মঙ্গলদীপ

আজ দীপাবলি| সমস্ত গ্রাম আজ সাজবে মঙ্গল প্রদীপের আলোক মালায়| সুগন্ধী ধূপের মনোলোভা সৌরভে আমোদিত
হবে পুরো গ্রামের বাতাস| মূহুর্মূহু শঙ্খ, কাসর আর উলুধ্বনীতে ঘোষিত হবে মঙ্গলবারতা| সারাগ্রামে আজ উৎসবের সাজসাজ রব| রায় বাবুদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির| সহস্র প্রদীপ জ্বলবে| আবালবৃদ্ধবনিতা ভিড় করে আছে রায়বাবুদের উঠানে, মন্দির প্রাঙ্গণে| কত কাজ, মায়ের বোধন, পূজা, প্রসাদ তৈরী, নাড়ু পাকানো, প্রদীপ তৈরী, তা দিয়ে কোঠাবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি সাজাতে হবে| দম ফেলার ফুসরত নেই কারও| উঠানের এককোনে আসন করে নারান ভটচায ধর্মকথা শোনাচ্ছে| বুড়োর দল পূণ্যের আশায়

আজ দীপাবলি| সমস্ত গ্রাম আজ সাজবে মঙ্গল প্রদীপের আলোক মালায়| সুগন্ধী ধূপের মনোলোভা সৌরভে আমোদিত
হবে পুরো গ্রামের বাতাস| মূহুর্মূহু শঙ্খ, কাসর আর উলুধ্বনীতে ঘোষিত হবে মঙ্গলবারতা| সারাগ্রামে আজ উৎসবের সাজসাজ রব| রায় বাবুদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির| সহস্র প্রদীপ জ্বলবে| আবালবৃদ্ধবনিতা ভিড় করে আছে রায়বাবুদের উঠানে, মন্দির প্রাঙ্গণে| কত কাজ, মায়ের বোধন, পূজা, প্রসাদ তৈরী, নাড়ু পাকানো, প্রদীপ তৈরী, তা দিয়ে কোঠাবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি সাজাতে হবে| দম ফেলার ফুসরত নেই কারও| উঠানের এককোনে আসন করে নারান ভটচায ধর্মকথা শোনাচ্ছে| বুড়োর দল পূণ্যের আশায়
বসে বসে শুনছে ভটচাযের শাস্ত্রকথা| রায়বাবুর শরীর বিশেষ ভালনা| তবু ছুটাছুটির উপরেই আছেন, বাড়ির পূজো বলে কথা| কত মান্যিগন্যি মানুষেরা আসবেন আজ| রায়গিন্নীরও দম ফেলবার ফুসরত নেই| ভাড়ারের দায়িত্ব তার, চাবিগোছা আচলে বেধে বাড়িময় আলতারাঙ্গা পায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন|
সন্ধ্যা হতে আর বেশী দেরি নেই| একটু পরই মঙ্গলদীপ জ্বালাতে হবে| তারই তোড়জোড়| একটু পরই মঙ্গল আলোয় ভরে যাবে গ্রাম, দূর হয়ে যাবে সকল অকল্যান..
আজ ৩ সপ্তাহ ধরে পবন পালের জ্বর কিছুতেই ছাড়ছে না| পবন পাল-বৈরাগী, প্রতিদিন সকালে প্রভাতী আর ভজন গেয়ে লোকের ঘুম ভাঙ্গায় সে| গান গেয়ে যায় আপন মনে, কারও কাছে কিছু চায় না| এমনকি যে ভদ্রকালির সে উপাসক তার
কাছে ও না| যে যা যেচে দেয় তাতে বাবা-মেয়ের দুমুঠো সেদ্ধ ভাত জুটে যায়| রায়বাবুদের বাড়ির থেকে মাঝে মাঝে তেল নুন
আসে তাতে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়| আজ ৩ সপ্তাহ বের হতে পারে নি বলে গত ২ দিন ধরে চাল বাড়ন্ত| একবেলা খেয়ে দিন
যাচ্চে বাবা-মেয়ের| ৯ বছরের মেয়ে সূধা খিদে সহ্য করতে পারে না তবু পাছে বাবা কষ্ট পায় তাই কিছু বলে না।
বিকেল থেকে পবন বার বার বলছে, মা সূধা, আজ দীপাবলি, মায়ের মন্দিরে অন্তত একটা প্রদীপ দিও মা|
সূধা আজকেরজন্যে পরিপাটি করে একটা প্রদীপ বানিয়েছে|
সলতে পাকিয়েছে পরম যত্নে| গোধূলির রং ফিকে হয়ে এসেছে,
সন্ধ্যা নামে নামে এমন সময়| মুসলমান পাড়ার মসজিদ থেকে আজানের সুললিত সুর ভেসে আসছে| রায় বাবুদের মন্দির প্রাঙ্গন থেকে শোনা যাচ্ছে ঢাক কাসরের বাদ্য| সূধা বাবার বারংবার তাড়ায় মন্দিরে যেয়ে প্রদীপ
জালাতে গিয়ে দেখে তেল নাই|
বাবাকে কিছু না বলে সূধা একদৌড়ে চলে যায় রায়বাবুদের বাড়ি| গিন্নীমাকে গিয়ে ধরে, গিন্নীমা,
আমার বাবা অসুস্থ, আমাদের ঠাকুরের সামনে প্রদীপ
জ্বালাবো, একটু তেলও নেই
গিন্নীমা| একটু তেল দাও না|
গিন্নীমা আতকে ওঠেন, ওমা, মেয়ে বলে কি শোন, একে পূজোবার তায় আবার সাঝসন্ধ্যে, এমন সময়
কেউ কাউকে কিছু দিতে আছে? অমঙ্গল হবে যে! সন্ধ্যার বয়স ৯
হলে কি হবে জীবন এটুকু বয়সে তাকে যা শিখিয়েছে অনেকে ৯০
বছরেও তা শেখে না| সে অনেক অনুনয় বিনয় করে বলে,
গিন্নীমা ভাড়ার থেকে না দাও তোমাদের মন্দিরেও তো প্রদীপ
জ্বালাবে, ওখেন থেকে একটুখানি দাও না গো|
পাশদিয়ে যাচ্ছিল
নারান ভটচায, একথা শুনে হা হা করে উঠল|
বলে কি মুখপুড়ি, মায়ের পূজোর তেল
পূজোর আগে হতচ্ছাড়ীকে দিয়ে অকল্যান ডেকে আনি আর কি|
উপায়ান্তর না পেয়ে সূধা বাড়িতে ফিরে যায়|
ঠাকুরের সামনে ঠায় দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ,
হটাৎ শুনতে পায় বাবা ডাকছে,
ঠিক ডাকছে না গোঙ্গাচ্ছে|
সূধা বাবার মাথার কাছে গিয়ে বসে|
ধীর লয়ে সন্ধ্যা নামছে যেন আজ| পবনের জীবন প্রদীপ
নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে|
সূধা বাবার মাথার
কাছে বসে আছে নির্বাক| নিষ্পলক| দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে| আস্তে আস্তে নিভে যায় পবনের জীবনের টিমটিমে বাতিটা, আলোহীন একটা ঘরে|
কাসর বাজছে, ঢাকের শব্দে মূখর পুরো গ্রাম, মূহুর্মূহু
শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে রায়বাড়ির মন্দির থেকে| মঙ্গলদীপের আলোক মালায় আলোকিত হয়ে উঠেছে পুরো গ্রাম| অপসৃত হয়ে যাচ্ছে অমঙ্গলের অন্ধকার| সদ্যমৃত বাবার মাথা কোলে নিয়ে অন্ধকার ঘরের ভাঙ্গা বেড়ার ফাকা দিয়ে দীপাবলির মঙ্গল আলোক সজ্জার দিকে অশ্রুভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, নিরুদ্বিগ্ন ভাবে| ভাগ্যিস সে ঘরে কেউ ছিলনা আর থাকলেও
দেখার মত কোন আলো ছিল না, থাকলে হয়ত দেখতে পেত, রায়বাড়ির দীপাবলির আলোকমালার দিকে সূধা যে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মন্দিরে মন্দিরে দীপাবলির আলোকমালার দিকে দেবীও হয়ত সেই একই দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন|

৬ thoughts on “মঙ্গলদীপ

  1. আজ কি সত্যই দীপাবলি?
    সমস্ত

    আজ কি সত্যই দীপাবলি?

    সমস্ত গ্রাম আজ সাজবে মঙ্গল প্রদীপের আলোক মালায়| সুগন্ধী ধূপের মনোলোভা সৌরভে আমোদিত

    কেন এসব? না করলে কি মানুষের?

  2. ধর্ম কিছু বিশ্বাস, কিছু
    ধর্ম কিছু বিশ্বাস, কিছু আনুষ্ঠানিকতা আর অনেক অনেক খানি দার্শনিকতার এক অপুর্ব সমন্ময়। এর কোনটা বাদ পড়লে তা হয়ে পড়ে অসম্পুর্ণ। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য প্রায় সকল ধর্মের মানুষই আজ আমরা ভুলেছি এই সমন্ময় যার ফলে আমরা হারিয়ে ফেলেছি ধর্মের কল্যানময়ী রুপ, কোথাও আচারের আড়ালে কোথাও অতিশাসনের।

    1. ধর্ম কিছু বিশ্বাস, কিছু

      ধর্ম কিছু বিশ্বাস, কিছু আনুষ্ঠানিকতা আর
      অনেক অনেক খানি দার্শনিকতার এক অপুর্ব
      সমন্ময়। এর কোনটা বাদ
      পড়লে তা হয়ে পড়ে অসম্পুর্ণ। কিন্তু দুঃখ
      জনক হলেও সত্য প্রায় সকল ধর্মের মানুষই
      আজ আমরা ভুলেছি এই সমন্ময় যার
      ফলে আমরা হারিয়ে ফেলেছি ধর্মের
      কল্যানময়ী রুপ, কোথাও আচারের
      আড়ালে কোথাও অতিশাসনের।

      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. দুরন্ত জয়, শঙ্খনীল কারাগার,
    দুরন্ত জয়, শঙ্খনীল কারাগার, ডাঃ আতিক@ ধন্যবাদ সবাইকে কষ্ট করে পড়ার জন্য এবং মুল্যবান মতামত দিয়ে উৎসাহিত করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *