ধূম্রজালের রাতে কবিতার আসর হোক,কি ক্ষতি?

অনেকদিন ধরে ব্লগে কিছু লিখিনা,সময় হয়ে উঠে না,ব্যস্ত শহর,তার সাথে আমিও ব্যস্ত।ভাবলাম যা কিছু জমে আছে মনে একটু একটু গুচ্ছ গুচ্ছ সব একসাথে জমাট করে প্রকাশ করে দিই।তাই করলাম।অনেকেরই ভালো লাগবে না।কারন এখানে ব্যক্তিগত কিছু কথা ছাড়া কিছু নেই,নেই কোনও গভীর দার্শনিক কিছু।শুধুই কিছু কবিতা আর ব্যক্তিগত কথামালার আসর।


অনেকদিন ধরে ব্লগে কিছু লিখিনা,সময় হয়ে উঠে না,ব্যস্ত শহর,তার সাথে আমিও ব্যস্ত।ভাবলাম যা কিছু জমে আছে মনে একটু একটু গুচ্ছ গুচ্ছ সব একসাথে জমাট করে প্রকাশ করে দিই।তাই করলাম।অনেকেরই ভালো লাগবে না।কারন এখানে ব্যক্তিগত কিছু কথা ছাড়া কিছু নেই,নেই কোনও গভীর দার্শনিক কিছু।শুধুই কিছু কবিতা আর ব্যক্তিগত কথামালার আসর।

একদল পাতার সাথে গল্পে বিভোর ছিলাম,তারা বলে যাচ্ছে কিভাবে জন্ম থেকে নার্সারি জীবন কাটাচ্ছে,কি আনন্দে হাওয়ায় দোল টা খায়, কিভাবে পৃথিবীর সিঙ্ঘভাগ পাতারা বোহেমিয়ান জীবন কাটায়,কেউ কেউ তরকারি হয়,কেউ ঔষধ,কেউ ফুলসজ্জার শোভা বাড়ায়।তারাও ঝরে যাবে কিছুদিন পর,সে নিয়ে তাদের দুঃখ হয় না,কালবৈশাখির কথা তারা জানে,রোজ বুড়ো পাতারা গুনগুনিয়ে কবিতা আবৃত্তি করে শোনায় তাদের,তারা রোজ দেখে কত পাতারা নীরবে ঝরে যায়!কেউ ফিরেও দেখেনা,ওরা জন্ম থেকে শব্দহীন,ওদের একটা জাতীয় শপথ পত্র আছে,ভোরে ঘুম ভাঙ্গলেই হাওয়ায় দোলে দোলে ওরা আবৃত্তি করে-

“আমি ভোরবেলার বর্ষাস্নানে বেঁচে উঠেছিলাম
সন্ধ্যেবেলার কালবৈশাখিতে আবারো ঝরে যাবো।”

আজকাল নিজেকে পত্রদলীয় কেউ মনে হয়,মনে হয় যেকোনও সময় আমিও ঝরে যাবো,তবু মনে হয় কোনদিন হয়তো বর্ষার ঝড়ে পাখি হয়ে উড়ে আসবো আবারো,রাতজাগা যুদ্ধের গান শুনাবো,জানলার পাশে গিটারটা ঠিকই বেজে উঠবে!বিছানায় আমার মৃত দেহের পাশে শুয়ে শুয়ে গান শুনে যাবে মরে যাওয়া আরেকটি হলুদ পাতা। সে চিৎকার করে উঠবে আমার মৃত দেহের সাথে “পৃথিবীর সকল পাতাদের পাখি করে দাও,নইলে অভয়ারণ্য দাও,পাতাদের অভয়ারণ্য চাই।”

সেদিনই আমাদের হতাশার জীবন নিয়ে তাতক্ষনিক একটি কবিতা বানিয়ে শুনালেন ইস্টিশনের রেলগাড়ি,বললেন

“হতাশার দেয়ালে মাথা খুটে মরে মানুষ
তবুও চাওয়ার হয় না শেষ
প্রেমিক ও প্রেমিকার,পিতা ও মাতার,
দাদাভাই,দিদিভাই।

বন্ধুর হাত ধরে হেঁটে বেড়াই পৃথিবীর পথ
মনোরথ তবুও বুঝে না কি?
প্রেমিকের শেষ কথা ভুলে যাওয়া চাই
প্রেমিকার দেয়া বিষ ছুঁড়ে ফেলা চাই
পিতার শেষ ধিক্কার মনে রেখো না।

হতাশার রাত বাড়ে,বেড়ে চলে বিষাদের জল
গড়িয়ে পড়ে না,তবু এই পৃথিবীর বুকে-
প্রয়োজন হয় না তো শেষ।
মানুষকে ঘিরে রাখে কামনার রথ,
শরীরের চাওয়া,তৈলাক্ত কল্পনার বৃক্ষ,
নিওলিথিক ঘাতক সময়।

সূর্যের মাধুর্য ভরা ধূসর বিকেল,প্রজাপতি নেই,
পাখিরা নেই,কতগুলো অভূক্ত মানুষ আছে,
বাতাসের বিছানাতে বিষাদ আর আনন্দের মিশ্রন-
রেখে গেলো আধপেটা মানুষের বুকে আশা,
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বাতাস কোনওদিন
হয়ত উড়িয়ে নিয়ে আসবে খাদ্যের অফুরন্ত সম্ভার!

তারপরও হতাশার রাত বাড়ে,বেড়ে চলে বিষাদের জল
গড়িয়ে পড়ে না,তবু এই পৃথিবীর বুকে-
প্রয়োজন হয় না তো শেষ।

আনন্দের মাস্তুল জুড়ে হাসি নেই,শুধু আশা আছে,
মনোরথ বলে শুধু ভালো থাকা চাই
পৃথিবীর সব সুখ নিয়ে নেয়া চাই
প্রতিজ্ঞা করো-
প্রেমিকের শেষ কথা ভুলে যাবে এখনি
প্রেমিকার দেয়া বিষ ছুঁড়ে ফেলবে অনায়াসে
পিতার শেষ ধিক্কার মনে রাখবে না
আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করো-
শুধু ভালো থাকা চাই,শুধু ভালো থাকবে।”

তারপর থেকে ভালো থাকার নিয়ত প্রচেষ্টা চলে,শুধু ভালো থাকতে হবে,তারপর সকাল হয়,আমাদের ঘুম ভাঙ্গে ,পাতার জীবন,বৃক্ষের জীবন আর মানুষের জীবন কখনো কখনো ক্রসফায়ারে এক হয়ে যায়,বৃক্ষের বক্ষে যে কি গভীর জলস্রোতের কাব্য তা তো শুনাইনি কখনো,আসুন শুনি,বৃক্ষমানব তার প্রেয়সীকে বলছে-

“শুনো,এবার একটু শুনো?আমি বলছি
আমার বলার কারন কিন্তু ভিন্ন
উত্তরের কোন এক জঙ্গলে এক বৃক্ষ আছে
তাজিনডং সমান উঁচু ,কখনো কাঁদে না,ঝরে যায় না,
আজ অবধি কেউ তাকে মরে যেতে দেখেনি।
আরেক ধরনের মানুষ আছে,খুব বেশি না
তবে অনেক কম করে হলেও
ওরা মানুষ প্রজাতি নয়,যেমন আমি,আমার কথাই ধরো
আমি উদ্ভট নই,অথচ নিজেকে আর এখন
আমার মানুষ বলে মনে হয়না।
বৃক্ষটা অসম্ভব সত্য বলেছে
আমি ওর জ্ঞাতি ভাই,এসব বলছি কারন
কথা ছিলো আমরা অন্য কিছু হবো
কিন্তু আজকাল আমি এতটাই সহ্যপ্রবণ হয়ে উঠেছি
আমাকে কেঁটে টুকরো করলেও আমি চুপ করে থাকি
আমার বৃক্ষ হৃদয়ের শিকড়ে কেউ পানি দেয় না কখনো
সকলে আগুন জ্বালিয়ে উজাড় বন করে যায়…
কিন্তু আজকাল বড় ভয়ে আছি,অনেক ভয়ে থাকি-
বৃক্ষের শরীর ঘেষে যে নাফাখুম জলপ্রপাত বইছে
তার জলের আগুনে শরীরে বেজে উঠে ঝড়ের জগঝম্প
তাই বলছি এবার শুন,
ওমনটি কখনো করিস না পাগলি,ঝরে যাবো,সত্যি বলছি
আরেকবার শরীর ছুঁয়ে গেলে কসম আমি ডুবে যাবো।”

তারপর এক হতাশার জীবনের বুকে নেমে আসে অসম্ভব জলস্রোতের মতো নৈসর্গিক ভালো লাগা,ডুবিয়ে দিয়ে যায় স্টেশনের চত্বর,এবার পাতার কাছে শেষ পত্র লিখতে গিয়ে ভুল করে ফেলছে ভেবে আটকায় নিজেকে,পুনশ্চ লিখে দেয় ছোট্ট করে-

“রক্তে নিয়ত শানিত হচ্ছে যা
তা যদি প্রকাশিত হয় আজ
বিশ্বাস করো,আর নাই করো
আমি শিরোনাম হয়ে যাবো।।”

মিথ্যে নয়,রক্তে টগবগ করে যা তা সবসময় প্রকাশিত হতে নেই।যেমন গত সপ্তাহে চিঠি টা লিখতে গিয়েছিলাম কিন্তু পরে ছিঁড়ে কুচি কুচি করেছি।

“আজকে তুমি স্নান করবে বলে,নির্জন কুয়াশা জলে
গাছে গাছে ফুলেরা সেজেছে পাখোয়াজ নাগরদোলা।
এমন বসন্ত এসেছে হায়,চারপাশে কি মুক্তির ঢেউ!
ওমন সমুদ্র থেকে উঠে আসলো যারা,তারা-
সবাই তোমার নামটি ধরে ডাকেনা,ডাকে কেউ কেউ।

বাতাস জুড়ে বাজছে আঙ্গুলের মৃদংগ,নিওলিথিক তানপুরা,
অষ্টপ্রহর ঝড়ো নৃত্য!তুমি জলে নামবে বলে-
কী নিথর হাহাকারের গুঞ্জন উঠে সমগ্র স্থলে!
অবুঝ নিউরণ,এখনো বুঝে না,এখনো বেকুব,বেসামাল।

সলিল ভৃত্য,হে নৃত্য,কিছু কথা বলা হয়নি ভুলে
এখন আমিও স্নান করবো বিশুদ্ধ চন্দ্রমল্লিকা জলে
শিরায় শিরায় ঘুম থেকে জেগে উঠে যারা
তারা সবাই তো আমার নামটি ধরে ডাকে না,
কেউ কেউ পাখোয়াজ মেয়েটির নাম ধরে ডাকে
ও নাম সবাই ডাকতে জানে না,ও নাম সবার ডাকতে নেই।।”

হুমম,ওমন নাম সবাই ডাকতে জানেনা,ও নাম সবার ডাকা উচিত নয়।যে নাম শুনলে শিরদাড়া শক্ত হয়ে উঠে,যার নিঃশ্বাস শুনে শুনে রাত কেটে যায়,ওমন নামটি কজন ডাকতে জানে?প্রতিদিন ভোর হয়,আমি তাকে কবিতা শুনাই-

“আমার সমস্ত ঘর জুড়ে তোমার গভীর নিঃশ্বাস জেগে আছে
জেগে আছে ডাহুক,ইলেক্ট্রিক তার,ট্রান্সফরমার,জেগে আছে
বারান্দার বিরহ বিধুর কাপড়ের দড়ি দুলে উঠে,চড়ুই উঠে ডেকে
বৃক্ষরা নড়েচড়ে গান গায়,আহা আজি এ বসন্তে,ভোর জাগে,
শহর জাগে,তার মাঝে আমরা দুজন মানুষ কি নিবিড় জেগে আছি
ইস্টিশনের রেলগাড়ি হুইসেল দিয়ে হুশ করে ছুটে চলে গেলো,তবুও
তোমার সমস্ত নিঃশ্বাস আমার গায়,সমস্ত নিশ্চয়তা আমার বুকে
এমন জেগে জেগে আরো বহুকাল কাটিয়ে দিবো পাগলি,থাকবি তো?”

তুমি কপালে হাত ছুঁইয়ে দিলে আমি বুঝে নেই নীরব সত্য।বিকেলে পাতাদের সাথে আলাপ সেরে বাড়ি ফিরি,চিঠি আসে সন্ধ্যাবেলা-

“মরা কাক এসে ডাক দিয়ে বলে গেছে-আজ রাতে পেঁচারা নিড়ে ফিরে আসেনি,শহরের সকল বৃক্ষ আজ দালান হয়ে গেছে,দালানের চার তলায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছি আমি আর মরে যাওয়া হলুদ পাতা!পাতার অভয়রাণ্য চাইতে আসেনা কেউ।”

হতাশার রাত বাড়ে বেড়ে চলে বিষাদের জল,চুপ করে থাকি,লিখে দিই সুইসাইড নোট,রেখে আসি বনের গভীরে,দালানের গভীর জঙ্গলে-

“যে পাতাঝরার বন বুঝে নাই তোমাকে,তার কাছে তুমি সবুজ চাইবে কেনো?তার চেয়ে বরং শ্বাস নেয়া বন্ধ করে দাও,পাখিরা এইখানে কখনোই আসবে না,খবর পৌঁছে দেবার কেউ নেই,পৃথিবীর কাছে অজানা রয়ে যাবে কী কারনে এই পাতাঝরার বনে একটি অবাধ্য প্রেমিক আত্নহত্যায় প্ররোচিত হয়েছিলো,কোন কবি দিয়েছিলো সেই প্ররোচনা!কেউ জানবে না সেইবার রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটটা বনের গভীরে ক্রীড়াশীল আজো,তাইতো আজো পাতা ঝরে বনে!”

৬ thoughts on “ধূম্রজালের রাতে কবিতার আসর হোক,কি ক্ষতি?

  1. পুরোটা পড়িনি। যতটুকু পড়েছি
    পুরোটা পড়িনি। যতটুকু পড়েছি ভালো লেগেছে। এতোটা একসাথে না দিয়ে রয়েসয়ে দিলে ভালো হতো মনে হয়। আমি আবার একটানা কবিতা পড়তে পারিনা। একটার রেশ অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করতে পছন্দ করি।

    1. পোস্ট টা দেয়ার পর আমার নিজেরও
      পোস্ট টা দেয়ার পর আমার নিজেরও মনে হয়েছে একটু বেশিই হয়ে গেলো সম্ভবত,কিন্তু আবার মনে হলো থাক,এগুলো এভাবে ঝেরে না ফেললে সামনে এগোতে কষ্ট হবে।

      যতটুকুই পড়েছেন এবং যতটুকুই ভালো লেগেছে তার জন্যে ধন্যবাদ 🙂 :ফুল:

  2. কবিতা আর গদ্যের মিশালে ভাল
    কবিতা আর গদ্যের মিশালে ভাল লেগেছে লেখকের চেতনার অনুরণন।

    “আমি ভোরবেলার বর্ষাস্নানে বেঁচে উঠেছিলাম
    সন্ধ্যেবেলার কালবৈশাখিতে আবারো ঝরে যাবো।”

    চরণদুটো চমৎকার। ভাল থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *