তোতা মিয়া, রিক্সাচালক ।

গ্যারেজেই থাকে, গ্রাম ছেড়ে এসেছে প্রায় ৩৫ বছর আগে, এরি মাঝে দুনিয়া বদলে গেছে কিন্তু তার পরিবর্তন হয় নাই, ছেড়া জামা- ময়লা লুঙ্গি, হাড্ডিসার রোদেপোড়া দেহ । বউ অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ করতো, নুন আনতে পান্তা ফুরায় বলে প্রায়ই ঘরে ঝগড়া লেগে থাকতো । মাত্র ১০,০০০ টাকা জমাতে পারলেই তোতা মিয়া ঢাকা ছেড় দেশে চলে যেতো, একটা গাভীর বাছুর আর একটা ভ্যান কিনতে পারলেই দুই পোলা আর ল্যাংড়া বৌটাকে নিয়ে ভালোভাবেই চলে যাবে । এই নিয়ে বাড়ি যাই যাই করে যাওয়া হয়না গত ১১ বছর । দেশে ঘর তোলার জন্য বাপের কালের বসত ভিটা আছে, অন্য ভাইয়েরা খায় । কিন্তু গত ৩৫ বছরেও তোতা মিয়া একসাথে ১০,০০০ টাকা জমাতে পারে নাই । একটা পচা গলা ময়লা আবর্জনার ডোবা সাঁকোয় পেরিয়ে বাঁশের মাচার উপর তোলা ঘরে তোতা মিয়ার প্রায় ২৫ বছরের সংসার ।

এরি মাঝে বড় ছেলেটা চুরি ছিনতাই মারামারি সর্বোপরি বখে যাওয়ায়, গত একবছর আগে দুই ছেলে নিয়ে বৌ দূরে কোথাও চলে গেছে, সেই থেকে তোতা মিয়ার ঘর-বাড়ি এই রিক্সা গ্যারেজেই । একদিন কাজ করলে তিনদিন বের হয়না, অন্তত গাঁটের টাকা শেষ হওয়ার আগে । রোগে শোকে পড়লে গ্যারেজ মহাজনের কাছে ধার অথবা পাড়ার সুদি মহাজনদের কাছে থেকে চড়া সুদের কিস্তিতে ঋণ গ্রহণ । এক কিস্তি দিতে না দিতে আরেক কিস্তি হাজির । তোতা মিয়ারা কিস্তি থেকে বের হতে পারেনা । এই কিস্তি ব্যাবসা রিক্সা গ্যারেজগুলোতে শিকড়হীন মানুষগুলোর মাঝে হরহামেশাই চলে । এটাকায় তারা যতোটা না পরিবারের বা উন্নতির চাহিদা মেটায়, তার চেয়ে জুয়া-মদ-গাজা-মা* ীর(তাদের ভাষায়) নেশায়ই ব্যায় হয় । তাই তারা কোনদিনই টাকাকড়ি জমাতে পারেনা, নিত্য অভাবে থাকে, তাতে প্রতিদিন রিক্সা নিয়ে বের হবার মহাজনেরও একটা নিশ্চয়তা থাকে , তাই তারাও অবাধ প্রশ্রয় দিয়ে যায় জুয়া বা অন্যান্য নেশার, আবার আমাদের প্রশাসনের একশ্রেনীর লোককে নিয়মিত গ্যারেজে যাতায়াত এবং এই অসামাজিক কার্যকলাপের ধারাবাহিকতা তাদের দায়িত্বের প্রতি সন্দেহপ্রবন করে তুলে, যদিও এটাই অঘোষিত নিয়ম । তাদেরও ডিউটির সময় চা পানি খেতে হয় ।

বললাম, তা তোতা মিয়া জুয়া খেললে বা গাঁজা খেলে পুলিশে কিছু বলে না ।
তোতা মিয়া ফোকলা দাঁতে ফিক করে হেসে বললো, পুলিশরে ১০ টেহা কইর‍্যা, ৫জনে ৫০ টেহা দিয়া দিলেই অয়, তয় আর কিচ্ছু কয়না। তারপরও একদিন ধইর‍্যা নিয়া গেছিলো-টেহায় কাম অয় নাই ।

জিজ্ঞাসা করলাম কেনো ?
সহাস্য উত্তর, গাঁজা খাইতে আছিলাম, তয় আমার কাছে, ৩০ টেহা আছিলো, আমি কইছি ১০ টেহা ন্যান, আর আমার ২০টেহা থাউক, তাও হুনেনা- তারপর ২০ টেহা দিছি ১০ টেহা থাউক, তাও হুনেনা, খেইপ্যা যাইয়া আমারে নাডি দিয়া ৩ডা বাড়ি দিছি আর এট্টা চটকানা, বাও আতটা ফুইল্যা গেছিলো । তারপর গাড়ীতে নিয়া উডাইছে, মহাজনে যাইয়া ছাড়াই আনছে, একজন দারোগা আর দুইজন সিপাই, ১০০ টেহাই নাগছে, তয় আমি দেওনের সুমায় ১০ টেহা কম দিছি, আর গাঁজার পুটলাও নিয়া আইছি, টেহা দিছিনা-তয় আবার পুটলা দিমু ক্যা, ফাও আনছিনি, পুটলা আনতে টেহা নাগে নাই? তয় দিমু ক্যা, বাড়ি আরোট্টা খাইলেও না ।

বুঝলাম, আমরা যেই পুলিশকে প্রশাসনকে এতো সম্মান করি, যাদের উপর শেষ ভরসা রাখি, আইনের শাসনের আস্থা রাখি, তাদের অনেকে এইসব রিকশাওয়ালাদের কাছে ৫০ বা ১০০ তে বিক্রি হয়ে গেছে, তাই ওরা পুলিশে ভয় পায় না । ওরা সুদি মহাজনকে দেখলে ভয় পায়, রিক্সার আড়ালে লুকিয়ে থাকে, তাতেও ছাড় পায়না ।

আজ তোতা মিয়া একটা বিশাল কাজ করে ফেলেছে, সে কারো কাছে থেকে টাকা ঋণ নেয়ইনি বরং আরেক রিকশাচালককে দুঃসময়ে ঋণ দিয়েছে , এই নিয়ে সে মহাখুশি । আজ আমাকে চা না খাইয়ে ছাড়বেনা, যদিও পাড়ার গলির চায়ের দোকানে দেখা হলে প্রায়ই আমিই খাওয়াই, কিন্তু আজ ব্যাপার ভিন্ন ।

বললাম, কতো টাকা ঋণ দিয়েছেন ?
অকপটে বললো- ৫০ টেহা ।
কতোটাকা দিবে ?
বললো, সন্ধ্যার সুম দিবো ৪০ টেহা আর ্রাইত নয়ডার সুম দিবো ৪০ টেহা । ২ কিস্তি…
তারমানে ? ৫০ টাকায় মাত্র ৬ ঘণ্টায় ৩০ টাকা লাভ ?
তোতা মিয়া হাসছে, আমি হিসেব করছি, ১০০ টাকায় ৬ ঘণ্টায় ৬০% লাভ ।

তোতা মিয়াকে বললাম, যদি এই টাকা না দেয় ?
-তাইলে আমি আরেকজনরে ১০ টেহা নয়লে এট্টা স্টিক( গাঁজার সিগারেট) খাওয়াইয়া, দুইজনে মিইল্যা মাইর‍্যা টেহা তুলুম । কিস্তির টেহা না দিয়া পারবোনি ।
তারমানে, সুদের টাকা তুলতে লোক নিয়োগ করতে হবে , তাইতো ।
তোতা মিয়া তৃপ্তির হাসি হাসছে, তাকে কিছুক্ষনের জন্য সুদি মহাজন মহাজন লাগছে ।

আমিতো পুরাই টাস্কি,
ইউনুস চাচা, আপনি বছরে ১৫% ঘোষণায় ৬০% লাভের চক্রবৃদ্ধি ফাঁদ বানিয়ে নোবেল পেয়ে দুনিয়ার মানুষকে কর্পোরেট সুদের ব্যাবসা শিখাচ্ছেন, এই তোতা মিয়ার কাছেও আপনার কিছু শেখার আছে-শিখে যান ।

টাস্কি খাওয়াঃ ভবঘুরে বিদ্রোহী ।

১ thought on “তোতা মিয়া, রিক্সাচালক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *