কর্মকাণ্ডে নাখোশ হয়েছে পুত্র, সঙ্গত কারনে পুত্র সেটার প্রতিবাদ করলে অথবা পিতার করা কর্মকাণ্ডকে পুনর্বিবেচনা করার অনুরধ জানালে সেটাকে পুত্রের বেয়াদবি বলা চলে না। সেটা বড়জোর পুত্রের আবদার, অভিমান বা অনুযোগ বলা যেতে পারে কিন্তু কোন অবস্থাতেই বিরোধ বলা যায় না। সরকার বা আদালতের প্রতি গনজাগরন মঞ্চের মনোভাব ছিল এটাই; এটি নিয়ে যারা অযথা বিতর্ক করেন তারা না জেনেবুঝে করেন অথবা অন্য অভিসন্ধি থাকা অসম্ভব নয়।

গনজাগরন মঞ্চের শুরুতে এটি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছিল যে গনজাগরন মঞ্চের কর্মকাণ্ড অরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরিচালিত হবে, কোন রাজনৈতিক দলের নেতা, দলীয় স্লোগান এবং ব্যানার, রাজনৈতিক বক্তব্য পরিহার করে গনজাগরন মঞ্চকে গন মানুষের পক্ষ থেকে রাজাকার-আল বদর-জামাত-শিবির এবং যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশ গড়ার আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। কালক্রমে এই মনোভাব থেকে সরে আসে মঞ্চের নেতৃবৃন্দ, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেওয়ার বিধিনিষেধ বলবত থাকলেও জয় জনতা বা এই জাতীয় আরও বেশকিছু বাম ঘরানার স্লোগান অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এভাবেই দলীয়করনের প্রচেষ্টা আস্তে আস্তে প্রতিভাত হতে শুরু করে আন্দোলনের মধ্যে।

“শাহাবাগের আন্দোলন ছিল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন” বলে সবার পিলে চমকে দেন ইমরান এইচ সরকার।

……………

তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-৫
http://istishon.blog/node/7015

তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-৪
http://istishon.blog/node/7001

তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-৩
http://istishon.blog/node/6971

তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-২
http://istishon.blog/node/6959

তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-১
http://istishon.blog/blog/9505

১ thought on “তথাকথিত আন্দোলনঃ কিছু কাগুজে বাঘের মিথ্যে হুঙ্কার। পর্ব-৬

  1. “শাহাবাগের আন্দোলন ছিল একটি

    “শাহাবাগের আন্দোলন ছিল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন” বলে সবার পিলে চমকে দেন ইমরান এইচ সরকার।

    ধন্যবাদ কআআ। ভাল থাকুন দাদা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *