একটি ঋণাত্মক স্লোগান “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ মুজিবের বাপের নাম” এবং এর স্বরূপ সন্ধান

বিগত ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম ভোট দিতে। ধর্মান্ধতায় ঘেরা কুসংস্কার আর জামাত-হেফাজত-বিএনপি সমর্থিত এলাকাটিতে একটি স্লোগান ধর্মান্ধ অনেকের মুখে মুখে ভাসছিল, আর তা হচ্ছে “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ মুজিবের বাপের নাম”।


বিগত ২০০৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম ভোট দিতে। ধর্মান্ধতায় ঘেরা কুসংস্কার আর জামাত-হেফাজত-বিএনপি সমর্থিত এলাকাটিতে একটি স্লোগান ধর্মান্ধ অনেকের মুখে মুখে ভাসছিল, আর তা হচ্ছে “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ মুজিবের বাপের নাম”।

বাজারের ব্যানারেও স্লোগানটি লেখা দেখলাম প্রকাশ্যে! এলাকায় একটি প্রপাগান্ডাও ছড়ানো হয়েছিল প্রবলভাবে যে, ‘শেখ মুজিব হিন্দু পরিবারের সন্তান’, যে কারণে বিগত নির্বাচনে নৌকার প্রবল বাতাসেও বিএনপি প্রার্থী সংসদ নির্বাচিত হন ঐ আসনে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আলেম সমাবেশে তার পরিবারের ব্যাপারে ঐরূপ নেতিবাচক সমালোচনার ব্যাপারেও তাঁর দু:খবোধ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখলাম! টুঙ্গীপাড়ার শেখ পরিবারের ধর্ম বিষয়টা কিছুটা ধোঁয়াশা থেকে সুষ্পষ্ট হলো বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠে। নিরাভরণ সত্য কথনের সহজ সরলতার বর্ণনা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে অনেকটা তৃপ্তির সমাপ্তি দিয়েছে, দিয়েছে শেখ পরিবারের ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়টির স্বচ্ছতর মিমাংসাও অনেকটা।

এ পরিবারের ইতিহাস খুঁজে নানা সূত্রে জানা যায়, সূদুর ইরাকের বাগদাদ থেকে এসেছিলেন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী এদেশে। মুসলিম দর্শনের এক বিখ্যাত ওলী তথা আল্লাহর খাস বান্দা ছিলেন তিনি। এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারের এক অগ্রনায়কও বটে। শেখ পরিবারের পূর্ব পূরুষ শেখ আউয়াল ছিলেন হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর সুযোগ্য শিষ্য ও প্রচারক। দীর্ঘকাল পর তাঁর বংশধর শেখ বোরহান উদ্দীন বসবাস শুরু করেন টুঙ্গিপারায়। তখন থেকেই তাঁদের পরিবারকে লোকে টুঙ্গিপাড়ার ধার্মিক শেখ পরিবার হিসেবে চিনতো। সেই ঐতিহাসিক শেখ পরিবারের সুযোগ্য সন্তান “শেখ মুজিবুর রহমান”, নিরাভরণ নির্লিপ্ত আবেগ বর্জিত ভাষায় বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের পুরো ঘটনা প্রবাহ লিখতে গিয়ে বলেন, “তাঁর বংশের গোড়াপত্তনকারী শেখ বোরহান উদ্দিন কবে থেকে পুর্ববাংলায় লেখকের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় এসে বসবাস করতে থাকেন, তার কোন আদি ইতিহাস পাওয়া যায় না, যে টুকু স্মৃতি অবশিষ্ট ছিল, তা হচ্ছে প্রায় দুইশত বছরের পুরাতন কিছু দালান। যার ৪-টি ভবন নির্মিত হয়েছিল মোঘল আমলে”, পার্শ্ববর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী কাজীরাও ছিলেন মুসলিম বনেদী পরিবার। যাদের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমায় ধনবান শেখ পরিবার ধনহীন পরিবারে রূপান্তরিত হন নানা পথ-পরিক্রমায়, যার ইতিহাসও পাঠক জানতে পারেন এ আত্মজীবনী থেকে।

সুতরাং বাংলাদেশে বসতি স্থাপনকারী কোন পরিবারই টুঙ্গীপাড়ার শেখ পরিবারের চেয়ে বেশী ধার্মিক ছিলেন, এ কথা ইতিহাস স্বীকার করেনা। কিন্তু প্রগতি বিরোধী, ধর্মীয় কুসংস্কার আর অন্ধকারে বসবাসকারী স্বার্থবাদী মোল্লাদের আর কি অস্ত্র আছে এ ধর্মান্ধতা ছাড়া? যে অস্ত্রটি তারা আবার প্রয়োগ করেন পাকিস্তান বিরোধী অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনের প্রাক্কালেও। যা নিজেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনে বর্ণনা করেছেন চমৎকার সহজ ভঙ্গিমায়। নিজ ইউনিয়নের মাওলানা, শর্ষিণা, বরগুনা, শিবুপুর আর রহমতপুরের আলেমরা একযোগে ফতোয়া দিলেন, “মুজিবকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না”, যদিও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য মুসলিম লীগে সমর্থন করে আন্দোলন করেছিলেন অনেকদিন, পরে সেই মুসলিম লীগের অত্যাচার এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিরোধী দল গঠন করলেন এবং হলেন মুসলিম লীগ আর পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শত্রু! তারাই অপপ্রচার চালালো “মুজিবকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না”।

যদিও বঙ্গবন্ধু তার প্রায় সব কথাবার্তা ও বক্তৃতায় ‘ইনশাল্লাহ’ বলতেন। প্রমাণস্বরূপ আমরা তার ৭ই মার্চের ভাষণ তুলে আনতে পারি যেখানে তিনি বলেছিলেন “–এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ”, বঙ্গবন্ধু বলতেন, “আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল আমরা মুসলমান, আরেকটা হল আমরা বাঙালি”, এই বাঙালি হওয়াই তার অপরাধ ছিল এবং এই অপরাধেই তাকে ও তার পরিবারকে কম্যুনিস্ট, নাস্তিক, “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ মুজিবের বাপের নাম” ইত্যাদি ঋণাত্মক অভিধায় ভূষিত হতে হয়েছিল।

এবং বিস্ময়করভাবে এ ২০১৩-সনেও ধর্মের ঐ ভোঁতা অস্ত্রটি এখনো প্রয়োগ করতে চাইছে ধর্মব্যবসায়ীরা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ২-নেত্রীর তুলনা করলে নিরপেক্ষবাদীরা অবশ্যই শেখ হাসিনার পাল্লা ভারী দেখলেও, জামাত-শিবির-হেফাজত আস্তিকতা খুঁজে পান বিএনপি নেত্রীর কাজকর্মে, আর নাস্তিকতায় ভরপুর দেখেন মুজিবকন্যার ফজরের নামাজ পরবর্তী কোরান তেলাওয়াত করে দিনের কর্মসূচির সূচনাকে! সচেতন পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম ধার্মিকতা আর অধার্মিকতার ব্যাপারে সত্যাসত্য নির্ণয়ের এ সুনিপুণ সূত্র!

ফেসবুক : https://www.facebook.com/logicalbengali

৩১ thoughts on “একটি ঋণাত্মক স্লোগান “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ মুজিবের বাপের নাম” এবং এর স্বরূপ সন্ধান

  1. অসাধারন একটা কাজ করেছেন
    অসাধারন একটা কাজ করেছেন বাঙ্গালী ভাই… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :তালিয়া: :মুগ্ধৈছি: :বুখেআয়বাবুল: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: আপনার এই সিরিজটা চলুক, আর উন্মোচিত হোক যত প্রোপ্যাগান্ডা আর ষড়যন্ত্র… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow: :অপেক্ষায়আছি:

  2. প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি
    প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে আজ যারা সোনার বাংলায় স্মশানের আগুন জ্বালাচ্ছে তারাই একদিন সে আগুনে পুড়বে। বঙ্গবন্ধুর নামে যারা কালিমা লাগিয়েছে তারা জানে না, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস অনেক আগেই বাঙ্গালীর অন্তরে লেখা হয়ে গেছে। সেটা মোছার চেষ্টা বৃথা।

    1. প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি

      প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে আজ যারা সোনার বাংলায় স্মশানের আগুন জ্বালাচ্ছে তারাই একদিন সে আগুনে পুড়বে। বঙ্গবন্ধুর নামে যারা কালিমা লাগিয়েছে তারা জানে না, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস অনেক আগেই বাঙ্গালীর অন্তরে লেখা হয়ে গেছে। সেটা মোছার চেষ্টা বৃথা।

      সব বলে দিয়েছেন আর কি বলবো। ধন্যবাদ

  3. প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি

    প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে আজ যারা সোনার বাংলায় স্মশানের আগুন জ্বালাচ্ছে তারাই একদিন সে আগুনে পুড়বে। বঙ্গবন্ধুর নামে যারা কালিমা লাগিয়েছে তারা জানে না, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস অনেক আগেই বাঙ্গালীর অন্তরে লেখা হয়ে গেছে। সেটা মোছার চেষ্টা বৃথা

    অসাধারন বলেছেন আইজুদ্দিন ভাই… :bow: :bow: :bow:

  4. স্বাধীন বাংলাদেশ বলতেই
    স্বাধীন বাংলাদেশ বলতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটা সবার আগে আসবেই। কম চেষ্টা তো হয়নি এই নামটি মুছে ফেলতে। তবে শুয়োরকুল জেনে নিক হাজার বছর চেষ্টা করলেও এই নাম মুছে দেয়া, এই নামের পিছনে প্রপাগান্ডা লাগানো কোনটাই সম্ভব না; যতদিন বাঙালিরা বেঁচে আছে।

  5. দুর্দান্ত লাগলো… সময়ের
    দুর্দান্ত লাগলো… সময়ের অভাবে এতো দিন পড়া হয়নি… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

    1. ফাতেমাকে ধন্যবাদ। মূল বইটি
      ফাতেমাকে ধন্যবাদ। মূল বইটি পড়েছেন? না পড়লে অনুরোধ জানাই। নেটেও পাওয়া যায়। :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  6. জাতির জনকের পরিবার নিয়ে
    জাতির জনকের পরিবার নিয়ে লেখাটায় হৃদয় ছুয়ে গেছে। ধন্যবাদ :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply to ড. লজিক্যাল বাঙালি Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *