একুশ নিয়ে আমার স্মৃতি…

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… আমি কি ভুলিতে পারি…
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি…” ছেলেবেলা থেকেই যতো বার এই সুরটি শুনি প্রতিবারই আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। পৃথিবীতে এর চেয়ে করুন আর গৌরব মিশ্রিত কোন সুর আছে কিনা আমার জানা নেই। এই একটি গানের মধ্যেই মিশে আছে একটি জাতির সূর্য সন্তানদের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আশা শোক আর শ্রদ্ধার অবিমিশ্র নিবেদন। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এরকম ত্যাগের ইতিহাস মানুষ হিসেবেই আমাদের করে গৌরবান্বিত। জাতি হিসেবে আমাদের নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়।


“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… আমি কি ভুলিতে পারি…
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি…” ছেলেবেলা থেকেই যতো বার এই সুরটি শুনি প্রতিবারই আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। পৃথিবীতে এর চেয়ে করুন আর গৌরব মিশ্রিত কোন সুর আছে কিনা আমার জানা নেই। এই একটি গানের মধ্যেই মিশে আছে একটি জাতির সূর্য সন্তানদের জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আশা শোক আর শ্রদ্ধার অবিমিশ্র নিবেদন। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এরকম ত্যাগের ইতিহাস মানুষ হিসেবেই আমাদের করে গৌরবান্বিত। জাতি হিসেবে আমাদের নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়।

আজকে ছেলেবেলার একুশ উদযাপন নিয়ে কিছু স্মৃতিকথা লিখতে ইচ্ছে করছে। আমি জানি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে সত্যিকারের চেতনাই কাজ করে। ভীরের মাঝে অসংখ্য মানুষের মাঝে আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করে বাবার কাঁধে চড়ে আসা ছোট্ট শিশুটির অবাক করা চাহনি, আর বাবার গর্বিত চেহারা। দৃশ্যটা দেখলেই আমার ছেলেবেলার একুশ উদযাপনের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আমাদের শৈশবের একুশ উদযাপনের সাথে ঢাকার এই জাঁকজমকপূর্ন উদযাপনে একটা পার্থক্য আমার চোখে ধরা পড়ে। ঢাকার এই জাঁকালো উদযাপনকে আমার কাছে অনেকটাই মেকি মনে হয় শুধুমাত্র একটি কারনে। এখানে নিবেদিত সকল ফুলের স্তবকই রেডিমেড দোকান থেকে কেনা। ঢাকাবাসীর এছাড়া যদিও কোন উপায় নেই। তবুও এরকম মনে হয়, যদিও এর কোন যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা নেই।

ছেলেবেলায় আমাদের একুশ উদযাপন শুরু হতো ২০ ফেব্রুয়ারির দুপুর থেকেই। সকাল থেকেই অপেক্ষায় থাকতাম কখন স্কুল ছুটি হবে। স্কুলে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকেই বন্ধুদের সাথে ফিসফিস করে চলত পরিকল্পনা প্রণয়ন। স্কুল ছুটি হতেই দে ছুট। বাসায় গিয়ে বই খাতা রেখে দুটো নাকে মুখে গুজেই এক দৌড়ে বাসার বাইরে। বাইরে তখন অপেক্ষমান বিচ্ছুর দল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ছক সাজিয়ে নিয়েই শুরু হতো অভিযান। আসলে আমাদের একুশ উদযাপন শুরু হতো আরও এক সপ্তাহ আগে থেকেই। আমার ছেলেবেলা কেটেছে পাকশী পেপার মিল’স কলোনিতে। কলোনির বিশাল এরিয়ায় কোন বিল্ডিং এর সামনে ফুলের বাগানে ভালো ফুল ফুটেছে। কোথায় গেলে পাওয়া যাবে ইয়া বড় বড় সাইজের গাঁদা, কোথায় গেলে পাওয়া যাবে খই ফুল (একধরনের সাদা ফুল, সঠিক নাম জানিনা)। আর এক সপ্তাহ আগে থেকেই নজরে রাখতাম কোন গোলাপের কলিটি ঠিক একুশ তারিখের আগে ফুটে যৌবনবতী হবে। সব থাকত আমাদের নখ দর্পনে। পরিকল্পনা মাফিক আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে শুরু করতাম অভিযান।

ঠিক দুপুরের সময়টা বেঁছে নেওয়ার একটা কারণ ছিল। ঠিক দুপুরের সময় বাসার আংকেলরা থাকত অফিসে। আর অ্যান্টিরা সব ব্যস্ত থাকত দুপুরের খাওয়া দাওয়া আর ভাত ঘুম নিয়ে। এই সুযোগে আমরা হামলা চালাতাম ফুলের বাগানগুলোতে। কি অসম্ভব দ্রুততায় একটার পর একটা ফুল সিমারের মতো নিষ্ঠুরতায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে সঙ্গে থাকা পলিথিনের ব্যাগে ভরতাম ভাবলেই এখনও হাসি পায়। একটার পর একটা বাগানে চলত আমাদের অভিযান। এই ফুল চুরি নিয়েও চলত প্রতিযোগিতা। কলোনিতে বিচ্ছুর দলগুলো সাধারণত আমাদের স্কুলের ক্লাসের ব্যাচ অনুযায়ী বিভক্ত থাকত। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো কোন ব্যাচ কতো বেশী এবং কতো বড় বড় সাইজের ফুল সংগ্রহ করতে পারে। কারণ ফুল সংগ্রহের উপরই নির্ভর করত কাদের ফুলের স্তবক কতো বড় এবং সুন্দর হবে। মাঝে মাঝে হিংসার বশবর্তী হয়ে একদল যখন কোন একটা ভালো বাগানে হামলে পড়েছে আমরা পাশ থেকে চিল চিৎকার দিয়ে বাগানের মালিককে শুনিয়ে দিতাম তার শখের বাগানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। চিল চিৎকার দিয়েই দে ছুট। কারণ হামলে পড়া দলের হাতে উত্তম মধ্যম খাওয়ার সাথে সাথে বাগানের মালিকের হাতেও ধরা খাওয়ার চান্স ছিল। একবার ধরা খাইলেই বাসায় নালিশ চলে যাবে।

সারাদিন এভাবে পুরো কলোনি চষে বেড়িয়ে ভরে উঠত আমাদের হাতে থাকা পলিথিনের ব্যাগগুলো। তাড়াহুড়ায় যারা বাসা থেকে ব্যাগ আনতে ভুলে যেতো তাদের পড়নের প্যান্টের আর শার্টের পকেট ফুলে থাকত হরেক রকম ফুলে। কেউ যদি একটা বড় সাইজের গোলাপ কিংবা ডালিয়া সংগ্রহ করতে পারতাম তাইলে আর পায় কে? ভাবের চোটে মাটিতে পা পড়েনা অবস্থা। গ্রুপের মধ্যে তার আলাদা কদর। সন্ধ্যার অন্ধকারে চলত শেষ সময়ের অভিযান। কারণ কিছু কিছু বাসার আংকেলের শিফটিং ডিউটি থাকত সন্ধ্যায় বা রাতে। তাই দুপুরে অভিযান চালানো বিপদজনক ছিল। আর এক্সক্লুসিভ কিছু কিছু বাগান ছিল যেগুলো কড়া পাহারায় রাখা হতো। তাই সন্ধ্যা বা রাতের অভিযান ছাড়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমরা বিচ্ছুর দল তখন থেকেই ছিলাম এক একজন অনন্ত জলিল। অসম্ভবকে সম্ভব করেই ছাড়তাম। কোন বাগানে একুশে ফেব্রুয়ারি সকালেও ফুল ফুটে থাকতে দেখলে আমাদের আঁতে ঘা লাগত। ফুলগুলো যেন ফুটে থাকত না, আমাদের মুখ ব্যাদান করে ভেংচি কাটত। তাই জান হাতে করে হলেও চলত আমাদের অভিযান। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুরো বাগান সাফা করে দিয়ে আসতাম।

সন্ধ্যায় পর চলত ফুলের স্তবকের সাথে ব্যবহার করার জন্য পাতা সংগ্রহের কাজ। এটা তুলনামূলক সহজ ছিল। এর সাথে একজনের উপর দায়িত্ব থাকত বাঁশ এবং চিকন লোহার তার বা গুনা সংগ্রহের। রাতে একবার বাসায় ঢু মারার হতো রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। খেয়েই আবার দে ছুট। আমাদের গ্রুপের যে কোন একজনের বাসায় আগে থেকে স্থান ঠিক করে রাখা থাকত ফুলের স্তবক বানানোর জন্য। রাত দশটা থেকেই শুরু হতো কাজ। এই কাজে যারা পারদর্শী তারা চরম আগ্রহে কাজ চালিয়ে যেতো। আর বাকীরা উপদেষ্টা ও দর্শকের ভূমিকায়। কোন ফুলটা কোন জায়গায় লাগালে সুন্দর লাগবে। সাইজ কতো বড় হলে পরদিন আমরা সবার মাঝে সেরা হবো এই নিয়ে চলত বিস্তর গবেষণা। প্রথমে বাঁশের চটা গোল করে গুনা দিয়ে বেঁধে চাকা বানানো হতো। এরপর পাতাবাহারের পাতা দিয়ে বাঁশ আর গুনা ঢেকে দেওয়ার কাজ। এরপর শুরু হতো ফুল বসানো। এই কাজে নারিকেলের শলা ব্যবহার করা হতো। প্রথমে গাঁদা আর সাদা রঙের খই ফুল দিয়ে চাকাটি ঢেকে ফেলানর কাজ। এই কাজে সবাই হাত লাগাতাম। ঢেকে দেওয়ার কাজ শেষ হলে মাঝখানে বসানো হতো বিশেষ বিশেষ ফুলগুলো। রক্ত গোলাপ, ডালিয়া, বড় চন্দ্রমল্লিকা এরাই প্রাধান্য পেতেন। একেবারে মাঝখানে সাদা কাগজে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে লেখা হতো মনের কথাগুলো। সাথে এই ফুলের স্তবক যে আমরা দিচ্ছি সেটাও উল্লেখ করা হতো।

ফুলের স্তবক বানানোর এই পুরো কাজটা কি যে উপভোগ করতাম বলে বুঝানো যাবে না। কাজ শেষ হতে হতে প্রায়ই রাত বারোটা বেজে যেতো। ঢাকার মতো একেবারে রাত বারোটায় শহীদ মিনারে যাওয়ার প্রচলন ছিলোনা। আমরা যেতাম একেবারে অন্ধকার ভোরে। রাতের ফুল বানানোর কাজ শেষে কেউ কেউ ওখানেই থেকে যেতো। কেউ কেউ বাসায় ফিরে ঘুম দিতাম। ঘুমানোর সময় মাকে কঠিন ভাবে বলা থাকত যেন একেবারে ফজরের আজানের সময় ডেকে দেওয়া হয়। এখনকার মায়েদের মতো আমাদের অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মায়েরা এতো কর্পোরেট আচরণের ছিলেন না। এই পুরো সময়টাতে একবারও মা বকাঝকা করতেন না। কখনও ফুল চুরি করে ধরা খাইলেও বাসায় নালিশ আসলে সবার সামনে বকেঝকে দিলেও পরে ঠিকই প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে মার খাওয়ার কষ্ট ভুলিয়ে দিতেন। ঠিক ফজরের আজানের সময় মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙতেই উঠে হাত মুখ ধুয়ে শীতের কাপড় পড়ে খালি পায়ে বের হয়ে যেতাম বাসা থেকে। এরপর চলত বিভিন্ন বাসায় বাসায় গিয়ে যেইসব আইলসার হাড্ডি তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি তাদের ডেকে তোলার পালা। সবাই উপস্থিত হলে ফুলের স্তবকটি গভীর মমতা আর সাবধানতায় সবাই মিলে ধরে রওয়ানা দিতাম শহীদ মিনারের দিকে। আমাদের লক্ষ্য থাকত সবার আগে উপস্থিত হয়ে এমন একটা জায়গায় সেটা সেট করে দেওয়া যেন অসংখ্য ফুলের স্তবকের ভিড়ে আমাদেরটা সবার নজরে আসে।

একে একে সবগুলো গ্রুপ এসে উপস্থিত হতো। ফুলে ফুলে ছেয়ে যেতো শহীদ মিনার। একটু ভোরের আলো ফুটতেই বরড়াও এসে উপস্থিত হতেন। আমাদের কারখানার বড় কর্তারা, স্কুলের শিক্ষকরা সবাই এসে উপস্থিত হলে শুরু হতো আনুষ্ঠানিকতা। সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নেওয়া হতো শপথ। মায়ের ভাষার সুনাম রক্ষা এবং দেশ গড়ার জন্য নেওয়া সেই শপথের সবটুকু আমরা না বুঝলেও এটা যে খুব গুরুরত্বপুর্ন একটা ব্যাপার সেটা বুঝতাম। শপথ শেষে শুরু হতো প্রভাতফেরী। খালি পায়ে শৃংখলা বদ্ধ হয়ে লাইন ধরে আমরা পুরো কলোনি প্রদক্ষিণ করতাম। সাথে একটা রিকশা ভ্যানে থাকত মাইকের সরঞ্জাম। মাইকে গান বাজত- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, সালাম সালাম হাজার সালাম সহ অসংখ্য একুশের গান। সে এক দারুণ মুহুর্ত। মাইকের গানের সাথে সাথে আমরা গলা মিলিয়ে গাইতাম- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…

সত্যিই এভাবে একুশ উদযাপন করলে কি গৌরবময় সেই ইতিহাস কেউ ভুলতে পারে। আমি গর্বিত যে এইরকম একটা পরিবেশে বেড়ে উঠতে পেরেছি। আমাদের পরিবেশই আমাদের চেতনার গভীরে গেঁথে দিয়েছ আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন সহ সকল ইতিহাস সেই ছেলেবেলা থেকেই। আজকাল টিভিতে যখন দেখি এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না একুশে ফেব্রুয়ারি কি, তখন তাদের জন্য আফসোস হয়। এখনকার বাবা মায়েরা সন্তানের স্কুলের ক্লাসের মার্কস আর গ্রেডিং নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে, সন্তান যে তার শিকরের পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়ে মানুষ না হয়ে এক একটি রোবটে পরিণত হচ্ছে সেটাও বোঝে না। আমি বিশ্বাস করি, একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য ইতিহাস এবং দেশপ্রেমের চেতনা বিশাল ভূমিকা পালন করে। ছেলেবেলা থেকেই নিজের অজান্তেই খেলাচ্ছলে হলেও এই শিক্ষাটা আমরা পেয়েছি।

এখন বড় হয়ে গেছি। সবকিছুই চলে মেপে মেপে। এখন আর সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে একুশ উদযাপন করা হয় না। কিন্তু ছেলেবেলার সেই স্মৃতি মনের গভীরে এতোটাই ভেতরে গেঁথে গেছে যে, একুশ এলেই রক্তে দোলা ওঠে। রক্তের প্রতিটি কনিকা ছুটে ছুটে গায়- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…

সরকারী চাকরীতে জয়েন করার পর প্রায় আড়াই বছর একটা উপজেলায় থাকতে হয়েছে। ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গিয়েছি একটা জরুরী রোগী এটেন্ড করার জন্য। রোগী দেখে হাসপাতাল থেকে বের হতেই দেখি হাসপাতালের সামনের ফুলের বাগানে দেখি একদল বিচ্ছু ফুল ছিঁড়ছে। দেখে প্রথমে মেজাজ খারাপ হলো। তারপর হুট করেই মনে পড়ে গেলো কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রথম দেখার পরই বিচ্ছুগুলাকে ডাক দিয়েছিলাম। ডাক দেওয়ার পরই একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ে গেছে। কাঁচুমাচু মুখে বিচ্ছুর দল সামনে এসে দাঁড়াতেই ওরা এক ঝলকে আমার শৈশবকেই যেন সামনে এনে দাঁড় করাল। ওদের ভীত মুখের মাঝে আমি খুঁজে পেলাম নিজেকে, খুঁজে পেলাম আমার শৈশবের সেই বিচ্ছু বাহিনীর সদস্যদের। মুখের কাঠিন্য ইচ্ছে করেই দুষ্টুমি করে ধরে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে জেরা করলাম- কিরে ফুল ছিঁড়ছিস কেন? সমস্বরে ওরা উত্তর দিলো- স্যার কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। এক মুহুর্ত চুপ থেকে আকর্ন বিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে বললাম- যাহ্‌ ইচ্ছামতো ফুল ছিঁড়। একটা ফুলও যেন বাকী না থাকে… যাহ্‌… বিচ্ছুর দলের মুখের টিউব লাইট জ্বলে উঠলো যেন। মুহুর্তেই হইহই করে বিচ্ছুর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ফুলের বাগানে। আমি প্রানভরে তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের মাঝে দেখলাম আমার শৈশব। রক্তের কনিকারা ছুটে ছুটে গাইতে লাগলো- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…

৪৪ thoughts on “একুশ নিয়ে আমার স্মৃতি…

  1. লেখকের বলা কথাও মিলে যায়
    লেখকের বলা কথাও মিলে যায় পাঠকের অতীত স্মৃতির সাথে। এর নামই বোধহয় “স্বপ্নসেতু”

    নিজের অতীতের স্মৃতি লিখলাম/পড়লাম মনে হলো। ভাল থাকুন দাদা।

  2. আপনার সাথে আমার দেখি ব্যাপক
    আপনার সাথে আমার দেখি ব্যাপক মিল আতিক ভাই। আমি যেই কলোনিতে থাকি ছোটবেলায় এখানে আমরা বন্ধুরা মিলে শহীদ মিনার তৈরি করতাম, ফুল দিতাম, খেলাধূলার আয়োজন করতাম। তখন বয়স খুব কম ছিল। আমাদের মিনার হতো কলোনীর ভিতরেই যে অফিস সেখানকার ইটের রাস্তার ইট দিয়ে। দলবেধে আগে পর্যাপ্ত পরিমান ইট চুরি করতাম, চাঁদা তুলে গাম, দড়ি, রঙিন কাগজ ইত্যাদি আনতাম। একদল রঙিন কাগজ কেটে দড়িতে গাম দিয়ে লাগাতো আর আরেকদল শহীদ মিনার তৈরি করতাম। রাত দশটা এগারোটার মধ্যেই সব কাজ হয়ে যেত। খুব ভোরে ফুটন্ত তাজা ফুল চুরি করতে চলে যেতাম পাশের বাংলো বাড়িতে। খুব সুন্দর দক্ষ হাতে পুরো বাগান সাবাড় করে দিতাম তারপর সেই ফুল শহীদ মিনারে দিয়ে আমাদের দিন শুরু হতো।

  3. এই লেখা পড়ার পর বুঝলাম- তোমার
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    এই লেখা পড়ার পর বুঝলাম- তোমার রাইটার্স ব্লক কেটে গেছে। আশাকরি এখন আবার আগের মত নিয়মিত ব্লগ পোস্ট তোমার থেকে আমরা পাব।

    আর একুশ নিয়ে তোমার স্মৃতিগুলোর সাথে আমাদের প্রজন্মের স্মৃতির তেমন একটা ফারাক নেই। তুমি আমার না বলা কথাগুলোই যেন বললে। এগিয়ে যাক তোমার ব্লগিং নতুন উদ্দোমে।

  4. লেখায় মিশে থাকা অপরিমিত
    লেখায় মিশে থাকা অপরিমিত অসাধারন আবেগের কথা না হয় নাই বললাম, আপনার এ লেখাটার গুরুত্ব অন্য একটা কারনে অপরিসীম… সেটা হল বর্তমান প্রজন্মের কিছু আলট্রামরডান ফার্মের মুরগির কাছে একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ফ্যাশন শো, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গির কনসার্ট আর উদ্ভট সাজপোশাকের সমাহারে বিকৃত আনন্দ উদযাপনের একটা দিন। তাদের জন্য একটা শক্ত চড় হতে পারে আপনার এ অসাধারন স্মৃতিচারনটি। হয়তো এ চড় খেয়ে তাদের হুশ ফিরলেও ফিরতে পারে… :ভাবতেছি:

    একরাশ ভালোলাগা রেখে গেলাম… :ফুল: :ফুল: :মুগ্ধৈছি: :বুখেআয়বাবুল:

    1. লেখা শুরু করার সময় যদিও এরকম
      লেখা শুরু করার সময় যদিও এরকম কোন উদ্দেশ্য ছিলোনা। স্রেফ স্মৃতিকথা শেয়ার করার ইচ্ছে থেকে লেখা। পরে মনে হোল এই কথাগুলো যোগ করে দেওয়া উচিৎ। ধন্যবাদ ডন।

  5. chronological ফরম্যাটে লেখাটা
    chronological ফরম্যাটে লেখাটা চমৎকার লাগল । আপনার উপস্থাপনার দক্ষতা সতত প্রশংসনীয় । এক কথায় লেখাটা চমৎকার, আর কিছু বলার নাই। 😀 😀 :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  6. পড়ে খুব ভাল লাগলো।
    পড়ে খুব ভাল লাগলো। :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    আজকাল টিভিতে যখন দেখি এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না একুশে ফেব্রুয়ারি কি, তখন তাদের জন্য আফসোস হয়। এখনকার বাবা মায়েরা সন্তানের স্কুলের ক্লাসের মার্কস আর গ্রেডিং নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে, সন্তান যে তার শিকরের পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়ে মানুষ না হয়ে এক একটি রোবটে পরিণত হচ্ছে সেটাও বোঝে না।

    চরম সত্যি বলেছেন। দিন দিন এই রোবটের পরিমাণ এতো বাড়ছে যে ভয় হয় ভবিষ্যৎ না জানি মূর্খ প্রজন্মের হাতে চলে যায়

  7. মুখের কাঠিন্য ইচ্ছে করেই

    মুখের কাঠিন্য ইচ্ছে করেই দুষ্টুমি করে ধরে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে জেরা করলাম- কিরে ফুল ছিঁড়ছিস কেন? সমস্বরে ওরা উত্তর দিলো- স্যার কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। এক মুহুর্ত চুপ থেকে আকর্ন বিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে বললাম- যাহ্‌ ইচ্ছামতো ফুল ছিঁড়। একটা ফুলও যেন বাকী না থাকে… যাহ্‌… বিচ্ছুর দলের মুখের টিউব লাইট জ্বলে উঠলো যেন। মুহুর্তেই হইহই করে বিচ্ছুর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ফুলের বাগানে। আমি প্রানভরে তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের মাঝে দেখলাম আমার শৈশব। রক্তের কনিকারা ছুটে ছুটে গাইতে লাগলো- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…

    চোখে পানি এসে গেলো।

  8. সরকারী চাকরীতে জয়েন করার পর

    সরকারী চাকরীতে জয়েন করার পর প্রায় আড়াই বছর একটা উপজেলায় থাকতে হয়েছে। ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গিয়েছি একটা জরুরী রোগী এটেন্ড করার জন্য। রোগী দেখে হাসপাতাল থেকে বের হতেই দেখি হাসপাতালের সামনের ফুলের বাগানে দেখি একদল বিচ্ছু ফুল ছিঁড়ছে। দেখে প্রথমে মেজাজ খারাপ হলো। তারপর হুট করেই মনে পড়ে গেলো কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রথম দেখার পরই বিচ্ছুগুলাকে ডাক দিয়েছিলাম। ডাক দেওয়ার পরই একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ে গেছে। কাঁচুমাচু মুখে বিচ্ছুর দল সামনে এসে দাঁড়াতেই ওরা এক ঝলকে আমার শৈশবকেই যেন সামনে এনে দাঁড় করাল। ওদের ভীত মুখের মাঝে আমি খুঁজে পেলাম নিজেকে, খুঁজে পেলাম আমার শৈশবের সেই বিচ্ছু বাহিনীর সদস্যদের। মুখের কাঠিন্য ইচ্ছে করেই দুষ্টুমি করে ধরে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে জেরা করলাম- কিরে ফুল ছিঁড়ছিস কেন? সমস্বরে ওরা উত্তর দিলো- স্যার কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। এক মুহুর্ত চুপ থেকে আকর্ন বিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে বললাম- যাহ্‌ ইচ্ছামতো ফুল ছিঁড়। একটা ফুলও যেন বাকী না থাকে… যাহ্‌… বিচ্ছুর দলের মুখের টিউব লাইট জ্বলে উঠলো যেন। মুহুর্তেই হইহই করে বিচ্ছুর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ফুলের বাগানে। আমি প্রানভরে তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের মাঝে দেখলাম আমার শৈশব। রক্তের কনিকারা ছুটে ছুটে গাইতে লাগলো- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…

    খুবই নস্টালজিক! চোখে পানি এসে যায়…
    চমৎকার লিখেছেন! মনেহচ্ছিল নিজের গল্প পড়ছি :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

  9. আহারে। সেই ছুডু বেলায় যখন
    আহারে। সেই ছুডু বেলায় যখন কোয়ার্টারে থাকতাম তখন সেখানকার সব বান্দরেরা মিলে একবার পাটখড়ি আর মাটি দিয়ে কবরের মত উঁচু করে একটা শহীদ মিনার বানিয়েছিলাম। ফুলও চুরি করেছিলাম। একবাসায় গিয়ে ধরাও খেয়েছিলাম। তবে মার খেতে হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারির একটা আলাদা টান আছে মনে হয় আমাদের বাঙালীদের মধ্যে। সেকারণেই একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য ফুল চুরির মতো সামান্য অপরাধ সেখানে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। চমৎকার লাগলো। শৈশবের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
    চমৎকার লেখা আতিক ভাই। :বুখেআয়বাবুল:

    1. হুম, সারাবছর অপেক্ষায় থাকতাম
      হুম, সারাবছর অপেক্ষায় থাকতাম কবে একুশে ফেব্রুয়ারি আসবে। সত্যি বলতে এটাই আমার কাছে কেন জানিনা সবচেয়ে ভালো লাগার একটা দিন ছিল ছোটবেলায়। আপনাকে ধন্যবাদ চমৎকার মন্তব্যের জন্য। :বুখেআয়বাবুল:

      1. ওহ! আমার আবার হাই স্কুল থেকেই
        ওহ! আমার আবার হাই স্কুল থেকেই বিজয় দিবসটা ভালো লাগতো। ওই দিন গার্লস হাই স্কুল আর বয়েজ হাই স্কুলের ছেলে মেয়েরা ডিসির পক্ষ থেকে আয়োজিত প্যারেডে আসতো। আমরা সেই সুযোগে মেয়েদের একটু দেখতে-টেখতে পারতাম। কি যে ভালো লাগতো! 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *