ভারতীয় সিনেমা গুন্ডে ও আমাদের প্রতিবাদ

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি, আজ থেকে ১১ বৎসর আগের কথা, বরিশালের যে কোন এক এলাকায় ভাড়া করা একটা বাসায় আমাদের পুরো পরিবার থাকে। আমি নিজে থাকতাম কাছেই একটা আবাসিক মাদ্রাসায়। বাসা কাছাকাছি হওয়ায় আমার খাবার বাসা থেকেই পাঠানো হতো। আমার সাথের একটা ছাত্র আমার খাবার নিয়ে আসতো, আমাকে বাসায় যেতে দেয়া হতো না; যদি সময় মত না আসি- সেই ভয়ে। যাই হোক, যখন সেই ছেলেটা না থাকতো, মানে বাড়িতে বেড়াতে যেতো, শুধু তখন-ই আমার বাসায় যাওয়ার সুযোগ জুটতো। তো একদিন ওই ছেলে না থাকায় আমি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় গেলাম, গিয়ে দেখি বাসার সামনের দরজায় তালা লাগানো। আমার তো মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো, আমি বাসার দোতলায় আমার বোনদের হাসাহাসি শুনতে পাচ্ছি, অথচ ঘরের সামনে তালা!
যাই হোক, আমি বোনদের নাম ধরে ডাকাডাকি করছি, হঠাৎ দেখলাম, আমার থেকে বয়সে ছোট একটা ছেলে আমার সামনে এসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, জিজ্ঞেস করলাম- কি হইছে?
ও বললো- আপনে মুক্তা আপুরে ডাকেন ক্যান?
– তোমার দরকার কী?
– দরকার আছে, আপনে তারে ডাকেন ক্যান?
মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো, ওকে জিজ্ঞেস করলাম- আমাকে চেনো?
– আপনারে চেনা লাগবে না, আপনে আমারে চিনেন?
– না, চিনি না, আর আমি মুক্তাদের ভাই, এইটা আমাদের বাসা, বুঝছ?
– এহ, আমি মুক্তা আপুর ভাই রে চিনি, প্রত্যেকদিন বাসায় আসে ভাত নিতে, আপনে কেডা? যান মিয়া এইখান থেইক্কা!
মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেলো, বললাম- একটা থাপ্পর দেবো ফাজিল, যা এইখান থেইক্কা।
ছেলেটি আরও উল্টা ঝাড়ি দিলো, বলে- মুক্তা আপু আমারে আপনের থেইকা বেশি চিনে, আমি নালিশ দিলে আপনের খবর আছে কিন্তু।
কথা চলছে, এর মাঝেই পাশের বাসা থেকে আমার মেজো বোন বের হলো, হাতে বাসার চাবি। বললো, কী কাজে যেন ওই বাসায় গেছে, আব্বা- মা বাসায় নেই, তাই বের হওয়ার সময় তালা মেরে রেখেছিলো, আরও কী কী যেন বলেছিলো।
যাই হোক, আমি আমার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটার কথা জিজ্ঞেস করলাম, বললাম- এই ফাজিলটা কে? ততক্ষণে বাসার ভেতরে চলে এসেছি, তো বোনকে বললাম ওই ছেলেটার কথাগুলো। তখন আপু জানালো, ছেলেটার নাম রুবেল, পাশের বাসায় উঠেছে ওরা, আর ওই ছেলের মাথায় একটু ঝামেলা আছে মনে হয়।
যাই হোক, আমার বয়স তখন ১৩ আর ওই ছেলেটার হয়তো ৯-১০!
বর্তমানের গুন্ডে সিনেমার কাহিনী দেখে সবাই যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেভাবে দেখালে ঐদিন তো আমার মানব বন্ধন আর মিছিল না হলেও যে ছেলেটা বাসায় খাবার নেয়ার জন্য আসতো, ওর বাসায় আসা বন্ধ করে দেয়া উচিৎ ছিল। নিজের পরিচয় বিলুপ্তির যে সম্ভাবনা (!) দেখা দিয়েছিলো, তা থেকে বাঁচতে গায়ে নাম- পরিচয়, নয়তো সাথে জন্মনিবন্ধন নিয়ে হাটার দরকার ছিলো, অথবা ছেলেটাকে গিয়ে হাত-পা ধরে বুঝানো দরকার ছিলো যে, – ভাই দেখ, এই আমাদের বাসার সবার একসাথে ছবি, এইখানে আমি আছি, তার মানে আমি এই ঘরের ছেলে। নইলে কাছেই মামার বাসা ছিলো, ওকে নিয়ে সেখানে যাওয়া উচিৎ ছিলো। আর অন্য কিছু না হলেও ওর বাসায় আমার বোনদের সাথে নিয়ে গিয়ে সবার সামনে নিজের পরিচয় তুলে ধরা উচিৎ ছিলো।
আমি কিন্তু এর কোনটাই করিনি, তাতে আমার পরিচয় কি বিলুপ্ত হয়েছে? ওই ছেলেটার সাথে এখনো মাঝে মাঝে দেখা হয়, খুব-ই ভালো সম্পর্ক আমার ওর সাথে। এখন ও খুব ভালো করেই জানে আমি কে।
অর্থাৎ, প্রথম যখন ও আমাকে দেখে পাগলা পাগলা কথা বলছিলো, তখন ও আমাকে চিনতো না বা আমার সম্পর্কে, আমাদের পরিবার সম্পর্কে ও জানতো না। এটা ওর জানার অভাব ছিলো। সেটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করাটা আসলেই পাগলামি হয়ে যেতো।

এখন আসি মূল কথায়-
একটা সিনেমা কখনো কোন ইতিহাসের দলীল হতে পারে না। তার উপরে ভিনদেশীদের বানানো সিনেমায় শুধু কোন ইতিহাসের প্রতি তাদের মনোভাবটাই প্রকাশিত হতে পারে; ইতিহাসের সত্যতা না।
যুদ্ধ এখানে হয়েছে, ভারতে না। আর পুরো ভারতের মাঝে শুধু পশ্চিমবঙ্গ-ই যতটুকু সত্য জানে, বাকি প্রদেশ গুলোর জানার সুযোগ বলতে শুধু ওই মিডিয়া। আর তখনকার যুগের মিডিয়ার কথা বা সাধ্য উঠানোটাই মনে হয় অবান্তর। তাই ওরা আমাদের ইতিহাসের বিকৃতি করলে সেটাকে ওদের জানার অভাব বলেই ধরে নেয়া হবে।
পরবর্তী কথা হল, ভারতের একটা ফালতু সিনেমা আমাদের দেশ নিয়ে কী না কী বললো, তাতেই আমাদের মাথা খারাপ! ভারতের এতো দাম কেন আমাদের কাছে? কোথাকার কার কথায় আমরা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে গেলাম? তাহলে আমি এইবার বললাম, আমেরিকান সাবেক প্রেসিডেন্ট কেনেডি সাহেবকে খুনের পিছনে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী জড়িত। এইটা নিয়ে একটা সিনেমা বানান তো কেউ, তারপরে দেখেন ভারতীয়রা বা আমেরিকানরা লাফালাফি করে কি না!
ওরা কেউ আপনার এই সিনেমার কথা হিসেবেই নিবে না। কারণ, ওরা আমাদের তেমনভাবে পাত্তা দেয় না। কিন্তু আমাদের কাছে ওদের কী দাম!
আমার মনে হয়, আমরা গুন্ডে সিনেমা নিয়ে মাতামাতি করলে সেটা আমাদের-ই সম্মানে লাগে। তাই এটাকে হাস্যকর আর অযৌক্তিক হিসেবে নেয়াটাই যুক্তিযুক্ত। নইলে ভারতীয় কোন সিনেমা কোন দিন আবার বলে বসবে বাংলাদেশ নামের দুনিয়ায় কোন দেশ নেই, ভারতের পাশে যে ব-দ্বীপ টা আছে, ওইটা তাদের আবর্জনা ফেলার জায়গা। সাথে সাথে আমরা পুরো দেশ সাবান দিয়ে ধুইতে শুরু করে দেবো। তারপর পরিষ্কার দেশের ছবি ফেসবুকে দিয়ে, সিনেমা কর্তৃপক্ষের কাছে মেইল করে প্রমাণ করবো আমরা কারো আবর্জনা ফেলার স্থান নই।
.
.
আরে ভাই, প্রতিবাদ যদি জানাতেই হয়, তাহলে ওই সিনেমাকে অগ্রাহ্য করেন। নিজের মত নিজে থাকেন। আর ভারতীয় সিনেমা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়, ওদের সিনেমার কথা মানুষ বিশ্বাস করে আমাদের ইতিহাসকে ভুল বুঝবে- তেমন মনে করলে যা ইচ্ছা তাই করেন। ওদের ইতিহাস বিকৃত করে সিনেমা বানান। সারা দুনিয়ায় প্রচার শুরু করেন- ওদের সিনেমার কথা মিথ্যা! তাতে আপনার মনের জ্বালা যেমন দূর হবে, তেমনি ভারতের অভিযুক্ত সিনেমাটাও হিট হয়ে যাবে।

শেষে একটা কথা- তথাকথিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক প্রতিনিধি গত বৎসর বলেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ফকিন্নির পুত’রা পড়ে, তাই দেশের সকল স্থান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান সকল শিক্ষার্থীর চৌদ্দ গুষ্ঠির পরিচয় সংগ্রহ করে একটা জাদুঘর বানানোর আহ্বান জানাচ্ছি, যেখানে প্রমাণ করা হবে, আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ফকিন্নির পুত নই। আর ফকিন্নির পুত একটা বিশেষ গালি, যার অর্থ খুব পচা!

৪ thoughts on “ভারতীয় সিনেমা গুন্ডে ও আমাদের প্রতিবাদ

  1. শেষে একটা কথা- তথাকথিত

    শেষে একটা কথা- তথাকথিত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক প্রতিনিধি গত বৎসর বলেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ফকিন্নির পুত’রা পড়ে, তাই দেশের সকল স্থান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান সকল শিক্ষার্থীর চৌদ্দ গুষ্ঠির পরিচয় সংগ্রহ করে একটা জাদুঘর বানানোর আহ্বান জানাচ্ছি, যেখানে প্রমাণ করা হবে, আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ফকিন্নির পুত নই। আর ফকিন্নির পুত একটা বিশেষ গালি, যার অর্থ খুব পচা!

    একবার নিউজিল্যান্ড এয়ারপোর্টে সরকারি কাজে যাওয়া আমাদের ২২-বাংলাদেশিকে ‘আটক’ করা হলে, আমাদের টিম লিডার অতিরিক্ত সচিব বলেন “উই কেইম ফরম পুওর কান্ট্রি বাট উই আর নট পুওর” তাতেই কাজ হয় ও এয়ারপোর্ট কর্মকর্তারা ক্ষমা চান।

    ব্যাস!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *