মেঘনাদবধের রাবণ ও খালেদা জিয়ার ট্রাজেডির চমকপ্রদ ঐকতান!


বাংলাসাহিত্যের একমাত্র(?) ও অনন্য মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’র প্রধান চরিত্র ‘রাবণ’, যার চরিত্রটি কানায় কানায় ট্রাজিক রসে পূর্ণ। যদিও প্রাপ্য ট্রাজেডিটির আমন্ত্রক ‘রাবণ’ নিজেই। অনেকেরই জানা ঘটনাটি সংক্ষেপে এই-“লঙ্কার রাজা ‘রাবণ’ দশরথপুত্র রামের পরমাসুন্দরী স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে নিজ প্রাসাদে বন্দী করে বিয়ে করার জন্যে। স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্যে রাম শান্তিপূর্ণ নানাপন্থা অবলম্বন করেও যখন ব্যর্থ হন, তখন বাধ্য হয়ে সকল মিত্রদের নিয়ে ‘মহাজোট’ গঠন করে লঙ্কা তথা ‘রাবণ’কে আক্রমন করে ক্রমান্বয়ে রাবণের বীরপুত্রদের নিধন তথা হত্যা করে এবং সবশেষে রাবণকে হত্যা এবং তার সাজানো স্বর্ণলংকাকে বিধ্বস্ত করে সীতাকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়” চারিদিক থেকে রামের ‘মহাজোট’ রাবণকে আক্রমন করে যখন একে একে তার সকল বীরপুত্রদের নিধন করে ফেললো, তখন রাবণ নিজেকে তুলনা করে একটি বৃক্ষের সঙ্গে, যাকে কাটার জন্যে কাঠুরিয়া একে একে তার ডালপালাগুলো ছেটে, সবশেষে শিকড়সহ উপড়ে ফেলে শক্তিধর বৃক্ষটি। যার কাব্যিক বর্ণনা দ্রোহী কবি মাইকেলের মহাসৃষ্টি মেঘনাদবধ থেকে –

“বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে
একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে
নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু
তেমতি দুর্ব্বল, দেখ, করিছে আমারে
নিরন্তর! হব আমি নির্ম্মুল সমূলে
এ শরে!”

রাবণের সাজানো স্বর্ণলঙ্কাকে রামের যৌথবাহিনী ছিন্নভিন্ন করে, যেখাবে সুন্দর সাজানো পানের ‘বরজে’ সজারু ঢুকে পানের লতাকে করে ছিন্নভিন্ন। মাইকেলের মহাকাব্যিক বর্ণনা যার

এরকম-

“বরজে সজারু পশি বারুইর যথা
ছিন্নভিন্ন করে তারে, দশরথাত্মজ
মজাইল লঙ্কা মোর”

এবং সবশেষে রাবণের সাজানো স্বর্ণলঙ্কা এবং সকল বীর সন্তানদের হারানোর পর তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কাব্যিক বর্ণনা মাইকেলের মহাসৃষ্টি মেঘনাদবধ থেকে –

“ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে-
বিসর্জ্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে!
সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে” ॥

রাবণের হৃদতন্ত্রী ছিঁড়ে যাওয়া এ কান্নার সঙ্গে কোন কোন পাঠকের হৃদ উৎসারিত প্রকৃত কান্না জড়িত হলেও, বিশ্বের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বী রাম-সীতার উপাসকরা কিন্তু রাবণের বর্ণিত “সপ্ত দিবানিশির কান্নার ট্রাজেডি”তে একটুও বিচলিত না হয়ে বরং বর্ণিত ট্রাজেডি রাবণের সত্যিকার প্রাপ্য ছিল বলে মনে করেন। যে কারণে বিশ্বের কোটি কোটি হিন্দুর কাছে রাবণের ট্রাজেডি হচ্ছে “হাস্যকর ট্রাজেডি”।

বছর ২/৩ আগে ৬ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে অপমানজনকভাবে উৎখাত, তার ৬১-জন ব্যক্তিগত কর্মচারীকে (ব্রুনাইর রাজা নাকি?) অপসারণ, দরজা ভেঙে তাঁর বেডরুমে অনধিকার প্রবেশ, তাকে ধাক্কা মেরে গাড়িতে তোলা এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির বিধতা স্ত্রী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে হৃদয় বিদারক কান্নার দৃশ্য রাবণের ট্রাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুটো ঘটনার মধ্যে চমৎকার হারমোনি বা ঐকতান খুঁেজ পাওয়া যায়।

সীতাকে অপহরণ করার পরও রাবণ কর্তৃক তাকে ফেরত দিলে হয়তো স্বর্ণলঙ্কা রক্ষা পেতেও পারতো কিন্তু রাবণ অপরাধটি করার পরও মারাত্মক ‘গোয়ার্তুমি’ দেখানোর কারণে যেভাবে তার সাজানো রাজ্য নছনছ হয়ে গেল, একইভাবে খালেদা জিয়া কর্তৃক অবৈধভাবে বাড়িটি গ্রহণের পর সরকার কর্তৃক বার বার প্রদত্ত নোটিশের তোয়াক্কা না করা এবং সবশেষে হাইকোর্টের বেঁধে দেয়া ৩০ দিন সময়কেও গ্রাহ্যে না নিয়ে, বস্তি এলাকার সরকারী জমি অবৈধ দখলে রাখা ব্যক্তিদের মত ‘গেট-দরজা বন্ধ করে’ সম্পদ রক্ষা করার নিম্ন মানসিকতার কারণে, সংবাদ সম্মেলনে তার কথিত অভিযোগগুলো হয়তো ঘটতেও পারে। এ ক্ষেত্রে উপরে অভিশিক্ত অভিধার একজন মাননীয় দায়িত্বশীল উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি কিভাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে দরজা-গেট-জানালা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে থাকতে পারে, তা আমাদের মত সাধারণ বুদ্ধিসম্মপন্ন মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ, আদালত কর্তৃক ৩০ দিনের সময়, নিজের মর্যাদাবোধ কিছুই কি তার বিবেককে নাড়া দিতে পারেনি?

অপরদিকে এদেশের মানুষ দেখেছে, যখন বিগত সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নামে বরাদ্দকৃত বাড়ি/জমি বাতিল করা হলো, তাঁরা দুজনেই ‘বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত কন্যার মত’ সম্মান রক্ষার্থে কোনরূপ ‘সিন-ক্রিয়েট’ না করেই, নিজেদের সম্মান নিয়ে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ছেড়ে দিল। এভাবে “লাঠি-সোটা” দিয়ে (বেগম জিয়ার ভাষ্যমত) ধাক্কা দিয়ে তাদেরকে বের করে দিতে হয়নি।

এদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বেগম জিয়াকে অনুরোধ করবো, বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করুন, দেখবেন রাবণের মত আপনার ট্রাজেডি ও কান্নার জন্যে আপনি নিজেই দায়ী। রাবণের বীরপুত্র বীরবাহু এবং দেবতা থেকে বরপ্রাপ্ত মেঘনাদ তথা ইন্দ্রজিতের মত আপনার পুত্রদ্বয় তারেক ও কোকোও নিজ কর্মদোষে এখন নির্বাসিত। আপনি এখন রাবণ নামক “বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে নাশে বৃক্ষে”র অবস্থানে পৌঁছেছেন। আপনি জামাত-হেফাজত প্রীতি আর হরতাল ইত্যাদি নেতিবাচক কর্মকান্ড বাদ দিয়ে এদেশের কল্যাণকর রাজনীতিতে ফিরে আসুন। দেশের জন্যে কাজ করুন, তখন আপনার কান্নায়ও এদেশের লক্ষ-কোটি মানুষের হৃদয় নাড়া দেবে। না হলে রাবণের মত চরম ট্রাজেডিতে পূর্ণ ব্যক্তিকেও মানুষ পুজো করবে না, বরং তার বদলে রাম-সীতার পুজোই চলতে থাকবে অনন্তকাল!

ব্লগারের ফেসবুক আইডি :
https://www.facebook.com/falgunishekh.dipa

২৯ thoughts on “মেঘনাদবধের রাবণ ও খালেদা জিয়ার ট্রাজেডির চমকপ্রদ ঐকতান!

  1. আমার ব্রাউজার সমস্যার কারণে
    আমার ব্রাউজার সমস্যার কারণে একটি কমেন্ট কয়েকবার হয়ে গেছে ।কমেন্ট ডিলিট করার পদ্ধতিও জানা নাই ।অহেতুক বিরক্তির জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *