বিশ্বের ইহুদি জাতির ৩০০০ বছরের ইতিহাস : ভেতর-বাহির [পর্ব-৭]



ইহুদি তথা ইসরাইল জাতি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা এই যে, ইসরাইল একটি আগ্রাসী তথা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। আমারও ধারণা এমনই ছিল। এই কিউরিসিটি থেকে ইহুদি জাতি তথা ইসরাইল সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। নানাবিধ বই-পুস্তক এবং বিশাল ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করে ইহুদি জাতির ইতিহাস জেনে বিষ্মিত হয়েছি। আজকের বিশ্বে তারা সন্ত্রাসী বা আগ্রাসি কিনা তা সচেতন পাঠক বিবেচনা করবে। নিজে বিভিন্ন উৎস থেকে ঐ জাতিটার যে ইতিহাস জানতে পেরেছি, তাই ধারাবাহিকভাবে দিলাম ১-১৮ পর্বে। ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকে নানাবিধ তথ্য সংগ্রহের কারণে কোথাওবা ভিন্নতর তথ্য-কথামালা, একই কথা পুনরাবৃত্তি চলে আসতে পারে। এ ব্যাপারে সচেতন পাঠক বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে ও যৌক্তিক সংশোধনি ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহিত হবে। রাজনৈতিক শক্তিতে এত দুর্বল আর কোনো জনগোষ্ঠী পৃথিবীর ইতিহাসকে এতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেনি, যতটা করেছিল হিব্রু বা ইহুদিগণ।

পৃথিবীর ইতিহাস টেনে আনলে দেখা যায়, ইহুদিরা হলো সবচেয়ে অত্যাচারিত সম্প্রদায়, যাদের উপর শুধু বছরের পর বছর, হাজার বছর ধরে অত্যাচার করা হয়েছে। একটি নির্যাতিত ও অত্যাচারিত সম্প্রদায় কিভাবে নিজেরাই অত্যাচারি হয়ে উঠল একুশ শতকে সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন হাজার বছর আগে ইহুদি সম্প্রদায়ের যাত্রা শুরু হয় যা আমরা কমবেশি জেনেছি। ইহুদি ধর্ম পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম ধর্ম, যা এখনো অনেক মানুষ পালন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরেলিদের আদি নিবাস ছিল। তবে তারা এখন যে জায়গা চিহ্নিত করছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। নবি মুসা বা মোজেস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সুন্দর সময় গিয়েছে খৃষ্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে সম্রাট দাউদ বা ডেভিডের সময়। দাবি করা হয় বর্তমান সময়ের লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান ও মিশরের বড় অংশই ছিল তখনকার কিংডম অব ইসরেলের অংশ। ডেভিডের ছেলে সলোমন বা সোলাইমান এর সময়ও তাদের অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এ-জাতি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এ সময় আসিরিয়ানরা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে ঢুকে পড়ে ও দখল করে নেয় তাদের স্বদেশ ভূমি। এরপর বিভিন্ন সময় ব্যাবিলনিয়ান, পার্সিয়ান, হেলেনেষ্টিক, রোমান, বাইজেনটাইন, অটোম্যান, মুসলিম, বৃটিশ শাসনসহ বিভিন্ন পর্যায় পাড়ি দেয় এই অঞ্চল। আর এর প্রায় অনেকটা সময় জুড়েই ইহুদিদের তাড়া খেতে হয় দেশ থেকে দেশান্তরে!

যদিও হিব্রু একটি ভাষার নাম কিন্তু কালক্রমে এটি একটি জাতির পরিচায়ক এমনকি একটি ধর্মের নামেও পরিচিত হয়। পৃথিবীতে আধুনিক যুগে আজকে যে ইহুদিদের পরিচয় পাই তাদেরই আগের নাম হিব্রু। সে অনেক আগের কথা। ইব্রাহিম নামে এক নবীর মাধ্যমে এ ধর্মের বিকাশ সাধন হয়। পরে ইব্রাহিমের পুত্রের ঘরে আরেক নবীর আগমন ঘটে তার নাম ইয়াকুব। যার অপর নাম ইসরাইল। পরে ইসরাইলের বংশের লোকদের বনি ইসরাইল নামে ডাকা হতো। ইয়াকুবের এক পুত্রের নাম ছিল ইউসুফ। যিনি মিসরের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় মূলত হিব্রু জাতির লোকেরা মিসরে রাজকীয় সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করে কিন্তু কালক্রমে কিতবি জাতি, যারা মিসরে স্থায়ী বাসিন্দা ছিল তাদের হাতে শাসন কাঠামো চলে যায়। কিতবি জাতির শাসকদের উপাধি ছিল ফেরাউন। এ ফেরাউন রাজারা বিরাট প্রতিপত্তি অর্জন করে। তারা বনি ইসরাইলদের দাস হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে এবং ইসরাইল জাতির ওপর অন্যায় অত্যাচার চালাতে থাকে। এ সময় নবী মুসার আগমন ঘটে। যিনি ফেরাউনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে কথিত ঈশ্বর প্রদত্ত শক্তির মাধ্যমে ফেরাউনকে পদানত করে এবং বনি ইসরাইলদেরকে দাসত্বের হাত থেকে উদ্ধার করেন। এ সময় থেকেই ইসরাইল জাতির নব উত্থান ঘটে। তারা তখন থেকে ইহুদি নামে পরিচিত হয়ে আজ অবধি সে নামেই বিশ্বব্যাপী বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পৃথিবীতে বহুকাল আগের সে হিব্রু ভাষা আজো হিব্রু জাতির যোগ্য উত্তরসূরি ইহুদিদের মধ্যে টিকে আছে। হিব্রু জাতির সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইহুদি জাতি স্রষ্টার একাত্মবাদে বিশ্বাসী ছিল। এ কারণে ইহুদি ধর্ম একেশ্বরবাদী ধর্ম। এ ধর্মে ব্যক্তি জীবনের সব দিকও বিভাগ থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্রে, সর্বস্থানেই একাত্মবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠিত। ধর্মীয় একাত্মবাদে বিশ্বাস ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনে এ ধর্মে নিজেকে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ এ ধর্মে বিশ্বাসী সবাইকে মনে করতে হবে যে, সে স্রষ্টার বান্দা এবং তার উদ্দেশ্য থাকবে জীবনে সব কাজের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা। ইসলাম ধর্ম মতে ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মকে বলে আহলে কিতাব অর্থাৎ কিতাবের অনুসারী। এ কিতাব বলতে ইহুদি ধর্মের তাওরাতকে বুঝানো হয়েছে, যা মুসার ওপর নাযিল। তুর পর্বতে ৪০ দিন ধ্যানমগ্ন হওয়ার পর তার ওপর আসমানি ওহি হিসেবে তাওরাত অবতীর্ণ হয়। একাত্মবাদের দাওয়াতই ছিল তাওরাতের মূলমন্ত্র। যা আজো ইহুদি ধর্মে পালনীয়। ইহুদি ধর্মে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা দেয়া আছে। ইচ্ছা করলে সে ভালো কাজ করতে পারবে ইচ্ছা করলে মন্দ কাজও করতে পারবে। ইহুদি ধর্মের মৌলিক নীতিমালাগুলোর মধ্যে রয়েছে আখেরাতের ওপর বিশ্বাস। অর্থাৎ মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করার তাগিদ এ ধর্মে রয়েছে। এভাবে নবী ও রাসুল গণের আগমনকে সত্য বিবেচনা করা ইহুদি ধর্মের একটি মূল বিশ্বাস। সুদ প্রথাকে ইহুদি ধর্মে হারাম বিবেচনা করা হয়না। অনুরূপভাবে এ ধর্মে শ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে বিবেচনা করা হয় মুসাকে। তাদের মতে বনি ইসরাইলরাই স্রষ্টার কাছে প্রিয় বান্দা এবং পৃথিবীতে মুসাই শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল।

এরপর পর্ব – ৮ [সিরিজটি মোট ১৮ পর্বে সমাপ্ত হবে]

ইতোপূর্বেকার পোস্টসমূহের লিংক :
http://www.istishon.com/node/6503#sthash.QPjpEpOB.dpbs (Part 1)
http://istishon.blog/node/6532#sthash.rFf73XX7.dpbs (Part 2)
http://www.istishon.com/node/6546#sthash.uK8UMiUo.dpbs (Part 3)
http://www.istishon.com/node/6587#sthash.DF0y7UrP.dpbs (Part 4)
http://www.istishon.com/node/6637#sthash.jXFqvLNX.dpbs (Part 5)
http://www.istishon.com/node/6665#sthash.VjHtq0Lp.dpbs (Part 6)

লেখকের ফেসবুক ঠিকানা [ধর্মান্ধতামুক্ত যুক্তিবাদিদের ফ্রেন্ডভুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই ] : https://www.facebook.com/logicalbengali

৪ thoughts on “বিশ্বের ইহুদি জাতির ৩০০০ বছরের ইতিহাস : ভেতর-বাহির [পর্ব-৭]

  1. ইহুদি জাতির অনেক অনেক
    ইহুদি জাতির অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জানতে পারছি পর্বগুলিতে। আর ছবিগুলো আরো মূল্যবান। এর নিচে ক্যাপশান দিলে ভাল হয়। ১৮-পর্ব পর্যন্ত পড়ার ইচ্ছা আছে।

    আপনাকে ধন্যবাদ ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *