গ্রন্থমেলা/নতুন বই

(এবারের মেলায় এ হুসাইন মিন্টু’র “স্বপ্ননীল” নামে এই বইটি প্রাকাশিত হয়েছে। আফসার ব্রাদার্সের ব্যানারে 322 323 324 নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ)


(এবারের মেলায় এ হুসাইন মিন্টু’র “স্বপ্ননীল” নামে এই বইটি প্রাকাশিত হয়েছে। আফসার ব্রাদার্সের ব্যানারে 322 323 324 নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ)

উপন্যাস স্বপ্ননীল থেকে- রাফি দা-র সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম এখনো খুশির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি! খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ফের মন খারাপ হয়ে গেল। অর্ধবুঝি বা আধাপাগল এ রকম একটি মেয়ে অচেনা অজানা জায়গায় কার কাছে যাবে, কী করবে, কোথায় গিয়ে থাকবে? জানি না খুশি এখন কেমন আছে! পুরানো মন খারাবের সাথে আজ আবার যোগ হয়েছে অফিসের সামান্য ঝামেলা। আজ হঠাৎ করেই অফিসের টি-বয়কে ধমক দিয়েছি। ওকে ধমক দেওয়ার পর থেকে আরো বেশি মন খারাপ হয়েছে। কেন যে ছেলেটাকে আবার ধমক দিতে গেলাম?
বিষন্ন মনে আমি এখন বসে আছি রমনাপার্কের সরকারী ব্রেঞ্চির উপর। এত শীঘ্র বাসায় যেতে ইচ্ছে করছিল না বলে, অফিস থেকে বের হওয়ার পর ঘুরতে ঘুরতে এই পর্যন্ত এসে পৌছেছি। আমাদের অফিসের টি-বয়ের নাম ফটিক। ভালো নাম কী বলতে পারবো না। ফটিক অনেক ভালো ছেলে। গত চৌদ্দ মাসের চাকরী জীবনে আমি ওকে কখনো কারো সঙ্গে বেয়াদবি করা তো দূরের কথা উচু স্বরে কথা বলতেও শোনি নি। আজ আমি তুচ্ছ কারণেই ওকে ধমক দিয়েছি। আমার ধমক শোনার পর ফটিকের ভেতরে তেমন কোনো বিকার পরিলক্ষিত না হলেও আমি নিজেই কষ্ট পেয়েছি। ধমক দেওয়ার আধা ঘন্টা পর আমি ওকে ডেকে ছিলাম। ফটিক দিব্যি মুচকি হাসতে হাসতে আমার অফিসরুমে ঢুকেছে। আমাদের দেশে অসংখ্য লোক আছেন যারা এক রকম ধমকের উপর-ই বেঁচে থাকেন। এদের মধ্যে এক শ্রেণী আছেন, যারা কেবল ধমক দিতে জানেন। নিজের অধিনস্থ সকলকেই এরা ধমক দিয়ে বেড়ায়। আরেক শ্রেণী আছে ভাগ্য বিড়ম্বনায় যারা কিনা সারা জীবন ধমক শোনেই গেলেন। পারলে মাঝে মাঝে স্ব-স্ত্রীর উপর সেই ধমকের শোধ নেয়, নতুবা কিসমতের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে জড় পদার্থের মতো নিঃসংকোচে সব সহ্য করেন । ধমকের ব্যাপারে আরো একটি কথা প্রচলিত আছে, যারা নিজেদের সিনিয়রের কাছে ধমক খায়, তারাই নাকি নিজেদের জুনিয়রকে ধমক দিয়ে বেড়ায়। তবে আমি কেন আজ ছেলেটিকে ধমক দিলাম? আমাকে তো কেউ ধমক দেয় নি। ধমকের এই ভূবণে আমিই বোধ হয় এক বিচিত্র লোক! কেউ আমাকে ধমক দিলে যেমন কষ্ট লাগে, আবার কাউকে ধমক দিতেও অস্বস্তি বোধ হয়।
গত কয়েক দিন বেশ ভালোই কাটল। রহমান সাহেবের নির্দেশনায় কাজ হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। রাতে শুয়ার আগে মোবাইলে এ্যালার্ম দিয়ে রাখি, সেই এ্যালার্ম বাজে রাত দুইটায়। রাতে এ্যালার্ম শোনে ঘুম থেকে ওঠি। আগে প্রতি রাতে দশটা বা এগারোটার দিকে ঘুমাতে যেতাম, আর ঘুম থেকে ওঠতাম সকাল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে। এখন ঘুমিয়ে পড়ি রাত আটটার মধ্যে, আর ওঠি ঠিক রাত দুইটায়। আগে যেহেতু রাত দুইটার পর দুঃস্বপ্নটা দেখতাম, সেই জন্যে রহমান সাহেবের নির্দেশ অনুযায়ী এখন আমাকে রাত দুইটার মধ্যে ওঠতে হয়। সুফলও পাচ্ছি ভালো। এখন আর ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটা দেখি না। সামান্য একটি স্বপ্ন যে মানুষের জীবনকে এভাবে বিষিয়ে তুলতে পারে,আমার তা জানা ছিল না। এখন জানি স্বপ্ন কি, ভয়ে অস্থির হয়ে যাই স্বপ্নের নাম শোনতেই। আমি মহাপুরুষ পর্যায়ের কেউ না। আমি মিনহাজ উদ্দিন। সহজ সরল মনের অধিকারী মনে করে যাকে সবাই মিনু বলে ডাকেন। আমি অতি সাধারণ একজন মানুষ। আমার ভেতরে দুঃখ কষ্ট, ভয় ডর, সাহস, সব ধরনের অনুভূতি কাজ করে।
বাদাম খাবেন স্যার, বাদাম লাগবো ?
আমি মাথা তুলে তাকালাম। বারো তেরো বছরের একটি ছেলে আমার সামনে দাড়িয়ে আছে। নিম শ্যামা রঙের গায়ে ময়লাক্ত টি শার্ট পরেছে। ছেলেটিকে দেখে বড়ই মায়া লাগছে। হায় কিসমত! হায় রে ভাগ্য, তুই আসলে কি? এই বয়সে কেউ কেউ বন্ধুদের সাথে খেলাধূলা করে মাঠ কাঁপানোর পাশাপাশি লেখাপড়া করছে বড় মানুষ হওয়ার বিভোর স্বপ্নে, আবার কেউ রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে বেড়াচ্ছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। হায় নিয়তি! হায় রে দুনিয়া, তোর এই নিষ্ঠুর আচরণ আমার মোটেও ভালো লাগে না। এখন বাদাম খেতে ইচ্ছে করছে না, তবুও ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে বাদাম দিতে বললাম। ছেলেটি মূহুর্তের মধ্যেই বাদামের একটি পুটলা আমার হাতে দিলো। বাদামের পুটলা ব্রিঞ্চির উপর রেখে আমি বাদামের দাম চুকালাম। যখন সাত্তার চাচার সঙ্গে কথা বলি, তখন মনে হয় আমরা এখনো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় নি। সমাজে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছেন, যাদের সংস্পর্ষে এলে মানবতার সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। মানুষ মানুষের জন্য, এর সত্যতা খোঁজে পাওয়া যায়। আবার যখন আকাশ ছোঁয়া ভবণগুলোর দিকে তাকাই, যেই রাস্তা দিয়ে সু সু করে চলে সাহেবদের বিলাস বহুল গাড়ী সেই রাস্তার পাশেই যখন কাউকে পেটের দায়ে হাত পেতে বসে থাকতে দেখি, তখন মনে হয় এর কোনো সত্যতা নেই, ভীত্তিহীন এক প্রবাদ। কোনো এক জ্ঞানী ব্যক্তির মুখ খঁসে বেরিয়ে পড়া দামি কোনো বুলি, যা কেবল বই পুস্তকেই মানায়। বাস্তবে এর কোনো স্থান নেই, বাস্তবতা ঢের নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়ক। সারাদিন বাদাম বিক্রি করে কত উপার্জন করে এই ছেলে? চল্লিশ বা পঁঞ্চাশ টাকা? যা কিনা আমাদের সমাজের কারো কারো এক প্যাকেট সিগারেটের মূল্য হতেও কম। অথচ এই ছেলেকে সেই চল্লিশ বা পঁঞ্চাশ টাকা উপার্জন করার জন্যে সোনার জীবন পানি করতে হচ্ছে। সারাদিন ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে হাট বাজার পার্ক অথবা স্টেশনে স্টেশনে। নিঃসঙ্গ, বেদনাতুর মনে কতই ভাবনার উদয় হয়! আমি এসব কেন ভাবছি? আমি ভেবেই লাভ কি? প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরীরত তেইশ বছরের এক যুবক, মাসিক মাইনে যার সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা, তার কী এমন সাধ্যি আছে? যাদের ভাববার কথা তারা তো নির্বিকার, যাদের এসব দেখার কথা তারা অন্ধ সেজে বসে আছে! হায় রে সমাজ, হায় স্বাধীনতা!
এখনও মাগরিবের আযান হয় নি। পশ্চিম আকাশে গোধূলীর মাখামাখি দেখে বুঝাই যাচ্ছে দিবসের অন্তিম ক্ষণ চলে এসেছে। সূর্য বোধ হয় বিদায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সূর্যমামা অস্ত যাওয়ার আগেই আজ দিনের বুকে রাতের হাতছানি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বলে চারিদিক কেমন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। ভূবণ কাঁপানো শব্দে হঠাৎ গর্জে ওঠল মেঘদূত। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে ওঠল। আজ বৈশাখের শেষ দিন। ভ্যাপসা গরমে জীবন অস্থির হয়ে যাচ্ছিল একটু আগেও। অধুনা ঈশাণ কোণ হতে ছুটে আসা ঝড়ো গতির বাতাস শরীরে সামান্য প্রশান্তি ছোঁয়া দিলেও, ঘুটঘুটে কালো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর বিরতিহীন বিজলী চমক ক্রমশ ওঠে পড়তে তাড়া দিচ্ছে । আবহাওয়ার এমন হেয়ালিপনা মোটেও ভালো ঠেকছে না। যে কোনো মূহুর্তেই শুরু হতে পারে কালবৈশাখী ঝড়। ঝড়ের আগে বাসায় পৌছতে হবে বলেই ব্রিঞ্চি ছেড়ে ওঠে দাড়ালাম। পার্ক থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে ডান পা আগে বাড়িয়ে সামনে তাকাতেই ফের থমকে দাড়ালাম। দুই চোখে যা দেখছি তা একেবারেই অবিশ্বাস্য! এটা কীভাবে সম্ভব? আমার শরীর শিউরে উঠছে। ভেতরে ভেতরে মৃদু ক¤পন শুরু হয়ে গেছে। যে মেয়েটিকে গাজীপুর চৌরাˉ—ায় প্রথম দেখে ছিলাম, তরপর প্রতিনিয়তই যাকে স্বপ্নে দেখছি, স্বপ্নে ব্রহ্মপুত্রের পার ধরে যার সাথে হাটতে হাটতে পৌছে যাই বিভীষিকাময় এক গোরস্থানে। যেখানে আছে নতুন একটি গোর। সেই গোরের পাশে দাড়িয়ে দুইটা আদমখোর শিয়াল তাদের তীক্ষ্ন দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিড়ে বিড়ে খাচ্ছে শব। সেই মেয়েটি এখন আমার সামনে দাড়িয়ে আছে! তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো অবস্থায় থাকলেও ঝড়ো বাতাস তার এলো কেশের একটি চুলও হেলাতে পারছে না! মেয়েটি পলকহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার শরীর ঘেমে একশা, ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড অস্বস্তি লাগছে। ফের বিজলী চমকাল। ঘোর অন্ধকারে হুট করে এক চিলতে আলোর প্রবেশ অন্ধকারকে যেন আরো বেশি দ্বিগুন তেগুন করেই ফের লাপাত্তা। এখন এই পার্ক আমার কাছে শুধুই এক অন্ধকারপুরীর মতো লাগছে। জনবহুল এই রমনা পার্ককে হঠাৎ করেই কেমন যেন শুনশান জনশূন্য মনে হচ্ছে। আশেপাশে আর কাউকে দেখতে পারছি না। অসহায় দৃষ্টি এদিক ওদিক করতেই কোনো একটি অজানা কণ্ঠ মৃদু স্বরে আমাকে ডেকে বলছে, মিনু পালিয়ে যা। পালা মিনু, সময় থাকতে পালিয়ে যা।
আমি দ্রুত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করলাম। না, কাউকে দেখতে পারছি না। তাহলে কে আমাকে পালিয়ে যেতে বলছে? হুবুহু যেন আমার-ই কণ্ঠ! যেন শুষ্ক স্বরে আমি-ই আমাকে পালিয়ে যেতে বলছি। শঙ্কিত নয়নে আমি ফের মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটি আগের জায়গাতেই অনড় দাড়িয়ে আছে। আমি পর পর কয়েক বার ঘন ঘন ঢোক গিললাম। কে যেন পেছন থেকে ফের ডেকে বলল, পালিয়ে যা মিনু, পালিয়ে যা।
আমি পেছন ফিরে চাপা স্বরে জিজ্ঞাস করলাম, কে, কে?
কোনো জবাব পেলাম না। আকাশে ঘন ঘন বিজলী চমকাচ্ছে। বুকের ভেতরটায় ধড়ফড় শব্দ রেল গাড়ীর হুইসালের মতো বিরামহীন বাজছে। সামনে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটি তার দুই হাত বাড়িয়ে আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মেয়েটিকে আমার দিকে আসতে দেখে ভয়ার্ত কন্ঠে বললাম, কে, কে তুমি? আমার কাছে কী চাও?
মেয়েটি কোনো জবাব দিলো না। নিরবে নিঃশব্দে সে আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে! কোনো দিসকূল না পেয়ে আমি গেইট বরাবর দৌড় দিলাম। জীবননাশি বিপদে পতিত হওয়ার পর মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য যেভাবে দৌড়ায়, ঠিক সেই ভাবে ঝেড়ে দৌড় দিলাম।
এক দৌড়ে পার্ক থেকে বের হয়েছি। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আহঃ। আমি আর চলতে পারছি না। পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে।

৬ thoughts on “গ্রন্থমেলা/নতুন বই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *