মানুষ কি অন্য প্রাণিকূল থেকে উন্নততর? মানুষ ভার্সাস অন্য প্রাণির তুলনামূলক বিশ্লেষণ (শেষ পর্ব)

একটি কুকুর কখনো প্রভুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করলেও, মানুষ অর্থের বিনিময়ে প্রায়ই এ কাজটি করতে পারে যে কোন সময়ে। অন্য প্রাণিরা তাদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্য না করলেও, মানুষ তার শ্রেণির মধ্যে নানাবিধ বৈষম্যের সৃষ্টি করে। অন্য প্রাণিকূলেরা শুধু তার দৈনন্দিন বা আপদকালীন খাবার সংগ্রহে ব্যাপৃত থাকলেও, মানুষ নিজের জন্যে অনেক বেশী সম্পদ মজুদ করতে অভ্যস্ত তার গোষ্ঠীর অন্য মানুষদের বঞ্চিত করে। ভোগবাদী মানুষেরা একাধিক স্ত্রী, স্বামী, ফিঁয়াসে, দাসদাসী গ্রহণে অভ্যস্ত হলেও, অন্যপ্রাণিরা এগুলো থেকে সাধারণত মুক্ত। ধর্মীয়, বর্ণীয়, সামাজিক, আর্থনীতিক, রাজনীতিক কারণে মানুষ তার দখলীকৃত এলাকায় অন্য মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করলেও, অন্য প্রাণিরা সমগোত্রীয় প্রাণিদের নিয়ে সাধারণত ‘মাইগ্রেড’ করে এদেশ থেকে অন্য দেশে। অন্য প্রাণিরা তার জৈবিক প্রয়োজনে বিজাতীয় প্রাণি হত্যা করে এবং এ জন্যে কোন ভণিতা বা লোকদেখানো ঠুনকো যুক্তি প্রদর্শন করেনা কিন্তু মানুষ ঐ জাতীয় বহু ‘অমানবিক’ কাজ করার পর তার নানাবিধ ‘খোড়া’ যুক্তি হাজির করে নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষি হিসেবে। যেমন মানুষেরই ভূখন্ড অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় কেন ‘বাঙাল’ নামক ‘কাঙাল’-দের প্রবেশ করতে দেয়া হবে না কিংবা বিশেষ একটি প্রাণিকে কেন হত্যা করে মাংস খাওয়া হবে কিংবা মুরগীর ডিম কেন বাচ্চা না ফুটিয়ে ‘ওমলেট’ করা হবে কিংবা একটি বোকা প্রাণির দুধ কেন তার বাচ্চাকে বঞ্চিত করে মানুষ নিয়ে আসবে আইসক্রিম বানানোর জন্যে; তার নানাবিধ খোড়া, হাস্যকর ও অযৌক্তিক যুক্তি প্রদর্শন সম্ভবত একমাত্র মানুষই করতে পারে তার ‘চতুরতা’র কারণে।

মানুষ নাকি সবার সেরা সৃষ্টি। কিছু নমুনা দেখা যাক কথাটা সত্য কিনা ১) শকুনের চোখ মানুষের তুলনায় অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী; ২) হাতী বা কুকুরের মেমোরীর তুলনায় মানুষের মেমোরী কিছুই না; ৩) পিপিলীকার বা মৌমাছিদের সাহস আর ডিসিপ্লিনের সামনে মানুষ নিতান্তই শিশু; ৪) কুমীর বা কচ্ছপেরা মানুষের তুলনায় অনেক বেশিদিন বাঁচে; ৫) প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ব্যাপারে মানুষ সবচেয়ে পিছিয়ে; ৬) মানুষ না থাকলে দুনিয়ার আর কোনো জীবেরই কিছুমাত্র অসুবিধা নেই, বরং তারা আরো ভালো থাকবে। কিন্তু অন্য যেকোনো প্রাণী লুপ্ত হয়ে গেলে মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়বে । আবার ব্লাক ভালচাররা সারাজীবন একগামী থাকে। পুরুষ হর্নবিল ডিম পারার পর থেকেই শাবক ও নারীকে খাবার এনে একটি ফোকড় দিয়ে খাওয়ায়। স্ত্রী কোটরের ফাক দিয়ে কেবল ঠোট বের করে থাকে। শিম্পাজী পুরুষ রক্ষণশীল ও লম্পট। আলফা পুরুষ ৮/১০ জনের পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ পুরুষত্বহীন হলে তাকে পরিবার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।

আরো কতিপয় উদাহরণ : কমোডে ড্রাগন, পুরুষ ছাড়াই শুধু নারী এককভাবে বাচ্চা দিতে পারে। পুরুষ না পেলে নারীর ৫০% ক্রমোজন পুরুষ ক্রোমোজনে রূপান্তরিত হয়ে সব পুরুষ বাচ্টচা জন্ম দেয়। আর পোলার বিয়ারের কালো ত্বক তাপ ধরে রাখে, প্রচন্ড শীতে মহিলা বরফের গর্তে ঘুমিয়ে কাটায় প্রায় ৩/৪ মাস। এ সময় ৩/৪ মাস পর্যন্ত সে খায়না, পান করে না, বর্জ ত্যাগ করে না। মাইনাস তাপমানেও সে তার শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে। এ্যাংলার ফিস যৌনতার সময় স্ত্রীর শরীরে নিজের শরীরকে লীন করে দেয়, আর সে বাঁচে না। পুরুষ ম্যানপিছ যৌনতা শেষে স্ত্রী তার মাথা খেয়ে ফেলে কিন্তু তারপরো সে সঙ্গম অব্যাহত রেখে নিজ জীন স্ত্রীর শরীরে রাখার পর সে মারা যায়। টিক পোকা খাদ্য ছাড়া ১০ বছর বেঁচে থাকতে পারে। ক্যানাবাল রাও খাদ্য ছাড়া অনেক দিন বাঁচে। বক্স জেলিফিসের বিষাক্ত বিষে একসাথে ৭-জন মানুষ মারা যেতে পারে। টাইগার সেলোম্যানরা ঘ্রাণ দিয়ে শিকার চিনতে পারে ও ঐ গর্তেই মুখ ঢোকায় যেখানে তার শিকার বিদ্যমান। সাপ খেকো গেকোরা ১০০ গজ দূর থেকেও শিকারী সাপের গন্ধ চিনতে পারে। কলোরাডো ফ্রগ বিষাক্ত সেন্টিপিড মারাত্মক বিষসহ সহজেই হজম করতে পারে। উড ফ্রগের রক্ত প্রচল্ড শীতে জমাট বাঁধে, হৃদপিণ্ডের স্পন্দর থেমে যায়, ফ্রজেন টাইম ক্যাপসুলে ব্যাঙটি মাসের পর মাসে কাটিয়ে বরফ গলার পর তার রক্ত, হৃদস্পন্দর শুরু হয় ও জীবন ফিরে পায় আবার। ইদুর যে কোন কঠিন পরিবেশে বেঁচে থেকেও বছরে ১৫০০০ বাচ্চা উৎপাদন করে যায় । লাংফিস ১ মিটার মাটির নিচেও পানি ছাড়া বেঁচে থাকে অনেকদিন। প্রচন্ড খরায় মাটির ভেতর টাইম ক্যাপসুলে জীবন ধরে রাখে সে। কোমায় থেকে এভাবে ৪-বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। নিজের পেশী সভোজীকরণের মাধ্যমে সে বেঁচে থাকে এ সময়। ফায়ার এ্যান্ট ৯৫% টক্সিন এলকালয়েড নিয়ে নিজের ও কলোনীর প্রতিরক্ষা করতে সক্ষম হয়। স্ট্রিং রে তার লেজের বিষাক্ত কাটার আঘাতে এমনটি একটা হাঙরকেও ঘায়েল করতে পারে। গার্টার সাপ ৮ মাস শীত ঘুম দেয়। বসন্তে নতুন জীবন ফিরে পায় বরফ গলার পর। সি হর্স ও স্কুইডরা যৌনতার জন্য রং ও শরীরের ডিজাইন পাল্টায়। স্ত্রীরা ডিম পুরুষের শরীরে ট্রান্সফার করতে পারে ও পুরুষ সময়সত (সি হর্স) তাতে বাচ্চা ফোটায়। স্কুইডরা যৌনতার জন্য রং ও সৌন্দর্য পাল্টাতে পারে এমনকি শরীরের এক দিকের। প্রজননে এরা নিজ লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে ও করে কখনো কখনো। সামুদ্রিক মারাকাটা গ্রাউন্ট ফিস পরিবারে কোন কারণে নারী মারা গেলে পুরুষটি নারীতে রূপান্তর ঘটাতে পারে। কিলার বি বিপদ সংকেত পেয়ে ফেরোমেন নিস্বরণ করে ও রাণী ও বসতির জন্য যুদ্ধ করে জীবন দেয়।

অনেক প্রাণির অন্ধকারে দেখার শক্তি, দূরাভাষ শোনার শক্তি, তীব্র ঘ্রাণশক্তি, বোধগম্যতা শক্তি, অনুভবের শক্তি, শিকার ধরার শক্তি, নিজের প্রতিরক্ষার শক্তি, প্রকৃতিকে বোঝার শক্তি মানুষ থেকে উন্নততর। মানুষ একটি মহা ‘ট্যান্ডন’ প্রকৃতির প্রাণি বলেই, সে তার নিজ নিজ সুবিধার জন্যে নানাবিধ জাতি, ভাষা, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, রীতি, নীতি ইত্যাদি বহুধা সংজ্ঞা ও রীতি নীতি বানিয়েছে, যা থেকে হয়তো মানুষ একদিন বেড়িয়ে আসবে! মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্বে যদিও তা খুব অল্প সময়ের ভেতরেই ঘটবে কিন্তু পৃথিবীর মানুষের সময়ের হিসেবে এ ‘ট্যান্ডন চক্র’ থেকে বেরুতে মানুষের আরো অনেক সময় লাগবে! যে সময়ে মানুষ বর্ণিত প্রপঞ্চকে আরো জটিলতর করবে এবং নিজেদের আপাত সুখী প্রাণি মনে করলেও, প্রকৃত বিচারে অন্য প্রাণিরাই মানুষের চেয়ে সুখী। কারণ মানুষের মত ‘অ-সুখ’ তাদের আক্রান্ত অদ্যাবধি। যে কারণে স্ট্রোক বা হার্টএ্যাটাকে মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব বরণ মানুষের মধ্যে সহজপ্রাপ্য হলেও, অন্য প্রাণিকূলের মধ্যে বেশ দুষ্প্রাপ্য।

আগের পর্বের লিংক :
http://www.istishon.com/node/6771#new (Part 1)

লেখকের ফেসবুক ঠিকানা [ধর্মান্ধতামুক্ত যুক্তিবাদিদের ফ্রেন্ডভুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই ] : https://www.facebook.com/logicalbengali

৪ thoughts on “মানুষ কি অন্য প্রাণিকূল থেকে উন্নততর? মানুষ ভার্সাস অন্য প্রাণির তুলনামূলক বিশ্লেষণ (শেষ পর্ব)

  1. অন্যান্য প্রাণীর সাথে লজিকাল
    অন্যান্য প্রাণীর সাথে লজিকাল ভাই যে পার্থক্য দেখিয়েছেন সেটা নিতান্তই তাদের জেনিটিক আর দীর্ঘ দিনের চেষ্টায় বংশগত ভাবে প্রাপ্ত চরিত্র। মানুষের সাথে তাদের মূল পার্থক্য কিন্তু মাথায় অর্থাৎ ব্রেইনে।
    আপনি নিশ্চয়ই জানেন সিংহ শিকার করে ঝাঁক বেঁধে এবং তাঁরা থাকেও দলবদ্ধ ভাবে। এক বা একাধিক সিংহ থাকে সেই দলের নেতা। সিংহীরাই মূলত শিকার করে আর সিংহের মূল কাজ হচ্ছে এলাকা দখলে রাখা, ঘুমানো আর “ইয়ে” করা। এখন ঘটনাক্রমে যদি বাইরে থেকে নতুন কোন সিংহ এসে সেই দলের সিংহটাকে হারিয়ে সেই দলের উপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করে তাহলে এরপর একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। নতুন সেই সিংহটা দলের সব শাবক গুলোকে মেরে ফেলে।
    এখন বুনো প্রান্তরে শিকারের ক্ষেত্রে আপনি নিশ্চয়ই আমাকে সিংহের পারফরমেন্সের সাথে তুলনা করবেন না, তাই না।
    আমার কাছে মনে হয় প্রতিটি প্রাণীর কাছ থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।

    আর সেজন্যই

    ১) শকুনের চোখ মানুষের তুলনায় অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী – আমাদের কাছে বাইনোকুলার আছে। স্যাটেলাইট আছে। শকুন ফেইল। হা হা হা।
    ২) হাতী বা কুকুরের মেমোরীর তুলনায় মানুষের মেমোরী কিছুই না – এইটা নিয়ে সন্দেহ আছে। তারপরও বলবো হাতি বা কুকুরের কাছে কম্পিউটার নাই।
    ৩) পিপিলীকার বা মৌমাছিদের সাহস আর ডিসিপ্লিনের সামনে মানুষ নিতান্তই শিশু – ক্ষেত্র বিশেষে পিপিলীকার বা মৌমাছিরা মানুষের সাহস আর ডিসিপ্লিনের নমুনা দেখলে আত্মহত্যা করবে।
    ৫) প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ব্যাপারে মানুষ সবচেয়ে পিছিয়ে – এই কথাটাও মানতে পারলাম না। মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে তাঁর যন্ত্র ব্যাবহারের দক্ষতা। সেটা কেড়ে নিয়ে আপনি একজনকে এন্টার্ক্টিকায় ফেলে আসবেন তাহলে কিভাবে হবে? তবে Bear Grylls এর Man vs. Wild দেখলে আপনার ধরনা পাল্টাতে পারে।
    ৬) মানুষ না থাকলে দুনিয়ার আর কোনো জীবেরই কিছুমাত্র অসুবিধা নেই, বরং তারা আরো ভালো থাকবে। – এইটাও ঠিক না। মানুষ নিজেই তো কত প্রাণীকে গুষ্টি সহ খতম করে ফেলেছে এবং আরো করছে। তাতে কার কি ক্ষতি হয়েছে?

    যাক! অনেক কথা বলে ফেললুম। এইবার আপনি কিছু বলেন।

    1. আগেই বলেছি এটা স্যাটায়ার, সে
      আগেই বলেছি এটা স্যাটায়ার, সে হিসেবে অন্য প্রাণির সাথে মানুষকে আমি বিশ্লেষণ করেছি। তবে হ্যা আপনার কথা অন্য বিচারে যৌক্তিক, তা আমি অস্বীকার করছি না।

      তবে ঋণাত্মক চিন্তনে মানুষ শ্রেষ্ঠ, কুটকৌশলে মানুষ দক্ষ। অন্য প্রাণিরা প্রকৃতি থেকে দক্ষতা অর্জন করেছে একটা সিস্টেমের মাঝে, যাকে ধারণ করে সে সিস্টেমের মাঝে বেঁচে থাকতে চাইছে। কিনতু মানুষের ভয়াবহতা আর কুটচালের কাছে তারা পরাস্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত, ধর্ম এ ক্ষেত্রে মানুষকে দিয়েছে ইনডেমনিটি।

      Bear Grylls এর Man vs. Wild দেখেইতো প্রবন্ধটা লিখলাম। যারা প্রকৃতিবাদের আন্দোলন করে, অন্য প্রাণির বেঁচে থাকার অধিকারের ব্যাপারে বিশ্ব কাঁপায়, তারাই আবার বাণিজ্য করতে Man vs. Wild বানায়।

      বিচিত্র বিশ্ব, বিচিত্র এর মানুষ, আর বিচিত্র প্রাণি জগতের বিশ্বজনীনভাবে বেঁচে থাকার কৌশল। আপনি ভাল থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *