বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে খালেদা জিয়াকে দীর্ঘকাল প্রত্যাশা করি (হায় তা এখন রওশনের দখলে) !!



প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেশ ক’বার এদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে (হায়) বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করছেন (হায়), প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালীন অনেকেই তার মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা খুবই কম দেখতে পেয়েছেন। গণতন্ত্রের নামে তিনি একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের মত সকল ক্ষমতা তার হাতে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের ‘অপরাধে’ প্রাক্তন সজ্জন রাষ্ট্রপতি ড. বদরুজ্জোহা চৌধুরীকে তিনি অত্যন্ত অপমানজনকভাবে তার এই স্বৈরশাসক সুলভ ক্ষমতা দেখাতে পিছপা হননি। এমনকি প্রাক্তন বামপন্থী বেগম জিয়ার দীর্ঘদিনের সাথী ও বিশ্বস্ত ‘ডানহাত’ পার্টির জেনারেল সেক্রেটারী আ. মন্নান ভুইয়াকেও তিনি তার ব্যক্তিগত বিরোধীতার কারণে স্বল্প সময়ে নিজ হাতে নিষ্ঠুরভাবে ‘কোরবানী’ করে দেন অত্যন্ত তড়িৎ গতিতে। তার নিয়োজিত ‘উপদেষ্টাবৃন্দ’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় সবাই টিভি টকশোতে স্বীকার করেছেন যে, বেগম জিয়া তাদের ‘উপদেশ’ খুব একটা গ্রহণ করতেন না বা নিতেন না।

তা ছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালীন বিরোধীদলের প্রতি তার আচরণ ও কথাবার্তা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান (সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি) নির্বাচনের ব্যাপারে অগণতান্ত্রিক ভূমিকা, ড. ইয়াজউদ্দিনকে একই সাথে প্রেসিডেন্ট ও সরকার প্রধান হিসেবে নিয়োগ, ২২-জানুয়ারীর নির্বাচনের ব্যাপারে বিতর্কমূলক তথা যুদ্ধংদেহী কর্মকান্ড, হাস্যকর নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে লক্ষ-কোটি ভুয়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন, গঙ্গার পানি বন্টন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও রক্ষা সংক্রান্ত কথা-কাজে বিপরীতমুখী আচরণ, জেএমবি তথা ইসলামের নামধারী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দান, ১০-ট্রাক অস্ত্র মামলা ও আওয়ামী লীগ অফিসে গ্রেনেড হামলার তদন্তের ব্যাপারে লুকোচুরি ও হাস্যকর তদন্ত কমিটি গঠন, বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় বাস্তবায়ন ও কার্যকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, যুদ্ধপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে ‘ধরি মাছ না ছুই পানি’ (অবশেষে পানি ছুয়েছেন তিনি) টাইপের হেয়ালীপূর্ণ আচরণ বা কথাবার্তা, গ্যাস রপ্তানী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্টন, হরতাল সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গী, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও বিসিএস পরীক্ষা, দূদক প্রতিষ্ঠা ও ‘ক্লাউন’ জাতীয় চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা, নির্বাচন কমিশন গঠন ও বিচারপতি আজিজের মত বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ, প্রশাসন দলীয় করণ ও দলীয় কর্মকর্তাদের ব্যাপারে বিশেষ আনুকুল্য প্রদর্শন, পদ্মা ব্রিজ, এশিয়ান হাইওয়ে নির্মাণের ব্যাপারে নানাবিধ কালক্ষেপণ ইত্যাদি নানাবিধ কার্যক্রমে দৃষ্টি ‘গণতান্ত্রিক’ ছিলেন এ কথা তার পরম ‘মিত্ররা’ও বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হারিয়ে যখন বেগম জিয়া বিরোধীদলের নেতার আসনে সমাসীন, তখন তার মুখে নানা গণতান্ত্রিক কথা শুনে আমাদের মত সাধারণ মানুষ মোহিত না হয়ে পারে না। এমনকি ধ্বসাত্মক হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার, বর্তমান সরকার সরকারী কর্মচারীদের দলীয়করণ করছেন এবং তাদের ভাল ভাল স্থানে পোস্টিং দিচ্ছেন, নির্বাচন কমিশনারগণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছেন না, সরকার ভালভাবে দেশ চালাতে পারছেন না, দেশে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটে মানুষ দিশেহারা, জিনিসপত্রের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে না থাকা, বাজেট পেশ নিয়ে বেগম জিয়ার বিকল্প উচ্চশ্রেণীর ভাবনা, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির ব্যাপারে সোচ্চার মনোভাব, নিজের ট্যাক্স জরিমানাসহ পরিশোধের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করে জাতির কাছে দৃষ্টান্ত(!) স্থাপন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে এই সরকারকে ভবিষ্যত সম্পর্কে হুসিয়ারী ও নসিহত, বিরোধীদলের প্রতি পুলিশের নেতিবাচক আচরণ, বেসরকারী স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করনে সরকারী দলীয়করণের ব্যাপারে শতর্কতা, র‌্যাব ও পুলিশ কর্তৃক বিচার বহির্ভূত হত্যার ব্যাপারে সমালোচনামূলক মনোভাব, আইন শৃঙখলার অবনতির ব্যাপারে সরকারের ব্যর্থতা, বহুতল ভবন হেলে পড়ায় সরকারের দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে শতর্কতা, সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা, জনসংখ্যা রপ্তানীতে ভাটা, উপনির্বাচনে সরকারী দলীয় ক্যাডার কর্তৃক ভোটকেন্দ্র দখলের সমালোচনা, দেশব্যাপী দুর্নীতি বিস্তারে খালেদা জিয়ার উৎকণ্ঠা আমাদের খুব ভাল লাগছে।

মানে প্রকৃতপক্ষেই তিনি যথার্থ বিরোধী দলের নেতার মতই ভূমিকা পালন করছেন (যদিও প্রায়ই তিনি দৃষ্টিকটুভাবে সংসদে অনুপ্িস্থত থাকছেন) এবং মনে হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া সরকারে থাকার সময় উপরে বর্ণিত ইস্যুগুলোর ব্যাপারে সোচ্চার না থাকলেও, বিরোধীদলে থাকলে যেহেতু এইসব ইস্যুর ব্যাপারে তিনি খুবই সরব থাকেন (এবং গণতান্ত্রিক দেশে তা-ই থাকা উচিত), তাই তার উচিত সরকারে না গিয়ে সব সময় বিরোধী দলে থাকা (হায় এখন তাও নেই), অন্য কথায়, বাংলাদেশের জনগণেরও উচিত আরো ২/৩-টার্মে বেগম জিয়াকে সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে বরং এমন পরিমান ভোট দেয়া, যাতে তিনি বার কয়েক বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হতে পারেন এবং এভাবে জনগণের অধিকারের কথা বলে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। আমরা সাধারণ মানুষ বিরোধীদলের নেতা হিসেবে বেগম জিয়াকে দীর্ঘদিন প্রত্যাশা করি, আমাদের পাশে দেখতে চাই, আমাদের অধিকারের কথা তার মুখ থেকে শুনতে চাই এবং এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তার দীর্ঘায়ূ কামনা করি।

ব্লগারের ফেবুক :
https://www.facebook.com/falgunishekh.dipa?fref=ts

৪ thoughts on “বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে খালেদা জিয়াকে দীর্ঘকাল প্রত্যাশা করি (হায় তা এখন রওশনের দখলে) !!

Leave a Reply to ড. লজিক্যাল বাঙালি Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *