রমা [বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা ]

রকিকে ভাল লাগার তেমন কোন কারণ নেই। ভাল ছেলে বলতে যা বোঝায় সেরকম কোন গুণই রকির নেই। বাবাহীন পরিবারে মায়ের কষ্টে উপার্যিত টাকায় ওদের মা-ছেলের সংসার চলে। বড় বোনটার বিয়ে হয়ে গেল গত বছর। বোনটাকে নিয়ে মায়ের কোন চিন্তা ছিল না। শান্ত-ভদ্র-দায়িত্বশীল একটা মেয়ে। টিউশনি করে নিজের লেখাপড়া হাত খরচ চালিয়েও পারলে টুকটাক সাহায্যও করতো ছোট ভাইয়ের পড়াশোনায়। কিন্তু রকিটা সেরকম হয়নি। ছোটবেলা থেকেই একরোখা জেদি স্বভাবের ও। পরিবারের প্রতি কোন দায়িত্ববোধ আছে বলে মনে হয় না। শত কষ্টে একাই চালিয়ে যাওয়া সংসারে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর কোন তাগিদ নেই তার। কেমন একটা নিরুত্তাপ হতাশায় ডুবে থাকে সে সারাক্ষণ। পকেটে টাকা থাকলে সিগারেট কিনে খায়। না থাকলে বন্ধুদের কাছে হাত পাতে। বড় কোন ডিমান্ড নেই। একে ওকে ধরে চা-নাস্তা-সিগারেট যোগার করে চলে। ভার্সিটির ২য় বর্ষে পড়ুয়া যে কোন স্টুডেন্টই হাত খরচ চালানোর জন্য কিছু না কিছু করে। একমাত্র রকিই কিছু করে না। করার প্রয়োজনও মনে করে না! ছাত্র হিসেবেও যে খুব ভাল তা নয়। তবুও বিশেষ কোঠায় জাতীয় ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। রকির বাবা মুক্তিযোদ্ধা নয়। নানা-দাদাদের কেউও যুদ্ধে যায়নি। তবু রকির মা কিভাবে কিভাবে কাকে ধরে যেন ওকে মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছে! সেটা নিয়েও কোন মাথা ব্যথা নেই রকির। সে ভার্সিটিতে আসে, ক্লাস করে। ক্লাস ভাল না লাগলে বের হয়ে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে থাকে। কেউ কিছু খাওয়ালে খায়, নয়তো চুপচাপ বসে থাকে! রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো অনেক সময় এরকম অলস ছেলেদের কাজে লাগায়। রকিকেও তেমন চেষ্টা করা হয়েছে… কিন্তু ওকে কেউ সেদিকেও নিতে পারেনি! ভার্সিটির ফি টা পর্যন্ত বাসায় চায় না। রকির মা নিজে খোঁজ না নিলে সে পরীক্ষা না দিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিতো বোধহয়।
এই যার সার্বিক অবস্থা তার মত একটা ছেলেকে ভাল লাগার তেমন কোন যুক্তি থাকতে পারে না। কিন্তু ভাললাগা বিষয়টা বোধহয় কোন যুক্তি মানে না। আর সেকারণেই হয়তো রকিকেও তার কিছু ক্লাসমেট পছন্দ করে। রমা তেমনই একজন। এটা অবশ্য ঠিক পছন্দ না হয়ে করুণাও হতে পারে!

রমা তিন বোনের মাঝে মেঝো। বাবা মোটামুটি ভাল একটা চাকরি করে। বেশ স্বচ্ছল সংসার। তারপরেও রমা একটা টিউশনি করে নিজের হাত খরচ চালায়। ভার্সিটির টিউশন ফি, যাতায়াত ভাড়া সব বাবাই দেয়। মাস শেষে টিউশনির টাকাটা হাতে পেলে রমার কাছে তাই বেশ কিছু অলস টাকা জমে যায়। রমার এই অলস টাকার একটা বড় অংশ খরচ হয়ে যায় রকিকে চা-নাস্তা খাওয়াতে। সিগারেটের বিল অবশ্য সে কখনওই দেয় না।
রমা খুব চুপচাপ শান্ত স্বভাবের মেয়ে। ভার্সিটিতে খুব ক্লোজ ২/৩টা বান্ধবী ছাড়া আর কোন ফ্রেন্ড নেই। ছেলেদের মধ্যে কেবল রকি আর শাওনের সাথেই একটু ঘনিষ্টতা আছে। বাকিদের সাথে জাস্ট ফরমাল রিলেশন।

তবে শাওন ছেলেটাকে রমার কাছে খুব ব্যক্তিত্বশীল মনে হয়। যদিও ক্লাসমেটদের মধ্যে রকি আর রমা ছাড়া আর তেমন কেউ শাওনের সাথে খুব একটা মেশে না। মেশার সুযোগও আসলে খুব একটা নেই। কারণ, শাওন পড়ালেখা ও থাকা-খাওয়ার খরচ চালানোর জন্য ভার্সিটি গেটের ক্যান্টিন কাম ষ্টেশনারী দোকানে চাকরি করে। বন্ধু পরিচয় দেবার জন্য কিংবা ঘনিষ্ট মেলামেশা করার জন্য কোন “ক্যান্টিনের মামা” বোধহয় আর সবার জন্য খুব একটা সম্মানজনক নয়! শাওন অবশ্য ঠিক ক্যান্টিনের “মামা” নয়। শাওনের কাজ হচ্ছে মোবাইলের ফ্লেক্সি করা, টুকটাক একাউন্টস্‌ দেখা আর মাঝে মাঝে মাইক্রো ওভেনে সিঙ্গারা-সমুচা গরম করে দেয়া। ভার্সিটিতে পড়ুয়া একটা ছেলে যে নিজ ভার্সিটির ক্যান্টিনে এরকম একটা চাকরি করতে পারে এই ব্যাপারটাই বোধহয় সবাই সহজ ভাবে নিতে পারেনি। শাওনের তাতে খুব একটা কিছু এসে যায় না। মান-সম্মান বোধ-এর সজ্ঞাটা তার কাছে একটু অন্যরকম।
শাওনের বাবা গ্রামে থাকে। মা মারা গেছে ছোট বেলায়। বছর তিনেক আগে বড় ভাই বিয়ে করার পর হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে তার বৃদ্ধ বাবা পাশের গ্রামের একটা নিঃসন্তান ডিভোর্সি মাঝ বয়েসী মহিলাকে বিয়ে করে ফেললেন! শাওনের সৎ মা তাদের সংসারে এসে সবাইকে আপন করে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। নিজ সংসার ভাঙ্গার ভয়ে কয়েকদিনের মাঝেই বড় ভাই ভিন্ন হয়ে শ্বশুর বাড়ির এলাকায় নতুন নতুন ঘর তুলে আলাদা থাকা শুরু করে। শাওনের জীবনটা তখন অদ্ভুত রকমের নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। হটাৎ করেই গ্রামের বন্ধু ও সমবয়েসীরা তাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। অজানা একটা অপরাধবোধে বাবা যেন বোবা হয়ে যায়। সবার সাথেই কথা বলা বন্ধ করে দেয় সে…!
শাওন যে তার বাবাকে ঘৃণা করে এমন নয়। মায়ের মৃত্যুর পর একাই বহু কষ্টে কোলে পিঠে দুই ভাইকে মানুষ করে প্রায় এক যুগ পর হঠাৎ কেন প্রায় মেয়ের বয়সী একটা নারীকে সে বিয়ে করলো এটাই শুধু রহস্য! এই রহস্য কারোরই জানা হয়নি কোনদিন। জানার আগ্রহও তেমন কেউ দেখায়নি!
শাওনের বাবা পরিবারের সবার সাথেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর সৎ মা বোধহয় কথা বলার ঠিক সাহসই পায় না। শাওন কখনও এই মহিলাকে ‘মা’ ডাকতে পারেনি। তাই বলে ওনার প্রতি তার কোন রাগ বা ঘৃণাও নেই। বরং সহজ সরল অসহায় মহিলাটির প্রতি তার একটু করুণাই হয়। কিন্তু কোন এক অজানা সঙ্কোচে সেই করুণা বা আবেগ দেখানোর সুযোগ হয়নি কখনও।
আপন মনে একা একা থাকার কারণেই কিনা কে জানে, গ্রামের কলেজ থেকে শাওন বেশ ভাল রেজাল্ট করে H.S.C-তে। শহরের ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে চলে আসে ঢাকায়।

শাওনের ক্লাসমেটেরা কেউ ক্যান্টিনে খেতে আসে না। কেবল রকি আর রমা ছাড়া। রকির কথা আলাদা। ওকে কেউ ফ্রি খাওয়ালে ডাস্টবিনের পাশে বসতেও আপত্তি নেই। রমা আসে মূলতঃ রকিকে খাওয়ানোর জন্য। আর শাওনের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য। রমা ছাড়া ক্যান্টিনে আর তেমন কোন মেয়ে আসে না। এমনিতেও নিরিহ-ভদ্র স্টুডেন্টদের জন্য অবশ্য ক্যান্টিনে বসার পরিবেশ নেই।
রাজনৈতিক ভার্সিটিগুলোতে এটা খুব সাধারণ দৃশ্য। ভার্সিটির ক্যান্টিন হয়ে যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের দলীয় কার্যালয়! আর ক্যান্টিনের স্টাফরা হয়ে যায় সেই সংগঠনের আজ্ঞাবাহক খানসামা। পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতা বদলায়। ক্যান্টিনের স্টাফও বদলায়। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সহ-সম্পাদক “জুয়েল ভাই”-এর সাথে লিঁয়াজু করে শাওন এই কাজটা যোগাড় করেছে। দল ক্ষমতায় আছে আরো তিন বছর। তিন বছর পর শাওন আর এখানে থাকতে পারবে না। সেটা কোন সমস্যা নয়। শাওন এখন সেকেন্ড ইয়ারে। বড় কোন সেশন জটে না পড়লে তিন বছরের মধ্যেই তার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হবার কথা।

আজকে রকিকে নিয়ে রমা যখন ক্যান্টিনে আসলো শাওন তখন কাউন্টারে খুব ব্যস্ত। মোবাইল অপারেটরে কী একটা অফার দিয়েছে। সবাই ৩৩৳ রিচার্জ করছে। ২৳ ভাংতি ফেরত দেয়া নিয়ে রিতিমত হট্টগোল। ঠিক সেই সময়ে রমা আর রকি ক্যান্টিনে এসে সমুচা অর্ডার দিল। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও শাওন এক ঝলক তাকালো রমার দিকে। চোখাচোখি হতেই নিরব হাসি বিনিময় হলো।
রমা মেয়েটাকে খুব ভাল লাগে শাওনের। বাবার ২য় বিয়ের পর এই একটা মানুষের সাথে সে খুব ঘনিষ্টভাবে মনের কথা বলতে পেরেছে। অনেক দিন ধরে জমে ভারি হয়ে থাকা কথার স্তূপ হালকা করা গেছে। ভার্সিটিতে রমা-রকি ছাড়া অন্য কারো সাথে তেমন কোন যোগাযোগ নেই শাওনের। রকির সাথে যোগাযোগটা কেবলই অর্থনৈতিক। প্রায়ই রকি বাকি খায় শাওনের কাছ থেকে। নগদ টাকাও ধার করে অনেক সময়! সেই বাকি কিংবা ধার কোনদিন ফেরত দেয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করে না রকি। শাওন জানে সেটা ফেরত পাওয়া যাবে না। তবুও দেয়। রকির নামে শাওনের একটা ছোট্ট খাতা আছে। সেখানে রকির কাছে পাওনা টাকার হিসাব লিখে রাখে সে। মাস শেষে পাওয়া সামান্য বেতনের একটা অংশ থেকে শাওন নিজে সেই বাকি-দেনা পরিশোধ করে দেয়। অনেক কষ্ট হয়; কিন্তু তবুও সততা আর মানবতা দু’টোই সমান ভাবে পালন করে চলে সে…
তবে রমার সাথে সম্পর্কটা হচ্ছে মন খুলে কথা বলার। রমার একটা খুব ভাল গুণ হলো- সে খুব ভাল শ্রোতা। আমরা সবাই কেবল বলতে চাই, মন দিয়ে শুনতে চাই না। রমা চায়। কোন রকম শর্ত ছাড়াই সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা শুনে যেতে পারে মনযোগ দিয়ে। শুধু যে মনযোগী শ্রোতা তা-ই নয়, অনুভূতিগুলো অনুভবও করে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে। একদিন মৃত মায়ের গল্প বলতে বলতে শাওন হঠাৎ অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছিল রমার দু’চোখ বেয়ে পানি ঝরছে! সেদিন হঠাৎ করেই ওর প্রতি ভাল লাগাটা এক লাফে বহু গুণ বেড়ে যায় শাওনের। শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় ভরে যায় মনটা। আবেগে শাওনের ইচ্ছা করছিল রমাকে জড়িয়ে ধরে। একজন সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে। কিন্তু সেটা সে পারেনি। অজানা এক সংকোচ তাকে আঁটকে দিয়েছে। সমাজের একটা অদ্ভুত শক্তিশালী কাঁচের দেয়াল আছে। আমরা সবাই সেই দেয়ালে বন্দি। মন যত পরিষ্কারই হোক, সমাজের চোখে ভাল না দেখালে মনের কথা শোনার সাধ্য আমাদের নেই।

সেদিনের পর থেকে শাওন রমাকে খুব ভালোবাসে। এই ভালোবাসা হয়তো ঠিক প্রেম নয়। এতে কোন কামনা নেই, প্রত্যাশা নেই। যেটা আছে সেটা শ্রদ্ধা। মনের শুদ্ধতম শুভ কামনা। শাওন রমার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে। কিছু পাবার জন্য না, শুধু ওর হাসি মুখ দেখার জন্য… একটা কিছু করতে ইচ্ছে করে ওর জন্য। কিছু ব্যাপার থাকে যার জন্য মানুষ জীবন দিয়ে দিতেও আনন্দ বোধ করে। শাওনের কাছে রমা তেমনই একটা ব্যাপার।

কিন্তু রমা সেটা বুঝতে পারে কিনা ঠিক স্পষ্ট নয়। রমার মন নরম, সেটা সবার জন্যই! সে সবার আবেগেই আপ্লুত হয়। সবার সমস্যাকেই সে নিজের সমস্যা ভেবে বসে থাকে। রকির সাথে সে যখন মেশে তখন সে খুব হতাশায় ভোগে। যদিও রকি থাকে ভাবলেশহীন। এই একটা ছেলে যার কোন প্রাণ নেই। জীবনের কাছে কোন চাওয়া নেই। নেই কোন ভবিষ্যৎ চিন্তা। এতো ভাবলেশহীন কিভাবে হয় একটা মানুষ- সেটাই মাথায় ঢোকে না রমার। রমা চায় রকি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করুক। এভাবে পশুর মত “আজকের জন্য বাঁচা” থেকে বেরিয়ে আসুক। রকির মনের ভেতর ডুব দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে রমার। দেখতে ইচ্ছে করে কী আছে ওর মনের গভীরে? কিন্তু কখনোই সেটা পারেনি সে। কে জানে- হয়তো ওর মনে আদৌ কোন গভীরতাই নেই। ভরা নদীর গভীরে ডুব দেয়া যায়। শুকনো নদীর কি আদৌ গভীরতা বলে কিছু আছে? রকি কি তবে একটা শুকনো নদী? কেন সে শুকিয়ে গেছে?
রমা খুব চায় ওর মনের শুকনো নদীতে আবার জোয়ার আসুক। কেন চায় সে নিজেও জানে না। কিন্তু চায়! সেজন্য যদি তার নিজেকেও বিলিয়ে দিতে হয় তাতেও আপত্তি নেই। এটা কি রকির প্রতি তার দুর্বলতা? নাকি নিছক করুণা? সেটাও হয়তো রমার জানা নেই। তবে কোনদিন যদি রকি রমাকে তার নিজের জীবনের সাথে জড়াতে চায় তাতে বোধহয় রমা রাজি হয়ে যাবে কোন দ্বিধা ছাড়াই।
কিন্তু রকি কখনোই কিছু চায় না। শুকনো নদীর কখনও কুল ভাঙ্গার ইচ্ছা থাকে না। রকির স্বভাব অনেকটা ভাসমান ভিক্ষুকের মত। তার চাওয়াগুলো নাস্তা খাওয়ানো বা বড়জোর একটা সিগারেটের টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাইরে তার কোন জগৎ নেই।

আজ ক্যান্টিনে বসে রকি যখন গোগ্রাসে সমুচা খাচ্ছিল রমা তখন অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে এগুলোই ভাবছিল। ওর খাওয়া দেখে রমার নিজের আর খেতে ইচ্ছা করছে না। রকি নিজেরটা শেষ করে রমার দিকে তাকালো।
কিরে তুই খাবি না?
রমা বললঃ ইচ্ছা করছে না! তুই খেয়ে ফেল।
রকি আর একটা কথাও না বলে রমার প্লেট থেকে সমুচা নিয়ে সস ঢেলে নিবিষ্ট মনে খেতে লাগলো। এতো মায়া লাগলো দৃশ্যটা রমার কাছে- হঠাৎ করেই তার চোখে পানি এসে গেল। কেউ আবার দেখে না ফেলে তাই সাথে সাথেই মুছে ফেলল পানিটা। রকি কিছুই খেয়াল না করলেও একজনের চোখ এড়ালো না ব্যাপারটা। সে হচ্ছে শাওন!

ঠিক সেই সময় ছাত্র নেতা “জুয়েল ভাই” তার চার-পাঁচটা চ্যালা-চামচা নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকলো। এসেই এক কোনের টেবিলে রমাকে দেখে শিষ দিয়ে উঠলো। পেছন থেকে আরেকজন কিছুটা অশালীন একটা মন্তব্যও করে বসল। শিষ বা মন্তব্য কোনটাই সোরগোল পূর্ণ ক্যান্টিনের এক কোনে বসা রমাদের কানে পৌঁছল না। কিন্তু তীরের মত এসে বিঁধল শাওনের কানে।
এটা নতুন ঘটনা নয়। প্রায়ই জুয়েলের সাঙ্গ-পাঙ্গরা রমাকে ক্যান্টিনে দেখে বাজে আলোচনা করে। জুয়েলকে শাওন “ভাই” বলে ডাকে। তার দয়াতেই সে এখানে আছে। তাই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না কখনও। কিন্তু ভীষণ কষ্ট হয় তার। আজ রমাকে কিছু কথা জোর দিয়ে বলে দিতে হবে। বলতে হবে- ও যেন আর ক্যান্টিনে না আসে। এর আগেও আকারে ইঙ্গিতে বলেছে। কিন্তু রমা বোধহয় ঠিক বুঝেনি সেগুলো। তাই আজ একটু ক্লীয়ার করেই বলে দেয়া দরকার।
জুয়েল দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইদানিং প্রায়ই ওর ছেলে-পুলেদের নামে বিভিন্ন ব্যাড রেকর্ড শোনা যায়। ক্যাম্পাসে টিজিং, ছিনতাই, হাইজ্যাক বেড়ে গেছে ইদানিং। রমার তাই আরেকটু সাবধান করা দরকার…

শাওনের কাছে এসে জুয়েল বললঃ কিরে! খবর কি তোর?
ভাই, ভাল। আপনে ভাল আছেন ভাই?
হুম… তুই ঐ মাইয়ার মোবাইল নাম্বার রাখছিলি?
কোন মাইয়া ভাই?
আরে গাধা! ঐ মাইয়া… ঐযে কোনার টেবিলে বসা?
ন-নাতো ভাই! কেন?
কাম আছে। নাই মানে! তোরে না কইছিলাম নাম্বার যোগার করতে? তোর কাছে লোড করে না? পড়েও তো শুনলাম তোদের ব্যাচেই!
নাই ভাই। মানে রাখি নাই…
পরের বার লোড করতে আসলে নাম্বারটা রেখে দিস। আমার লাগবো… শালা মাল একটা!
শাওন কোন কথা বলে না। দাঁতে দাঁত চেপে থাকে। রমাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় শাওনের। শাওনের পায়ের কাছে একটা হকিস্টিক রাখা আছে। ক্যান্টিনের ক্যাশ বাক্সের নিচে এরকম আরো কিছু জিনিস পার্টির ছেলেপুলেরাই রেখে দেয় সব সময়। শাওনের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে হকিস্টিকটা দিয়ে এইগুলার মাথায় একটা বাড়ি দেয়। অনেক কষ্টে রাগ সামলায় সে… তবে এভাবে আর চলতে দেয়া যাবে না। নয়তো সত্যি সত্যিই একদিন সে এরকম কিছু একটা করে বসবে।

এর কিছুদিন পরের কথা। প্রায় সবগুলো অনলাইন ও জাতীয় দৈনিকে “জাতীয় ভার্সিটির ক্যাম্পাসে তরুণী গণধর্ষিত” শিরোনামে একটা খবর ছাপা হয় বেশ বড় করে। কোন কোন পত্রিকায় এটার পাশে ছোট্ট করে “একই ক্যাম্পাসে তরুনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার”-এর খবরও ছাপা হয়। এই খবরটা এতো ছোট করে কেন ছাপানো হয়েছে বোধগম্য নয়। সম্ভবতঃ খুন-জখমের খবরের চেয়ে ধর্ষণের খবর বড় করে ছাপালে পত্রিকার কাটতি বেশি হয়… হয়তো মানুষ মৃত্যু সংবাদের চেয়ে ধর্ষণের সংবাদেই বেশি আগ্রহী! পত্রিকা থেকেই জানা যায় রক্তাক্ত তরুনের নাম “শাওন”।
তবে ধর্ষণের ঘটনার সাথে তরুনের সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটা কোন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়নি। ফালতু কিছু পত্রিকা অবশ্য দুইটা ঘটনাকে একত্র করে মনগড়া রসালো গল্প বানিয়ে ছেপেছে…!
আর যে খবরটা কোন পত্রিকা, মিডিয়া বা অন্য কোন ভাবেই কারো নজরে পড়েনি তা হলো- সেদিনের পর থেকে ক্যাম্পাসের কোথাও রকি নামের একটা ছেলেকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি!
==========০==========

[শানে নুযূলঃ মানুষ স্বপ্নে যা দেখে সাধারণতঃ ঘুম থেকে ওঠার পর তার সবই ভুলে যায়। কিন্তু আজ সকালে ঘুম ভাঙার পরেও স্বপ্নের রেশটা রয়ে যায় মাথায়। এমনকি স্বপ্নের অনুভূতিটা পর্যন্ত তখনও জ্যান্ত ছিল। স্বপ্নে রমা নামের একটা মেয়েছিল। আর স্বপ্নের থিমটাও ছিল অনেকটা এরকম। এই সম্পূর্ণ অপরিচিত নামের একটা মেয়ে এরকম একটা অদ্ভুত থিম নিয়ে আমার স্বপ্নে কিভাবে এলো সেটা ঠিক বোধগম্য নয়। তবে ফিলিংসটা এতো প্রবল ছিল যে ব্রেনের ভেতর থেকে যাওয়া স্বপ্নের স্মৃতিটুকু নিয়ে এই গল্পটা লিখে ফেললাম। ধারা বর্ণনায় একটু অসম্পূর্ণতা আছে। সেটা আমার দোষ নয়। স্বপ্নটাই এমন অসম্পূর্ণ ছিল… আমি কী করতে পারি?
এই গল্পটা “বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা” তে দেয়ার ইচ্ছা ছিল না। এটা তো ঠিক গল্প নয়, এটা নিছক একটা স্বপ্ন। স্বপ্ন নিয়ে তো প্রতিযোগিতা চলে না!
ইচ্ছা না থাকা সত্যেও কেন দিলাম জানা নেই। স্বপ্নের মত বাস্তবেও আমরা অনেক সময় বিচিত্র কাজ করি। এটাও হয়তো তেমনই কিছু একটা!]

-সফিক এহসান
১৪ জানুয়ারী ২০১৪

৪৩ thoughts on “রমা [বর্ষপূর্তি গল্প প্রতিযোগিতা ]

  1. বর্ননা ভালো হয়েছে। শেষটা পড়ে
    বর্ননা ভালো হয়েছে। শেষটা পড়ে মন খারাপ হোল। গল্পে উপন্যাসে আমরা সবসময় ভালোর বিজয় দেখে অভ্যস্ত। এটা যে নিছক গল্প নয় সেটাই মনে হোল ফিনিশিং দেখে। ভালো লিখেছেন।

    1. । গল্পে উপন্যাসে আমরা সবসময়

      । গল্পে উপন্যাসে আমরা সবসময় ভালোর বিজয় দেখে অভ্যস্ত। এটা যে নিছক গল্প নয় সেটাই মনে হোল ফিনিশিং দেখে

      সহমত আতিক ভাই… :থাম্বসআপ: আসলেও বাস্তব বড়ই ভয়াবহ… :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মনখারাপ:

      1. সমস্যা হলো- স্বপ্ন আরো
        সমস্যা হলো- স্বপ্ন আরো ভয়াবহ!

        বাস্তবের তো তাও একটা শেষ থাকে… স্বপ্নের কোন শেষ থাকে না। এলার্ম বাজার সাথে সাথে চট করে থেমে যায় এবং নির্মম ভাবে “The End” না দেখিয়েই চলে যায়!
        😛

        1. বাস্তবের তো তাও একটা শেষ

          বাস্তবের তো তাও একটা শেষ থাকে… স্বপ্নের কোন শেষ থাকে না। এলার্ম বাজার সাথে সাথে চট করে থেমে যায় এবং নির্মম ভাবে “The End” না দেখিয়েই চলে যায়

          কেন এমন হয়… :কানতেছি: :দেখুমনা: :মনখারাপ:

  2. সফিক ভাই… অসাধারণ
    সফিক ভাই… অসাধারণ লেখনী!
    গল্পের বর্ণনা আমার কাছে দারুণ লাগলো। আপনি যেভাবে প্রত্যেকটা মুহূর্তকে বিশ্লেষণ করেছেন, সেটা আমার পাঠক মনকে শান্তি দিয়েছে।
    শেয়ার দিলাম।

    শুভ কামনা রইলো 🙂

  3. এটা তো ঠিক গল্প নয়, এটা নিছক

    এটা তো ঠিক গল্প নয়, এটা নিছক একটা স্বপ্ন। স্বপ্ন নিয়ে তো প্রতিযোগিতা চলে না!
    ইচ্ছা না থাকা সত্যেও কেন দিলাম জানা নেই। স্বপ্নের মত বাস্তবেও আমরা অনেক সময় বিচিত্র কাজ করি। এটাও হয়তো তেমনই কিছু একটা!

    গল্প পড়ে যতটা যন্ত্রণাবোধ হল, এই লাইনগুলো সেটা অনেকটাই কাটিয়ে দিয়েছে… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ধইন্যাপাতা: চমৎকার… :তালিয়া:

  4. রাতেই পড়েছিলাম। মন্তব্য করা
    রাতেই পড়েছিলাম। মন্তব্য করা হয় নি… দারুণ বর্ণনা আর লিখনির গাঁথুনি…
    আপনার অন্য যেকোন গল্প থেকে অন্যরকম। থিমও যথার্থ!!
    :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ:

    1. তাই নাকি?!
      ব্যাপুক আহ্লাহিত

      তাই নাকি?!

      ব্যাপুক আহ্লাহিত হইলাম লিংকন ভাই… :লইজ্জালাগে: :ভালাপাইছি: :দিবাস্বপ্ন:

      (তবে কথা হলো- আপনার কোন গল্প কিন্তু পেলাম না! :মনখারাপ: )

    1. ঐ আন্ডার মেট্রিক পেজগিবাজ!
      ঐ আন্ডার মেট্রিক পেজগিবাজ! আমি থিমের কথা বলছি… পুরোটাই স্বপ্নে দেখছি এইটা কখন বললাম?

      বাই দ্যা ওয়ে- তুই এইখানে কী করিস? তোর ওপর না এক্সাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হইছিল!
      :ক্ষেপছি:

      1. পেজগিবাজ!
        যাক নতুন একটা

        পেজগিবাজ!

        যাক নতুন একটা উপাধি যুক্ত হল আমার উপাধির তালকায়। তয় রিজন টা কি! আমি তো এখনও কাউরে কই নাই ভাবির কাহিনী

          1. শুধু যে জানে তা-ই না, যা জানে
            :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট:
            শুধু যে জানে তা-ই না, যা জানে না তাও আন্তাজে ঢিল মেরে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে! :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি:

    1. (No subject)
      :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:
      :ভেংচি:

  5. ভালো লাগলো সফিক ভাই। গল্পের
    ভালো লাগলো সফিক ভাই। গল্পের শেষে এমন করলেন ক্যান? টাইম ছিল না? আর একটু বর্ণনা মনে হয় দরকার ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *