পিশাচ উপন্যাসিকা হাকিনী (সম্পূর্ণ)

হাকিনী
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর ( https://­­m.facebook.com/­­muhammad.toimoor?ref­i­d=52 )



হাকিনী
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর ( https://­­m.facebook.com/­­muhammad.toimoor?ref­i­d=52 )


পয়সাঅলা বাঙালি পরিবারগুলোর ব্যাপারে একটি প্রবাদ আছে। সেটি হলো এদের প্রথম পুরুষ কেনারাম, দ্বিতীয় পুরু ষ ভোগারাম, আর তৃতীয় পুরুষ বেচারাম। সোজা কথায় প্রথম পুরুষ টাকা বানাতে, জমিজমা কিনতেই জীবন হারাম করে ফেলে। দ্বিতীয় পুরুষ শুধু বসে বসে খায় আর ঘোরে। তৃতীয় পুরুষ সব বেচেকিনে শেষ করে। চতুর্থ পুরুষের বেলায় কী হয় তা অবশ্য বলা নেই। তবে সে যে বস্তিরাম হবে তা নিশ্চিত। আমাদের পরিবারে অবশ্য কেনারাম যে বেচারাম সেই-ই। এক পুরু ষেই সব উড়েপুড়ে শেষ। আমার বাবার ছিল তেজারতির ব্যবসা, যাকে বলে সুদের কারবার। জমিজমা-গয়না বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়াই ছিল তার কাজ। প্রথম দিকে বাবা ছিলেন খুলনা শহরের এক মাড়োয়ারির দোকানের হিসাব লেখক। ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর সেই মাড়োয়ারি ব্যবসাপাতি গুটিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেল। সেই সাথে গেল বাবার চাকরিও। বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। একদিন দুপুরে চার আনার বাদাম কিনে হাদিস পার্কের এক বেঞ্চের ওপর বসে কীভাবে আগামী মাসের ঘরভাড়া দেবেন ভাবতে লাগলেন সেই কথা। বাবা ভাড়ার কথা যখন ভাবছেন এবং মাঝেমধ্যেই উদাস হয়ে পার্কের গেটের সামনে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন তখন হঠাৎ তার চোখ পড়ল গেটের পাশে বটগাছের নিচে বসা এক জ্যোতিষীর ওপর। জ্যোতিষীর পাশে পার্কের রেলিংয়ে লাল সালুতে রুপালি রঙে লেখা :

জ্যোতিষ সাগর নেতাই নাথ
হাত দেখিয়া ভাগ্য গণনা করা হয়
দর্শনী ১২ আনা মাত্র।

মাঝবয়সী ঘোর সংসারী মানুষ অর্থকষ্টে পড়লে তার মাথার ঠিক থাকে না। চার আনার বাদাম কেনার পর বাবার সম্বল তখন একুনে বারো আনা। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে দিয়ে ভাগ্য গণনা করালেন। নেতাই নাথ বাবাকে বললেন, ব্যবসার লাইনে বৃহস্পতি তুঙ্গে। চাকরির ক্ষেত্রে শনির বলয়ে কেতুর আনাগোনা। আগামী পঁচিশ বছরে শনির বলয় ছেড়ে কেতুর অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট। জ্যোতিষ সাগরকে হাত দেখানোর আগে বারো আনাই অ্যাডভান্স করতে হয়েছে। বাবার দুবছরের পুরোনো রংজ্বলা ক্রিজভাঙা প্যান্টের পকেট তখন গ্যাস বেলুনের মতো হালকা। বাসায় শ’খানেক টাকা মা’র কাছে আছে। শেষ সম্বল। ব্যবসা কীভাবে হবে বুঝতে পারছেন না। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের ব্যবসায় উন্নতির সম্ভাবনা। জ্যোতিষ তাঁকে তেজারতির ব্যবসা ধরতে বলল। সাফল্যের পরিমাণ শতভাগ। আগেই বলেছি, ছাপোষা মানুষ বিপদে পড়লে মাথার ঠিক থাকে না। বাবা চলে গেলেন ঘোরের ভেতর। বাস করতে লাগলেন এক মানসিক কোমায়। বাসায় ফিরে মাকে বললেন,
‘বিমলা, চাকরি তো অনেক দিন করলাম। এবার ভাবছি ব্যবসা-বাণিজ্য করব।’
মা বললেন, ‘আচ্ছা, তা না হয় করবেন। কিন্তু আপনার পুঁজি কোথায়?’
‘তোমার বড় ভাইয়ের তো বিরাট অবস্থা। তার কাছ থেকে হাজার দশেক এনে দাও। এক বছরের ভেতর শোধ হয়ে যাবে।’
‘আর যদি শোধ দিতে না পারেন, তখন?’
‘না পারলে তোমার বাবার সম্পত্তির যে অংশ তুমি পাবে ওটা তার হবে।’
‘ওইটুকুই তো সম্পত্তি। হাতের পাঁচ। ওটা গেলে আর থাকল কী? পথে পথে ভিক্ষে করে খেতে হবে।’
‘অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে পথে পথে ভিক্ষে তো মনে হয় কাল থেকেই করতে হবে। যা বলি মন দিয়ে শোনো। তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকাটা এনে দাও। মাড়োয়ারির দোকানটা এখনো খালিই আছে। আপাতত ওখানেই বসা যাবে। নতুন মালিককে মাঝে মাঝে কিছু ভাড়া দিলেই হলো।’


সেই থেকে শুরু। দশ বছরে বাবা প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার মালিক হয়ে গেলেন। সুদের কারবারে সাধারণত যা হয়। আসল শোধ দিতে পারলেও সুদ থাকে। যদি সুদ শোধ হয় তো আসল থাকে। এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা, পেছালেও নির্বংশের ব্যাটা। খাতকদের কাউকেই ছ’মাসের বেশি সময় বাবা দিতেন না। এর ভেতর আসলসহ সুদের টাকা শোধ না হলে বন্ধকী সম্পত্তি কিংবা গয়না বাজেয়াপ্ত হতো। নিয়মানুযায়ী সুদসহ আসল কেটে রেখে সম্পত্তি বা গয়না বিক্রির উদ্বৃত্ত টাকা খাতককে দেওয়ার কথা। বাবা দিতেন না। বিশেষ করে, অসহায় বিধবা, এতিম অথবা অন্য জেলার লোকদের বেলায়। তার পোষা কিছু গুন্ডাপান্ডা ছিল। কেউ প্রতিবাদ করতে এলে তাদেরকে এরা ভাগিয়ে দিত।


বাবা যখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন, দুটি বাড়ি কেনার পর তিন নম্বর বাড়ির বায়না করবেন বিপদ ঘটল ঠিক তখন। পৌষ মাসের এক মেঘলা দিনে সন্ধেবেলা অশীতিপর এক বৃদ্ধা রিকশা থেকে তার দোকানের সামনে নামল। মহিলা কালীঘাটে পুরোনো এক বাড়িতে থাকে। দুটো বালা বন্ধক রেখে টাকা ধার করতে চায়। বালা দুটো হাতে নিয়ে খুব ভালো করে পরীক্ষা করলেন বাবা। পুরোনো জিনিস। আদ্যিকালের ডিজাইন। তবে জিনিস ভারী। দুটোতে কম করে হলেও পাঁচ ভরি সোনা আছে। বর্তমান বাজারদরে ওগুলোর দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা হওয়ার কথা। বাবা বললেন,
‘ওগুলো রেখে পাঁচশো টাকা নিয়ে যান। ছ’মাসের ভেতর সাতশো পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বালা ফেরত নিয়ে যাবেন। দেনা পরিশোধ করতে না পারলে মাল বাজেয়াপ্ত হবে।’

বুড়ি কাগজে টিপ সই দিয়ে টাকা, রশিদ নিয়ে কালীঘাটে ফিরে গেল। ছ’মাস পার হলো। বুড়ির দেখা নেই। বাবা বালা দুটো বাসায় এনে তার শোবার ঘরে সিন্দুকে রেখে দিলেন। তখন ১৯৭৫ সাল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া জাতীয় গণতান্ত্রিক দল বা জাগ দল নামে নতুন দল গঠন করেছেন। সেই দলের উঠতি নেতাদের সাংঘাতিক দাপট। এইরকম এক নেতা যার নাম মোটা মোসলেম বাবাকে বলল দোকান ছেড়ে দেওয়ার জন্য। মাড়োয়ারির ওই দোকান অর্পিত সম্পত্তি। ভেস্টেড প্রপার্টি। সরকারের কাছ থেকে নিরানব্বই বছরের লিজ নিয়েছে সে। কাগজপত্র আপটুডেট। বাবা বললেন, দোকান তার দখলে। আগের মালিকের কাছ থেকে তিনি কিনে নিয়েছেন। কাগজপত্র তারও আছে। বাবা যেমন বুনো ওল নেতাও তেমন বাঘা তেঁতুল। গন্ডগোল চরমে উঠল। নেতা বুঝল হুমকি-ধামকিতে কাজ হবে না। সে ধরল অন্য রাস্তা। থানার ওসিকে হাত করে দুটো মার্ডার কেসে বাবার নাম ঢুকিয়ে দিল। এর একটিতে তার পোষা গুন্ডাপান্ডার একজনকে বানাল রাজসাক্ষী। ভালো রকমের জটিল মামলা। টুটপাড়ার এক হিন্দু বিধবার নাতি খুন হয়েছিল। পুরোপুরি বখে যাওয়া এই নাতির বাবা-মা থাকত কলকাতায়। বিরাট বাড়িতে দিদিমা একা। কলকাতার ছোট্ট খুপরি বাসায় দাদিমার দম বন্ধ হয়ে আসে। নাতির কাজ কলেজে পড়াশুনো করা, দিদিমাকে দেখে রাখা। এই দুটোর কোনোটাতেই তার আগ্রহ ছিল না। তার সব আগ্রহ জুয়া, মদ, বাজে মেয়েমানুষে। দাদির গয়নাপাতি বন্ধক রেখে বাবার কাছ থেকে প্রায়ই টাকা ধার নিত নাতি। কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখা গেল, প্রায় বিশ হাজার টাকার গয়না বন্ধক রেখে বাবা তাকে দিয়েছেন মাত্র দুহাজার। খুনের মোটিভ ‘পরিষ্কার’।

বাবার ঠাঁই হলো জেলহাজতে। কেস চলল মাসের পর মাস। থানা, পুলিশ, কোর্ট-কাছারি, উকিল-মোক্তার করতে গিয়ে টাকা খরচ হতে লাগল হু হু করে। সুদখোরকে কেউ পছন্দ করে না। আমরা কারও সহানুভূতি পেলাম না। যেখানে পাঁচশোতে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে দিতে হয় হাজার টাকা। ক্যাশ যা ছিল গেল। এরপর গেল জমিজমা, বাড়িঘর। বাবা হাজত থেকে আর বেরোতে পারলেন না। সাজানো মামলায় ফাঁকফোকর কম। উকিল সাহেব প্রথম প্রথম বলতেন, আগামী হেয়ারিংয়েই বেইল হবে। এখন কিছুই বলেন না। একদিন চেম্বারে অপেক্ষা করছি। উকিল সাহেব কোথায় যেন গেছেন। তার মুহুরি আস্তে করে বলল,
‘মনে হয় কনভিকশন হয়ে যাবে।’

এদিকে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। একদিন সকালে বসে ডায়েরি লিখছি, শোবার ঘরের সিন্দুক খুলে সেই পুরোনো বালা দুটো বের করে মা বললেন,
‘দেখ তো সঞ্জয়, এগুলো বেচা যায় কি না?’


খুলনার সবচেয়ে বড় সোনার দোকান অমিয় জুয়েলার্স। মন্ময় চৌধুরী দোকানের মালিক। বিরাট ধনী লোক। কারও সাথে মেশেন না। দোকানের কাউন্টারে বালা দুটো রেখে সেলসম্যানকে বললাম, এগুলো আমি বেচতে চাই। সেলসম্যান প্রথমে খুঁটিয়ে দেখল। কষ্টিপাথরে ঘসে সোনার মান যাচাই করল। সবশেষে নিল ওজন। তারপর বলল,
‘এ দুটোতে পাঁচ ভরি সোনা আছে। অনেক টাকার ব্যাপার। মালিককে দেখাতে হবে।’
‘ঠিক আছে, দেখান আপনার মালিককে।’
ভেতরে চলে গেল সেলসম্যান। পাঁচ মিনিট পর ঘুরে এসে বলল,
‘আপনাকে আমরা এ দুটোর জন্য পাঁচ হাজার পর্যন্ত দিতে রাজি আছি। দোকানে এত ক্যাশ নেই। সাহেব বলেছেন, এখন আড়াই হাজার দিতে। বাকিটা সন্ধ্যার পর আসলে পাবেন। কী করবেন দেখেন?’

সত্যি বলতে কী তিন হাজারের বেশি আমি আশাই করিনি। সেই তুলনায় পাঁচ হাজার অনেক বেশি। বললাম,
‘ঠিক আছে, সন্ধের পর এসে বাকিটা নিয়ে যাব। একটা রশিদ লিখে দেন।’

সন্ধের পর আবার গেলাম অমিয় জুয়েলার্সে। আগের সেলসম্যান কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত। বুড়োমতো একজন এগিয়ে এল। বলল,
‘আমি দোকানের ম্যানেজার। সাহেব আপনার সাথে দুমিনিট কথা বলতে চান। টাকাটা উনিই আপনাকে দেবেন। আমার সাথে একটু ভেতরে আসেন।’

কাউন্টার পার হয়ে শোকেসের পাশে সরু দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বিরাট হলঘরের মতো কামরায় আবছা অন্ধকারে স্যাঁকরার দল লাইন দিয়ে বসে কাজ করছে। নাইট্রিক এসিডের ঝাঁঝালো গন্ধে দম বন্ধ হয়ে এল। লোকগুলো বছরের পর বছর এই পরিবেশে কাজ করছে কী করে? পেতলের সরু পাইপ মুখে লাগিয়ে গয়নার গায়ে অনবরত ফুঁ দিচ্ছে তারা। গাল ফুলে উঠেছে শ্রাবণ মাসের কোলা ব্যাঙের মতো। ফুসফুস এত চাপ সহ্য করে কীভাবে! হলঘর পেরিয়ে লাল কার্পেট মোড়া ছোট একটি প্যাসেজের মাথায় কাচ লাগানো সেগুন কাঠের দরজা। নক করে ম্যানেজার আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল।

প্রকাণ্ড জানালাঅলা ঝকঝকে কামরা। দেয়ালের একদিকে রেমিংটন কোম্পানির ইয়া বড় সিন্দুক। এই জগদ্দল পাথরের মতো ভারী বস্তু দোতলায় যে কারিগর উঠিয়েছে, তাকে অভিনন্দন। অন্য দেয়ালের পুরোটা জুড়ে বইভর্তি কাচের শোকেস। মন্ময় চৌধুরী আমার দিকে তাকালেন। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের ‘কিনু গোয়ালার গলি’ কবিতার কথা। ‘যত্নে পাট করা লম্বা চুল। বড়বড় চোখ। শৌখিন মেজাজ। কর্নেট বাজানো তার শখ।’ পার্থক্য শুধু এই যে ইনার চুলগুলো ধবধবে সাদা। ছড়িয়ে আছে ঘাড়ের ওপর। ইস্ত্রি করা ফিনফিনে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। তবে ইনি যন্ত্র শিল্পী কি না বুঝতে পারছি না। ধারণা করেছিলাম, কালো মোটা ফতুয়া পরা ধূর্ত চেহারার কাউকে দেখতে পাব। মন্ময় চৌধুরী দেখতে রবীন্দ্রনাথের মতো। সাধক-টাইপ চেহারা। এই লোকের লেখালেখি করার কথা। মাঝে মাঝে সভাসমিতিতে বক্তৃতা। কাগজে কাগজে ইন্টারভিউ। মনোযোগ দিয়ে পুরোনো আমলের একটি ক্যাটালগ দেখছেন মন্ময় চৌধুরী। ইশারায় বসতে বললেন।
‘আপনি সঞ্জয় বাবু?’ গভীর কালো চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন ম. চৌধুরী।
‘আজ্ঞে, আমিই সঞ্জয়।’
‘বালা দুটো পেলেন কোথায়?’
কোনো কিছু গোপন না করে তাঁকে সব ভেঙেচুরে বললাম।
‘বুড়ির বাড়ির ঠিকানা কি আছে আপনার কাছে?’
‘ছিল তো বটেই। তবে পুলিশ খাতাপত্র সব জব্দ করে মালখানায় রেখেছে। এখন আর সেটা পাব কীভাবে?’
‘হুমম, বুঝতে পারছি। একটা প্রশ্ন করি। কিছু মনে করবেন না তো?’
‘সেটা বোঝা যাবে প্রশ্ন শোনার পর। কী প্রশ্ন? বুড়ির বাড়ি গিয়ে ভেরিফাই করতে চান, আমি সত্যি বলছি কি না এইতো? তার প্রয়োজন নেই। আমি সত্যি কথাই বলছি। মিথ্যে বললে আপনি ধরে ফেলতেন।’
‘ব্যাপারটা তা নয়। বুড়ির সাথে একটু কথা বলতে চাই আমি। বালা দুটো তার কাছে আসলা কীভাবে, সেইটে জানতে চাই। আপনি বলেছেন বুড়ি থাকে কালীঘাটে। এটাই বা জানলেন কীভাবে? খাতাপত্র মালখানায়। বাবা জেলহাজতে। বালা দুটো হাতে পেয়েই আপনি আমার এখানে।’
‘মার কাছ থেকে জেনেছি। দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা গয়নাপাতি বাসায় আনতেন খুব কম। পুরোনো গয়না মাকে কখনো দেননি। নতুন বানিয়ে দিতেন। বালাগুলো একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। বাবাকে জিজ্ঞেস করে মা জানতে পারেন কালীঘাটের এক বুড়ির গয়না ওগুলো। আপনি যদি বুড়িকে খুঁজে বের করতে পারেন, তাহলে বলবেন। কিছু টাকা তাকে ফিরিয়ে দিতে চাই আমি।
‘আপনার কোনো ফোন নম্বর থাকলে আমাকে দিয়ে যান। খোঁজ পেলে জানাব।’
লক্ষ করলাম, কথা বলার পুরো সময়টাতেই ম্যানেজার ঠায় দাঁড়িয়ে। বুঝলাম, কর্মচারীরা মন্ময় চৌধুরীকে খুব সমীহ করে। ভাবুক ধরনের এই মানুষটাকে এরা এত ভয় পায় কেন কে জানে?


পরদিন কোর্টে বাবার হেয়ারিং ছিল। সাবজজ-১-এর কোর্টে কেস। বিশ-পঁচিশটা ফৌজদারি মামলার শুনানি হবে। কার কেস কখন উঠবে আগে থেকে বলার উপায় নেই। অফিস সকাল ন’টায় শুরু হলেও জজ সাহেব এগারোটার আগে এজলাসে ওঠেন না। কেসের শুনানি চলে একটানা বিকেল চারটে অব্দি। এর ভেতর লাঞ্চ ব্রেক, নামাজের ওয়াক্ত এসব আছে। সকাল ন’টার ভেতরই জেল থেকে প্রিজনভ্যানে সব আসামি এনে পুলিশেরা কোর্ট-হাজতে রাখে। দশ টাকা, বিশ টাকা দিলে হাজতিকে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়াতে দেয় তারা। আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা হয়। দর্শনার্থীদের ভেতর গ্রামের বৌ-ঝিরাই বেশি। কোলে-কাঁখে দু-তিনটা ছেলেমেয়ে। সিকনি গড়িয়ে পড়ছে বাচ্চাগুলোর নাক দিয়ে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে এর খানিকটা গালেও মেখেছে তারা। শুকিয়ে চড়চড় করছে গাল। সব কটার পা খালি। এদের মায়েদের স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা ধুলোভরা পা দেখে এত মন খারাপ হয়! একটা ছোট ছেলে তার হাজতি বাবাকে বলছে, ‘আব্বা, আমাকে একটা পাউরু টি কিনে দেন না।’ শহরের মানুষের কাছে পাউরু টি কিছু না। গ্রামের মানুষের কাছে ওটা স্বপ্নের খাবার। আমাদের গাঁয়ের একটি খুব বুড়ো লোককে চিনতাম। অনেক দিন থেকেই রোগে ভুগছিল। মরণ ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে মেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বা, কী খেতে মন চায়?’ ‘আমাকে একটা পাউরু টি খাওয়াতি পারবি?’ জবাব দিলেন বাবা। গ্রাম থেকে রেলস্টেশন সাতাশ মাইল দূরে। পাউরু টি পাওয়া যায় শুধু সেখানেই। পায়ে হেঁটে একজন রওনা হলো পাউরু টি আনতে। পরদিন বাসি পাউরু টি এসে যখন পৌঁছাল বুড়ো তখন পরপারে। একটা পাউরু টির দাম ষাট পয়সা। বাবার চোখ ছলছল করছে। তার কাছে এক টাকাও নেই।

আগেই বলেছি, কার কেস কখন উঠবে বলা যায় না। এ হচ্ছে ‘শেষ পুরোহিত কঙ্কালের পাশা খেলা।’ সাক্ষী-সাবুদ, আসামি সব বসে আছে সকাল থেকে। উকিলরা দু-তিনটা কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করছে। আরিচা ঘাটে ফেরি-ধরা টেনশন। কোর্টে কেস উঠল। সত্য-মিথ্যা সব সাক্ষী রেডি। আসামি হাজির। জজ সাহেব অপেক্ষা করছেন। উকিলের দেখা নেই। কিছুক্ষণ দেখে জজ সাহেব সে কেস বাদ দিয়ে আরেকটি ধরলেন। নেঙ্ট হেয়ারিং ডেট তিন সপ্তাহ পরও পড়তে পারে, দু মাস পরও পড়তে পারে। আসামি আবারও প্রিজনভ্যানে। গন্তব্য কারার ঐ লৌহকপাট। কার গোয়ালে কে দেয় ধুঁয়ো। বাবার কেস ওঠা নিয়ে রাশিয়ান রু লেত খেলা চলে না। পেশকারকে দুশো টাকা দিয়েছি। প্রথমেই যাতে বাবার কেসটা জজ সাহেবের হাতে ধরিয়ে দেয় সে। হেয়ারিং হলে আরও পঞ্চাশ। উকিলকে ধরে এনে বসিয়ে রেখেছি। তিনজন সাক্ষীকে একশো টাকা করে দিতে হয়েছে। ভালো হোটেলে গোস্ত-পরটা খেয়েছে সকালে। কোর্টে এসে চা, পান, সিগারেট। মুহুরিকে বিশ টাকা দিয়ে হাজিরা জমা করে বসে আছি। ওপারের ডাক যদি আসে। দুহাত বুকের সমানে জড়ো করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বাবা। হাতে বেড়ি, পায়ে বেড়ি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। ক্ষুদিরামের খালু। তাকিয়ে আছেন জানালার বাইরে ড্রেনের ধারে কচুগাছের দিকে। মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে! পয়সাঅলা মানুষদের চেহারায় যে তেলতেলে ভাব থাকে তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই তার ভেতর। উকিল একবার উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ধন বাবু (বাবার নাম ধনঞ্জয়), ভালো তো?’ বাবা পাত্তাও দিলেন না। তার চোখে সক্রেটিসের উদাসীনতা। পাথরের বাটিতে কখন হেমলক পরিবেশন করা হবে তার অপেক্ষা।

বাবার কেস উঠল ঠিকই তবে হেয়ারিং হলো না। মোটা মোসলেম আসেনি। জাগ দলের জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় গেছে। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত। তার উকিল টাইম প্রেয়ার দিয়েছে। পরের হেয়ারিং ডেট পড়ল তিন সপ্তাহ পর। ছোট্ট টিফিন ক্যারিয়ারে বাবার জন্য ইলিশ মাছ ভাজি, লাউ দিয়ে রান্না মাস কলাইয়ের ডাল পাঠিয়েছিলেন মা। এক জেল পুলিশকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বললাম টিফিন ক্যারিয়ারটা বাবাকে দিতে। পুলিশ বলল, ‘জেলে গিয়া দিমুআনে।’ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা পুলিশ আজও পেলাম না।

পরদিন দুপুরে খেয়ে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়েছি। বাইরে শুরু হলো বৃষ্টি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। মা ঘুম ভাঙিয়ে বললেন অমিয় জুয়েলার্স থেকে ফোন এসেছে। চৌধুরী সাহেব সন্ধের সময় দোকানে দেখা করতে বলেছেন। বুড়ির বাসার ঠিকানা পাওয়া গেছে।


রিকশা করে আমাকে সাথে নিয়ে রওনা হলেন চৌধুরী বাবু। কালীঘাট এলাকায় আগে কখনো আসিনি আমি। সরু রাস্তার দুপাশে পুরোনো সব টিনের বাড়ি। অনেকেই ধুনুচি জ্বালিয়ে সন্ধ্যা আরতি দিয়েছে। বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধ ম ম করছে। সরু গলির মাথায় ছোট ছোট ইটে গাঁথা আদ্যিকালের বাড়ি। পলেস্তারা খসে ইট বের হয়ে সেই ইট পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। চারদিকে ভাঙাচোরা ইটের স্ত্মূপ। মানগাছ, কচুগাছের ঝোপ। এর মাঝে দুখানা মাত্র ঘর কোনোরকম টিকে আছে। ছোট জানালায় চটের পর্দা ঝুলছে। ভেতরে কুপি জ্বলছে বলে মনে হলো। এ বাড়িতে কারেন্টের কারবার নেই। সামনেই সরু কাঠের দরজা। বারান্দা-সিঁড়ি এসবের কোনো বালাই নেই। কোনো কালে হয়তো ছিল। ঢোকার সরু দরজাটা পুরোনো ভাঙাচোরা হলেও এর জটিল নকশা দেখে বোঝা যায়, একসময় কত সুন্দর ছিল ওটা। দরজার ওপরে শেকল, মাঝে দুটো কড়া। খুব জোরে কড়া নাড়লেন চৌধুরী সাহেব। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, বুড়োরা কানে কম শোনে। প্রায় সাথে সাথেই মাঝবয়সী শ্যামলা এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় কাঠের মালা। কামানো মাথার পেছনে ছোট একটা টিকি ঝুলছে। দেখেই বোঝা যায়, মন্দিরের পুরুত ঠাকুর। ভদ্রলোক বের হচ্ছিলেন বোধ হয়।
‘আজ্ঞে, আপনারা?’ কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন পুরুত।
‘আমার নাম মন্ময় চৌধুরী। অমিয় জুয়েলার্স থেকে আসছি। আমরা কাদম্বিনী দেবীর কাছে এসেছি।’
‘আমি ওর নাতজামাই। তেনার শরীরটা খারাপ। কী দরকার জানা যাবে?’
‘উনি কিছু টাকা পাবেন। দেওয়ার জন্য এসেছি’, বললাম আমি।
‘আপনারা বসেন। দেখি কী করা যায়?’
ঘরের মেঝে স্যাঁতসেঁতে। নোনা ধরা দেয়াল। পায়া ভাঙা শাল কাঠের চকির ওপর পাটি বিছানো। পুরু ধুলো জমে আছে ওপরে। কড়ি-বর্গা দেওয়া ছাদ থেকে আগের আমলের শেকলে বাঁধা ঝাড়লন্ঠন ঝুলছে। ঝুলকালিতে দেখতে হয়েছে কাকের বাসা। বুড়ি ওটাকে এত দিন বেচে দেয়নি কেন? যেভাবে লোহার শেকল দিয়ে বাঁধা তাতে নামানোর পারিশ্রমিক বিক্রীত মূল্যের চেয়ে বেশি হবে। ঝাড়লন্ঠন বিলুপ্ত না হওয়ার পেছনে ওটাই প্রধান কারণ।

‘ঠাম্মা বাতের ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছেন। উনি উঠে আসতে পারবেন না। আপনাকেই ওর কাছে যেতে হবে।’ ফিরে এসে বলল পুরুত।
পুরুতের পেছন পেছন যে কামরায় এসে ঢুকলাম সেবা প্রকাশনীর বইয়ের ভাষায় সেখানে দারিদ্র্য ‘মুখ ব্যাদান’ করে আছে। বিমূর্ত দারিদ্র্য এখানে মূর্ত। পভার্টি ইজ আ কার্স। অভিশাপ নয়, এখানে পভার্টির গজব নাজিল হয়েছে। জরাজীর্ণ ছোট এক খাটের ওপর চাঁদিছিলা জাজিম। তুলো নারকোলের ছোবড়া এত কালো হয়ে বেরিয়ে পড়েছে যে ওগুলো তেলতেলে হয়ে গেছে। জাজিমের ওপর আঁশ ছেঁড়া শীতলপাটিতে শুয়ে আছে ফ্রানৎজ কাফকার ‘দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট’। স্রেফ হাড়ের ওপর কোঁচকানো চামড়ার জীবন্ত বিভীষিকা। বুড়ির বয়সের গাছ-পাথর নেই। টি এস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কবিতার দ্য সিবিল অভ ক্যুমা। ঘরের সিলিংয়ের নিচে পলিথিন টাঙানো। বৃষ্টি হলে ছাদ থেকে মনে হয় জল পড়ে। দেয়ালের এক কোণ ভেঙে ইট গেঁথে ড্রেনের মতো করা হয়েছে। বুড়ির বাথরুম। সেখানে এক বালতি পানিতে লাল রঙের প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। খাটের পাশে চিলুঞ্চি। কফ, থুতু চিলুঞ্চির ভেতরে যত, বাইরে তার শত গুণ। ঢাকা শহরের ডিআইটি ডাস্টবিন। মনে হলো, ঘরের ভেতরে ভেসে আছে ‘অনাদি কালের বিরহ বেদনা।’ নাকে এসে লাগল গা গুলিয়ে ওঠা তীব্র আঁশটে গন্ধ। হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসলেন মন্ময় চৌধুরী। চেয়ার একটাই। পুরুত ঠাকুর বুড়ির মাজার কাছে বিছানায় বসেছে। আমি দাঁড়িয়ে।
‘ঠাম্মা, উনার নাম মন্ময় চৌধুরী। আপনার সাথে আলাপ করতে চান।’ শুরু করল পুরুত।
ছানিপড়া চোখ তুলে মন্ময় চৌধুরীর দিকে তাকালেন বৃদ্ধা। কিছু দেখতে পেয়েছেন বলে মনে হলো না। পকেট থেকে বালা দুটো বের করে বুড়ির দিকে এগিয়ে দিলেন মন্ময়। বললেন,
‘দেখুন তো এগুলো চিনতে পারেন কি না?’
বালা হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখল বুড়ি। তারপর রিনরিনে অথচ স্পষ্ট করে বলল,
‘চিনতে পেরেছি, বাবা। সারা জীবন ওগুলো নাড়াচাড়া করেছি। এর প্রতিটি ঘাট আমার মুখস্থ।’
‘ওগুলো কে দিয়েছিল আপনাকে?’
‘কেউ দেয়নি। মায়ের কাছে ছিল। মা মারা যাওয়ার আগে দিয়ে গেছেন। মায়ের দেওয়া জিনিস শত কষ্টের ভেতরও বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কোথায়?’
‘আপনার মা ওগুলো পেলেন কোথায়, সে ব্যাপারে কিছু জানেন?’
‘আমার বাবা তাকে দিয়েছিলেন। সে অনেক কাল আগের কথা, বাবা। তখন এই শহরে অনেক সাহেব ব্যবসায়ী ছিল। এদের একজনের সাথে বাবার খাতির ছিল খুব। এই খুলনা শহরের নাম ছিল রোয়ালে বদেরপুর। রূপসা নদীর ধারে অনেক কাল আগের একটা মন্দির আছে। ওটা খুল্লনা দেবীর। ওর নাম থেকেই এই এলাকার নাম খুলনা। বাবা ওই মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন। পরে এই বাড়িতে চলে আসেন। এই বাড়িটা আগে থেকেই ছিল। এর মালিক ছিল নানাভাই ধূনজী। কলকাতার ব্যবসায়ী। বিখ্যাত ধনী। আমার জন্ম এ বাড়িতেই। তখন আমাদের অবস্থা ভালো ছিল। মন্দিরে বাবা আর ফিরে যাননি। বাকি জীবন তন্ত্র সাধনা করে কাটিয়েছেন। ওই সাহেব প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। দক্ষিণে আলাদা একটা ঘর ছিল। আমরা বলতাম কালীমন্দির। বাবার সাথে ওখানেই দেখা করতেন সাহেব।’
‘সাহেবের নামটা বলতে পারবেন?’ বুড়িকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মন্ময়।
আসল প্রশ্নের উত্তরের ধারেকাছেও বুড়ি এখনো আসেনি। হাজার এক রজনী গল্পের ভূমিকা একে দিয়ে লেখালে ভালো হতো।
‘উনাকে সবাই ঠাকরে সাহেব বলে ডাকত। লাল টকটকে চেহারা। সারা গায়ে ভালুকের মতো লোম। খুব শক্তিমান পুরুষ। দেখলে ভয় হয়। এ বাড়িতে আসার কিছুদিন আগে বাবার ক্যাশ বাঙ্রে ভেতর মা ও দুটো দেখতে পান। ভীষণ অবাক হন ওগুলো দেখে। সোনার বালা নিজের কাছে কেন রাখবেন বাবা? গয়না আগলে বসে আছে এ-জাতীয় পুরু ষ বিরল। বাবা ওই গোত্রের লোক ছিলেন না মোটেও। এ ছাড়া মা’র এ-ও মনে হলো, ওগুলো আগে কোথাও দেখেছেন। আগের দিনে অনেকেই মূল্যবান জিনিস, সোনাদানা, টাকাপয়সা মন্দিরে জমা রাখত। কেউ কেউ প্রতিমাকে অনেক কিছু দানও করত। মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের জোড় মূর্তির পেছনে ছোট্ট একটা ঘরে ওগুলো জমা করে রাখা হতো। বছরে একবার বের করে হিসাব মেলানো হতো, ঝাড়পোঁছ করা হতো। এসব কাজে মাকেও সাহায্য করতে হয়েছে। সে সময়ই মা বালাগুলো দেখে থাকবেন। বাবাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন মা। বাবা বলেছিলেন, কয়েক দিনের জন্য বালাগুলো নিজের কাছে রেখেছেন। বিশেষ দরকার। পরে ফিরিয়ে দেবেন। ফিরিয়ে আর দেননি। আষাঢ় মাসে অমাবস্যার এক রাতে কালীমন্দিরে সাধনায় বসেন বাবা। রাতে তার কাছে মন্দিরে যাওয়া মানা ছিল। সকালে মা গিয়ে দেখেন বাবা মরে পড়ে আছেন। সবার ধারণা, সন্ন্যাস রোগে মারা গিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু মা বলতেন, অপঘাতে মৃত্যু হয় তাঁর।’
‘নানাভাই ধূনজীর সাথে কখনো দেখা হয়েছে আপনার?’
‘ঠাকরে সাহেবের সাথে দু-একবার এখানে এসেছিলেন। বাবার সাথে মন্দিরে দেখা করতেন। লম্বা চুল-দাড়িঅলা খুব মোটা লোক। ধবধবে ফরসা গায়ের রং।’
‘আলাপ করে অনেক ভালো লাগল। আশা করি, শীঘ্রি ভালো হয়ে উঠবেন।’
‘আমার আর ভালো-মন্দ, বাবা। ভগবানের ডাক আসলে বাঁচি। যে অবস্থায় আছি তা মরারও অধম।’

আমি এগিয়ে গিয়ে বুড়ির একটি হাত ধরলাম। তাকে দুহাজার টাকা দিলাম। বুড়ি জিজ্ঞেস করল,
‘টাকা কিসের জন্য, বাবা?’
‘আপনার ওই বালা দুটো, যার সাথে এতক্ষণ কথা বললেন, তিনি কিনে নিয়েছেন। আমার বাবার কাছে ওগুলো বন্ধক রেখেছিলেন, মনে আছে? পুরো টাকাটা তো নেননি তখন। এখন কিছু রাখেন।’
বুড়ি খুশি হলো কি না বুঝতে পারলাম না। তবে নাতজামাই যে খুশি হয়েছে, সেটা বোঝা গেল। ফেরার সময় চৌধুরী এবং আমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাল। বলল,
‘দরকার হলে আবারও আসবেন। আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।’ বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়!


বুড়ির বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে দুজনে বড় রাস্ত্মায় আসলাম। গুমগুম করে মেঘ ডাকছে। হিলহিলে ঠান্ডা বাতাস। যেকোনো সময় ঝেঁপে বৃষ্টি আসবে। মন্ময় বাবু কোথায় থাকেন জানি না। এখান থেকেই আলাদা হয়ে যাওয়া ভালো। উনি আবারও রিকশা করে বাসায় পৌঁছে দেবেন, ভাবাই অন্যায়। বললাম,
‘বাবু, আমাকে একটু নিউ মার্কেটের দিকে যেতে হবে। তবে আর একবার আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনার সময় হবে তো?’
‘সময় করে একদিন আসেন। এ হপ্তা ব্যস্ত আছি। আগামী শনিবার আসতে পারেন। ফোন করে আসলে ভালো হয়। দোকানের ফোন নম্বর আছে না আপনার কাছে?’
‘আজ্ঞে আছে। দোকান থেকে যে রশিদ দিয়েছিলেন, তার ওপর লেখা আছে।’
‘গুড। দেখা হবে, কেমন?’
অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন মন্ময়। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে লাগল। ছোট একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে চা, কচুড়ির অর্ডার দিলাম। রেস্টুরেন্টের নাম ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার। ঢুকতেই বাঁ হাতে ভাঁটের আগুনে বাবলার খড়ি পুড়ছে। গাঁট পোড়ার পটপট শব্দ পেলাম। এক ইঞ্চি পুরু স্টিলের প্রকাণ্ড তাওয়ায় মোগলায় পরটা, নরমাল পরটা, কিমা পুরি ভাজা হচ্ছে। পাশে কেরোসিনের পাম্প কুকারে কড়াইয়ের ডোবা তেলে কচুড়ি, শিঙাড়া, ডালপুরি, রেগুলার পুরি ফুটছে। এগুলোর সাথে ফ্রি আমড়া, জলপাইয়ের চাটনি। ঘন দুধের ধোঁয়া ওঠা চা। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। রেস্টুরেন্টের টিনের চালে ঝমঝমাঝম। চমৎকার পরিবেশ। মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। বৃষ্টি ধরে এল দুঘণ্টা পর। এর মধ্যে কচুড়ি, শিঙাড়া, পুরি, দুই খুরি চাটনি, তিন কাপ চা, তিনটা ৫৫৫ সিগারেট শেষ করেছি। বাসায় ফিরতে হবে। মা দুশ্চিন্তা করবে। শেখ মুজিব হত্যার পর হিন্দুরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে। আসল অবস্থা সেরকম না মোটেও। বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘই খাচ্ছে বেশি। মাইনরিটি সারা জীবনই নিজেদের অনিরাপদ ভাবে।


ছ’দিন বাদে ফোন করলাম মন্ময় চৌধুরীকে। পরদিন শনিবার। বিকেলের দিকে দোকানে যেতে বললেন। দোকানে গিয়ে দেখি কাউন্টারে বুড়ো ম্যানেজার বসে আছে আমাকে সাহেবের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। পুরো দোকান খালি। শনিবার আধবেলা, রবিবার পুরো দিন ছুটি। অফিসে বসে আছেন মন্ময়। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছেন বালা দুটোর দিকে। আমাকে ইশারায় বসতে বললেন। ম্যানেজারকে বললেন চলে যেতে। শুরু করলেন মন্ময় বাবু :
‘সঞ্জয় বাবু, কোনো প্রশ্ন করবেন না। শুধু শুনে যান। আশা করি আপনার সব কৌতূহল মিটে যাবে। এই বালা দুটো অনেক দিন আগেকার। লক্ষণ সেনের আমলের। সেনেরা দক্ষিণ ভারতের লোক, জানেন তো? এঁরা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। সেনেরা বাংলাদেশে আসার আগে এই দেশ শাসন করত পালরা। তখন এখানকার বেশির ভাগ লোকই ছিল বৌদ্ধ। হিন্দুদের ভেতরও জাতপাত তেমন ছিল না বললেই চলে। থাকলেও তেমনভাবে কেউ মানত না। সেনেরা এসে সবকিছু পাল্টে দিল। বিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো বৌদ্ধ নিপীড়ন। পরে বখতিয়ার খলজির আমলে এই বৌদ্ধরাই দলে দলে মুসলমান হয়। এই জন্যই হিন্দুরা বাঙালি মুসলমানদের বলে নেড়ের জাত। বৌদ্ধরা মাথাটাতা কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে থাকত বলেই এই বিশেষণ। সেনেরা বাঙালিদের বিদেশে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়। ব্রাহ্মণরা ঘোষণা করে, কোনো বাঙালি বিদেশে গেলে জাতিচ্যুত হবে। বাঙালি জাতি কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ঘরে বসে থাকল। দিন-দুনিয়ার খবর আর রইল না কিছু তার কাছে।

‘লক্ষ্ণণ সেনের ঝোঁক ছিল তান্ত্রিকতার দিকে। লক্ষ্ণী নারায়ণ নামের এক কাপালিক ছিল তার গুরু। এই বালা দুটোর মুখগুলো দেখেন। দুটো ছাগির মুখ। অথচ সাধারণ বালাতে ব্যবহার হয় হাতি অথবা মাছের মুখ। মুখগুলোতে প্যাঁচ লাগানো। দু’আঙুলে ধরে ঘোরালেই খোলে। আমি খুলেছি ওগুলো। ভেতরে সাদা সিল্কের ওপর ব্রাহ্মী লিপিতে হাকিনী বশীকরণ মন্ত্র লেখা। তন্ত্রসাধনায় বসলে সাধকের আসনের চারপাশে সে নকশা আঁকতে হবে, সেটাও দেওয়া আছে এখানে। এগুলোকে ইংরেজিতে বলে অ্যামুলেট। নকশার ভেতরের ঘরগুলোর একটাতে লেখা ‘নাদেস সুরাদেস ম্যানিনার’। প্রাচীন ব্যাবলনীয় ভাষা। এ মন্ত্র ভারতীয় নয়। এটা ব্যাবলনীয়। প্রথম খিষ্টধর্ম, এরপর ইসলামের যখন প্রসার হলো, সেই সময় অনেক প্রেতসাধক ইরাক এবং সিরিয়া থেকে ভারতে চলে আসে। তন্ত্রমন্ত্র এখানে সারা জীবনই আছে। নরবলি, শবসাধনা এসব কাজে কোনো বাধানিষেধ নেই। লাকুম দ্বীনুকুম। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। ব্যাবিলনে তান্ত্রিকেরা বেড়ে উঠেছিল রাজানুকূল্য পেয়ে। ভারতেও সেটা পেতে তাদের খুব বেশি অসুবিধা হয়নি।

‘বখতিয়ার খলজি বাংলা দখল করে নিলে লক্ষ্ণণ সেন পালিয়ে গেল পূর্ব বাংলার রাজধানী বিক্রমপুরে। সাথে লক্ষ্ণী নারায়ণ। মনে প্রতিহিংসার আগুন। হারানো রাজ্য কীভাবে ফিরে পাবে রাত-দিন সেই ভাবনা। দৌর্দণ্ডপ্রতাপ বখতিয়ার আর তার মুসলমান সৈন্যরা এক মূর্তিমান বিভীষিকা। চিন্তা বাড়ে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে হতাশা। বাঙালি সেনদের দুঃশাসনে নিষ্পেষিত। গণ সমর্থন দুরাশা। লোকবল, অর্থবল, মনোবল কোনোটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রান্তিকালে এগিয়ে এল কাপালিক লক্ষ্ণী নারায়ণ। বখতিয়ার বিনাশ হবে হাকিনীর হাতে। জ্বরাসূরের বিকট মূর্তির সামনে জোড়া মোষ বলি হলো। লক্ষ্ণী নারায়ণের ইচ্ছে ছিল কুমারী উৎসর্গ করার। লক্ষ্ণণ রাজি হননি। দেশের অবস্থা ভালো না। কুমারী, অকুমারী, বিবাহিতা সবারই বাবা-মা থাকে। এ নিয়ে ভেজাল হলে বিক্রমপুর ছেড়ে মিয়ানমারে গিয়ে উঠতে হবে। পুবে এখন শুধু ওই রাজ্যই নিরাপদ। বখতিয়ারের এখতিয়ার মগের মুল্লুকে নেই। আয়োজন সম্পন্ন হলো বটে, তবে সমস্যা একটা রয়েই গেল। শবসাধনা করে হাকিনী ডেকে এনে বখতিয়ার বধ করতে হলে বখতিয়ারের কাছাকাছি থাকতে হবে। হাকিনীর কাছে রামও যা, রাবণও তা-ই। সে থাকে চির অন্ধকারের রাজ্যে। বখতিয়ারকে হাকিনী চেনে না। তাকে চিনিয়ে দিতে হবে। লক্ষ্ণণ সেন পালিয়ে আসার সময় বখতিয়ার ছিল নদিয়ায়। এখন কোথায় আছে কে জানে? মুসলমান যোদ্ধারা নাকি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামেই না। খাওয়া, ঘুম, নামাজ, যা-কিছু সব ওখানেই। বখতিয়ার ঘোড়ার পিঠেই থাকে দিনের অর্ধেক সময়। ভেবেচিন্তে এক বুদ্ধি বের করল লক্ষ্ণী নারায়ণ। তার দুজন সাগরেদকে পাঠাল এই কাজে। শুরু হলো ‘মিশন বখতিয়ার’।

‘বাসমতি চাল পুড়িয়ে বানানো কয়লার সাথে ঘোড়ার রক্ত আর গর্ভবতী নারীর প্রস্রাব মিশিয়ে তৈরি কালিতে সাদা সিল্কের ওপর হাকিনী জাগানো মন্ত্র লিখে কাপড়টা দুটুকরো করে লক্ষ্ণী। এই দুটো বালার ভেতর টুকরো দুটো ভরে সাগরেদ দুজনের হাতে একটা করে পরিয়ে দেয়। দুই সাগরেদ শুম্ভ ও নিশুম্ভ নদিয়ায় এসে জানতে পারে বখতিয়ার রংপুর অভিযানে। ওখান থেকে পায়ে হেঁটে রংপুর রওনা হলো তারা। দুদিন পর পদ্মা পার হয়ে বরেন্দ্র বা রাজশাহী পৌঁছাল। তখন চৈত্র মাস। রাজশাহীতে কলেরা-বসন্তে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হচ্ছে। কলেরার মহামারি চলছে, এমন এক গ্রামে সন্ধের মুখোমুখি ঢুকল দুজনে। দেখতে পেল তিন রাস্তার মাথায় ফাঁকা উঁচু ঢিবির মতো হাট বসার জায়গা। এর পাশেই প্রকাণ্ড বটগাছতলায় ধূপধুনো জ্বালিয়ে ওলাওঠা দেবীর পুজো হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই কাঁচা বাঁশের খাটিয়ায় বলহরি হরিবল করতে করতে শশ্মানে যাচ্ছে লাশ। শুম্ভ ও নিশুম্ভ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। মহামারি লেগেছে এমন গ্রামে জল পর্যন্ত খাওয়া নিষেধ। অথচ সাগরেদদের অবস্থা এত খারাপ যে কিছু না খেলে কলেরা-বসন্তে না-ও যদি মরে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অবশ্যই মারা যাবে। হাটের কাছে এক ময়রার দোকান দেখতে পায় তারা। সেখানে দই, চিড়ে, খাগড়াই খেয়ে প্রাণ বাঁচাল। শুয়ে পড়ল বটতলায়। শেষরাতে নিশুম্ভের পেট নেমে গেল। এশিয়াটিক কলেরা বড় মারাত্মক ছিল। কাউকে ধরলে চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরে যমালয়ে পাঠিয়ে দিত। পরদিন বিকেলে নিশুম্ভ ওলাওঠা দেবীর পায়ের কাছে মরে পড়ে থাকল।

‘বালাটা আস্তে করে তার হাত থেকে খুলে নিয়ে বিদেয় হলো শুম্ভ। রংপুরের রাস্তা ধরল। অন্তত তার কাছে তাই-ই মনে হলো। অন্ধকারে সারা রাত হেঁটে সকালে যেখানে পৌঁছাল, সে জায়গার চেয়ে কলেরা গ্রাম অনেক ভালো ছিল। ছোট এ গ্রামটির প্রায় সবাই ফাঁসুড়ে ডাকাত। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। দারা-পরিবার নিয়ে দিব্যি ঘর-সংসার করছে সবাই। সম্পন্ন গৃহস্থ। কিন্তু ভেতরে ভিন্ন চিত্র। নিরীহ, শ্রান্ত পথিকদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাড়িতে এনে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদেরকে মেরে ফেলাই এদের কাজ। এমনই এক ডাকাত ফ্যামিলির পাল্লায় পড়ে সে। দুদিন পর ডাকাতদের হাতে প্রাণ হারাল শুম্ভ। তবে মারা যাওয়ার আগে সব ঘটনা লিখে রেখে যায় সে। এ কাজে মন্ত্র লেখা সিল্কের কাগজটিই ব্যবহার করে। আমি ধারণা করছি, বালা দুটো ডাকাত তার স্ত্রী অথবা মেয়েকে দিয়েছিল। বাঙালি মায়েরা তাদের গয়না দিয়ে যান মেয়েকে বা ছেলের বৌকে। বংশপরম্পরায় একই গয়না হাতবদল হয়। পুরোনো গয়না ভেঙে নতুন গয়না বানানোর চল এখন যেমন আছে আগে তেমন ছিল না। ওতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি পড়ত।

‘সুলতানী আমলে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলে আট রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হয়েছিল। ব্যাপক ভূমিধসে তলিয়ে যায় অসংখ্য গ্রাম, গঞ্জ, নগরী। গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ লোক। এদের অনেকেই তখন দক্ষিণাঞ্চলে মাইগ্রেট করে। সম্ভবত সেই সময়ই এগুলোর তৎকালীন মালিক এই এলাকায় চলে আসে। পরে এখানে বর্গিদের উৎপাত শুরু হলে বালাগুলো খুল্লনা দেবীর মন্দিরে রেখে দেয় সে বা তার উত্তর পুরু ষ। পরে আর ফিরিয়ে নিতে পারেনি।

‘ব্রিটিশ আমলে খুলনায় ম্যাকপিস থ্যাকারে নামের এক ইংরেজ সাহেবের দোকান ছিল। স্যাবর অ্যান্ড ড্র্যাগুন নামের এই দোকানটির ব্রাঞ্চ ছিল কলকাতাতেও। মূল দোকান লন্ডনে। এই দোকানে ভালো ভালো সব অ্যান্টিক বিক্রি হতো। এই থ্যাকারে সাহেবকেই লোকেরা ডাকত ঠাকরে সাহেব বলে। থ্যাকারে জানতে পারে, খুল্লনা দেবীর মন্দির অনেক পুরোনো। প্রচুর অ্যান্টিক লুকানো আছে ওখানে। বুড়ির বাবার সাথে খাতির জমিয়ে অনেক জিনিস হাতিয়ে নেয় সে। অ্যান্টিক কেনার মতো লোক খুলনায় কেউই ছিল না। থ্যাকারের দোকানটি ছিল আসলে অ্যান্টিক কালেকশনের একটি আউটপোস্ট মাত্র। দালালেরা সরাসরি দোকানে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে কালেক্ট করা আর্টিফ্যাক্ট সাহেবের কাছে বিক্রি করত। যাহোক, বালাগুলো সাহেবের হাতে পড়লে সে বুঝে ফেলে, ওগুলোর মুখ খোলা যায়। মুখ খুলে একটি বালার ভেতর পায় মন্ত্রতন্ত্র লেখা সিল্ক, অন্যটিতে শুম্ভের লেখা কাহিনি। ধারণা করছি, কাদম্বিনী দেবীর বাবাকে ওগুলো দেখায় সে। জানতে চায়, কী লেখা আছে?

‘নানাভাই ধূনজীর ছিল ফিটন গাড়ি, পালকি, তাঞ্জাম এসব তৈরির কারখানা। কোম্পানি আমল থেকেই লাট সাহেবেরা পালকির ভক্ত হয়ে পড়ে। এত বেশি ভক্ত হয় যে অর্ডিন্যান্স জারি করে আমলারা ছাড়া ওগুলোতে কেউ চড়তে পারবে না। তবে ওই আইন কেউ মানেনি। আমলা-কামলা যে যেমন পারে, দেদারসে পালকি ব্যবহার করত। এখন যেমন ট্যাঙ্ িকোম্পানি আছে কলকাতায়, তেমন পালকি কোম্পানি ছিল। অসংখ্য বেহারা বেতন দিয়ে পুষত তারা। সবচেয়ে বড় পালকি কোম্পানির মালিকও ছিল আবার ধূনজীই। পাকা রাস্ত্মাঘাট তৈরি হওয়ার পর ল্যান্ডো এবং ফিটন গাড়ির চাহিদা হয় ব্যাপক। ইংরেজ সাহেব, উঠতি জমিদার, স্থানীয় মহারাজারা ছিল ওগুলোর খদ্দের। থ্যাকারে ছিল নানাভাই ধূনজীর কমিশন এজেন্ট। ধূনজীর সাহায্যে অনেক অ্যান্টিকও কালেক্ট করত সে। দুজনে হয়ে ওঠে মানিকজোড়।

‘অ্যান্টিক ডিলার হওয়ায় রহস্যময় সব ব্যাপারে থ্যাকারের আগ্রহ ছিল অসীম। সিল্কের টুকরো দুটো পাওয়ার পর তন্ত্রমন্ত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠে থ্যাকারে। কান টানলে মাথা আসে। ধূনজীও যোগ দিল এসে। ওদিকে মন্দির থেকে বহু জিনিস লোপাট করায় কাদম্বিনী দেবীর বাবার ওপর প্রধান সেবায়েতের সন্দেহ হয়। ওখান থেকে সরে পড়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে সে। ধূনজী নবাবি আমলের বড় একটি বাড়ি খুলনায় আগেই কিনেছিল। এ অঞ্চলে ভালো কাঠ সস্তা ছিল। তার কলকাতার কারখানার কাঁচামাল এই বাড়ি থেকে নদীপথে চালান হতো। ধূনজীকে বলে বাড়িটা কাদম্বিনী দেবীর বাবাকে পাইয়ে দেয় থ্যাকারে। উদ্দেশ্য, তাকে কাছাকাছি রাখা। আমার ধারণা, হাকিনী বশীকরণ ছাড়াও আর যেসব তন্ত্র বা পিশাচ-সাধনা আছে সেগুলোও তারা করেছে। টাকা আর ক্ষমতা লাভই ছিল তাদের সাধনার মূল লক্ষ্য।’
অনেকক্ষণ কথা বলে থামলেন মন্ময়।

‘কাদম্বিনী দেবীর কাছে এত দিন ওগুলো ছিল, অথচ একদিনও উনি খুলে দেখলেন না? আপনিই বা বুঝলেন কী করে যে ওগুলো খোলা যায়?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘বিখ্যাত স্বর্ণকারের নিখুঁত কাজ। আগে থেকে জানা না থাকলে বোঝার উপায় নেই। এ পর্যন্ত কলকাতা থেকে গয়নার যত ক্যাটালগ বেরিয়েছে, তার সবই আছে আমার কালেকশনে। মজার ব্যাপার কী জানেন, এর ভেতরে থ্যাকারে সাহেবের নিজের ছাপানো একটা ক্যাটালগও আছে। হাতে পাওয়ার পর ক্যাটালগ বের করে মিলিয়ে দেখেছি ছবির সাথে আসল বালা দুটো। সব আইটেমের বিস্তারিত বিবরণ আছে বইটিতে। ইতিহাস, শৈলী, মূল্য, প্রাপ্তিস্থান এইসব আর কি। ওগুলো যে সেন আমলের ডিজাইন, সেটা থ্যাকারের বর্ণনা থেকেই পাওয়া। তবে এর পেছনের যে কাহিনি সেটা এর ভেতরের চিরকুট থেকে জেনেছি। বাকিটা নিজের হাইপোথেসিস। তবে সে সময়ের লেখা খুলনা গেজেটিয়ার এবং খুলনা মিউনিসিপ্যালিটির ফাইলপত্র ঘেঁটেও অনেক তথ্য পেয়েছি।’

আমার মনে হলো, মন্ময় চৌধুরী সবটুকু আমাকে এখনো বলেননি। জিজ্ঞেস করলাম,
‘আপনার আগ্রহ কী শুধু ওগুলোর ইতিহাস জানার ব্যাপারেই সীমিত?’
মন্ময় চৌধুরী আমার দিকে ঘুমঘুম চোখ তুলে তাকালেন। বললেন,
‘না, হাকিনীর ব্যাপারটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত হলো, হাকিনী জাগানোর যে সাধনা সেটার বৈশিষ্ট্য। এই হাকিনীরা খুব নীচু স্তরের পিশাচ। এদের বুদ্ধিবৃত্তি পশুশ্রেণীর। তবে ক্ষমতা প্রচণ্ড। এদেরকে ডেথ অ্যাঞ্জেল বলতে পারেন। ডেকে এনে যার মৃত্যু চান, তাকে চিনিয়ে দেবেন। সেটারও প্রক্রিয়া আছে। তবে সমস্যা হলো, এরা প্রাণ না নিয়ে ফিরবে না। যার জন্য ডাকা, তাকে মারতে না পারলে যে ডেকেছে, তাকেই মেরে ফেলবে। হাকিনী জাগাতে হলে অশুচি যজ্ঞ করতে হয়। এই অশুচি যজ্ঞ হলো মৃতা কোনো যুবতীর সাথে যৌন সঙ্গম। যাকে পশ্চিমারা বলে নেক্রোফিলিয়া। নেক্রোফিলিয়া বহু প্রাচীন প্রথা। বার্মা এবং দক্ষিণ ভারতে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। ছিল পুরাকালে মিসরে ও ব্যাবিলনে। বার্মা এবং দক্ষিণ ভারতে কোনো অবিবাহিত তরু ণী মারা গেলে একজন পুরু ষকে সেই শবের সাথে বিয়ে দেওয়া হতো। পুরু ষটি তখন স্বামী হিসেবে যুবতীর লাশের সাথে সঙ্গম করত। মিসর মমির কারিগরদের ভেতর এই নেশা ছিল প্রবল। এ জন্য যুবতী মেয়েদের লাশ তাদের বাবা বা স্বামীরা দু-তিন দিন বাইরে ফেলে রেখে পচিয়ে এনে তারপর মমির কারিগরদের হাতে তুলে দিত। ইউরোপেও নেক্রোফিলিয়ার চর্চা ছিল। এ নিয়ে বহু গল্প-কাহিনি প্রচলিত আছে।’
‘আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে? দেখতেই পাচ্ছি, এর পেছনে সময়, শ্রম দুটোই ব্যয় করেছেন প্রচুর। কিন্তু এত সব করে লাভ কী?’
‘এই এক নেশা রে, ভাই। আমার এক কাকা ছিলেন তান্ত্রিক। ছেলেবেলায় তার পিছে পিছে ঘুরতাম। রাজ্যের যত অদ্ভুত জিনিসপত্রে কাকার ঘর ভর্তি ছিল। আমার যখন দশ বছর বয়স, তখন তিনি বিহারে যান। সেখানে এক দুর্গম এলাকায় মস্ত গুণীনের খোঁজ পান তিনি। এরপর নিজেই নিখোঁজ হন। আমার বয়স বাড়তে লাগল, সেই সাথে পৌনঃপুনিকভাবে বাড়তে লাগল নেশাও। সোনার কারবার আমাদের তিন পুরু ষের। প্রচুর বিষয়-সম্পদ। ব্যবসা চলছে কঠিন এক সিস্টেমের ভেতরে। কিছু না দেখলেও ওটা ঠিকই চলবে। আমি সময় কাটাই ভারতের উপজাতীয় গোত্রগুলোর উপাস্য দেবদেবী, তন্ত্রমন্ত্র বিষয়ে পড়াশুনো করে। প্রকৃত তান্ত্রিক আজকাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঠিকমতো উপচার সাজিয়ে নৈবেদ্য দিলে এগুলো আসলেই কাজ করে কি না জানা যেত।’
‘আপনার তো এ ব্যাপারে প্রচুর পড়াশোনা। এইসব মাম্বোজাম্বো আসলেই বিশ্বাস করেন?’
‘দেখেন থিওরি এক জিনিস, প্র্যাকটিকাল আর এক। সব নিয়ম মেনে ট্রাই করলেই কেবল এর প্রায়োগিক ব্যাপারটি জানা যাবে।’
‘হাকিনী জাগানো মন্ত্র, প্রক্রিয়া সব তো হাতের কাছেই আছে। এই বিষয়টি দিয়েই সেই পরীক্ষা হতে পারে।’
‘সঞ্জয় বাবু, হাকিনী এক সর্বনাশা জিনিস। যদি সত্যিই তাকে জাগানো যায়, তাহলে সে তো প্রাণ না নিয়ে ফিরবে না। এ হচ্ছে আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে খায় হায়েনা। পিশাচ সাধনা আর ঝুঁকি হলো পি’জ অ্যান্ড ক্যারট। হাকিনী সাধনায় যেসব উপচার লাগে তা জোগাড় করা যাবে। তিথি-নক্ষত্র দেখে যজ্ঞের কাল নির্ণয় করাও কঠিন না। কঠিন হলো শব সাধনার জন্য যুবতী নারীর টাটকা লাশ জোগাড় করা। তারচেয়ে কঠিন ওই লাশের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া। ব্যাপারটি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি আমি। বের করার চেষ্টা করেছি এর বিকল্প। শয়তান হলো চূড়ান্ত অপবিত্র সত্তা। জুডিও-ক্রিশ্চান-ইসলা­মিক ট্রেডিশনে বলা হয়েছে, আজাজিল আদম হাওয়ার পতন ঘটিয়েছিল তাদের যৌনতাকে পুঁজি করে। ইহুদি-খ্রিষ্টান দু’ধর্মেই যৌনমিলন একটি অপবিত্র বিষয়। ক্যাথলিক পাদ্রিদের জন্য এই কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধর্মগুলোতে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ যৌনমিলন দেহ ও মনকে পুরোপুরি কলুষিত করে। একটা উদাহরণ দেই। ইসলাম বলে, হজরত ইব্রাহিম তিনটি প্রধান একশ্বরবাদী ধর্মেরই আদি পিতা। ব্যাবিলনের বাদশা নমরু দ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল। বিশাল আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে তাঁকে তুলে তার ভেতর ফেলতে গেল নমরু দের লোকেরা। দেখা গেল, পয়গম্বর এত ভারী যে তাঁকে মাটি থেকে তোলাই সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপার কী জানার জন্য নমরু দ তার পুরোহিত-গণকদের ডেকে পাঠাল। এরা যা বলল, তা এই রকম। খোদার ফেরেশতারা ইব্রাহিমকে ধরে আছে। একশো হাতি লাগিয়ে টানলেও তাঁকে মাটি থেকে ওঠানো যাবে না। উপায় কী? ফেরেশতাদের তাড়াতে হবে। গণকেরা নমরু দকে বুদ্ধি দিল জায়গাটিকে অপবিত্র করার। নমরু দ তখন উপস্থিত জনতাকে প্রকাশ্যে অবাধ যৌনমিলনের নির্দেশ দিল। ঘটনাস্থল অপবিত্র হলো। পালাল ফেরেশতার দল। ইব্রাহিমকে নিক্ষেপ করা হলো আগুনে। যেসব মেয়েরা ওই কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, তারা নমরু দের কাছে পুরস্কার দাবি করে। সঙ্গমবাজ রতিক্লান্ত রমণীদের সহজে চেনার জন্য তাদের কপালে টিপ দেওয়া হয়। এ জন্য মুসলমান মেয়েদের কপালে টিপ দেওয়ার ব্যাপারে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা আজও আছে।’
‘মন্ময় বাবু, আপনার পরিকল্পনাটা আসলে কী?’
‘বলছি রে ভাই, একটু ধের্য ধরেন। মন্ত্র-তন্ত্র, পিশাচ সাধনা-এসব বিষয়ে সঠিক সূত্র খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। শব সাধনার কথাই ধরি। প্রায় সব বর্ণনায় আছে, ডোম চাঁড়ালের কুমারী মেয়ে যার অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে, সেই রকম একটি উলঙ্গ লাশের ওপর অমাবস্যার রাতে বসে সাধনা করতে হবে। লাশের বয়স তিন দিনের বেশি হওয়া চলবে না। ভেবে দেখেন, ডোম-চাঁড়ালের মেয়েদের প্রায় সবারই বিয়ে হয় যখন তারা কিশোরী। তার ওপর তাকে মরতে হবে অপঘাতে। সবচেয়ে কঠিন শর্ত হলো, এই মৃত্যুটাও হতে হবে অমাবস্যা রাতের কাছাকাছি সময়ে। সাত দিন আগে-পিছেও যদি হয় তাহলেও সমস্যা। লাশে পচন ধরবে। ফরমালিন, বরফ, হিমঘর-এইসব সামগ্রী কাপালিক, তান্ত্রিকদের কল্পনাতেও ছিল না। তবে এ ক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস, ঠিকমতো সবকিছু করলে ফল ফলবে। এটা প্রামাণ্য দলিল। অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারছি। তবে প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। হাকিনী ডেকে এনে তাকে দিয়ে করবটা কী? আমি অজাতশত্রু। তবে আপনার কথা আলাদা। মোটা মোসলেমের ওপর আপনি যদি প্রতিশোধ নিতে চান তাহলে . . . ।’
‘লাশের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিকল্পটির কথা কিন্তু এখনো বলেননি।’
‘বলেছি। আপনি খেয়াল করেননি। আমাদের হয় কোনো জায়গা অশুচি করতে হবে, অথবা এমন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে শুচি বলে কিছু নেই। অশুচি অনেকভাবেই হতে পারে। তবে এরমধ্যে যৌন ব্যাপার মুখ্য হতে হবে।’
“পতিতালয় ছাড়া এমন জায়গা আর কোথায় পাওয়া যাবে?”
“ধারণা সঠিক। তবে আশপাশের এলাকায় করা যাবে না। লোকে চিনে ফেলবে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মার চরে নতুন পাড়া হয়েছে। জমজমাট ব্যবসা। পাড়ার মাঝখানে একটা কামরা ভাড়া নেওয়া যেতে পারে। সাধনার সব উপচার এখান থেকে রেডি করে নিয়ে গেলে এক রাতেই কাজ সারা সম্ভব। হাকিনী সাধনায় নক্ষত্র-তিথি কোনো বিষয়ই নয়। পূর্ণিমা ছাড়া যেকোনো রাতেই হতে পারে। তবে আষাঢ় মাসের দিকে হলে উত্তম। আপনি ভেবে দেখেন, সাধনায় বসতে চান কি না। খরচপত্র, ব্যবস্থা সব আমার দায়িত্ব।’
‘মোটা মোসলেমকে চিনিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি কীভাবে হবে?’
‘ওর একটা ফুল-সাইজ ছবি আমাকে এনে দেন। তারপর কী করতে হবে, বলে দেব।’


মোটা মোসলেমের ছবি জোগাড় হলো সহজেই। সাপ্তাহিক রূপসা সংবাদ-এর রিপোর্টার কমল কান্তি পাড়ার লোক। আমরা তাকে ডাকি ককা’দা বলে। ছবি তার বাসাতেই এক ফাইলে ছিল। এলাকারই এক ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী সভা। মোটা মোসলেম প্রধান অতিথি। বিজয়ীর হাতে কাপ তুলে দিচ্ছে। মুখে দেঁতো হাসি। বললাম, দুদিনের ভেতর ছবি ফেরত দেব।
‘ছবি নিয়ে কী করবে?’ জিজ্ঞেস করল ককা।
উত্তর আগেই রেডি করে রেখেছিলাম। বললাম,
‘দৌলতপুরে নন্দঘোষ মার্ডার কেসের কথা তো জানেন। বছর খানেক আগের ঘটনা। ভরদুপুরে মোকামে বসা অবস্থায় খুন হয় নন্দঘোষ। খুনিদের সাথে মোটা মোসলেম ছিল। নন্দঘোষের কর্মচারীদের ছবিটা দেখাতে চাই আমি। যদি আইডেন্টিফাই করতে পারে? বাবার উকিলই এ পরামর্শ দিয়েছে।’
‘চিনতে পারলেও মোসলেমের বিরু দ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষী দেবে বলে মনে হয় না। শোনো সঞ্জয়, আমি কিন্তু এসবের ভেতরে নেই। তোমাকে ছবি দিয়েছি, এটাও কাউকে বলতে পারবে না। ক্রাইম রিপোর্ট আমি করি। পত্রিকার কাটতি বাড়ে। সম্পাদক পছন্দ করেন। তবে ওগুলো ‘রিকশাঅলা কর্তৃক মেথরানী ধর্ষিত’ টাইপের হয়। বড় বড় চাঁইদের ঘাঁটাতে জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টাররাই সাহস পায় না! ককা কিছু লিখতে গেলে ফান্দে পড়িয়া বকা কান্দেরে অবস্থা হবে।’

ছবি মন্ময় চৌধুরীর হাতে পৌঁছে দিলাম। বললেন, দুদিন পর বিকেল তিনটের দিকে তার দোকানে যাওয়ার জন্য। আরও জানালেন, বাসায় যেন বলে আসি ফিরতে একদিন দেরি হবে।

১০
পরদিন ইনস্যুলিন কিনে জেলে বাবার সাথে দেখা করতে গেলাম। তার ডায়বেটিস আছে। রেগুলার ইনস্যুলিন নেন। বাবার ইনস্যুলিন শেষ। সকাল ন’টায় দরখাস্ত জমা দিয়ে জেলগেটে বাসে আছি। চারদিকে পানের পিক, চুনের দাগ, কলার খোসা, বিড়ির মাথা, প্রস্রাবের ঝাঁঝালো গন্ধ। সাব ইন্সপেক্টরকে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট, একশো টাকা দিয়েছি। দালাল নিয়েছে বিশ। বড় সাহেব এখনো আসেননি। অপেক্ষা করছি তো করছিই। এগারোটার দিকে তিনটা মোটরসাইকেলে পাঁচজন রাজনৈতিক কর্মী সঙ্গে নিয়ে মোটা মোসলেম এসে হাজির। সাব ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়িয়ে গেল। বিষয় কী? তার দুজন ‘ছেলে’ জেলহাজতে আছে। আজকেই বেইল হবে। অথচ তাদের জেল পুলিশ কোর্টে চালান করেনি। সাব ইন্সপেক্টর বলল,
‘বড় ভাই, কোনো চিন্তা করবেন না। দুজন কনস্টেবল দিয়ে এখনই রিকশা করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। বসেন, চা খান। আমি কাগজপত্র রেডি করি। চালানে জেলার সাহেবের সই লাগবে। উনি এখনো অফিসে আসেন নাই। সেটা কোনো ব্যাপার না। সেপাইয়ের হাতে দিয়ে কাগজ পাঠাচ্ছি। সই নিয়ে আসবে। বাসা কাছেই, বেশিক্ষণ লাগবে না। এই হামিদ, ভাইয়ের জন্য ডবল পাতি চা আন। দুধ-চিনি বেশি। সাথে হুগলী বেকারির কেক।’
আমাকে দালাল বলল,
‘ভাই, কালকে আসেন। আজ দেরি হবে। ওপর থেকে চাপ আছে। সাহেব ব্যস্ত।’
রাগে আমার গা কাঁপতে লাগল।

১১
পরদিন জেলে যেতে পারলাম না। মন্ময় চৌধুরীর সাথে দেখা করার কথা, গেলাম সেখানে। আমাকে বসতে বলে ড্রয়ার খুলে বেল কাঠে তৈরি ফুট খানেক লম্বা একটা মূর্তি বের করলেন বাবু। তার কারিগর বানিয়েছে। হাতে নিয়ে দেখলাম ভেতরটা ফাঁপা। কিছুক্ষণ পর জিপে করে রওনা হলাম আমরা।
‘আরও আগে বের হলে ভালো হতো না?’ গাড়ি ছাড়ার পর বললাম আমি।
‘না, হতো না। দিনের বেলা ওখানে যেতে চাই না আমি। সন্ধ্যা আটটা নাগাদ পৌঁছাব আমরা।’

ড্রাইভারকে গোয়ালন্দ বাজারে গাড়ি পার্ক করতে বললেন মন্ময়। পাশেই বড় বড় গোডাউন। চিটে গুড়ের মিষ্টি গন্ধে আকাশ-বাতাস সয়লাব। মালপত্র সমেত দুজন দুটো রিকশায় উঠলাম। দৌলতদিয়ার নিষিদ্ধ পল্লি এখান থেকে চার মাইল দূরে। মাঝবয়সী রিকশাঅলা জিজ্ঞেস করল,
‘স্যার, আপনারা কোন জাগাত যাবেন?’
‘দৌলতদিয়া,’ বললাম আমি।
‘দৌলতদিয়ার কুথায়? ফেরিঘাট, না মাগিপাড়া?’
‘পাড়ায় চলো।’
‘কুড়ি ট্যাকা ভাড়া দিবেন।’
‘কুড়ি টাকাই পাবে, চলো।’

হেরিং বোন্ড রাস্তা। ঝাঁকুনি প্রচণ্ড। রিকশার সিট ছোট। সামনের দিকে ঢালু। বসে থাকা দায়। একবার হুড ধরতে হচ্ছে, আরেকবার রিকশাঅলার সিট। চারদিক ফাঁকা। হু হু ঠান্ডা বাতাস। গুমগুম করে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি শুরু হলে ভিজে ন্যাতা হতে হবে। চর এলাকা, একটা গাছ পর্যন্ত কোথাও নেই। শুধু কাশবন। হঠাৎ পুরো ব্যাপারটিকেই মনে হলো এক অবাস্তব অলীক কল্পনা। আবার এ-ও মনে হলো, আমি এসব কেন করছি? শুধুই প্রতিশোধ, নাকি অদম্য কৌতূহল?

ঘণ্টা খানেক পর ভিজে-পুড়ে যেখানে এসে পৌঁছালাম, সে এক অন্য জগৎ। এখানে কারেন্ট নেই। দোকানে দোকানে হ্যাজাক বাতি। ঘরে ঘরে হারিকেন। অগুনতি ছোট-বড় ঘর, গলি-ঘুপচি। দোকানপাট, ঘরবাড়ি, বাঁশ চাটাই, টিন দিয়ে বানানো। দেদার বিক্রি হচ্ছে পান, সিগারেট, ফুল, বাংলা মদ। কালো কুচকুচে ইয়াবড় কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, ডালপুরি। ছোট মাইকে গান বাজছে: নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে ও ভোমরা। অনেকগুলো ঘরে শুধু একদিকেই চাটাইয়ের বেড়া। মাটির উঁচু মেঝেতে বাঁশের মাচা। সেজেগুঁজে খোলামেলা শাড়ি, সালওয়ার কামিজ পরে বসে আছে সুবর্ণ কঙ্কন পরা স্বাস্থ্যবতী রমণীরা। খিলখিল হাসি। মাঝেমাঝে গানের কলি। আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন। তবে একটি জিনিস ভালো এদের। উগ্র সাজগোঁজ, ঝ্যালঝেলে মেকাপের বালাই নেই।

বুড়ো এক লোক আমাদের ঘর দেখিয়ে দিল। সরু দরজা, দুদিকে দুটো কাঠের জানালা, মাটির মেঝে। ঘর পুরো খালি। মন্ময় চৌধুরী পাকা লোক। আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। মন্ময় বুড়োকে দুশো টাকা দিয়ে কী যেন বললেন। কিছুক্ষণ পর লোকটা আমাদের মিশকালো দুটো মোরগ আর একটি কেরোসিনের স্টোভ দিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করে হুড়কো লাগিয়ে দিলেন বাবু। ব্যাগ খুলে টুকিটাকি অনেক জিনিস বের করলেন। টকটকে লাল সিঁদুর দিয়ে উল্টো করে বড় একটা ত্রিভুজ আঁকলেন মেঝেতে। ওটার ওপর সোজা আরেকটি ত্রিভুজ। দেখতে হলো ছয় কোনা তারা। তারাটাকে ঘিরে দিলেন আতপ চালের গুঁড়োয় আঁকা প্রকাণ্ড একটি বৃত্ত দিয়ে। ত্রিভুজের ভেতর ছয়টি কোণে সাপের কাটা লেজ, পেঁচার নখ, বাদুড়ের মাথা, ঘোড়ার খুর, শিশুর পাঁজরের হাড়, বানরের থাবা রাখলেন। বৃত্তচাপ এবং তারার পয়েন্টগুলো মিলে আরও ছয়টি কোণ তৈরি করেছে। এরপর এই কোণগুলোতে হালকা লাল রঙের কালি দিয়ে অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকলেন। নতুন একটা ধুতি বের করে আমাকে বললেন পরে নিতে। দুটো ত্রিভুজের মাঝখানে যে পেন্টাগ্রাম তৈরি হয়েছে, ঠিক সেখানে মোরগ দুটো জবাই করলেন। রক্তে মাখামাখি হলো জায়গাটা। শুকনো বালুমাটি খুব দ্রুত রক্ত শুষে নিল। এরপর সেখানে বাঘছাল বিছিয়ে আমাকে বললেন খালি গায়ে পদ্মাসনে বসতে।

হালকা লাল রঙের যে কালিতে চিহ্ন এঁকেছিলেন, সেই তরলের কিছুটা কাঠের মূর্তিটার ভেতর ঢেলে এক চুমুক খেতে বললেন। খেতে খারাপ লাগল না। ঘিয়ের গন্ধ পেলাম। মূর্তিটা ফিরিয়ে নিয়ে বাংলায় লেখা একটা সংস্কৃত মন্ত্র খুব ধীরে একশো চুয়াল্লিশবার পড়তে বললেন। মাটির মালসায় মরা একটা চড়ুই পাখি রেখে ঢেকে দিলেন সরা দিয়ে। কেরোসিনের স্টোভ জ্বেলে তার ওপর মালসাটা রেখে সবটুকু সলতে উসকে দিলেন। লাল গনগনে হয়ে উঠল মালসা। ঘণ্টা খানেক পর আঁচ কমিয়ে সরা যখন তুললেন, তখন দেখলাম, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে চড়ুই। এক চিমটে ছাই তুলে, যে তরলটুকু এখনো বাকি ছিল, তার সাথে মেশালেন মন্ময়। আমাকে বললেন পুরোটা খেয়ে ফেলতে। এইবার চড়ুইয়ের বাকি ছাইটুকু বৃত্তের চারপাশে ছিটিয়ে দিলেন। অন্য একটি কাগজ বের করে দু’লাইনের আর একটি মন্ত্র আমার হাতে দিয়ে বললেন আবারও একশো চুয়াল্লিশবার পড়তে।

মন্ত্র পড়তে শুরু করার পরই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে লাগল। মনে হলো, ঘরের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে গেছে। দেখলাম, মরু এলাকায় বিশাল এক পাথুরে মন্দিরে বসে আছি। পর মুহূর্তে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। দেখতে পেলাম, আদ্যি কালের এক বনের কিনারায় থান পরা শত শত টাকমাথা লোক শয়তানের বিকট এক মূর্তিকে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করছে। মূর্তির পায়ের কাছে পাথরের বেদিতে সাতটি তরু ণীর কাটা মাথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বেদি, শয়তানের পা। হঠাৎ অনুভব করলাম, এক অপার্থিব কুৎসিত ঠান্ডা হাত দিয়ে কে যেন আমার হৃৎপিণ্ড চেপে ধরেছে। প্রচণ্ড ব্যথায় জ্ঞান হারালাম আমি।

হুঁশ ফিরে পেয়ে দেখি, সেই বুড়ো লোকটা আমার মাথায় জল ঢালছে। চৌধুরী তার সব জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। মেঝের ওপরকার নকশা উধাও। খুব ভোরে যখন বের হলাম, পাড়াটাকে মনে হলো ভূতের শহর। কোথায় হারিয়ে গেছে রাতের সেই মৌতাত। দুটো রিকশা নিয়ে গোয়ালন্দ বাজারে ফিরলাম আমার। ড্রাইভার রওনা হলো সাথে সাথে। পথে রাজবাড়ী বাজারে নেমে মুরগির ঝোল, নানরু টি দিয়ে নাশতা সেরে আবারও গাড়িতে।
বাসার সামনে আমাকে নামিয়ে দিলেন মন্ময়। হাতে খবরের কাগজে পেঁচানো একটা প্যাকেট আর একটি চিঠি দিলেন। বললেন,
‘প্যাকেট সাবধানে রাখবেন। চিঠিটা ভালো করে পড়বেন।’ ড্রাইভারকে বললেন,
‘বাসায় চলো, জলদি।’

১২
বাসায় ফিরে জানলাম, মা বড় মামার ওখানে। গত রাতে তার স্ট্রোক করেছে। গোসল সেরে খেয়েদেয়ে বিছানায় শুয়ে চিঠি খুললাম। সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা চিঠি। খুব সম্ভব চৌধুরী আগেই লিখে রেখেছিলেন। দিন, তারিখ কিছু উল্লেখ নেই :

সঞ্জয় বাবু,
আপনার সাথে আমার হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। তার প্রয়োজনও নেই। সাধনা কতটুকু সফল হয়েছে তা বোঝা যাবে তিন দিনের মধ্যেই। কাগজের প্যাকেটে কাঠের মূর্তিটা আছে। এটা একটা টাইম বম্ব। মূর্তিটার কাজ কার প্রাণনাশ করতে হবে, হাকিনীকে সেই ব্যক্তি চিনিয়ে দেওয়া। সেই অর্থে এটাকে হোমিং ডিভাইসও বলতে পারেন। টাইম বম্ব এই অর্থে যে সময় মাত্র তিন দিন। আজ রাতেই মূর্তিটা, যার ছবি থেকে ওটা বানানো, তার বাসার সীমানার ভেতর পুঁতে রেখে আসবেন। মূর্তিটা ভারী মনে হবে। এর কারণ, ওটার পেটের ভেতর আপনি যেখানে বসে যজ্ঞ করেছেন, সেখানকার মাটি ভরে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন করতে পারেন, যে তরল আপনাকে খেতে দিয়েছিলাম, সেটা আসলে কী ছিল? অনেক পুরোনো রেড ওয়াইন এর সাথে একজন বারবনিতার ঋতুস্রাব এবং কালীমন্দিরে যে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলে, সেই পিদিমের ঘি মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওটা। এসব কথা আপনাকে বলছি এই কারণে যে আপনি যেন না ভাবেন, আপনাকে বিষাক্ত কোনো কিছু খাইয়ে অসুস্থ করে ফেলেছি। ঋতুস্রাব খেলে মানুষ অসুস্থ হয় না। প্রাক ইসলামি যুগে মক্কার লোকেরা ঋতুস্রাব খেত। তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।

আবারও বলছি, যত তাড়াতাড়ি পারেন মূর্তি দাফনের ব্যবস্থা নিন। শুভ কামনা রইল।

লেখকের নাম-ঠিকানা নেই। মোটা মোসলেমের নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই কোথাও। চিঠি অন্যের হাতে যদি পড়েও, মন্ময় চৌধুরীকে জড়ানো যাবে না কিছুতেই। সত্যি কথা বলতে কী, লোকটা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানিনা। এ হচ্ছে পিরামিড। সামনেই আছে অথচ চির রহস্যময়। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। তলিয়ে গেলাম ঘুমের গভীরে। স্বপ্নে দেখলাম, বুড়ির বাড়ির সামনে আমি দাঁড়িয়ে। তার সেই বীভৎস বসার ঘরের সরু দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল মন্ময় চৌধুরীর সাথে মোটা মোসলেম। আমাকে দেখতে পেয়ে মুখ হা করল। তাদের খোলা মুখ থেকে অসংখ্য ছোট ছোট তির আমার গায়ে এসে বিঁধতে লাগল। আমি দাঁড়িয়েই আছি। কোত্থেকে বুড়ির নাতজামাই ছুটে এল। ধাক্কা মেরে রাস্ত্মার এক পাশে সরিয়ে দিল আমাকে। জেগে উঠে দেখি, বাসার কাজের ছেলে নিমাই আমাকে ঝাঁকাচ্ছে। ঘুম ভেঙেছে দেখে বলল,
‘ও সঞ্জুদা, আপনারে তো মশা খায়ে ফেলালো। সেই ককুন সাঁজ হয়েচে। একুনও ঘোম পাড়তিচেন। ওটেন। আপনের বড় মামা মইরে গেচে। তেনার বাড়িত যাতি হবে। খপর পাটায়েচে।’

মাথায় আকাশ, সৌরজগৎ, ছায়াপথ সব ভেঙে পড়ল। আমরা জাতে হিন্দু। বড় মামার সৎকার করতেই হবে। যত রাতই হোক, শ্মশানে লাশ দাহ করা চাই। মূর্তি কখন দাফন করব, বুঝতে পারছি না। হায়রে সময়! সময় গেলে সাধন হবে না। ছুটলাম বড় মামার বাড়ি। মূর্তি পড়ে থাকল বেড-সাইড টেবিলের ড্রয়ারে। শ্মশান-মশান ঘুরে বাড়ি এসে লোহা-লবণ ছুঁয়ে পাকসাফ হয়ে যখন ঘরে উঠলাম, তখন সকাল আটটা। আবারও সেই রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা।

সারা দিন ঘুমালাম। বিকেলের দিকে হেঁটে হেঁটে মোটা মোসলেমের বাড়ির দিকে গেলাম। আহসান আহমেদ রোডে এক হিন্দু জমিদারের মেয়ের বাড়ি দখল করে বাস করছে মোসলেম। বাড়ির সামনে নিচু প্রাচীরঘেরা একটা ছোট বাগান। এককালে সুন্দর ছিল। এখন সেখানে চার-পাঁচটা কলাগাছ ডানে-বাঁয়ে হেলে আছে। বাড়ির রং ক্যাটকেটে হলুদ, জানালা-দরজা রয়েল ব্লু। মূর্তি দাফনের জন্য বাগানটাকেই বেছে নিলাম। রাত বারোটা নাগাদ দেয়াল টপকে ঢুকলাম ওখানে। ফুট খানেক গভীর গর্ত করতে হবে। কোদাল আনা সম্ভব হয়নি। ছোট একটা খুরপি এনেছি। বাগানে ঢুকে রাস্তার কাছাকাছি এক কোনায় গর্ত খুঁড়লাম। কাগজের মোড়ক সরিয়ে বের করলাম মূর্তিটা। হাতে নিয়ে মনে হলো, ভীষণ ঠান্ডা এবং অনবরত ঘামছে ওটা। মূর্তিটা মাটি চাপা দিয়ে উঠতে যাব, এমন সময় দুটো মোটরসাইকেল আসার শব্দ পেলাম। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হর্ন বাজাতে লাগল চালকেরা। জাগ দলের কর্মী মোটা মোসলেমের সাথে কথা বলতে চায়। দেখে ফেললে সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়বে। পাঁচিল ঘেঁষে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। ইচ্ছে হলো মাটিতে মিশে যাই। ভেবেছিলাম, লোকগুলো বাড়ির ভেতরে ঢুকবে। ঘটল এর উল্টোটা। বাসা থেকে বেরিয়ে এসে গেটের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগল মোসলেম। কথা আর শেষ হয় না। পাঁচিলের ওপাশে পৌর করপোরেশনের ড্রেন। মশাদের মহাদেশ। শরীরের ওপর চাদর বিছিয়ে দিল তারা। মনে হলো, অনন্ত কাল শুয়ে আছি। অসহ্য হয়ে উঠল মশা আর অদৃশ্য পোকার কামড়। সবকিছুরই শেষ আছে। কর্মীরা বিদায় হলো, মোটা ঘরে ফিরল। পাঁচিল টপকে আমি ফিরলাম বাসায়।

পরদিন বিকেলে চা নাশতা খেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড় ঘুরে হাঁটতে লাগলাম আহসান আহমেদ রোড ধরে। মনে প্রশান্তি। মিশন অ্যাকমপ্লিশড। দেখিব, খেলাতে কে হারে কে জেতে! মোসলেমের বাড়ির সামনে এসে খেলাম জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা। ধুন্ধুমার কাণ্ড। বাগান, কলাগাছ, পাঁচিল সব উধাও। পুরো জায়গাজুড়ে ফাউন্ডেশনের গর্ত। ওখানে নিচে মার্কেট, ওপরে জাগ দলের অফিস হবে। দুটো বাঁশের খুঁটিতে সাইনবোর্ড টাঙানো: দোকান-কোঠা বরাদ্দ চলছে। তিনটে বেডফোর্ড ট্রাক দাঁড়ানো। সারা দিন মাটি টেনেছে ওগুলো। এই বিরাট শহরে কোথায় মাটি ডাম্প করেছে কে বলতে পারে?

সন্ধে থেকে একটানা ডায়েরি লিখছি। মা মরা বাড়িতে। ন’টার দিকে নিমাই এসে খবর দিয়েছে খাবার রেডি। বলেছি রাতে খাব না। এক মহাজাগতিক হতাশায় ডুবে আছি। অপেক্ষা করছি চূড়ান্ত পরিণতির। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। জানালার শিক গলে ঘরে ঢুকল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। পর্দা ফুলে ঢোল। বাড়ির সামনে দেখতে পেলাম জমাট বাঁধা একতাল ঘন অন্ধকারকে। মনে হলো, আষাঢ়ি অমাবস্যার রাতে ডবল সাইজ গরিলা দাঁড়িয়ে। খুব ধীরে জানালার দিকে এগোতে শুরু করল ছায়াছায়া কিংকং। হাকিনী তার শিকার চিনে ফেলেছে . . . ।(শেষ)

লেখক – মুহাম্মদ আলমগীর তৈমূর
বিভাগীয় প্রধান
ইংরেজী বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
https://­­m.facebook.com/­­muhammad.toimoor?ref­i­d=52

৭ thoughts on “পিশাচ উপন্যাসিকা হাকিনী (সম্পূর্ণ)

  1. উপন্যাসটা অফিসে কাজের ফাকে
    উপন্যাসটা অফিসে কাজের ফাকে ফাঁকে চরম উত্তেজনা নিয়ে পরেছি। এবং খুবই ভালো লেগেছে। বাসায় নেটের লাইন নেই। তারপরও কেবল এই লেখাটাতে ভালো লাগা জানাব বলে নেটে বসলাম। লেখককে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *