‘শুনতে কি পাও’ মানুষের জয়গান?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের যখন বেহাল দশা চলছে, সিনেমা হলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে শপিং মলে রূপান্তর ঘটছে ঠিক সেই সময়ে কোন প্রামাণ্যচিত্রের বানিজ্যিকভাবে সিনেপ্লেক্সে মুক্তির খবর শুনে একটু হলেও চমকে উঠতে হয় বৈকি। জি, ঠিকই পড়েছেন। প্রামাণ্যচিত্রের বাণিজ্যিক মুক্তি। এমনই এক নতুন ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে আগামীকাল ২১ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে। পাঠক হয়ত ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, গাঁটে পয়সা থাকলে কতো শৌখিন পরিচালকই শুধু প্রামান্যচিত্র কেন, বিজ্ঞাপন চিত্রও বানিজ্যিকভাবে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু মশাই আমি যেই প্রামান্যচিত্রের কথা বলতে এসেছি সেটা ঠিক সেই ক্যাটাগরির নয়।


বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের যখন বেহাল দশা চলছে, সিনেমা হলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে শপিং মলে রূপান্তর ঘটছে ঠিক সেই সময়ে কোন প্রামাণ্যচিত্রের বানিজ্যিকভাবে সিনেপ্লেক্সে মুক্তির খবর শুনে একটু হলেও চমকে উঠতে হয় বৈকি। জি, ঠিকই পড়েছেন। প্রামাণ্যচিত্রের বাণিজ্যিক মুক্তি। এমনই এক নতুন ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে আগামীকাল ২১ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে। পাঠক হয়ত ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, গাঁটে পয়সা থাকলে কতো শৌখিন পরিচালকই শুধু প্রামান্যচিত্র কেন, বিজ্ঞাপন চিত্রও বানিজ্যিকভাবে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু মশাই আমি যেই প্রামান্যচিত্রের কথা বলতে এসেছি সেটা ঠিক সেই ক্যাটাগরির নয়।

প্রামাণ্যচিত্রটির এরই মধ্যে সারাবিশ্বের নামীদামী চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হওয়ায় বয়ান শুনলেই আপনার ধারণা পাল্টে যাবে আশা করি। গত বছর এপ্রিলে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউরোপের প্রধানতম প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী উৎসব সিনেমা দ্যু রিলের সেরা প্রামাণ্যচিত্রের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার “গ্রাঁ প্রি” জয় করেছিলো বাংলাদেশের একটি প্রামান্যচিত্র।

ইতিমধ্যে এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও মর্জাদাপূর্ণ মুম্বাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উতসব মিফ এও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের “স্বর্নশংখ” জিতে নেয় সেই একই ছবি। এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম এই প্রামাণ্য উৎসবে এ বছর ৩৪টি দেশ থেকে ৭৯৩টি ছবি জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে ১৫টি ছবি মূল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য মনোনীত হয়েছে। মুম্বাই ছাড়াও এই চলচ্চিত্রসহ প্রতিযোগিতার ছবিগুলো নয়াদিল্লি, চেন্নাই, কলকাতা, গৌহাটি আর নাগপুরে প্রদর্শিত হবে। ফিল্ম সাউথএশিয়ায় ‘জুরি-এওয়ার্ড’, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীণ প্রামাণ্য উৎসব ডক-লাইপজিগের (জার্মানী) ৫৫তম আসরের `উদ্বোধনী-ছবি’ এবং বিশ্বের বৃহত্তম প্রামাণ্য উৎসব ইডফার (নেদারল্যান্ডস্) ২৫তম আসরে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়াও সারা বিশ্বের আরও প্রায় ডজনখানেক আন্তর্জাতিকভাবে সুখ্যাত ও সম্মানিত চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্রসহ আরও নানান সম্মাননা অর্জন করে নেয় বাংলাদেশের সেই চলচ্চিত্রটি। কি? অবাক লাগছে না? এতো বাঙালির বিশ্বজয়ের সমান। সেই প্রামাণ্যচিত্রটির নাম- “শুনতে কি পাও?”

কামার আহমাদ সাইমন ও সারা আফরীনের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র শুনতে কি পাও। ২০০৯ সালের শেষের দিকে দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা ঘূর্নিঝড় “আইলা”র প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্র “শুনতে কি পাও”। পরিচালক সাইমনের মুখেই শুনুন এর শুরুর ইতিবৃত্ত-
“আমি ছিলাম তারেক ভাই (তারেক মাসুদ) পরিচালিত কাগজের ফুল ছবির প্রধান সহকারী পরিচালক। ২০০৯ সালে ছবির কাজ স্থগিত করেন তারেক ভাই। এ সময় আইলা আঘাত হানল দক্ষিণ বাংলাজুড়ে। আমি সেখানে গেলাম। পেলাম ছোট ছোট গল্প। এরপর মোটামুটি একটি স্টোরি লাইন তৈরি করে ক্যামেরা নিয়ে বসে পড়লাম সুতারখালি গ্রামে—ধারণ করলাম সৌমেন, রাখী ও রাহুলের গল্প।

আমরা দুজনেই পড়তাম বুয়েটে, স্থাপত্যবিদ্যায়। এরপর কখন যে সিনেমার নেশায় বুঁদ হয়ে গেছি, টেরও পাইনি। আমরা অচিরেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শুনতে কি পাও?-এর দেশব্যাপী প্রদর্শনী করব। এখানেও আমাদের আদর্শ তারেক ভাই। রানওয়ে ছবিটির ক্ষেত্রে যেভাবে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রদর্শনী করেছেন, আমরাও একইভাবে প্রদর্শনী করব। দর্শকই যদি না দেখতে পায় পুরস্কার জিতে কী লাভ?”

প্রামাণ্যচিত্র শুনে যারা হাই তুলছেন একঘেয়ে ধারাবর্ননার কথা মনে করে তারা নিশ্চিতভাবেই এক নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবেন “শুনতে কি পাও” দর্শনের মাধ্যমে। চলচ্চিত্রটি নিয়ে মনপুরা ছবির পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ভাষ্য- “আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম একটি প্রামান্যচিত্র দেখব। ধারাবর্ননা চলবে, আর সেইসাথে দৃশ্যকল্প। ছবিটি শেষ হওয়ার পর আমার অভিজ্ঞতা ভিন্নরকম হলো। আমি কি প্রামান্যচিত্র দেখলাম? নাকি কাহিনী চিত্র দেখলাম? আলাদা করা যাচ্ছে না তো। চলচ্চিত্রকার তার নিপুণ মুন্সিয়ানায় একটি প্রামান্য দলীল কাহিনীচিত্রে রূপ দিয়ে দিলেন। ওইদিন প্রদর্শনী অন্তে আমার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলো। হলভর্তি দর্শকের সামনে আমি একটি কথাই বলেছি… আমরা যারা ফিকশন বানাই, যারা দর্শকের ভালোবাসা পাই… আমাদের পা মাটিতে থাকেনা… আমরা আকাশে উড়তে থাকি… “শুনতে কি পাও” এর মতো চলচ্চিত্র আমাদের টেনে মাটিতে নামায়।”

ছবিটির সমালোচনায় আরেক সমালোচক বলেছেন-
রাখী, সৌমেন আর চার বছর বয়সী রাহুলকে ঘিরেই ছুটে চলে ছবি। কিন্তু প্রচ্ছদপটে এ তিনজন থাকলেও সুতারখালী গ্রামের সব ছিন্নমূল মানুষই দ্রবীভূত হয় মেঘের রঙে রাঙানো সচল ছবিতে। জীবনের যত ছোট ছোট অদরকারি বিষয় আছে, তার সবকিছুই দেখতে পাই আমরা। চশমা নিয়ে দুই শিশুর গর্বমাখা উপস্থিতি, কাঠের খেলনা গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন কেনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, লিপস্টিক কেনা, টয়লেট তৈরি করা…অদরকারি—কিন্তু শক্তিশালী হয়ে ওঠে এই বিষয়গুলোই, ছবিটিকে একটি অখণ্ড কাব্যে পরিণত করে তা। হঠাত্ আসা বৃষ্টির জল বালতিতে সংরক্ষণ কিংবা সে জলে স্নানের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয় জীবনই শিল্প, জীবনের শৈল্পিক প্রকাশের জন্য মগ্ন-চৈতন্যে শিস দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। সুতারখালী গ্রামের বাঁধের ওপরে যে রুক্ষ, কষ্টকর ও সংগ্রামী জীবন যাপন, তাতেই রয়েছে শিল্প-শিখর।

শেষ করি গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ভাষায়- “দর্শকের প্রতি আমার অনুরোধ, “শুনতে কি পাও” ছবিটি হলে গিয়ে দেখুন। বহু প্রতীক্ষার পর আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে ছবিটি মুক্তি পাবে। সম্ভবত এটাই বাংলাদেশের প্রথম প্রামাণ্যচিত্রের বাণিজ্যিক মুক্তি, আপনিও হতে পারেন এই ইতিহাসের সাক্ষী।”


বিস্তারিত জানতে “শুনতেকি পাও” এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজওয়েব সাইট ভিজিট করতে পারেন। জয় হোক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের।

(প্রথম পাতায় আমার দুটি পোস্ট আছে অলরেডি। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এমন জয়যাত্রার সুখবরের শুরুর কথা ইস্টিশনের যাত্রীদের জন্য না লিখে থাকতে পারলাম না। ইস্টিশন মাস্টার ইচ্ছে হলে আমার আগের পোস্ট করা যে কোন একটি লেখা প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।)

২০ thoughts on “‘শুনতে কি পাও’ মানুষের জয়গান?

  1. অনেক অনেক ধন্যবাদ এই পোস্টের
    অনেক অনেক ধন্যবাদ এই পোস্টের জন্য। :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: না হলে এতো বিষদভাবে জানতেও পারতাম না। “শুনতে কি পাও” সম্পর্কে হালকা-পাতলা শোনা ছিল। কিন্তু এটা যে এতো তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে তা আপনার এই পোস্টের মাধ্যমেই জানতে পারলাম। অত্যন্ত গর্বিত বোধ করছি। জয় বাংলা, জয় বাংলার তারুন্য। বসুন্ধরায় দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে রাখি।

  2. অনেক ধন্যবাদ আতিক ভাই। এই
    অনেক ধন্যবাদ আতিক ভাই। এই পোস্ট না পড়লে প্রামাণ্যচিত্রটি সম্পর্কে বিশদভাবে জানা হতো না।
    হলে গিয়ে দেখার ইচ্ছে রাখি :থাম্বসআপ:

  3. গতকাল মাছরাঙা টিভিতে (সম্ভবত
    গতকাল মাছরাঙা টিভিতে (সম্ভবত পূনপ্রচার) ছবিটির পরিচালক সাইমনের একটি শাক্ষাৎকার প্রচার করা হয় এবং সাথে ছবিটির কিছু অংশ।তখনি মনস্থির করে ফেলি ছবিটি দেখবো।আর আতিক ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ ছবিটি সম্পর্কে সুন্দর ভাবে তুলে ধরার জন্য।

  4. অসামান্য এই প্রামান্যচিত্র
    অসামান্য এই প্রামান্যচিত্র নিয়ে আপনার দুর্দান্ত পোস্ট!! :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
    শীঘ্রই দেখতে হবে!

  5. আগ্রহ জেগেছিল আরও আগেই, এখন
    আগ্রহ জেগেছিল আরও আগেই, এখন তো অধৈর্য হয়ে গেলাম দেখতে যাবার জন্য… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    তাগাদা দেবার জন্য :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল:

  6. অনেক ধন্যবাদ তথ্যবহুল পোষ্টের
    অনেক ধন্যবাদ তথ্যবহুল পোষ্টের জন্য :তালিয়া: ছবিটার পোষ্টার চোখে পরেছিল আগেই, কিন্তু ঠিক খেয়াল করে দেখা হয়নি। পোষ্ট’টা না পড়লে হয়ত জানাই হত না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *