সমাজবিধান আর আমাদের কন্যারা ! (“বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা”)

সুরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে, বয়স কত হবে~ দশ/এগারো বছর । সকালে সে পড়তে এসেছে তিমাদের বাড়িতে, তিমা এবার স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে কয়দিন সুরিকে পড়াতে পারেনি। ওদের বাসার দুইটা বিল্ডিং পরেই সুরিদের বাসা।

সুরিকে ও সেই প্রথম শেণীতে থাকা অবস্থা থেকেই পড়াচ্ছে। সুরি’র পরীক্ষা সামনে, আবার ওরও ব্যস্ততা- সব মিলিয়ে বাচ্চা মেয়েটাকে ওদের বাসায় এসেই পড়ার অনুরোধ করেছিলো সীমা আন্টি’র কাছে। আন্টি বরাবরই আন্তরিক মানুষ, ওর অবস্থাটা বুঝলো। তাই আজকে প্রথমবারের মতন সুরি ওর বেডরুমে বসে পড়ছে।


সুরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে, বয়স কত হবে~ দশ/এগারো বছর । সকালে সে পড়তে এসেছে তিমাদের বাড়িতে, তিমা এবার স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে কয়দিন সুরিকে পড়াতে পারেনি। ওদের বাসার দুইটা বিল্ডিং পরেই সুরিদের বাসা।

সুরিকে ও সেই প্রথম শেণীতে থাকা অবস্থা থেকেই পড়াচ্ছে। সুরি’র পরীক্ষা সামনে, আবার ওরও ব্যস্ততা- সব মিলিয়ে বাচ্চা মেয়েটাকে ওদের বাসায় এসেই পড়ার অনুরোধ করেছিলো সীমা আন্টি’র কাছে। আন্টি বরাবরই আন্তরিক মানুষ, ওর অবস্থাটা বুঝলো। তাই আজকে প্রথমবারের মতন সুরি ওর বেডরুমে বসে পড়ছে।

ওকে পরীক্ষার পড়াগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে, তিমা গোসল করবে বলে ওয়াশরুমে গেলো। তাড়াতাড়ি প্রস্তুত না হতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িটা মিস করবে, বাসার আর্থিক অবস্থাতো আর বলবার মত নয়~ এমনটা হলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়েই আর যাওয়া হবে না !

মাথায় হাজারটা কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে~ ক্লাস, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশনের ব্যস্ততার বাইরেও~ আজকে যে জামী’র জন্মদিনের অনুষ্ঠান আছে। জামী কি বুঝবে, আজ ওর জন্যই একটু বেশি যত্ন করে ও প্রস্তুত হতে চাইছে ! বুঝলেই কি হবে, তিমা’র অস্থির মন কেনোইবা জামী বুঝতে যাবে !

কি হলো???
সুরিটাকে না শব্দ করে পড়তে বলে এসেছি, ওর কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি নাতো ওয়াশরুম থেকে। নাহ, মেয়েটা দিন দিন পড়া-শোনায় অমনযোগী হয়ে উঠছে! শেষে রেজাল্ট খারাপ করবে, ফলে এতোদিনকার টিউশনিটা হয়তো ওকে হারাতে হবে! গোসল থেকে বেড়িয়েই ওকে আচ্ছামত বকা দিবো।

নীচ থেকে তিমার মা জয়িতা বানু, তরকারী কিনে বাসার দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। কাশেম সাহেব হাসি মুখে তাক্ সুরির পড়া-শোনা করার ভূয়সী প্রশংসা করে কথা বলতে আরম্ভ করলো। জয়িতা বানু স্বামীর মুখে অযথা বিষয়ে কথা বলা একেবারেই পছন্দ করে না।

তার উপর গত তিন দিন হলো মাছের ফেরিওয়ালা এসে মাছে টাকা চেয়ে যাচ্ছে, দিতে পারছে না বলে সে যারপরনাই বিব্রত। আজকের তরকারীগুলোও বাকিতে এনেছে, এইভাবে জীবন চলে !
ছেলেমেয়েগুলো নিজের টাকায় পড়াশোনা করছে। কি কষ্টই না ওদের করতে হচ্ছে। আর সে প্রশংসা করছে সুরির !
যত্তোসব আদিক্ষ্যতা আরকি।

তিমার গোসল শেষ, নাস্তা করবে বলে খাওয়ার টেবিলে খাবার দিতে বললো। জয়িতা বানু সেই তাড়াহুড়োয় ব্যস্ত। এর মাঝেই কাশেম সাহেব জানালো সে তার খাবারটা আজকে পেট পুরে খেয়েছে, এখন বাইরে যাচ্ছে। তিমা এসে তাকে বিদায় জানিয়ে দরজা বন্ধ করলো।

সুরিটা মুখ কালো করে বসে আছে। পড়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিহবলের মতো তিমার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা ওকে মাঝে মাঝেই বিরক্ত করে ফেলে, পড়েনি সেতো ও ভালোভাবেই বুঝতে পারছে !

কি আর করা যাবে! আজকের জন্য এখন আর কিছুই করা যাচ্ছে না, বাসা থেকে বের হতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তাই সুরির আজকের মত ছুটি।
ক্যাম্পাস থেকে ফিরে তিমা জানতে পারলো~ সুরি আর ওর কাছে পড়বে না, একথা লোক মারফত ওর বাসা থেকে জয়িতা বানুকে জানানো হয়েছে। সব শুনে তিনি সীমা ভাবীর কাছে কারণ জানতে গেলে~ তাকে সে বাসার বাইরে থেকেই কাজের লোক দিয়ে কোন কথা বলবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

তিমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এইরকম হওয়ার কারণ কি? সেতো যথেষ্ট যত্ন করেই সুরিকে পড়ায়। আজ একটু কম পড়িয়েছে, কাল না হয় একটু বেশি পড়িয়ে দিত। কিন্তু ওর মায়ের সাথে এমন খারাপ আচরণেরইবা কি কারণ থাকতে পারে !

আর এত কিছুর পরেও, ওর কি এই বিষয় নিয়ে আর কোন কথা বলতে যাওয়া ঠিক হবে কিনা~ সেটাওতো কিছু বুঝতে উঠতে পারছে না। তার চেয়েও বড়ো কথা মাস শেষে যে তিন হাজার টাকাটা আসতো, সেটা না হলে ও এখন চলবে কি করে !

ওর বাবা কাশেম সাহেবতো কেবল মদ আর জুয়ার আড্ডা নিয়েই ব্যস্ত !
তাহলে কি ওর পড়াশোনাটা আবার থেমে যাবে? আর কত পরীক্ষা তুমি নিবে, সৃষ্টিকর্তা !

বাসার বাইরে বেশ হৈ-হট্টগোল শোনা যাচ্ছে। বারান্দায় গিয়ে তিমা দেখল, ওর বাবাকে এলাকার লোকজন মারতে মারতে বাসার কাছে নিয়ে আসছে। লোকেদের মাঝে সুরির বাবাকে সবচেয়ে আগ্রাসী মুর্তিতে দেখতে পাচ্ছে সে।

আতংকিত তিমা যখন সবার সামনে এসে তার বাবার অপরাধ জানতে চাইলো~
সবার মুখে একটাই কথা~ সুরির শ্লীলতাহানির জন্য তিমার বাবাকে কেবল মার দিয়েই ক্ষান্ত হওয়া ঠিক হবে না।
লম্পট বাবার মেয়ে তিমাকে অপমান না করলে এর প্রকৃত সাজা হচ্ছে না!

তিমার আর্তচিৎকারে কারো মন গললো না, বরং আশে-পাশের বিল্ডিং-এর মেয়ে-মহিলা-বুড়োরা এই বিচারে খুব খুশি হলো। ঠিক হয়েছে বলে সায় দিল। শুষ্ক আক্ষেপের সুরে কেউ কেউ বলতে লাগলো~
“বাবা লম্পট, মেয়েটা’র গা’য়ে এতো লোকের হাত পড়ছে এই মেয়ের আর বিয়ে হবে না। আফসোস !
অবশ্য এই সুরি মেয়েটা’র গা’য়েও ওর বেকুব বাপ-মায়ের জন্য কলংকের কালি লেগে গেলো, কি দরকার ছিলো এই কথা পাঁচ কান করার? এই মেয়েরও জীবন শেষ !”

কাশেম সাহেব কয়দিন জ্বরে ভুগে তার নির্দিষ্ট জুয়ার আড্ডায় আবার নিয়মিত। আর তিমা-সুরি !
তিমা এখন আর জামী’র কথা ভেবে গা’টা একটু বেশি যত্ন করে পরিষ্কার করে না, গালে-মুখে পাউডারের প্রলেপ বোলায় না, ঠোঁট রাঙ্গায় না, চোখে কাজলও টানে না!
সুরিতো এখন নিজের বাবার ছায়া দেখলেও আতংকে শিউরে উঠে!

হায়রে তিমা, হায়রে সুরি !

(“বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা”)

৩৬ thoughts on “সমাজবিধান আর আমাদের কন্যারা ! (“বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা”)

    1. ধন্যবাদ ভাইয়া।
      একটু না,

      ধন্যবাদ ভাইয়া। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
      একটু না, অনেকখানিই অভাব ছিলো।
      আমি নিজেই বুঝেছি বিষয়টা…হুট করেই লিখলাম, আরেকটু ভেবে-চিন্তে লিখতে হত… :খুশি:

  1. তিমা এখন আর জামী’র কথা ভেবে

    তিমা এখন আর জামী’র কথা ভেবে গা’টা একটু বেশি যত্ন করে পরিষ্কার করে না, গালে-মুখে পাউডারের প্রলেপ বোলায় না, ঠোঁট রাঙ্গায় না, চোখে কাজলও টানে না! সুরিতো এখন নিজের বাবার ছায়া দেখলেও আতংকে শিউরে উঠে!

    আর কতো তিমা আর সুরিরা নির্যাতিত হলে আমাদের সমাজের বিবেক জাগ্রত হবে সেটাই ভেবে পাই না। বেশ ভালো লাগলো… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  2. অসাধারন হয়েছে…
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: অসাধারন হয়েছে… মর্মস্পর্শী… শেষে খুবই কষ্ট লাগল… গল্প জানার পরও খারাপ লাগছে অনেক… :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

  3. প্রথমে বুঝে উঠতে পারি নি।
    প্রথমে বুঝে উঠতে পারি নি। অল্প কথায় অনেক বেশি কিছু বুঝিয়েছেন আপু…… ভাল লাগল , শেষ টা এমন হবে বুঝিও নি।

    🙂 আপনার লেখা প্রথম গল্প পড়লাম মনে হয়…

    1. হ্যাঁ, এই প্রথম লিখেছি…জানি
      হ্যাঁ, এই প্রথম লিখেছি…জানি কিছুই হয়নি…চেষ্টা করলাম আরকি !
      তোদের দেখা দেখি… :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে:

    1. কোন ঝাঁকুনি…বুঝিনি, বলে
      কোন ঝাঁকুনি…বুঝিনি, বলে দিলে ভালো লাগবে।
      :মনখারাপ:
      হয়তো না ভাইয়া…এটা কোন গল্পই হয়নি…বুঝতে পারছি… :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:
      :দেখুমনা:

        1. উনি আমার বরো ভাই না???
          তুমিও

          উনি আমার বরো ভাই না???
          তুমিও কি আমার বড়ো নাকি???
          কি জানি…!!!
          তাহলে আপ্নিও ভাইয়া… :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :লইজ্জালাগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে: :হাহাপগে:

    1. বরাবর…এর কোন পরিবর্তন হওয়ার
      বরাবর…এর কোন পরিবর্তন হওয়ার কোন সম্ভাবনা আমি দেখি না… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  4. একটা ভয়াবহ যন্ত্রণা আর কিছু
    একটা ভয়াবহ যন্ত্রণা আর কিছু আক্ষেপ পুড়িয়ে গেলো গল্পটা শেষ করা মাত্র…
    :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মনখারাপ: :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি:

    তোমার লেখাটা খুবই চমৎকার হয়েছে আপু… :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: নাড়িয়ে দিয়ে গেল ভেতরটা… :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন:

        1. আসলে কিছুদিন হলো আমি নেটে
          :খুশি: :খুশি: :খুশি:
          আসলে কিছুদিন হলো আমি নেটে বসার খুব একটা সময় করে উঠতে পারছি না…তাই আমাকে আপনার লেখাগুলোতে পান না।
          আমি আপনার সম্পর্কে শুনেছি…লেখনীর মাধ্যমে আপনি বেশ ভালোই চিন্তার খোড়াক যোগান…আমি সময় পেলে অবশ্যই আপনার লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করবো,ভাইয়া…

          :খুশি: :খুশি: :খুশি:

  5. দিদি গল্পটা ভাল লেগেছে কিন্তু
    দিদি গল্পটা ভাল লেগেছে কিন্তু গল্পের চরিত্রের নামগুলো কেমন জানি গতানুগতিক না একটু ভিন্ন ।। গল্পের মাঝে আকুতি আছে বলেই এটা এতোটা ভাল লাগলো ………

    1. হুট করেই লিখেছিলাম, আবার লিখে
      হুট করেই লিখেছিলাম, আবার লিখে আর সময় পাইনি সেটা পরিমার্জনা করবার !
      আপনার মতন আমারও তেমনটাই মনে হয়েছে…তাই আজ বসে গল্পটার নামটা পরিবর্তন করেছি।
      ধন্যবাদ ভাইয়া… :খুশি: :ধইন্যাপাতা: :খুশি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *