টোটেম>ব্রত>জাদুবিশ্বাসের বিবর্তনে চেপে বসা ধর্মীয় মন্ত্রবিশ্বাস, পুরোহিতের আত্মপ্রকাশ ।

————————————————————————————————————————-

আজকে আমরা অনেকেই বাংলার টোটেম বিশ্বাসের প্রতীকী মূর্তির সাথে হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মীয় দেবদেবীকে গুলিয়ে ফেলেছি । এর একমাত্র কারন আদিম মানুষদের জীবনাচরন বা আদিবাসী সাংস্ক্রিতির প্রতি আমাদের অদেখা অভিজ্ঞতা, তাদের জানতে না চাওয়ার মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের সংকীর্ণ মানসিকতা আর ইগোয় ঠাসা সব্জান্তার ভণ্ডামী দায়ী ।


————————————————————————————————————————-

আজকে আমরা অনেকেই বাংলার টোটেম বিশ্বাসের প্রতীকী মূর্তির সাথে হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মীয় দেবদেবীকে গুলিয়ে ফেলেছি । এর একমাত্র কারন আদিম মানুষদের জীবনাচরন বা আদিবাসী সাংস্ক্রিতির প্রতি আমাদের অদেখা অভিজ্ঞতা, তাদের জানতে না চাওয়ার মধ্যবিত্ত শিক্ষিতের সংকীর্ণ মানসিকতা আর ইগোয় ঠাসা সব্জান্তার ভণ্ডামী দায়ী ।

টোটেম একটি গোত্রের প্রতীক, আলাদা করে কারও নাম নয়, মানুষের দলটা যে প্রানী বা গাছের সাথে নিজেকে একাত্ম ভেবেছে, সেটাই দলের টোটেম, টোটেম থেকেই নাকি দলের সবার জন্ম, একটি প্রাচীন বংশপরিচয়ের পদ্ধতি, যে পদ্ধতি প্রথম আদিম মানুষকে দলবদ্ধ করতে শিখিয়েছে, বাচার জন্য দলের গুরুত্ব বুঝেছে । আদিম মানুষ কখনই একা একা বাচতে চায়নি, তাই তাদের দলের জীবনটা বাদ দিয়ে একার বলে কিছু নেই, দলের জীবনটাই আসল জীবন, দলটা এক, অখণ্ড, পুরোকিছুই । যেমন , অস্ট্রেলিয়ার কিছু আদিবাসীকে তাদের ব্যাক্তিগত নাম জিজ্ঞেস করতে সবাই বললো-আমরা সূর্যমুখী বা ক্যাঙ্গারু । তারা টোটেম এরমানে তাদের গোত্র পরিচয় সূর্যমুখী বা ক্যাঙ্গারু, বা মিসরে বাজপাখি বা সিংহ, বা চাইনিজদের ড্রাগন তাদের গোত্র প্রতীক। টোটেম বিশ্বাসীরা নিজগোত্রে তারা সূর্যমুখী ক্যাংগারু, বাজপাখি বা ড্রাগন খায়না বা তাদের মধ্যে বিবাহ নিষেধ, কেনো ? কোন প্রশ্ন তুলবেনা, বারণ, এই বারণ নীতিকেই বলা হতো, নিয়ম বা টাবু । এমন কিছু আঞ্চলিক নীতি বিশ্বাসের ভিত্তিতেই আদিম মানুষের মাঝে তৈরী হয়েছিলো টোটেম প্রথা, টোটেম বিশ্বাসী সাম্যের সমাজ ব্যাবস্থা । ব্যাক্তিপরিচয় মুখ্য নয় তাই তৈরী হয়নি ধনী-দরিদ্রের তফাৎ, যেখানে গোত্রের সকলেই সমানাধিকার ভোগ করার সুযোগ ছিলো, যদিও গোত্র সর্দার ছিলো। সর্দারের পরিবর্তন হতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কিংবা মল্লযুদ্ধের মাধ্যমে । কেননা গোত্রকে নেতৃত্ব দিতে শক্তি সামরথ্য এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিলো । গোত্র সর্দার গোত্র প্রধান চিলেন , কিন্তু সে গোত্র ঈশ্বর ছিলেন না । দেবতারই জন্ম দেয়নি কেউ তাই যাগযজ্ঞের পুরোহিত বা ব্রাহ্মণের ধর্মও ছিলোনা তখনও ।

টোটেম বিশ্বাস যে ছিলো, তার প্রমান প্রাচীন পুঁথি পাঁচালীর মাঝে ভুরি ভুরি জন্তু জানোয়ারের নাম, আর হিন্দু ধর্মের দখলে নেয়া তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর চেহারাতেও জন্তু জানোয়ারের চিহ্ন, যেমন গনেশের মাথা, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতির হাঁস । তেমনি মিসরীয় বা প্রাচীন গ্রীক দেবদেবীদেরও আমরা বিভিন্ন জীব-জানোয়ারের মূর্তিতেই দেখে থাকি । আমাদের সাধারণের বংশ পরিচয়ের মাঝেও টোটেম বিশ্বাসের প্রতীক এখনও রয়ে গেছে, যেমন কলকাতার রাস্তায় কাউকে গোত্র পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই বললো, আমরা হলাম চাটুজ্যে, কশ্যপ গোত্রের । কশ্যপ মানে কাছিম, আমাদের কাছিম খাওয়া বারণ, কশ্যপ গোত্রের কাউকে বিয়ে করাও বারণ । কলকাতা ছেড়ে মেদেনীপুর, সেখানে কারো গোত্র নাম, অমুক বাঘ, তমুক হাতি, কেউ আবার শেয়াল । তারপর সাঁওতাল পরগণায়, সেখানে কারো দলের নাম এরগো, কারো বা মুরমু, এরগো মানে ইদুর আর মুরমু মানে নীলগাই । সাঁওতাল পরগনা ছেড়ে এবার মহীশুর, কারোর নাম আড়ু, কারোর নাম আনে; আড়ু মানে ছাগল, আনে মানে হাতি । আবার কারো নাম অরসু বা অট্টি; অরসু মানে বট আর অট্টি মানে ডুমুর ।

টোটেম বিশ্বাসের বিবর্তনেই আসে ব্রত বিশ্বাস, আমাদের দেশের ঘরে ঘরে মেয়েরা এখনও ব্রত করে, ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে এই ব্রতের সাথে কোন না কোন কামনার যোগাযোগ রয়েছে, অমুক জিনিস চাই তাই ব্রত করছি । এমনি একটা ব্রতের নাম ভাদুলি, কীসের কামনায় এ ভাদুলি ব্রত ? আত্মীয় স্বজন যাতে জলপথে স্থলপথে নিরাপদে ফিরে আসতে পারে তারই কামনা । ব্রত করার পূর্বে আলপনা দিয়ে ছবি আঁকা হয়, কীসের ছবি ? নদি, সমুদ্র, কাঁটাবন, নানান রকম হিংস্র প্রানী, নৌকা আরও কতো কী ! তারপর নদীর আল্পনায় ফুল ধরে ছড়া কাটে,

নদী নদী কোথা যাও
বাপ ভাইয়ের বারতা দাও ।

এই রুপে ভিন্ন ভিন্ন আল্পনায় ফুল ধরে ভাদুলি ব্রত সম্পন্ন করা হয় । এর মানে কী ? আমরা বুঝবো ভাদুলি নামে এক দেবতাকে ফুল দিয়ে পুজো করা হচ্ছে । ঠাকুর ফুল পেয়ে মনোকামনা পুরণ করবে-ঠাকুরের কৃপায় আত্মীয় স্বজন দূরদেশ থেকে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে । ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়, যারা কাছে থেকে ব্রত লক্ষ করেছেন তারা আমার সাথে একমত হবেন যে, পুজো মানে ঠাকুরের পায়ে ফুল দিয়ে ঠাকুরের মনে করুণা জাগাবার চেষ্টা। ঠাকুর খুশী হয়ে মনোকামনা পূরণ করে দিবেন । ব্রত মানে মোটেই তা নয়, ব্রতের মধ্যে করুণা ভিক্ষে করার চেষ্টা এতোটুকু নেই, তার বদলে বরং তারবদলে জোর-জুলুমেরই ভাব । আলপনা কেটে নদি একে, ছবির উপর ফুল ধরে, ছড়া কেটে নদীর মনে করুণা জাগানোও নয়, তার বদলে ভাবটা এমন যে, নদী বাধ্য হবে ওই কামনা মানতে; ছড়া কেটে, ফুল ধরে, ছবি এঁকে, নদীকে বশ করা হয়েছে । ব্রতগুলোর জন্ম এমন একসময়ে যখন মানুষ সবে ফসল ফলাবার কৌশলটা আয়ত্ত করেছে । তাই পুজো আর ব্রতে স্পষ্ট তফাৎ ।

তাই ফসলের জন্য ব্রত, বৃষ্টির জন্য ব্রত, নতুন ফসলের জন্য ব্রত, শীতের জন্য ব্রত, বসন্তের জন্য ব্রত । বাংলার আদিম সমাজে ঋতু প্রধান ব্রত বরাবর ছিলো, ঋতুকে ছবি এঁকে, ফুলধরে, ছড়া বা গান গেয়ে একা বা সমবেতভাবে ছেলেবুড়ো সকলেই নেচে নেচে ব্রত্মতে বশীকরণের বিশ্বাসে- ধর্মবিশ্বাসের আগে থেকেই বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়, একের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে আনুষ্ঠানিক রুপ পেয়েছে ।

ব্রতবিশ্বাসের বিবর্তনের পরবরতিরুপ জাদুবিশ্বাস । জাদু বিশ্বাসের আগাগোড়াই যদিও কিনা আজগুবি কল্পনা বা ভুলধারনা, তবু এই প্রাচীন জাদুবিশ্বাসই আদিম মানুষকে বাস্তবিকভাবে বাচতে সাহায্য করেছে । এখানেও ব্রতের মতোই দশজনে মিলে একই সঙ্গে একই কাজ করছে, একই কথা ভাবছে, একই ছবি দেখছে, কামনা সফল হবার একই ছবি , একের সামনে নয় একার সামনে নয়, দশজন এক হয়েছে, একই ছবি দেখে দেখে মেতে উঠেছে পুরো দলটা । জাদুবিশ্বাস যদিও আগাগোড়াই আজগুবি তারপরেও মানুষ যখন আধা অসহায় তখন এ জাদুবিশ্বাসের ছবিটুকুই তাদের ধৈরয ধারণের শক্তি হয়ে দেখা দিয়েছে, শিকার হাতে পাবার আগের ধৈরয, ফসল বুনে ফসল পাবার ধৈরয, রোদে পোড়া আকাশটা দেখে আষাঢ়ের ভিজে ছবি দেখে একটু আদ্র হওয়া তাদের বাচার জন্য ধৈর্যের শক্তি দিয়েছে।

এ কথা নিশ্চয় স্মরণ করিয়ে দিতে প্রয়োজন হবেনা যে, যে ছবি দেখে ওরা অমনভাবে নেচে গেয়ে মেতে উঠলো তা আগাগোড়াই আজগুবি, কাল্পনিক । শিকারে সফল হওয়াকে নেচে নকল করে নিলেই তো আর আসল শিকারের সমস্যাটা চুকে যায়না । তা বটে, তবে সেই কল্পনায় পুরো দলটা যে অমনভাবে মেতে উঠলো সেটাতো কল্পনা নয় । আর অইভাবে মেতে ওঠার জন্যই ওরা যখন সত্যিকারের শিকারে বের হলো, তখন ওদের হাতিয়ারগুলো যতোই দুর্বল হোক না কেনো, মনে মনে ওরা দলবদ্ধভাবে হয়ে উঠেছে দুর্বার শিকারী ।তাতেই আসল শিকারের আসল সমস্যাটা অনেক্ষানিই চুকে যায় ।

যে মানুষ ছিলো একসময় প্রকৃতির কাছে অসহায়, হাতপেতে বসে থাকতে হয়েছে, সেই মানুষই হাতের পাশাপাশি হাতিয়ারের উন্নতি করতে করতে প্রকৃতিকে বশ করার দাবী করলো, জাদুবিশ্বাসের বদৌলতে একে একে জয়ের স্বপ্ন দেখতে লাগলো, তার হাতিয়ার ভোতা থেকে শাণিত হতে লাগলো । লড়াইতে তার জয় হতে লাগলো একেরপর এক, আর যেখানে অপ্রিরোধ্য দুর্জ্ঞেয় সেখানে কল্পনা করে নিচ্ছে । তাই একে একে বশ হলো, বনের পশু, পৃথিবীর বুক চিরে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে ফসল ফলিয়ে নিতে, বশে আনা পশু দিয়ে হালচাষ করে নিতে । মানুষ নিজের প্রয়োজনের অধিক পশু শিকার ও বশীকরণের মাধ্যমে পশুপালন করে বংশবিস্তার, এবং প্রয়োজনের অধিক ফসল ফলিয়ে মানুষ শস্যের বা সম্পদের আগাম সঞ্চয় করে রাখতো ।

আর এই আগাম সঞ্চয়ের উপরই একশ্রেনীর অলস এবং পরের মাথায় কাঠাল ভাঙ্গে খাওয়া চতুর মানুষের লোলুপ দৃষ্টি পড়তে লাগলো, পৃথিবী দুইভাগে ভাগ হতে চললো, একদলে শ্রমিক আরেক দলে শোসক । আদিম সাম্যের সমাজ বিভেদের বলী হলো একশ্রেনীর অতিশয় ধূর্তের হাতে । বিশ্বাসের বদল হলো-

ব্রত আর জাদুবিশ্বাসের বিবর্তনে জাত বদল হলো, এলো মন্ত্র বিশ্বাস, পুরোহিতের যাগযজ্ঞের পরিহাস, এক পরজীবি পরকালের ফেরিওয়ালার ইতিহাস । ব্রতের সেই মেয়েটি বা জাদুনৃত্যের ছড়াকারের স্থলে পেশাজীবি পুরোহিত, ব্রতের বা জাদুর ছবি হয়ে গেলো দেবদেবীর মূর্তিতে ঠাসা, বাংলার চিরায়ত শারদিয় বা বাসন্তি উতসব হয়ে গেলো সনাতনী ধর্মীয় পুজো অর্চনা । পুরোহিতের পেশাদারিত্বের আদিপত্যে , শিকারে সফল শাণিত হাতিয়ারের শক্তির উপরেও স্থান দিতে হলো মন্ত্রের । পুজো-প্রারথনার ঈশ্বর ও তার ঐশ্বরিক মন্ত্রের ধর্মতন্ত্র এইসকল প্রাচীন বিশ্বাসের ঘাড়ে চেপে বসার আগ পর্যন্ত মানুষ পুজো করতে শেখেনি, প্রার্থনা করতে শেখেনি, শেখেনি মানত করতে, মাথা কুটতে, বলীদান করতে, যাগযজ্ঞ করতে । কিন্তু কে মানে পুরোহিতের কথা, দান্দক্ষিনার প্রথা ? তাই পুরোহিতের পিছনে আবির্ভাব করানো হলো শক্তিশালী অদেখা অলীক ঈশ্বরের । সেই অলীক ঈশ্বরের আইন মানাতে গোত্র সর্দার হয়ে গেলো গোত্র ঈশ্বর, তার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়ে উঠলো ঈশ্বরের লাঠিয়াল । তারপরের ইতিহাস সকলেরই জানা । শোসনে শাসনে পিষণে আগ্রাসনে আদিম সাম্যের সমাজব্যবস্থায় ছুরিকাঁচি চালিয়ে ধর্মীয় গোত্রভেদ ছেদ-ব্যবচ্ছেদ এবং অধিকৃত সীমানা ঘোষণায় কাটাছেড়া করে ধর্ম ঈশ্বর আর গোত্র ঈশ্বর দুইয়ে মিলে পৃথিবীটাকে নরকের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, শুধু যুগে যুগে কিছু প্রগতিশীল মানুষের দিকনিরদেশণায়ই পৃথিবী এগিয়ে নিয়ে গেছে । তেত্রিশ কোটি টোটেমকে পাকরাও করে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী টোটেম দলকে সনাতনী দেবতা দাবী করে ভাগাভাগি করে নিয়ে তাদের মাথার উপর ইশ্বরের নির্বাক মূর্তি বসিয়ে আমি শুধু পুরোহিতের বকবকানিই শুনেছি, যজ্ঞের ধন মিলবেই-ঈশ্বরেরও ক্ষমতা নেই যজ্ঞের ফল আটকানোয় ।

কী চমৎকার পুরোহিত বন্দনা !
পুরোহিত তুমি ঈশ্বরের চেয়েও মহান বটে ।
ভবঘুরে বিদ্রোহীর আখেরি বয়ান, অধমের কিছু নেই বাকি আর ঘটে ।

February 14, 2014 at 2:08am

২ thoughts on “টোটেম>ব্রত>জাদুবিশ্বাসের বিবর্তনে চেপে বসা ধর্মীয় মন্ত্রবিশ্বাস, পুরোহিতের আত্মপ্রকাশ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *