বোধোদয়

আলমারি থেকে সবচেয়ে নতুন আর পরিষ্কার পাঞ্জাবীটা বের করে গায়ে চড়ালেন মোঃ সামসুল ইসলাম। নিজের দশ বছরের ছেলে রোহানকেও সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। আজ অনেক পুণ্যের কাজ করতে যাচ্ছেন দুজন। ছোটো বয়স থেকেই ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা না দিলে আধুনিক জমানায় চরিত্র ভাল রাখা কঠিন হবে – ভাবতে ভাবতে নিজের ও ছেলের গায়ে ইরানী আতর মেখে নিলেন সামসুল। তারপর বউ আর পনেরো বছরের মেয়ে সামিহার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলেন।


আলমারি থেকে সবচেয়ে নতুন আর পরিষ্কার পাঞ্জাবীটা বের করে গায়ে চড়ালেন মোঃ সামসুল ইসলাম। নিজের দশ বছরের ছেলে রোহানকেও সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। আজ অনেক পুণ্যের কাজ করতে যাচ্ছেন দুজন। ছোটো বয়স থেকেই ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা না দিলে আধুনিক জমানায় চরিত্র ভাল রাখা কঠিন হবে – ভাবতে ভাবতে নিজের ও ছেলের গায়ে ইরানী আতর মেখে নিলেন সামসুল। তারপর বউ আর পনেরো বছরের মেয়ে সামিহার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলেন।

আজ ৬ এপ্রিল ২০১৩, বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্যে এক মহান দিন। আজ নির্ঘাত অনেক পুণ্য হবে! ছেলের হাত ধরে রাস্তায় নেমে পড়লেন তিনি। এতক্ষণ দুষ্ট ছেলে রোহান সাজুগুজুতে মুগ্ধ হয়ে চুপ ছিল। কিন্তু রিকশায় উঠতেই মুখ দিয়ে প্রশ্নের ফোয়ারা ছোটাতে শুরু করলো।

“বাবা আমরা কোথায় যাচ্ছি? ঈদের নামাজ তো সকালে হয়। আমরা এই দুপুরে কই যাব?”

ছেলেকে চুপ করানোর জন্যে সামসুল বললেন, “আজ ঈদ থেকেও অনেক বড় দিন বাবা। আজ আমাদের পবিত্র ধর্মের ইজ্জত রক্ষার দিন।“

খুব বুঝেছে এমনভাবে রোহান মাথা নাড়ালো, “হুম!! আমাদের যেতে কতক্ষণ লাগবে?”

“বেশিক্ষণ না। আজ হরতাল তো, রাস্তা ফাঁকা। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।“

“তুমি বললে ঈদ থেকেও অনেক বড় দিন। তাহলে সবাই যাচ্ছে না কেন?”

“কারণ দুষ্ট ছেলেরা হরতাল ডেকেছে, তাই।“

“এমন দিনে হরতাল ডাকল কেন? ওরা মুসলমান না?”

সামসুল মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। শাপলা চত্বরে যেতে আরও ২০-২৫ মিনিট লাগবে। এর মাঝে রোহানের প্রশ্নের চোটে মেজাজের বাঁধ ভেঙ্গে না গেলেই হয়। “দেখ বাবা তুমি এখনো ছোট। এইসব বোঝার মতো জ্ঞান হয় নি। আরেকটু বড় হলে বুঝতে পারবে।”

এই কথা শুনতে শুনতে রোহান দশ বছরে পড়েছে। তাই কথাটা ওকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখতে পারলো না। যথারীতি ছেলের কৌতূহল মিশ্রিত প্রশ্ন সামসুলের কানে প্রবেশ করলো, “আজ কি ওইখানে ঈদের মত নামাজ হবে, বাবা?”

“না হবে না।“ উত্তপ্ত কণ্ঠে বললেন সামসুল। “তুমি বেশী কথা বলছ। এমনিতে রোদের তাপে মাথা গরম হয়ে আছে। একটু চুপ করে বস তো।“

বাবার বিরক্তি ছেলের মাঝেও সংক্রমিত হল।
প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ও বলল, “তাহলে এত গরমে আমাকে পাঞ্জাবী পরিয়েছ কেন? গত ঈদের পরে আমি এত করে চাইলাম কিন্তু আম্মু লাল পাঞ্জাবীটা পরতে দিল না। পার্কে যাওয়ার সময় নতুন লাল টি-শার্টটা পরিয়ে দিল।“

সামসুল নরম হলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে। এখন চুপ কর বাবা। মাথা ধরেছে।“

বাবার নরম কণ্ঠ রোহানকে আবারো প্রশ্ন করতে সাহসী করে তুলল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ও জিজ্ঞেস করলো, “তুমি যে বললে ঈদের থেকে বড়… ধর্মের ইজ্জতের প্রশ্ন… এসব কী বাবা? আসলে কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

আবারো মেজাজ বিগড়ে গেল সামসুলের। কিন্তু যথাসম্ভব ঠাণ্ডা মেজাজে উত্তর দিলেন, “শাহ্‌বাগের ছেলেরা আমাদের ধর্মকে অপমান করেছে। তাই আমরা এর প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি।”

রোহান ভ্রু কুঁচকে ফেলল, “কেন বাবা? শাহ্‌বাগে তো তুমি সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলে। সবাই কত সুন্দর গান গাইল, দেশের কথা বলল, তুমিও দাদুর কথা বলে কত গর্ব করলে। তাহলে শাহ্‌বাগ কী করলো?”

বিপদের আভাস পেলেন সামসুল। ৮ ফেব্রুয়ারির সমাবেশে ছেলে-মেয়ে-বউ নিয়ে তিনিও উপস্থিত হয়েছিলেন। এখন ছেলেকে বুঝাবেন কী করে সেই শাহবাগ আর এই নাস্তিক শাহবাগের পার্থক্য?

“হয়েছে কি রোহান, আমরা ভেবেছিলাম ওরা ভালোর জন্যে আন্দোলন করছে। কিন্তু এখন দেখছি তারা আমাদের ধর্মকে অপমান করছে। তাই সবাই শাহবাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো।”

রোহানের মাথায় ঢুকল না কিছু। “তুমি আগে বুঝ নি শাহ্‌বাগের সবাই এত খারাপ? তাদের সাথে তো তুমিও অনেক স্লোগান দিয়েছিলে, আমরাও দিয়েছিলাম। তাহলে কি আমরা সবাই ভুল করেছিলাম?”

বাবা-পুত্রের কথোপকথনে শ্রোতার ভূমিকা পালন করা রিকশাওয়ালা আর চুপ থাকতে পারলেন না। মুচকি হেসে বললেন, “হইছে কি বাবা, ওইখানের কিছু ছেলে আমাদের নবীকে অপমান করে কথা বলছে। তাই সবাই কষ্ট পাইয়া আজ এক হইছে।“

চত্বর থেকে একটু দূরে থাকতেই রিকশা ছেড়ে দিলেন সামসুল। ছেলের হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন সামনের দিকে। কিছুক্ষণ পর বিশাল জনসমুদ্র দেখা গেল। অবস্থা আগ্রাসী দেখে ছেলেকে বললেন, “বাবা, তুমি যে শাহ্‌বাগ গেছ এইসব নিয়ে কাউকে কিছু বলবে না। ঠিক আছে?“

ঘণ্টা দেড়েক থাকার পর ছেলেকে নিয়ে অন্ধকার হওয়ার আগেই বাসায় ফেরার জন্যে রওনা দিলেন সামসুল। অনেক দূর হাঁটার পর একটা রিকশা পেলেন। ভাগ্য ভাল যে আগে বের হয়েছেন। দেরী করলে আর রিকশা পাওয়া লাগতো না।

রোহানের মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। কখন বাবাকে জিজ্ঞেস করবে এই অপেক্ষায় থেকে থেকে ওর পেটে গুড়গুড়ানি শুরু হয়ে গেছে। তাই রিকশায় উঠেই ছুঁড়ে দিলো প্রশ্নের বাণ, “আচ্ছা বাবা, সবাই এতো রেগে ছিল কেন? শাহ্‌বাগের আঙ্কেলেরা কতো সুন্দর সুন্দর মানচিত্র এঁকেছিল, কত কী করেছিল! আর এরা এমন কেন? আব্বু, কারা ভাল?”

রিকশায় ওঠার আগে কেনা চিপসের প্যাকেট খুলে ছেলের হাতে দিয়ে বললেন, “শাহ্‌বাগের গণজাগরণের ঘটনা সরাকারের সাজানো ছিল। এরা খালেদা জিয়াকে বিপদে ফেলতে এমনটা করেছে। এইখানে দেশপ্রেম নেই, রাজনীতি আছে। এজন্য সবাই খেপেছে।“

চিপস হাতে রোহান চিন্তিত হয়ে বলল, “আজকের আঙ্কেলরা সবাই কোথায় পড়ে?”

অবাক হয়ে উত্তর দিলেন সামসুল, “বেশীর ভাগই মাদ্রাসায় পড়ে। কেন বাবা?”

“আমাকে কি তুমি মাদ্রাসায় পড়াবে?” সামসুল বেশ ধাক্কা খেলেন। ছেলে যে কোত্থেকে কই যাচ্ছে, বুঝতে পারছেন না।

“কী বল বাবা? তুমি তো হবে ডাক্তার। তুমি ঢাকা মেডিক্যালে পড়বে।“

“তাহলে শাহ্‌বাগের ইমরান আঙ্কেল কীভাবে খারাপ হয়, বাবা? উনি না ডাক্তার?”

থতমত খেলেন সামসুল। ছেলে এইদিক দিয়ে আক্রমণ করবে, বুঝেন নি। সামলানোর জন্য বললেন, “ইমরান নয়, অন্য কিছু খারাপ ছেলে এইসব করেছে। আবার ইমরানও হতে পারে।“

কণ্ঠে খুব একটা জোর পেলেন না সামসুল। “আচ্ছা বাবা, তুমি কত বিখ্যাত বিখ্যাত কবি-লেখকদের দেখিয়েছিলে ওইদিন। তাহলে? ওনারা সবাই কি খারাপ? আর আজকের মিছিলে কোন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নাই?”

“না বাবা। ওরা তো ধর্মের জন্যে পড়ে। ওরা আমাদের নামাজ পড়াবে, কুরবানিতে গরু জবাই করবে। বাসায় মিলাদ পড়াবে।“

কয়েক মুহূর্ত রোহান চিন্তা করলো ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু খুব একটা স্পষ্ট হল না। “আচ্ছা বাবা, আজকের হুজুরেরা যে নাস্তিকদের ফাঁসি চাইলো, ওই নাস্তিক কারা?”

“যারা আমাদের মহানবীকে অপমান করেছে, তারাই নাস্তিক। ওদেরই ফাঁসি চেয়েছে সবাই, বুঝেছ?”

“হুম। জানো আব্বু, আমাদের ক্লাসের একটা ছেলে যারা শাহ্‌বাগ গেছে, সবাইকে বকেছে। অপমান করেছে। বলেছে তুমি নাকি কিসের দালাল! এখন কি ওই ছেলেটার ফাঁসি চাইব আমি? ও তো আমাকে, তোমাকে অপমান করেছে।” ঢোঁক গিললেন সামসুল।

“দেখ, ও ছোট মানুষ, তাই ভুল করেছে। বড় হলে এমন করতো না।“

“জানো, ও মুক্তিযোদ্ধাদেরও গালি দিয়ে কথা বলে। ওর অবশ্যই ফাঁসি হওয়া উচিৎ!”

রোহানের তীব্র কণ্ঠ সামসুলের আত্মা কাঁপিয়ে দিলো। আত্মজের সরল দৃষ্টি উনার চিন্তায় প্রভাব ফেলতে শুরু করলো। আসলেই তো শাহ্‌বাগ আর হিফাজতের মাঝে অনেক পার্থক্য। আসলেই তো আমরা নিজেদের ছেলেকে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর বিষয়ে চিন্তা করি আর মাদ্রাসার ছেলেদেরকে ব্যবহার করি ধর্মান্ধতা উশকে দিতে। তাহলে কি এরা ভুল?

প্রতিটি বিপ্লবের প্রতি বিপ্লব থাকে। তাহলে কি শাহ্‌বাগ নাটকের প্রতি নাটক এইটা? না না। শাহবাগে তো কোন নাটক হয় নি। বিপ্লব হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। তাহলে কোন বিপ্লবের প্রতি বিপ্লব শাহ্‌বাগ? নাকি শাহ্‌বাগেই বিপ্লবের শুরু যা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল? অযথা শাহ্‌বাগের নামে বদনামি করে উগ্র ধর্মগোষ্ঠী কি ধোঁকাটাই না আজ দিল! কি বাজে এ দেশের রাজনীতি! ধর্মটাকে কত বিশ্রীভাবে ব্যবহার করল রাজনৈতিক দলগুলো। ভাবতে ভাবতে সামসুল ছেলের হাত ধরে সিঁড়িতে পা রাখলেন।

রোহান বাবার হাত থেকে ছুটে চেঁচিয়ে উঠলো, “বল বাবা, ওর কি শাস্তি হওয়া উচিৎ না?” তারপর দৃপ্তপদে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। সামসুল ক্লান্ত চোখে রোহানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে লাগলেন। অনুভব করলেন, পারলে এই তারুণ্যই পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ঋণ এই প্রজন্মই শোধ করবে।

ছেলেকে অনেক উপরে উঠতে হবে। হতে হবে মানুষের মত মানুষ। রোহানকে তিনি ডাক্তার বানাবেনই!

[বিঃদ্রঃ এই গল্পটি আপডেট করা হয়েছে! এপ্রিল মাসে যখন লিখা হয় তখন আমি একজন নয়া ব্লগার (আজও তাই), এমন ক্রিয়েটিভ লিখায় আমি বরাবরই দুর্বল! ইস্টিশনের খুব প্রিয় মুখ নির্ঝর রুথ ঘোষ তার সৃজনশীলতা দিয়ে গল্পটিকে সার্থক করেছে! পূর্বেররূপটি দেখলেই পাঠকেরা বুঝতে পারবেন এই গল্পের সম্পূর্ণ ক্রেডিট রুথের পাওনা…]

১৭ thoughts on “বোধোদয়

  1. খুব উজ্জ্বল কিছু স্মৃতি মনে
    খুব উজ্জ্বল কিছু স্মৃতি মনে করিয়ে দিল গল্পটা… কি যে উত্তেজনায় ভরা দিন গেছে একেকটা… মনে পড়লে এখনও গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :বুখেআয়বাবুল:

    লিংকন ভাই, আপনার গল্প পড়ি না বহুদিন… :ভাবতেছি: আগামী ৫ই ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে একটা গল্প আজ সময়ের দাবী, জাতীয় দাবী… :মাথানষ্ট: :জলদিকর: :অপেক্ষায়আছি:

    1. আমি তো ভাই গল্প লিখি না!!
      আমি তো ভাই গল্প লিখি না!! মাথায় নাই কিছুই…
      :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল:

    1. অফুরন্ত ধইন্যা…
      অফুরন্ত ধইন্যা… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

  2. গল্পটা আমি মিস করছিলাম কেমনে
    গল্পটা আমি মিস করছিলাম কেমনে কেমনে জানি। দারুণ লিখেছেন তারিক ভাই। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. চমৎকার একটি গল্প।অসম্ভব ভালো
    চমৎকার একটি গল্প।অসম্ভব ভালো লাগলো।চেনা-জানা ঘটনা যখন কারো লেখাতে ফুটে ওঠে তখন অসাধারণ কিছু একটাই সৃষ্টি হয়।এক্ষেত্রেও অসাধারণ একটা শিল্পকর্মই সৃষ্টি হয়েছে……. :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *