রাজীব ভাইয়ের মৃত্যুর এক বছর

থাবা বাবা — আমাদের রাজীব ভাই, আমাদের ক্যাপ্টেন ক্ল। তিনি যে আর আমাদের মাঝে নেই, এই কথাটা এক বছর পার হওয়ার পরেও বিশ্বাস করতে পারছি না। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে কখনও দেখাসাক্ষাৎ হয় নি, পরিচয়ও ছিলো না সেভাবে। তাঁকে চিনতাম ধর্ম নিয়ে তাঁর লেখা আর তাঁর অসাধারণ ফোটোগ্রাফির কারণে। তিনি আর ধর্মকারীতে লিখবেন না, তাঁর ফোটোগ্রাফি পেইজে আর কোনো দিন তাঁর তোলা ছবি দেখতে পাবো না, এ যেন ভাবাই যায় না।


থাবা বাবা — আমাদের রাজীব ভাই, আমাদের ক্যাপ্টেন ক্ল। তিনি যে আর আমাদের মাঝে নেই, এই কথাটা এক বছর পার হওয়ার পরেও বিশ্বাস করতে পারছি না। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে কখনও দেখাসাক্ষাৎ হয় নি, পরিচয়ও ছিলো না সেভাবে। তাঁকে চিনতাম ধর্ম নিয়ে তাঁর লেখা আর তাঁর অসাধারণ ফোটোগ্রাফির কারণে। তিনি আর ধর্মকারীতে লিখবেন না, তাঁর ফোটোগ্রাফি পেইজে আর কোনো দিন তাঁর তোলা ছবি দেখতে পাবো না, এ যেন ভাবাই যায় না।

ধর্মের ব্যাঙ্গাত্মক সমালোচনার কারণে নয়, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনে অংশ নেওয়াতেই মূলত তিনি খুন হয়েছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলে কার বা কাদের হাত আছে, এ নিয়ে রহস্যের জট এখনও পুরোপুরি খোলে নি। তাঁর হত্যাকারীরা অবশ্য ধরা পড়েছে, কিন্তু এর পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে কারা, তা নিয়ে এখনও আমরা অন্ধকারে। শাহবাগ আন্দোলনকে বিতর্কিত করে যারা ফায়দা হাসি করতে চায়, শাহবাগকে যারা একটি তৃতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চায় না, নিঃসন্দেহে তারাই এ কাজ করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের পরপরই হঠাৎ করে শাহবাগকে ঘিরে ‘নাস্তিকতা’র বিতর্ক, এ আন্দোলনকে ঘিরে অপপ্রচারের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে সরকারের কোন ব্যবস্থা না নেয়া এবং সর্বোপরি শাহবাগ আন্দোলনকে দেশের ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের সামনে চিরতরে কলঙ্কিত করা — এ ঘটনাগুলো থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, কারা রাজীব ভাইকে মেরেছে।

রাজীব ভাইয়ের হত্যার পরবর্তী ঘটনাপরম্পরা সাধারণ মানুষদের অধিকাংশ এবং তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে শাহবাগবিরোধী করে তোলে। এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শাহবাগকে ঘিরে নাস্তিক্য-মাদক-যৌনতা ইত্যাদি হরেক গুজব ডালপালা মেলতে শুরু করে। এ কারণেই আমরা পরবর্তীতে দেখি, “শাহবাগে যারা যায় তারা নাস্তিক, তারা কোন ধর্মই মানে না” বলার পরেও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী পার পেয়ে যান, চরম মৌলবাদী ও সহিংস দল হেফাজতে ইসলাম শুধুমাত্র শাহবাগের বিরুদ্ধে কথা বলেই ধর্মভীরু মানুষের আস্থা অর্জন করে ফেলে, এমনকি সরকারও শাহবাগ আন্দোলনের সাথে জড়িত চারজন ব্লগারকে গ্রেফতার করার মাধ্যমে মৌলবাদীদের কাছে মাথা নত করে। এদিকে শাহবাগে নাস্তিক ব্লগাররা অপাংক্তেয় হয়ে পড়েন, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে ‘ইস্যু’ ‘তুলে দেওয়া’র ‘অপরাধে’ আওয়ামী পাণ্ডাদের হাতে অনলাইনে চলে নাস্তিকদের মুণ্ডূপাত। নিজেদেরকে খাঁটি আস্তিক প্রমাণে উঠেপড়ে লাগা ‘নেতা’রা বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের শুরুতে একেকটি মিনি মিলাদ-মাহফিল আয়োজন করে প্রকারান্তরে আন্দোলনের সেক্যুলার ভাবধারাকে নষ্ট করে ফেলেন।

রাজীব ভাইকে নিয়ে আন্দোলনের ‘নেতা’রা নানা আঙ্গিকে চেতনার ব্যবসা করেছেন, আবার “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না” স্লোগান দেওয়া তারাই সময়মত তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একেকজন খাঁটি আস্তিকে পরিণত হয়েছেন। তাই থাবা বাবার মৃত্যু আসলে বরং বৃথা যায়ই নি, তিনি মরে গিয়ে আমাদের চিনিয়ে গেছেন শত্রুমিত্রদের, শিখিয়েছে কীভাবে হিপোক্রেটদের থেকে দূরে থাকতে হয়, কী করে ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে মৌলবাদীরা কলঙ্কিত করতে চেষ্টা করে এবং সে অপচেষ্টাকে কীভাবে রুখতে হয়।

রাজীব ভাইয়ের মৃত্যুর বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো।

২ thoughts on “রাজীব ভাইয়ের মৃত্যুর এক বছর

  1. একটা তাজা প্রাণের এভাবে ঝরে
    একটা তাজা প্রাণের এভাবে ঝরে যাওয়া কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না।

    যারা এই ঘৃণ্য কাজ করেছে, তারা ইসলামের ধৈর্য, ত্যাগ আর দাওয়াতের মত কিছু মূলনীতি থেকে অনেক দুরের। তারা বুঝতে চায়না যে উগ্রতা আর হত্যা কোনকিছুর সমাধান নয়।

    তবে, তার মৃত্যুর পর গণজাগরন মঞ্চ তাকে যেভাবে শহীদ বানিয়ে দিয়েছে, সেটাও হাস্যকর একটা জিনিস হয়ে গেছে। চারুকলার সামনে কয়েকদিন আগে গনজাগরন মঞ্চের প্রদর্শনী দেখলাম। সেখানে তার ছবি দিয়ে উপরে লেখা হয়েছে ‘শহীদ রাজিব হায়দার শুভ’। রাজিব ভাই যদি এখন কথা বলতে পারতেন, তাহলে তিনি নিজেও মনে হয় বিষয়টা মেনে নিতে পারতেন না এবং সবকিছুকে এভাবে ধর্মীয় লেবাস দেয়ার বিপক্ষেই কথা বলতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *