একটি বিতর্কিত আলোচনা ও ব্যক্তিগত অভিমত. . . . . মানুষ আর পশুর পার্থক্য

একটি বিতর্কিত আলোচনা ও ব্যক্তিগত অভিমত

আমাদের সমাজে প্রয়াশই নীতিহীন তথা মনুষত্ব্যহীন ব্যক্তিকে পশুর সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। এ থেকে সহজেই মানুষের দৃষ্টিতে পশুর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা জন্মে। তবে মাঝে মাঝে মানুষের আচরন দেখে স্বাভাবতই প্রশ্ন জাগে; মানুষ আর পশুর পার্থক্য কোথায়?


একটি বিতর্কিত আলোচনা ও ব্যক্তিগত অভিমত

আমাদের সমাজে প্রয়াশই নীতিহীন তথা মনুষত্ব্যহীন ব্যক্তিকে পশুর সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। এ থেকে সহজেই মানুষের দৃষ্টিতে পশুর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা জন্মে। তবে মাঝে মাঝে মানুষের আচরন দেখে স্বাভাবতই প্রশ্ন জাগে; মানুষ আর পশুর পার্থক্য কোথায়?

সাধারনত মানুষের বৈশিষ্ট্যকে বা ধর্মকে আমরা মনুষ্যত্ব বলি আর পশুর ধর্মকে বলি পশুত্ব। মনুষ্যত্ব একটি গুনবাচক শব্দ বলে পরিচিত যা বিবেক, আত্নসন্মানবোধ ইত্যাদির ধারক অপরদিকে পশুত্ব মানে হিংস্রতা, বর্বরতা। মানুষের ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য তো কেবল বিবেক বা আত্নসন্মানবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাগ, লোভ, হিংসা, কাম, বিদ্বেষ এই সবই মানুষের সাধারন বা সহজাত ধর্ম। মনুষ্যত্ব বলতে যদি মানুষের সহজাত গুনাবলিকেই বোঝায় তবে তা কোন গুনবাচক শব্দ হতে পারে না। তেমনি পশুত্বও কোন দোষবাচক শব্দ হতে পারে না, কারন তাদের সব বৈশিষ্ট্য যে খারাপ সে কথার কোন ভিত্তি নেই।
প্রচলিত কথায় বিবেক, বুদ্ধি, আত্নসন্মানবোধ ইত্যাদিকে পার্থক্যের প্রধান নির্ণায়ক হিসেবে মনে করা হয়।কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষের ক্ষেত্রে স্থান কাল পাত্র ভেদে আলাদা। এক সমাজে যা বিবেক বর্জিত কাজ অন্য সমাজে সেটা বিবেক বর্জিত নাও হতে পারে; যেমন- কোন কোন সমাজে মদ্যপানকে পাপ বলে মনে করা হয়। সেহেতু বলা যায় নৈতিকার কোন সার্বজনীন রূপ নেই। ‘আত্নসন্মানবোধ’ শব্দটি শব্দগতভাবেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক; অর্থাৎ ব্যক্তিবিশেষে এটা বিভিন্ন। আত্নসন্মানবোধ সমাজ ব্যবস্থা ও মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক তথা রাজনৈতিক অবস্থার একটি প্রতিফলন মাত্র যা মানুষেরই তৈরী; সহজাত কোন বৈশিষ্ট্য নয়। তাই ভিখারির জন্য ভিক্ষার পয়সা গ্রহন তৃপ্তিদায়ক হলেও স্বচ্ছল মানুষের জন্য তা আত্নসন্মানের পরিপন্থী। অর্থাৎ এই বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যক্তি বা সমাজের জন্য বিভিন্ন হয়ে থাকে; এগুলো কোন সার্বজনীন মানদন্ড নয়।
আবার যদি এই বৈশিষ্ট্যগুলেকে মানদন্ড হিসেবে ধরেও নেই তবে এটা ভাবা যুক্তিযুক্ত হবে না যে, মানুষের ক্ষেত্রে এগুলো যেমন অর্থ বহন করে অন্যান্য পশু/প্রানীদের বেলায়ও তেমন অর্থই বহন করবে; কেননা তাদের জীবনধারন পদ্ধতি মানুষের থেকে আলাদা। নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দ্বারা কেবল নির্দিষ্ট বস্তুরই তুলনা হয়।

তবুও অনেকে এসবের আলোকেই বিষয়টি ব্যখ্যা করতে চান – অনেকে বলে থাকেন “পশুরা হিংস্র প্রকৃতির”। পশু হিংস্র হয় শুধু বাঁচা বা আত্নরক্ষার জন্য; পক্ষান্ত্মরে মানুষ কেবল বেঁচে থাকা বা আত্নরক্ষার জন্য নয় ক্ষমতার কালো চেয়ারের লোভে, আমিত্বকে বজায় রাখতে কিংবা শ্রেণীবিভেদ টিকিয়ে রাখতে পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে। মানুষের কাছে পশু হিংস্র হলেও কোন কুকুরের কাছে কোন কুকুর হিংস্র নয়, কোন বানরের কাছে কোন বানর হিংস্র নয়, কোন হায়নার কাছে কোন হয়না হিংস্র নয় তবে মানুষের কাছে মানুষ অধিক হিংস্র। তৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য মানুষই দুগ্ধপোষ্য শাবককে বঞ্চিত করি তার প্রাপ্য থেকে, ক্ষমতার লোভে আর শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে আমরাই তৈরী করি পৃথবিীবিনাশী মারণাস্র। জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ব্যবধান কেবল শাসকের অঙ্গুলির নির্দেশে মাত্র।

তবে একথা ঠিক মানুষের মস্ত্মিস্ক তুলনামূলকভাবে উন্নত; স্বামী বিবেকানন্দের মতে “মানুষের মনের একাগ্রতা আছে।” সেদিক থেকে বললে, মানুষকে বরং উন্নত মস্ত্মিস্কের একধরনের পশু বলা যেতে পারে। এই একাগ্রতার কারনে মানুষ হয়ে উঠেছে উৎপাদনমুখী, তৈরী করেছে বিভিন্ন জিনিস সমাজ, সভ্যতা যা একটি বিবতর্নের ফল বলে আজ প্রমানিত। অন্যান্য প্রানীদের থেকে মানুষ সবচেয়ে বেশী বিবর্তিত হয়েছে, যার কারনে তার জেনেটিক কোড অন্যান্য প্রানীদের চেয়ে অনেক বেশী যা মানুষকে দান করেছে বৈচিত্রতা। মানুষ ‘মানুষ’ হয়ে জন্মায় না; বরং মানুষ হয়ে ওঠে এবং তার এই হয়ে ওঠাকে সহায়কা করে সমাজ।

মানুষ আর পশুর প্রধান পার্থক্য হচ্ছে মানুষের পশুর উপর (উরৎবপঃ ফড়সরহধঃরহম ঢ়ড়বিৎ) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা আছে; যা পশুর নেই। অর্থাৎ মানুষ পশুর উপর কতৃর্ত্ব করতে সক্ষম আর একারনেই মানুষ নিজেকে পশুর থেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে থাকে; যেমন প্রাচীনকালে মনিবেরা দাসদের চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করত। প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতাই শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড। বিভিন্ন ধর্মে নারীর উপর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে; কারন নারীরা অনেকাংশে পুরুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আবার জাতিগতভাবে দেখলে অনেক জাতি তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে কারন তারা অপরকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম ছিল/আছে; যেমন ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশরা আমাদের চাষার-জাত বলে মনে করত এবং তারাই ছিল হর্তাকর্তা।

বি.দ্র. প্রতিটি প্রাণীই ঈশ্বরের নির্দেশিত পথে চলে; তবে কখোনো কখোনো এ থেকে বিচ্যুতি দেখা দেয় যার ফলে ঈশ্বর ধর্ম প্রেরণ করেন। সকল ধর্মই মানুষের জন্য এসেছে অন্য কোন প্রাণীর জন্য নয়; তবে কি মানুষই ঈশ্বরের বিরুদ্ধগামী?

৩ thoughts on “একটি বিতর্কিত আলোচনা ও ব্যক্তিগত অভিমত. . . . . মানুষ আর পশুর পার্থক্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *