রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনঃ কিছু জরুরী প্রশ্নের অবতারণা

সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত ও বর্ধিত বেতন-ফি প্রত্যাহারের দাবিতে গত ২১ জানুয়ারি থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হলেও সেটা গতকালের আগে পত্রিকার পাতায় কিংবা টিভির পর্দায় ‘সেইভাবে’ স্থান পায়নি, ফলে সারাদেশে তা প্রচারিতও তেমনভাবে হয়নি। তবে গতকাল দেশের সবগুলো পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়া রাবি’র ছাত্র আন্দোলনকে ‘স্থান’ দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে দেশবাসী বিষয়টা একমাত্রায় জেনেছেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা বিভিন্ন পরিসরে মতামতসহ বিবেচনাও করেছেন।


সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত ও বর্ধিত বেতন-ফি প্রত্যাহারের দাবিতে গত ২১ জানুয়ারি থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হলেও সেটা গতকালের আগে পত্রিকার পাতায় কিংবা টিভির পর্দায় ‘সেইভাবে’ স্থান পায়নি, ফলে সারাদেশে তা প্রচারিতও তেমনভাবে হয়নি। তবে গতকাল দেশের সবগুলো পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়া রাবি’র ছাত্র আন্দোলনকে ‘স্থান’ দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে দেশবাসী বিষয়টা একমাত্রায় জেনেছেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে তারা বিভিন্ন পরিসরে মতামতসহ বিবেচনাও করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান বিভিন্ন ধরনের। শিক্ষা প্রশ্নেও তেমন ভিন্নতা বর্তমান। মোটাদাগে পক্ষ দুইটা; শিক্ষা বাণিজ্যের পক্ষের শক্তি আর শিক্ষা বিস্তারের পক্ষের শক্তি। আবার রাবি’র ছাত্র আন্দোলন প্রশ্নেও দুইটা পক্ষ; আন্দোলনকারী আর আন্দোলন দমনকারী। বিরোধী পক্ষগুলো একজন অন্যজনকে খারিজ করছেন, একজনের যুক্তি অন্যজনের কাছে অসার ও হাস্যকর মনে হচ্ছে।

কিন্তু উৎপাদনমূখী অর্থনীতি বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষেও একটা পক্ষ আছে। বোধ করি দেশের বেশিরভাগ মানুষ মর্মবস্তুতে এই পক্ষেই অবস্থান করেন !!!

বিবেচ্য একঃ ‘শিক্ষা বৈষম্যের’ শুরু কোথায় ?

একটা দেশের ‘জাতীয় সংহতি’ প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যতম প্রধান জরুরী বিষয় হলো- সেই দেশের প্রতিটা শিশু একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত একই শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে কিনা। কোন শিশুর প্রতিভা কোন দিকে বিকশিত হবে তার জন্যও একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত কিছু সাধারণ বোঝাপড়া জরুরি। তারপর শিশুর ঝোঁক ও মেধার ভিত্তিতে তাকে বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত করলে শিক্ষার সাথে মনের সংযোগ ঘটবে, যাতে করে তার যোগ্যতা-দক্ষতার সর্বোচ্চ বিকাশ ‘জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে’ যুক্ত হবে। তখন সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির (ততোদিনে শিশু ব্যক্তি হয়ে উঠবে) যোগ্যতা-দক্ষতা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার হবে না, তা হবে জাতীয় সম্পদের অংশ। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে শুরু থেকেই শিক্ষা বিষয়টা বহুধা বিভক্ত। ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়ামের ইংলিশ ভার্শন, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা মাধ্যম, বেসরকারী কিন্ডার গার্টেন, মাদ্রাসা (আলিয়া ও কওমী), মসজিদ ভিত্তিক মক্তব ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বিভক্তির ‘একমাত্র’ কারণ অর্থনীতি। যা আবার আরো দূর্বল ‘জাতীয় অর্থনীতি’র নিয়ামক হিসেবেই কাজ করছে। ফলে দিন দিন দেশের অর্থনীতি হয়ে পড়ছে দূর্বল ও পরনির্ভরশীল (সাম্রাজ্যবাদ কবলিত)।

কে কোথায় শিক্ষা গ্রহণ করবে তা যখন প্রাথমিক স্তরেই ঠিক হচ্ছে অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে, ফলে সেখানেই ঝড়ে পড়ছে বিপূল অধিকাংশ শিশু। মাধ্যমিক স্তরে এসে এই বৈষম্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রাইভেট টিউশন আর কোচিং সংক্রান্ত সামর্থ্যের মাপকাঠিতে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আরো স্পষ্ট হয় বৈষম্য, উচ্চশিক্ষায় আরো আরো… ।

ফলে এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি সহিংস ব্যবস্থা। যেখানে একজন অন্যজনকে পরাস্ত না করলে তথাকথিত ‘উপরে উঠা’ যায় না। অর্থনৈতিক সামর্থ্যই অন্যকে পরাস্ত করার হাতিয়ার, মেধা নয়। কারণ ‘মেধা-জ্ঞান’ অন্যকে জয় করে, অন্যকে ধারন করে সামগ্রিক হয়ে ওঠে।

বিবেচ্য দুইঃ সবার জন্য উচ্চশিক্ষার দরকার আছে কি?

উচ্চশিক্ষা একটা বিশেষায়িত ও গবেষণা নির্ভর শিক্ষা, বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চার সাথে তা যুক্ত। ফলে উচ্চশিক্ষা মানুষের সাধারণ মৌলিক অধিকার ভোগ করার জন্য আবশ্যিক নয়। উচ্চশিক্ষা মূলতঃ যোগ্যতা অনুযায়ী সামাজিক-সামগ্রিক এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রয়োজনে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। ব্যক্তির জীবনধারণের প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষা নয়, বরং দেশের সকল জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার জন্য জরুরী। ফলে তা হবে বিশেষত উৎপাদনমুখী। ফলে “কেরানীর চাকুরী পাওয়ার জন্যও উচ্চশিক্ষার ডিগ্রী-সার্টিফিকেট লাগবে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে”— এই যদি হয় উচ্চশিক্ষার অবস্থা(!!!) তখন সেই উচ্চশিক্ষা দিয়ে জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ হবে না, হচ্ছে না। যা হচ্ছে এবং যা সামনে আরো হবে তা হলো- ‘শিক্ষা ব্যবসা’। ফলে জেলায় জেলায় ‘শিক্ষা ব্যবসার দোকান’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জাতীয় সক্ষমতা বাড়াবে না, জাতীয় অর্থনীতিকেও করবে না উৎপাদনমূখী। যা দরকার তা হলো- কৃষি-শিল্পায়নের বিকাশ ঘটিয়ে, উৎপাদনমুখী শিক্ষার উপযোগী কারিকূলাম ঠিক করে প্রত্যেকের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এবং সেভাবে সবাইকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করা, কর্মক্ষম হিসেবে গড়ে তোলা। আর সেই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য, সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্যই বিশেষায়িত ও গবেষণা নির্ভর শিক্ষাই রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে প্রদান করবে উচ্চশিক্ষা স্তরে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রী না নিয়ে নূন্যতম মৌলিক অধিকার ভোগ কিংবা সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করার মতো কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কতোটুকু? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন তুলতে হবে, বাংলাদেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় কি শেখানো হচ্ছে আর চাকুরীতে কি কাজ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের কোচিং টাইপের উচ্চশিক্ষায় একদিকে যেমন ‘খাবার বিতরণ করার আধুনিক শিক্ষা’র প্রসার লক্ষ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে মৌলিক বিষয়গুলোর (ইতিহাস, দর্শণ, সাহিত্য, পদার্থ, রষায়ন ইত্যাদি) প্রতি চরম অবহেলা ও উন্নাসিকতাও প্রতিয়মান হচ্ছে। কাজেই তৈরি হচ্ছে না দার্শনিক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ…। ফলে উচ্চশিক্ষা হয়ে পড়ছে পুরোটাই বাজারী, মৌলিক জ্ঞানের সাথে ও সমাজের উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন এবং সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস তৈরির শিক্ষা হিসেবে। কর্পোরেট সেবাদাস হিসেবে উচ্চশিক্ষিত যুবক কিংবা যুবতী কোট-টাই পড়ে বিভিন্ন টাইপের পণ্য বিক্রি করছে বিশেষ বিশেষ স্বার্থে। যার সাথে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে দেশ আরো বেশি পরনির্ভরশীল হচ্ছে। মানুষ হয়ে পড়ছে পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন।

রাবি’তে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যে সকল জরুরী প্রশ্ন সামনে এসেছেঃ

১…
বেশিরভাগ শিক্ষক (সবাই নন) যুক্তি দিচ্ছেন যে, তাদের টাকা নাই ফলে সান্ধ্যকালে প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু টাকা তারা আয় করতে চান। যাতে করে কিছুটা উন্নত জীবন তারা ‘যাপন’ করতে পারেন।

অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, শিক্ষকদের বেতন পর্যাপ্ত নয়। হ্যা, ঠিক কথা। শিক্ষকরা যে বেতন পান তাতে তাদের পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন কষ্টকর। গবেষণায় তাদের জন্য বরাদ্দ খুবই কম, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই। ফলে শিক্ষকদের ‘জ্ঞান চর্চা’ও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

এই কথাগুলো ছাত্ররা বোঝে, জানে। ছাত্রদের বেতন বাড়লে যেমন জীবনযাপন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তেমনি শিক্ষকদের বেতন কম হওয়ার কারনে তাদেরও কষ্ট করতে হচ্ছে। ছাত্ররা বেতন কমানোর জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার- কষ্ট সহ্য করেও জ্ঞান চর্চাকারী মহান শিক্ষকদের তাদের বেতন কিংবা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বিষয়ে কোনদিন দল বেঁধে কথা বলতে দেখা যায় না। বরং যখন বাংলাদেশের শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মাঠে নামেন, তখন সেই শিক্ষকেরাই মালিকদের পক্ষ নিয়ে সুশীল সেজে মতামত প্রদান করতে থাকেন, যা দালালীর পর্যায়েই পড়ে। তবে তারা দল বাঁধেন, কথাও বলেন— কিন্তু সেটা সাদা কিংবা নীল রংযের ব্যানারের পেছনে। বেশিরভাগ শিক্ষক সাদা কিংবা নীলে বিভক্ত থাকলেও ছাত্রদের বেতন-ফি বৃদ্ধি কিংবা সান্ধ্যকালীন কোর্সের মতো শিক্ষা ব্যবসার ক্ষেত্রে ভেদাভেদ ভুলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যান !!! শিক্ষকদের এই ‘রাজনৈতিক সাদা-নীল বিভক্তি’ এবং ‘শিক্ষা ব্যবসার ক্ষেত্রে আবার তাদের একই কাতারে দাঁড়িয়ে যাওয়া’ মূলতঃ লুণ্ঠনকেন্দ্রীক ক্ষমতা কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই পরিচালিত হয়।

২…
যে শিক্ষকগণ আজ বেতন-ফি বৃদ্ধি কিংবা সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্সের পক্ষে সাফাই গাইছেন তারা কি একটিবার ভাববেন তাদের সময়ে কতো ছিল বেতন-ফি !!! তাদের বেশিরভাগ সদস্যই তো সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মান নি। অধিকাংশই তো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারী হাই স্কুল, সরকারী কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী বৃত্তিতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা… তারপর শিক্ষক। অর্থাৎ তাদের প্রায় গোটা শিক্ষাজীবনটাই তো জনগণের পয়সায় চলেছে। তাহলে এখন তাদের এই হাল কেন? এটা কি নিজেদের অতীত ভুলে যাওয়ার চেষ্টা, নাকি আত্মপ্রতারণা। নাকি শ্রেনী উত্তরণের আত্মতুষ্টিতে বোধশূন্যতায় আত্মহারা !!!

৩…
ছাত্রদের বেতন-ফি বৃদ্ধির পক্ষের লোকজন একটা যুক্তি বার বার উত্থাপন করে থাকেন যে, “ছাত্ররা এখন প্রচুর টাকা খরচ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাহলে তারা বেশি বেতন দিয়ে পড়বে না কেন ?” হ্যা, আসলেই এখন ছাত্ররা প্রচুর খরচ করে। কারণ এখন প্রচুর খরচ করা ছাত্ররাই শিক্ষা কেনার সুযোগ পায়, কেননা তা প্রাথমিক স্তর থেকেই নির্ধারিত হয়ে পড়ে। সমাজের সর্বত্রই যখন এই বৈষম্য বিরাজ করছে তখন ছাত্রদের দোষ কি? কিন্তু প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্রের শিক্ষানীতিতে “মেধা-জ্ঞান থাকা এবং তার সাপেক্ষে রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তার অনুপাতে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রদান-গ্রহণ” না হয়ে যদি “টাকা যার শিক্ষা তার” নীতি অবলম্বন করা হয়, তাহলে জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ ঘটে কিনা। এর উত্তর স্পষ্টতই, ‘না’। কারণ টাকা যেখানে নিয়ামক সেখানে শিক্ষা, মানবিকতা উবে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক।

৪…
“রাষ্ট্রের টাকা নাই, দেশ গরিব”- এই ডাহা মিথ্যা কথাগুলো আজ অধিক ব্যবহারে ‘প্রবাদপ্রায়’ ও ‘সত্য’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সুশীল লোকগুলো এই কথাগুলো বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন তারা অবশ্য কথাটা মানেন না। বাংলাদেশের লুটপাটকেন্দ্রীক অর্থনীতিতে “রাষ্ট্রের টাকা নাই, দেশ গরিব” ইত্যাদি বলেই লুটপাট চালানো হয়। খুব বেশি নয়, শুধুমাত্র বাংলাদেশের ব্যাংক লুটের টাকার সাম্প্রতিক হিসাব, কিংবা শেয়ার বাজার থেকে টাকা লোপাট করার হিসাব কষলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে দেশে টাকা আছে কি নাই। যে পরিমাণ অর্থ লুটেরা শাসকশ্রেনী বিদেশে পাচার করে থাকেন তা কোন দেশের টাকা !!! সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব করতে গিয়ে দেশের সম্পদ বিকিয়ে দিয়ে যে পরিমাণ ডাকাতি এই সরকারগুলো করে তা কই যায়? শুধুমাত্র বিদ্যুত খাতেই কুইক রেন্টালের নামে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা জনগণের পকেট কেটে লুট করা হয়েছে। দেশের সর্বস্তরে এই সরকারগুলোর সাথে যুক্ত লুটেরারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেয়ার সময় রাষ্ট্রের কাছে টাকা থাকে না, বেতন-ফি বাড়াতে হয়। তখন সেই আর্থিক সুবিধাভোগীদের সন্তানেরাই শিক্ষা পায়, বঞ্চিত হয় বিপুল অধিকাংশ জনগণ।দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, জনশক্তি ইত্যাদিই টাকায় রুপান্তরিত হয়। কিন্তু এই বাংলাদেশের লুটেরা শাসকগোষ্ঠী সেই সম্পদগুলো কমিশন খেয়ে পানির দামে বিকিয়ে দেয়। আর বলতে থাকে ‘টাকা নাই, টাকা নাই’। জনগণের সাথে ভাঁড়ামি ও প্রহশণমূলক নির্বাচনের জন্য ৩০০ কোটি টাকা খরচ করার সময় টাকার অভাব হয় না।যারা বলেন, বলছেন ‘দেশ গরিব, দেশের টাকা নাই’ তারা মূলতঃ এই লুটপাটকেন্দ্রীক অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখে লুটের ভাগ নেয়ার পক্ষে এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের উপযোগী উৎপাদনমূখী অর্থনীতি নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন।

৫…
সাম্রাজ্যবাদী উন্নয়ণ মডেলের আদলে উন্নত হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। ক্যাম্পাসকে বানানো হচ্ছে গাছ-ঘাস-মাঠশূন্য ‘ইটের বস্তি’। ক্লাসরুমে এসি লাগানো হচ্ছে। লাগানো হচ্ছে লিফট। কিন্তু পাশাপাশি লাইব্রেরী হয়ে পড়ছে বইশূন্য, ল্যাব হয়ে পড়ছে গবেষণাহীন। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র কিংবা শিক্ষক কোন পক্ষ থেকেই তেমন কোন জার্নাল বের হয় না, নাই কোন সাংস্কৃতিক পরিবেশ। ফলে মুক্তচিন্তা চর্চার বালাই নাই। এগুলোকেই আমাদের বিদগ্ধ শিক্ষক, সুশীল সমাজ শিক্ষা উন্নয়ণ বলে প্রচার করছেন।

এই উন্নয়ন মডেল মানে আপামর জনগণের “অনুন্নয়ণ ও শোষনের মডেল”, শিক্ষা ধ্বংসের মডেল। ছাত্রদের পকেট কেটে টাকা মেরে এই ধরনের উন্নয়ন শিক্ষাকে ধ্বংসই করবে, বিস্তার ঘটাবে না।

৬…
“ডিগ্রীর চাহিদা বাজারে আছে তাই ডিগ্রী দেয়া দরকার; এবং তা বেশি দামেই”— এই কথাও অনেকে বলছেন, বিশেষ করে ব্যবসার সাথে জড়িত শিক্ষকবৃন্দ। শুরুতেই আলোচনা করেছি যে, উচ্চশিক্ষা জ্ঞান উৎপাদনের সাথে যুক্ত। ফলে বাজারে চাকুরীর সাথে কী যুক্ত আর কী যুক্ত নয়- তা দিয়ে উচ্চশিক্ষা নির্ধারিত হয় না। ফলে চাকুরীর বাজারে যে ডিগ্রীর চাহিদা আছে তা উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে পড়ে না। তাছাড়া বাংলাদেশের পরনির্ভরশীল অর্থনীতিই মূলতঃ এই তথাকথিত ডিগ্রীর চাহিদা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবসাও হচ্ছে আবার উচ্চশিক্ষিত লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও দাবী করা যাচ্ছে।

ফলে ডিগ্রীর চাহিদা মেটানোর জন্য কোচিং টাইপের কোর্সকে উচ্চশিক্ষা বলে চালানো শিক্ষা ধ্বংসেরই নামান্তর। এবং”চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, চাহিদা কমলে দাম কমে” ধরনের কথা শিক্ষকদের কিংবা প্রগতিশীল মানুষের কথা নয়; বরং ব্যবসায়ী মহাজন বা খুচরা দোকানদারদের মুখেই মানায়।

৭…
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ব্যাপক চিন্তা। যে বিশ্বব্যাংক সারা দুনিয়ায় বিশেষ করে প্রান্তিক দেশগুলোর অর্থনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা। কিন্তু ইউজিসি সেই বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশানেই ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র বাস্তবায়নের পথে হাটছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের জন্য যে প্রতিষ্ঠান দায়ী সে কিভাবে আমাদের শিক্ষানীতির নিয়ন্ত্রক হতে পারে। আজ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সরকারী ভর্তুকী তুলে নেয়া, নতুন হল নির্মাণ না করা, মৌলিক বিষয়গুলো ধীরে ধীরে তুলে দিয়ে বাজারী বিষয়ের প্রাধান্য দেয়া— এসবই এই ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্রের মধ্যেই রয়েছে। অর্থাৎ এই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস হয়েই শিক্ষাসহ সকল সেবাখাত প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দেয়ার তৎপরতার সাথে যুক্ত।

আন্দোলন দমনে রাবি প্রশাসন ও সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠনসমূহের ঘৃণ্য রাজনৈতিক কৌশল
আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ঢোকার চেস্টা করেছিল। আন্দোলনকারী ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হতে পারেনি। তখন তারা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। আন্দোলনকারীদের শিবির বলে আখ্যা দিতে শুরু করে। আমরাও জানি এবং ইতিহাসও সাক্ষী দেয় যে, কোন কালেই ছাত্রদের স্বার্থের ন্যায্য আন্দোলনে শিবির থাকতে পারে নাই। কখনোই শিবির ছাত্রস্বার্থের পক্ষের শক্তি নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম প্রশাসনের মদদে পুলিশের উপস্থিতিতেই ক্যাম্পাসে ককটেল ফাটিয়ে আতংক সৃষ্টি করা হয়েছে। কে বা কারা তা করেছে তা খুজে বের না করে ঢালাও ভাবে দায় চাপানো হয় আন্দোলনকারীদের উপর। অথচ আন্দোলন শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ ভাবেই সংগঠিত হচ্ছিল। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন গত ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে নগ্ন হামলা চালায়। ছাত্রলীগের মাস্তানরা পুলিশের সহযোগি হিসেবে প্রকাশ্যেই গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ করে প্রায় ২০ জন ছাত্রকে, আহত করে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে। সেই সুযোগে প্রশাসন ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে।

শিবির আখ্যা দিয়ে হামলাকে ‘ন্যায্যতা’ দেয়ার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে আজ (৪ ফেব্রুয়ারি) যখন মামলা দায়ের করা হলো সেখানে দেখা গেল মামলার আসামী প্রায় সবাই বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। রাবি প্রশাসন ও পুলিশ ছাত্র ফেডারেশন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৭ জন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ৫ জন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৩ জন এবং ছাত্র ইউনিয়নের ৩ জন নেতাকর্মীসহ মোট ৫০ জনের নামে মামলা দায়ের করেছে।

অর্থাৎ শিবির ট্যাগ দিয়ে হামলা-গুলি করে আন্দোলন দমন এবং মামলা করে প্রগতিশীল শক্তিকে দমন করার রাজনৈতিক তৎপরতাই চালাচ্ছে রাবি প্রশাসন, সর্বোপরি এই সরকার। এই ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী অংশের সাথে তাদের কোন বিরোধ নাই। শিক্ষকদের মধ্যেও এই বিষয়ে সাদা কিংবা নীলের কোন তফাত নাই।

ছাত্রসমাজের প্রতি আহবান
খুব ভালো করে খেয়াল রাখতে হবে– “সন্ত্রাসীদের তিনটি দল, লীগ-শিবির-ছাত্রদল”। এবং “নৌকা-পাল্লা-লাঙ্গল-শীষ, সবার দাঁতেই লূটের বিষ”। তাই জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির বিকাশের জন্য যারা শিক্ষিত হতে চান, মানুষ হতে চান তাদেরকে এই লুটেরাদের কবল থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। ৭১’এ জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে শামিল হতে হবে।

৭ thoughts on “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনঃ কিছু জরুরী প্রশ্নের অবতারণা

  1. আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার

    আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ঢোকার চেস্টা করেছিল। আন্দোলনকারী ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হতে পারেনি। তখন তারা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। আন্দোলনকারীদের শিবির বলে আখ্যা দিতে শুরু করে। আমরাও জানি এবং ইতিহাসও সাক্ষী দেয় যে, কোন কালেই ছাত্রদের স্বার্থের ন্যায্য আন্দোলনে শিবির থাকতে পারে নাই। কখনোই শিবির ছাত্রস্বার্থের পক্ষের শক্তি নয়।

    কুনটা সত্য? আপনের এই কথাগুলো নাকি খবরের সংবাদ এবং চিত্রগুলো? রাবির ছাত্রদলের সহ-সভাপতি স্বীকার করছে যে ঐ আন্দোলনে শিবির ছিলো এমনকি জ্বালাও পোড়াও করেছে আর আপনি বলছেন শিবির ছিলোই না!!!

    ছাত্রলীগরে গালি দিতে মুঞ্চাইছে যখন তাইলে এত্তো প্যাঁচানির কি দরকার? ডাইরেক্ট গালি দিয়া দেন কেউ তো ধরে রাখে নাই। রঙ মেখে সং সেজে মেকি বিনোদন না দিলেই কি নয়!!!!

  2. নিজেই কানা পথ চিনে না,পরকে
    নিজেই কানা পথ চিনে না,পরকে ডাকে বারংবার।
    জামাত-শিবির রাজাকার এই মুহুর্তে বাংলা ছাড়।

    সন্ত্রাস করে তিনটি দল
    লীগ-শিবির-ছাত্র দল।

    নৌকা-পাল্লা-লাংগল-শীষ
    সবার দাতেই লুটের বিষ।

    1. বৎস সৈকত, এড়াইয়া যাওয়া কিন্তু
      বৎস সৈকত, এড়াইয়া যাওয়া কিন্তু “ম্যা ম্যা” কারীদের লক্ষণ। খিয়্যাল কইরা কিন্তুক, আমি স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে কিছু প্রশ্ন করলাম আর সেসবের উত্তর না দিয়েই কপিতা না মারিয়ে উত্তর দিলেই ভালো হয়। ভন্ডামি করে সবখানে ছাড় পাওয়া যায়, আওয়ামীলীগকে হুদাই গালি দিলে সবখানে বাহবা পাওয়া যায় কিন্তু ইস্টিশনে অন্তত আমি থাকা পর্যন্ত হুদা মিছা অপবাদ আওয়ামীলীগরে লাগাইলে একচুল ছাড় দেওয়া হবে না।

      1. মজা পাইলাম ইনার ম্যা ম্যা
        মজা পাইলাম ইনার ম্যা ম্যা শুনে… :হাসি: হেডম থাকলে স্পষ্ট প্রশ্নের সরাসরি দিয়া যান সৈকত সাব… :মানেকি: :এখানেআয়: যদিও আপনার পোস্ট পড়ে আপ্নের হেডম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা হয়ে গেছে… :ক্ষেপছি: :এখানেআয়:

        1. আবারো…… একই উত্তর দিলেই
          আবারো…… একই উত্তর দিলেই হতো।
          তবে তার আগে কয়েকটা কথা কই ভাই…
          ১। পত্রিকায় কী ছবি এসছে ?
          ২। অংশগ্রহণকারী হিসেবে শিবির থাকাটা অস্বাভাবিক না, ঠিক যেমন ছাত্রলীগের চেস্টা। কিন্তু নেতৃতে কি তারা থাকতে পেরেছে ?

          নিজেই কানা পথ চিনে না,পরকে ডাকে বারংবার।
          জামাত-শিবির রাজাকার এই মুহুর্তে বাংলা ছাড়।

          সন্ত্রাস করে তিনটি দল
          লীগ-শিবির-ছাত্র দল।

          নৌকা-পাল্লা-লাংগল-শীষ
          সবার দাতেই লুটের বিষ।

Leave a Reply to রাজু রণরাজ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *