ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন

পর্বঃ ১

– হ্যালো, আপনি অনেক ভালো লিখেন।
– তাই নাকি? জানতাম না তো । তবে প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ।
– দেখুন, আমি কাউকে সহজে প্রশংসা করিনা। আপনার লিখা আমার কাছে ভালো লাগে তাই বললাম।
– আবারো ধন্যবাদ আপনাকে।
– আচ্ছা, আপনি থাকেন কোথায়?
– দুঃখিত, এই মূহুর্তে ব্যক্তিগত কোন তথ্যাদি দিতে পারছিনা ।
– কেন? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন আমাকে? ভয় নেই, আমি মেয়ে হয়ে আপনার কি ক্ষতি করব?
– ভয় পাচ্ছি না। তবে একটু ব্যস্ত আছি।
– নতুন কিছু লিখছেন?

পর্বঃ ১

– হ্যালো, আপনি অনেক ভালো লিখেন।
– তাই নাকি? জানতাম না তো । তবে প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ।
– দেখুন, আমি কাউকে সহজে প্রশংসা করিনা। আপনার লিখা আমার কাছে ভালো লাগে তাই বললাম।
– আবারো ধন্যবাদ আপনাকে।
– আচ্ছা, আপনি থাকেন কোথায়?
– দুঃখিত, এই মূহুর্তে ব্যক্তিগত কোন তথ্যাদি দিতে পারছিনা ।
– কেন? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন আমাকে? ভয় নেই, আমি মেয়ে হয়ে আপনার কি ক্ষতি করব?
– ভয় পাচ্ছি না। তবে একটু ব্যস্ত আছি।
– নতুন কিছু লিখছেন?
– হুম।
– কি লিখছেন? আমি কি জানতে পারি?
– ফেবু ওয়ালে চোখ রাখলে অবশ্যই পারবেন। তবে একটু ধৈর্য্য ধরুন।
– আপনি কিন্তু অনেক সুন্দর করে কথাও বলেন ।
– আপুমনি, আপনার বাড়ির আশে-পাশে কি তেলের কল আছে?
– কেন?
– না মানে, যে হারে সেই তখন থেকে তেল মেরে যাচ্ছেন , তাই মনে হল আর কি!
– দেখুন, আপনি মানুষটা ফেবুতে যতটা ভালো, বাস্তবে তার থেকে অনেক বেশি খারাপ ।
– এইত, আপুমনি লাইনে এসেছেন এতক্ষনে । দেখুন, আপনার কারনে আমি লিখতে পারছি না । একটু বকবকটা থামাবেন দয়া করে ?

ছেলেটি বুঝতে পারেনি, সে কতটা ঝোকের মাথায় মেয়েটাকে অপমান করেছে । তবুও অপমানটা হজম করে যায় মেয়েটি । প্রতি উত্তরে এতটুকুই বলে- “জনাব, আপনাদের মতন ফেবু বিখ্যাত মানুষদের সাথে বোধহয় কথা বলতে যাওয়াটাই অপরাধ । আমাদের সাথে মিনিট খানেক কথা বললে মনে হয় আপনাদের পুরো ঘন্টা ধরে করা তপস্যা নষ্ট হয়ে যায় । যাই হোক, আর কোনদিন নক করব না । ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন।”

শেষের কথাটায় একটা ছোটোখাটো ধাক্কা খেল তৃপ্ত । “অনেক বেশি ভালো থাকবেন” কথাটা বোধহয় এই প্রথম তাকে কেউ বলে বসল । অনেক বেশি বেশি ভালো থাকতে বলেছে মেয়েটি তাকে । তিন বছর ধরে নিজেকে অনেকটা কষ্টে তিল তিল করে বাঁচিয়ে রেখেছে সে । কিন্তু তার ক্লান্তি-ভরা, ঘামে ভেজা মুখটি দেখে তো কেউ কোনদিন বলেনি – অনেক বেশি ভালো থাকবেন ।

কেন বলেনি? কেন শুনতে পায় নি সে একথা ? কেন তার শরীরের গত তিন বছর ধরে বাসা বেঁধেছে নিরব ঘাতক ঐ রোগটি ? কই, কোন ডাক্তারও তো কোনদিন বলেনি – অনেক বেশি ভালো থাকতে । সপ্তাহের ছুটির দিনটিতে সারাদিন ক্ষুধার কষ্ট করে খালি পেটে ওষুধ খেয়ে রুমের এক কোনায় পড়ে থাকতে দেখেও তো কোনদিন তার কোন রুমমেট বলেনি- “কিরে তোকে না বলেছি, অনেক বেশি ভালো থাকতে?” এমনকি তার অজস্র ভক্তের মধ্যেও তো কেউ কোনদিন বলে নি- অনেক বেশি ভালো থাকতে । কিন্তু, আজ কেন এই মেয়েটি বলল ? চিন্তা করতে অনেকটা কষ্ট হয় তৃপ্ত’র।

চিন্তা করে সে । কেন ভালো থাকব ? একটা মেয়ে প্রথমবারের মতন বলেছে বলে ? এর আগে কি কেউ তাকে বলেছিল এই কথাটি ? না, সে আজকের আগে এই কথাটি কোনদিন শুনেনি। কারন, তার যে ভালো থাকার কথা নয় । শরীরের ভিতর বাস করতে থাকা রোগটিই তার সকল ভালোতে মন্দের কাঁদামাটি লেপে দিয়ে গেছে। তাই, তার ভালো থাকতে নিষেধ আছে। চাইলেই সে ভালো থাকতে পারেনা । চিন্তা করতে করতে মাথাটা গুলিয়ে আসে তার । শরীরটা কাঁপতে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকার সাহস না পেয়ে শুঁয়ে পড়ে সে । কল্পনাতে সে হারিয়ে যেতে থাকে।

– আমি আপনাকে ভালোবাসি।
– আপনি পাগল হয়ে গেছেন।
– না, আমি একদম ঠান্ডা মাথাতেই আছি। আপনি ভেবে বলুন। খুব ভাল মতন চিন্তা করে বলুন।
– আপুমনি, আমি যে চিন্তা করতে পারি না । আমার মস্তিষ্ক ধরে আসে ।
– দেখুন, আমি অনেক খোঁজ খবর নিয়ে, চিন্তা-ভাবনা করে, লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে আপনাকে কথাটি বলেছি আর আপনি মজা করছেন। বলছেন, আপনি চিন্তা করতে পারেন না । দেখুন, আপনি সেলিব্রেটি হতে পারেন কিন্তু একটা মানুষের মন নিয়ে খেলা করার অধিকার আপনার নেই।
কথাটা শুনে তৃপ্ত নিশ্চুপ হয়ে যায় । ঠিক এই প্রশ্নটাই যদি সে স্রষ্টাকে করতে পারত – “দেখুন আপনি মহামালিক হতে পারেন, কিন্তু একটা নতুন কুঁড়িতে বিষ না ঢাললে কি হচ্ছিল না আপনার?” হাজার বার জিজ্ঞেস করেও কোন উত্তর পায় না তৃপ্ত । আকাশ থেকে কোন সাঁড়া পায় না সে । ভাবে, স্রষ্টা বুঝি আজ আমার মতনই বোবা হয়ে গেছে।
– কি হল, কথা বলছেন না যে?
হুশ ফিরে আসল তৃপ্তর।
– হু, বলুন শুনছি।
– আমি কি বলব ? বলবেন তো আপনি । যাই বলবেন, সোজা-সাপটা বলবেন ।
– পারব না।
– কি পারবেন না?
– কাউকে হোল্ড করতে আমার এ জীবনে।
– ধন্যবাদ । সোজা-সাপটা উত্তর দেবার জন্য। আচ্ছা, ওকে । ভালো থাকবেন । আর কোনদিন কথা হবে না আমাদের । তবে দূর থেকেই ভালোবাসব আপনাকে । দোয়া করি, সুস্থ থাকবেন । ভালো থাকবেন । অনেক বেশি ভালো থাকবেন ।

কিছুই বলে না তৃপ্ত । শুধু তার মস্তিষ্কে একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয় । কে যেন তাকে ডাঁকছে ঘুম থেকে উঠবার জন্য ।
ঘুম ভাঙ্গে। চোখ খুলে সে দেখতে পায়, রুমের এক কোনায় সে পড়ে আছে । পুরো শরীরটা ঝিনঝিন করছে । মাথাটা গোলাচ্ছে । এটা নতুন নয় । এমনি করেই তার প্রতিদিন ঘুম ভাংগে । টেবিল ক্লকের দিকে চোখ চলে যায় । চোখ রাখতেই বুঝতে পারে আস্তে আস্তে করে ছেড়ে যাচ্ছে সে জীবন থেকে। অবশ্য, প্রতিটি মানুষই এক সময় চলে যাবে । কিন্তু, সবার ক্ষেত্রে সময়টা অনির্ধারিত । কিন্তু, তার ক্ষেত্রে যে সময়টা নির্ধারিতের থেকেও কিছুটা বেশি । গত মে মাসে ডাক্তার শেষ সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেছেন, “ধারনা করছি, ২০১৬ পর্যন্ত।” অর্থাৎ, আর মাত্র ২ বছর ৩ মাস । তারপর সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। তৃপ্তুও সুস্থ হয়ে যাবে পুরোদমে । তারপর চাইলেও তৃপ্ত কখনো অসুস্থ থাকবেনা, খারাপ থাকবেনা । রুমের কোনায় দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকতে হবেনা । সত্যিই, সে সুস্থ হয়ে উঠবে তখন । কারন, মৃত্যুর উপর আর কোন অসুস্থতা থাকতে পারে না । কিন্তু, ততদিন পর্যন্ত কিভাবে বেঁচে থাকবে – সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর সাহস পায় না সে । তাই, আবার শুয়ে পড়ে । চোখ বুজতেই আবার ভেসে আসে কন্ঠটা- “ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন।”

তৃপ্ত চোখ বন্ধ করেই রাখে । চোখ খুলতে সাহস পায় না । চোখ খুললেই যে সব মিথ্যা হয়ে যায় ।যতক্ষন চোখ বন্ধ থাকে ততক্ষনই সে অনেক ভালো থাকার প্রেরনা পায় । শুয়ে থাকতে থাকতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে । ঘুমের মাঝেই হঠাৎ করে তার কন্ঠ ছাপিয়ে একটা আওয়াজ আসে – তুমিও অনেক ভালো থাকবে, আমিও দূর থেকে তোমাকে…… আর বলতে পারেনা । কন্ঠে জড়তা চলে আসে । নির্বাক-নিশ্চুপ ভাবে পড়ে থাকে দেহটি ।

পর্ব -২

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। কিন্তু স্বাভাবিকতাকে বারবার বিরক্ত করে চলে কন্ঠটি- “ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন।”
নাহ, আর পারা যাচ্ছে না এই কন্ঠটির সাথে। রুমের কোনায় পড়ে থাকতেও আজকাল বড় কষ্ট হচ্ছে তৃপ্ত’র। কোনভাবেই সে কন্ঠটিকে দূরে সরাতে পারছে না, আবার নিজেকেও ভালো রাখতে পারছেনা। যতটুকু সময় জেগে থাকে, ততটুকু সময়ই অশান্তি। ঘুমের মাঝেও যেন আজকাল অশান্তিটা হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে। সে কোনভাবেই শান্তিতে থাকতে পারছেনা। না পারছে কন্ঠটিকে ভুলতে, না পারছে হুট করে নিজেকে বদলে ফেলতে। কিন্তু বদলাতে প্রচুর ইচ্ছে হয় তার। যতটা সম্ভব বদলে ফেলতে ইচ্ছে করে নিজেকে। তাই ইদানীং, বিকেলের দিকটা বাসার কাছে কোথাও হাঁটতে যাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারার চেষ্টা করছে। আরো একটা ভীষন পরিবর্তন এসেছে তার মাঝে। দিনদিন সে সিগারেট ধরে ফেলছে, আর ছেড়ে দিচ্ছে স্রষ্টাকে। অবশ্য স্রষ্টার অস্ত্বিত্ব নিয়ে তার মন আগা-গোঁড়াই যথেষ্ট সন্দেহ প্রবন। দিন দিন সেই সন্দেহটা অবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। নেবেই বা না কেন? একটা প্রশ্নের উত্তর তো আজও পায়নি সে স্রষ্টার কাছ থেকে। একটা নতুন কুঁড়িতে বিষ না ঢাললে কি হচ্ছিল না স্রষ্টার? এই প্রশ্নের উত্তর সে আজও খুঁজে ফেরে। নিজেকে ব্যস্ত করে রাখার যথেষ্ট সুযোগ থাকতেও সুযোগগুলো তার কাছে স্বান্তনা বানীর মতন মনে হয়।

শনিবার রাত বারোটা বাজলেই রাতুলের জন্মদিন। রাতুল ওর রুমমেট। প্রতিটা রুমমেটের জন্মদিন খুব ঘটা করে পালন করে সবাই মিলে। বন্ধুর জন্মদিন ঘটা করে পালন না করতে পারলে কিসের বন্ধু? জন্মদিন উপলক্ষে কিছু একটা তো দেওয়া উচিত, আমি যতই অসুস্থ হই না কেন? গিফট তো দিতেই হবে। এমন কিছু চিন্তা মাথায় আসতেই শপিং মলের দিকে ছুঁটতে থাকে তৃপ্ত’র রিক্সা। জন্মদিনটা বেশ ভালোভাবেই পালন করে ওরা কয়েকজন।
পরদিন আবারো হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে তৃপ্ত। এমন অসুস্থ সে খুব কম সংখ্যকই হয়েছে জীবনে। এতদিন ওষুধ খেয়েছে, কিছুটা দেরীতে হলেও ওষুধে কাজ করেছে।
কিন্তু এবার আর কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। লক্ষনটাও ভালো না। শরীর খুব বেশি দূর্বল হয়ে পড়েছে। মুখটা আর চোখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে রং ধারন করে আছে। হাতটা কেমন প্রায় অনুভূতিহীন হয়ে আছে। গলায় জড়তাটা স্থায়ীরূপ নিতে চাইছে। সাহস পায়না সিগারেট ধরাতে। কিন্তু এভাবে কি বেঁচে থাকা সম্ভব? না- একশব্দেই উত্তর আসে পাশ থেকে। ঘুরে তাকাতেই রাতুলের দেখা পায় সে।
– “অনেক হয়েছে, চল এবার ডাক্তার দেখাতে হবে তোর। আমি নিয়ে যাব তোকে। কোন কথা বলবি না। তুই যদি আমার কথা না শুনিস, তাহলে আজ থেকে জানব তৃপ্ত নামে আমার কোন বন্ধু ছিল না।”
– আমি তো এমনিতেও থাকব না একসময়। অত অস্থির হস কেন? এর আগেও তো এমন হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না।
– তুই যাবি আমার সাথে?
তৃপ্ত আর দ্বিতীয় বার না বলতে সাহস করে না। জড়তা কাটিয়ে না শব্দটা বলতেও অনেক বেগ পেতে হয় তাকে। তাই আর সাহস আসে না তৃপ্ত’র কন্ঠে।
ডাক্তার বলেছে, রক্ত নিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব। রাতুল ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ২ ঘন্টার মধ্যেই রক্ত যোগাড় হয়ে যায়। এবার ভর্তি হতে হবে হাসপাতালে। কিন্তু তৃপ্ত’র কাছে যথেষ্ট টাকাও নেই।
রাতুল শুধু এটুকুই বলে- “দরকার পড়লে সেমিস্টার ফি না দিয়ে তোর চিকিৎসা করাব। তাও তুই কোন কথা বলবি না। বন্ধু কি এমনিতেই হয়? বন্ধুর জন্য বন্ধুকেই এগিয়ে আসতে হয়।”
কথাটা শুনে তৃপ্ত’র চোখ থেকে দু-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে একটা প্রশ্ন জাগে। আচ্ছা, রাতুল তো আমাকে কোনদিন ভালো থাকতে বলেনি। অথচ, আমার ভালো থাকার জন্য নিজের সব কিছু ত্যাগ করে দিতে প্রস্তুত সে। তবে, সেটা কি শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে? নাকি মানবতার খাতিরে? নাকি সত্যিই ও আমাকে ভালোবাসে? অস্পষ্ট আর দ্বিধাদ্বন্দে ভর্তি উত্তরটা তার নিজের মাঝেই দ্বৈততা সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই উত্তর খুঁজতে সাহস হয় না তার। যদি আবারো শরীরটা ঝিমিয়ে পড়ে, সেই ভয়ে।
কিন্তু শুধু এতটুকু নির্ভর উত্তর খুঁজে পায় সে- কাউকে ভালো থাকতে বললেই ভালো থাকা যায় না এবং যে কেউ বললেই সেটা মন থেকে ভালো থাকতে বলা হয় না। কখনো কখনো সেটা শুধু ভদ্রতাকে খাতির করা হয় মাত্র।
এদিকে দাঁড়ি-গোঁফে মুখটা যেন রবীন্দ্র ছুঁই ছুঁই করছে। কিন্তু শেভ করবার মতন পয়সা আর সময় হাতে নেই এখন। যাই হোক আধ-ঘন্টা যেতেই ভর্তি হয়ে যায় হাসপাতালে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুধু দুটো কথার মাঝে গভীরতা বের করতে চেষ্টা করে সে। একটা সেই অপরিচিত নারীর কন্ঠ, যার কাছ থেকে সে জীবনে প্রথমবারের মতন শুনেছিল- “ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন।”
আর অন্য কন্ঠটি রাতুলের – “বন্ধু কি এমনিতেই হয়? বন্ধুর জন্য বন্ধুকেই এগিয়ে আসতে হয়।”
এই কন্ঠ দুইটি কখনো একসাথে শুনতে পায় নি সে। তাই কিছুটা অপুর্ণতা। কিন্তু, চোখ বন্ধ করে কন্ঠ মিলিয়ে মানুষ চিনে নিতে তার এতটুকু কষ্ট হবে না- এ ব্যাপারে নিশ্চিত।
রক্তের প্রবাহ বইছে ব্লাডব্যাগ থেকে শরীরে।
রাতুল হঠাৎ করেই বলে বসে- দোস্ত, পাঁচটা মিনিটের জন্য বাইরে যাচ্ছি। নিচে আমার একজন গেস্ট এসেছে। তোকে দেখতে চায়।
কথাটা বলেই রাতুল চলে যায় নিচে। আর এদিকে ঘুমে চোখ ভারী আসতে থাকে রাতুলের। মিনিট দুই বাদেই ঘুম আচ্ছন্ন করে ফেলে তাকে।
৪০ মিনিট পর।
হঠাৎ দুটো কন্ঠের আওয়াজে ঘুমের রেশ কেটে যায়। কিন্তু চোখ মেলে না তৃপ্ত। একটি তো রাতুলের কন্ঠ। আর অন্যটি একটি মেয়ের। কিন্তু এই কন্ঠ এর আগে তো সে শোনেনি। আরো মিনিট দশেক বাদে চোখ মেলে সে।
চারটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে অজানা কোন প্রশ্ন নিয়ে?
– কিরে এখন কি অবস্থা? রাতুল জিজ্ঞেস করে
– এইত।
কথাটা বলেই রাতুলের পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে দৃষ্টি যায় তৃপ্ত’র।
– ভাইয়া ভালো আছেন? মেয়েটি আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করে।
– হ্যা, আপনি?
মেয়েটি কিছু বলবার আগেই রাতুল- “ও তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ও আমার ফ্রেন্ড চৈতী। আমার সাথেই পড়ে। আর চৈতী, ও হচ্ছে আমার বন্ধু তৃপ্ত।”
নামটা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল মেয়েটি। অন্তত ওর চোখের চাহনীটা তারই ইঙ্গিত দিতে শুরু করল। আর বেশি কথা হল না ওদের মাঝে।
আরো প্রায় ঘন্টা খানেক পরে রক্ত নেওয়া শেষ। এবার যেতে হবে।
তৃপ্ত রাতুলকে উদ্দেশ্য করে বলে- “শোন, আমি একাই যেতে পারব। তুই বরং আপুমনিকে পৌঁছে দে।”
‘আপুমনি’ শব্দটা শুনে মূহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায় মেয়েটি। কিছুটা গোয়েন্দাদের মতন করে তাকায় তৃপ্ত’র মুখপানে। কি যেন একটা খুঁজে বেরাচ্ছে সে। কিন্তু মূহুর্তটি পার হতেই তার চোখে মুখে পালিয়ে বেড়ানোর ভাবমূর্তি ফুঁটে উঠে।
মূহুর্তের মাঝেই চাহনীর এই পরিবর্তন তৃপ্ত’র মাঝে কিছুটা সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। কিন্তু বন্ধুর বান্ধবী দেখে সন্দেহটাকে থামিয়ে দেয় সে।
রাতুল রিক্সা ডাকে। চৈতীকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। বিদায় নেবার মূহুর্তে তৃপ্ত’কে উদ্দেশ্য করে চৈতী- “আসি ভাইয়া, নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন। ঠিক মতন ওষুধ খাবেন। আর ডাক্তার যেভাবে বলেছে, সেভাবেই চলবেন।”
– আচ্ছা, ঠিক আছে। আবার দেখা হবে।
– আচ্ছা, ভাইয়া আসি তাহলে? ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন।
কথাটা কানে আসতেই কিছুক্ষনের জন্য থমকে যায় তৃপ্ত। শুধু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে তৃপ্ত। দাঁড়িয়ে থাকে তার হাতটি ধরে থাকে হাজারটা প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর গুলো আজ এলোমেলো করে দিয়ে যায় মূহুর্তটি। আর কন্ঠটা শুধু নিরুত্তাপ হয়ে বয়ে চলে পরের কয়েকটা দিন।

৫ thoughts on “ভালো থাকবেন, অনেক বেশি ভালো থাকবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *