একুশের দিনে এক ছোট বালিকা…

ছোট একটা মফস্বল শহরে তমার বাড়ি।তমার বাড়ির আশেপাশের মানুষগুলি আধুনিক প্রযুক্তির ছুয়া পেলেও নিজেরা ঠিক আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি।যদিও উচ্চ শিক্ষায় তাদের কোন সমস্যা নেই। বরং শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মান্ধতার জালে নিজেকে বন্ধি করে রাখাটাই তাদের কাছে আধুনিকতা!
কিছু বাড়ি আছে যে বাড়ির কর্তা কলেজের ‘বাংলা’র লেকচারার।অথচ সেই বাড়ির মেয়েরাই কলেজে পড়তে যায় আপাদ মস্তক বোরকা সহ হাত মোজা পা মোজা পড়ে।মোট কথা ১৪-১৫ বছর বয়স হবার পর তারা আর কোন ছেলে বা পুরুষের সামনে আসা টাকে ভয়ংকর পাপ বলে মনে করে।তমার ঠিক পাশের বাসার অবস্থাও এমনি।এবং এই বাড়ির ছোট মেয়ে তমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।নাম তার মীম।

ছোট একটা মফস্বল শহরে তমার বাড়ি।তমার বাড়ির আশেপাশের মানুষগুলি আধুনিক প্রযুক্তির ছুয়া পেলেও নিজেরা ঠিক আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি।যদিও উচ্চ শিক্ষায় তাদের কোন সমস্যা নেই। বরং শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মান্ধতার জালে নিজেকে বন্ধি করে রাখাটাই তাদের কাছে আধুনিকতা!
কিছু বাড়ি আছে যে বাড়ির কর্তা কলেজের ‘বাংলা’র লেকচারার।অথচ সেই বাড়ির মেয়েরাই কলেজে পড়তে যায় আপাদ মস্তক বোরকা সহ হাত মোজা পা মোজা পড়ে।মোট কথা ১৪-১৫ বছর বয়স হবার পর তারা আর কোন ছেলে বা পুরুষের সামনে আসা টাকে ভয়ংকর পাপ বলে মনে করে।তমার ঠিক পাশের বাসার অবস্থাও এমনি।এবং এই বাড়ির ছোট মেয়ে তমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।নাম তার মীম।
তমা এইবার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে।তমা এবং মীম দুইজনেই সেই ছোটবেলা থেকেই একসাথে একই স্কুলে পড়াশুনা করে আসছে।তাই দুই জনের মাঝে পরাশুনা নিয়ে তুমুল লড়াই।তবে তমার বেলায় ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।
তমা যখন থেকে পড়তে শিখেছে তখন থেকেই তাকে দেওয়া হয় পুর্ন স্বাধীনতা।বর্তমান সময়ে বাচ্চাদের ঘারে স্কুল ব্যাগ নামক এক বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সারাদিন স্কুল আর কোচিং এ নিয়ে মা অথবা বাবা দৌড় প্রতিযোগিতায় নামে। কিন্তু তমার বেলায় একেবারেই উল্টো।ওর স্কুলে যাবার কোন তাড়া নেই।যদিও সে স্কুল ফাঁকি দেয় না।তবে স্কুল শেষে অবসর সময় টুকু তাকে আর দশটা বাচ্চার মত কোচিং এ গিয়ে নষ্ট করতে হয়না।স্কুল বাদে বাকি সময়টুকু সে গল্পের বই পড়ে, নিজের মনে খেলে, নাচে, গান গায়।অন্য ছেলেমেয়ের তুলনায় পড়াশুনায় এতো কম সময় দিয়েও তমা সবসময় সবাইকে টপকে ক্লাসে প্রথম হয়ে যায়। এ নিয়ে মীম এর প্রচণ্ড হিংসে হয়।
তমার সাথে মীমের পড়াশুনা নিয়ে এই হিংসে আর প্রতিযোগিতার মাঝেই কেটে যায় পাঁচটি বছর। পঞ্চম শ্রেনীর বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্টে বরাবরের মতোই তমা এগিয়ে। তমা ট্যালেন্টফুলে বৃত্তি পায় আর মীম পায় জেনারেলে।তমা বয়সের তুলনায় অনেক বেশিই পরিণত।সেই ছোট বেলা থেকেই বই পড়ার ফল সে এখন টের পাচ্ছে।চারিদিকে এখন তমার গুনের যেমন ছড়াছড়ি তেমন নিন্দে করার লোকেরও যেন অভাব নেই।কারন তমা এখন বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে, এতো বড়(!) হওয়া সত্বেও মাঝে মাঝেই বিভিন্ন উৎসবে বা থানা পর্যায়ে কোন অনুষ্ঠানে তমার ডাক পড়ে।সেইসব অনুষ্ঠানে তমা, নাচে, গান গায়, কবিতা আবৃত্তি করে।মাঝে মাঝে ছবি আঁকা, রচনা প্রতিযোগিতা, যেখানেই এই ধরনের প্রোগ্রাম হয় সেখানেই তমা অংশগ্রহন করে এবং ঠিকই প্রথম পুরষ্কারটি ছিনিয়ে নিয়ে আসে।
এই বয়সেই তমার এতোসব গুন, আশেপাশের ওর সমবয়সী মেয়েরা হিংসে করলেও অনেকের মাঝেই ওর এইসব কর্মকান্ডের প্রভাব অনেকের উপরেই পড়ে।বিশেষ করে মীম তমার দেখাদেখি বই পড়া শুরু করে।কিন্তু মীম যেখানে ‘ঠাকুর মার ঝুলি’দিয়ে শুরু করেছে তমা সেখানে সুনীলের ‘প্রথম আলো’ পড়ে শেষ করলো মাত্র।তো তমার পড়াশুনা বা জানাশুনার সমকক্ষ হওয়া কি আর চারটি খানি কথা, যদি না তা তমার মতো হৃদয় থেকে না আসে?কাওকে হিংসে করে প্রতিযোগিতায় নেমে জ্ঞানী হওয়া যায়না। জানার আগ্রহ জন্মাতে হয় হৃদয় থেকে।
যাইহোক,সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া একে বালিকার মনে এখন একটাই স্বপ্ন। এখন ভাষার মাস। সামনে ২১শে ফেব্রুয়ারী।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।এইদিনে প্রতিবছর এলাকায় পাড়ার ছেলেরা মিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাম করে হিন্দি এবং ওয়েস্টার্ন গানের মিউজিকের সাথে নাচানাচি করে।কিন্তু তমা চায় এইবার ভাষার মাসে ভাষা শহীদদের প্রকৃতরূপে শ্রদ্ধা জানাতে। বড়রা হয়তো ওর কথা শুনবে না।কিন্তু ও নিজে মাসের শুরু থেকেই এলাকার ছোট ছোট বাচ্চাদের কে দেশাত্ববোধক গান, গান, কবিতা আবৃত্তি এইসব বিষয়ে রিহের্সাল দিয়ে আসছে।তমার ইচ্ছে এইবার এলাকায় সে যেভাবেই হোক, কাঁদা মাটি দিয়ে পাড়ার মাঠে একটা ছোট শহীদমিনার গড়ে তুলবে। তারপর সেখানে ভোরবেলা ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ফুল দিয়ে সকল ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।সারাদিন বাচ্চাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন রকম খেলাধুলার আয়োজন করবে, প্রতিযোগিতা দিবে। এবং সন্ধ্যার পর হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
হাঁতে সময় আছে আর পাঁচদিন।কিন্তু কেউ ওর কথা শুনছে না।ও নিজেই এখনো ছোট। তাই কেউ ওর কথার গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাছাড়া পাড়ার ছেলেরা ওকে পাত্তা দেয়না।কারন সবার ধারনা ও বেশি বুঝে, তাই সবাই ওকে হিংসে করে এড়িয়ে চলে।কিন্তু তমা দমে যায়না। সে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ওর ছোট ঘরে রিহের্সাল চালাতে থাকে।
তমার মামা ঢাকায় পড়াশুনা করে। তমা তাকে ফোন দিয়ে বিস্তারিত সব খুলে বলে।তমার মামা একজন সেক্যুলার মানুষ। বলতে গেলে তমার এই রকম হয়ে উঠার পিছনে তারই অবদান সবচেয়ে বেশি।তমার কথা শুনে সে এলাকায় চলে আসে। এবং পাড়ার ছেলেদের সাথে এই নিয়ে আলোচনায় বসে।অনেক চাপাচাপির পর তমার পরিকল্পনার ব্যাপারে সবাইকে রাজি করানো সম্ভব হয়।
২১শে ফেব্রুয়ারীর আগের দিন। মাঠের একপাশে শহীদমিনার তৈরির কাজ শেষ।এমন সময় কিছু বয়স্ক মানুষ এসে ওর ছোট স্বপ্নের শহীদমিনারটি ভেঙ্গে দেয়।তাদের কথা অনুযায়ী শহীদমিনারে ফুল দেওয়া আর পূজা করা একই কথা।এবং এই কাজ মহা পাপ(!)
সেই সাথে তারা তমার অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও বাঁধা দেয়।ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকে অসভ্য বানিয়ে ফেলছে বলে তমাকে তারা সবাই বকাঝকা করে।তমার সমস্ত পরিকল্পনা, স্বপ্ন ভেস্তে যায়।ওর প্রিয় মাতৃভাষার জন্য যারা ৫২ তে শহীদ হয়েছিলো, তমাকে ওদের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাতে দেওয়া হলো না।
২১শে ফেব্রুয়ারী।সারাদিন ধরে এলাকায় ঘরে ঘরে পাড়ার কয়েকজন ঊঠতি যুবক চাঁদা তুলছে।বিকেলে মঞ্চ তৈরি হবে।সেখানে অনুষ্ঠান হবে।গান হবে, নাচ হবে।আর ওইদিকে ভাষার মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনে এমন লজ্জাকর কর্মকান্ড দেখে লজ্জায় অপমানে তমা ঘরে একা একা কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে আর গেয়ে চলেছে একটি গান, ‘’আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’’।

৩ thoughts on “একুশের দিনে এক ছোট বালিকা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *