একটি অগ্নিকান্ড এবং কয়েকটি শিক্ষা

একঃ
ভোরে ফজরের আযান দেওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। কান একটু একটু সজাগ হয়েছে। এমন সময় একটা মাইকের আওয়াজ “মুন্সিরহাট বাজারের মিলে আগুন লেগেছে আশেপাশের সবাই যে যা পারেন বালতি কলসি নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসেন। প্রথমে কান দুটিকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল কিন্তু মাইকের ওই ঘোষণা শেষ না হতে হতেই আরও একটা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া শুরু হল। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল কম্বল ছুড়ে ফেলে উঠে গেলাম।


একঃ
ভোরে ফজরের আযান দেওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। কান একটু একটু সজাগ হয়েছে। এমন সময় একটা মাইকের আওয়াজ “মুন্সিরহাট বাজারের মিলে আগুন লেগেছে আশেপাশের সবাই যে যা পারেন বালতি কলসি নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসেন। প্রথমে কান দুটিকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল কিন্তু মাইকের ওই ঘোষণা শেষ না হতে হতেই আরও একটা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া শুরু হল। শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল কম্বল ছুড়ে ফেলে উঠে গেলাম।

শিক্ষাঃ দেশের এক প্রান্তে মসজিদের মাইককে ব্যাবহার করা হয় নাশকতা সৃষ্টি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আর অন্য প্রান্তে ব্যাবহার করা হল কোটি টাকার মালামাল বাঁচানোর জন্য। আমি জানি দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এভাবে ভালোকাজে মসজিদের মাইক ব্যাবহার করা হয়। দুনিয়াটাকে মানুষ খারাপ করেছে, একে ভালো করতে মানুষই পারে।

দুইঃ
মুহূর্তের মধ্যে মায়ের রুমে যেতেই মা বলল কি বললরে মাইকে। আমি বললাম মা আগুন লাইগা গেছে মুন্সিরহাট। সবাইরে যাইতে কইতাছে। “বাজান তাড়াতাড়ি যা বাজান তাড়াতাড়ি যা” – মায়ের আহাজারি শুরু হয়ে গেলো আহারে কার কপাল পুড়লো, আল্লাহ্‌ মাবুদ রহম করো এইসব বলে। আমি ঘর থেকে একটা বালতি আর একটা গামছা নিয়ে দৌড়। বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখি আমার মতো সবাই বের আসছে সবাইই হাক ডাক দিচ্ছে মুন্সিরহাট আগুন লাইজ্ঞা গেছে সবাই আহেন সবাই আহেন।

শিক্ষাঃ বাইরে সামান্যতম বিপদের আশংকা থাকলেও মা-বাবা ছেলেমেয়েদের পারলে কোলে করে বসে থাকে। আর অন্যের এমন এক বিপদের সময় কারো বাবা-মা নিজের ছেলেকে কোলে করে বসে থাকার কথা চিন্তাও করে না। উল্টা তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য তাগাদা দেয়। এক মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করে না তার ছেলের ক্ষতি হতে পারে আগুনে। আমাদের গ্রামীন সমাজ বেবস্থা টা আসলে কতটা শক্তিশালি তা বুঝলাম। এমন বাবা-মা ছিল বলেই বীর দর্পে যুদ্ধে যেতে পেরেছিল আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যারা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলো।

তিনঃ আমি দৌড়াচ্ছি, আমার দৌড়ের স্পীড একেবারে খারাপ না, মোটামটি সামনের সারিতেই আছি। কিন্তু এমন ভারি একটা শরীর নিয়ে দৌড়াতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। রীতিমত হাপাচ্ছি। একটু পরে দৌড়ে পিছনে পড়ে গেলাম।

শিক্ষাঃ শরীরের ওজনটা আসলেই কমানো দরকার। নিজের জন্যে না হলেও দশের জন্যে হলেও দেহের ওজনটা কমাতে হবে।

চারঃ
দৌড়ে পিছনে পড়ে অন্য সবার চেয়ে মিনিট খানেক পরে পৌঁছুলাম। ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে একটু শান্তি শান্তি লাগলো। অগ্নিকান্ড ততটা ব্যাপক না যতটা আমরা ধারনা করেছিলাম। অগ্নিকান্ডটি আসলে ব্যাপকই ছিল কিন্তু আমাদের সবার ধারনা ছিল আরও ব্যাপক। আসলে বাজারের চাপাচাপি দোকান। একটাতে আগুন লাগলে সবগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে যাবে এই আশংকা ছিল মনে। কিন্তু যে করাত কলটিতে আগুন লেগেছিল সে জায়গাটিতে দোকানপাট একটু ছাড়া ছাড়া। আগুন লেগেছে করাত কলটিতে আর এর কাঠের গোডাউনে। বড় বড় গাছের গুড়িতে আগুন জ্বলছে। তাই অগ্নিকান্ডের ব্যাপকতা খুবই বেশি উত্তাপও বেশি। লোকজন এতো তাড়াতাড়ি চলে না আসলে আশে পাশের দোকানগুলোও রক্ষা পেতো না। আমি মাত্র ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি, লোকজনের ভীর ঠেলে সামনে এগুচ্ছি। অনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে আর অনেক লোক আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যে চাঁদর গায়ে দেওয়া এক লোক আমাকে ঝারি দিয়ে বলল আরে মিয়া দাঁড়াইয়া থাইকেন না বালতি ভইরা পানি দেন। আমি কিন্তু তাঁদের ভীর ঠেলেই ভিতরে ঢুকছি, আর ওই লোকটা নিজেই তামাশা দেখছে চাঁদর মুড়ি দিয়ে। মেজাজটা এমন খারাপ হল বলার মতো না, বালতি দিয়ে ঠাটিয়ে একটা বারি দিতে মনে চাইছিল কিন্তু নিজের রাগ সামাল দিয়ে চলে গেলাম পানি আনতে, পাশেই খাল, পানির সমস্যা নাই।

শিক্ষাঃ চুতিয়া ইজ এভরিহয়্যার। এইসব চুতিয়া বসুন্ধরা সিটির অগ্নিকান্ডে দেখেছি, চুতিয়াদের ভীর ঠেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারছিলোনা। এইসব চুতিয়াদের আরও দেখেছি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময়। উৎসুক চুতিয়াদের কারনেই উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছিলো, তাঁদের দূরে সরানোর জন্যে দেখেছি সেনাবাহিনিকে পাহারা দিতে। এসব দেখেছি টিভিতে আর আজ তো চোখের সামনেই দেখলাম। একদল লোক কাজ করে যায় নিরলস ভাবে আরেকদল চুতিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে আর চায়ের দোকানে গিয়ে ঝড় তুলবে উনি হেন করেছেন তেন করছেন। আসলে তাঁরা হিন্দি চুল ছিঁড়েছেন।

পাঁচঃ আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় আগুন তখন অনেকটাই দমে গেছে। সম্পূর্ণ এখনো নিভে যায়নি। সব তো কাঠ পোড়া কয়লা। কয়লা থেকে আবার আগুন জ্বলে উঠছে মুহূর্তে মুহূর্তে আর আমরা নিভাচ্ছি। এমন সময় ফায়ার সার্ভিস এর লোকজন যন্ত্রপাতি নিয়ে চলে এসেছেন। তাঁদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের যে অবস্থা ফায়ার সার্ভিস আসতে দেরি হবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ফায়ার সার্ভিসকে কার্যকরী করতে হলে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে একটি করে ফায়ার সার্ভিস ক্যাম্প করতে হবে, যা আসলেই অসম্ভব। তাই এলাকা বাসীই সম্বল, প্রতিবেশীই সম্বল। অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের ভাইয়েরা আগুন পরিপূর্ণভাবে নিভালো। আমরা চলে আসলাম যার যার ঘরে। আজকের সকালটা এভাবেই শুরু হল।

শিক্ষাঃ> আপনার প্রতিবেশীর সাথে যোগাযোগটা ভালো রাখুন। আপনার বিপদে আপনার আত্মীয়-স্বজনদের চেয়ে আপনার প্রতিবেশীরাই আগে আসবে। তাই নিজের প্রয়োজনে, নিজের ভালোর জন্যেই আপনার প্রতিবেশীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন। শুনেছি নিজের ভালো নাকি পাগলেও বুঝে।

পরিশেষে বলতে চাই আপনারা একটু সাবধানতা অবলম্বন করুন। দোকান-পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চলে আশার সময় খেয়াল করে মেইন সুইচটি অফ করে আসুন। বাড়ি-ঘর, কল-কারখানায় ইলেকট্রিক সামগ্রীর (যেমন- ক্যাবল, সুইচ, সার্কিট ব্রেকার ইত্যাদি) ব্যাপারে কখনোই কৃপণতা করবেন না। দাম একটু বেশি হলেও ভালো মানের পণ্য ব্যাবহার করুন। দাহ্য পদার্থের সামনে বা আশে পাশে কখনোই সিগারেট খাবেন না। অগ্নিকান্ড এমন একধরনের দুর্ঘটনা যা যত দ্রুতই নিয়ন্ত্রনে আনা হোক না কেন ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে আপনি বাঁচতে পারবেন না। আমরা আজকের অগ্নিকান্ডটি খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রনে নিয়েছিলাম কিন্তু তারপরেও আমরা মালিকের কোটি টাকার মালামাল বাঁচাতে পারিনি। শুধু লাভের লাভ এইটুকুই হয়েছে আশেপাশের অন্য দোকান গুলো রক্ষা পেয়েছে।

সবাই ভালো থাকবেন এবং সাবধানে থাকবেন 🙂

৮ thoughts on “একটি অগ্নিকান্ড এবং কয়েকটি শিক্ষা

  1. দেশের এক প্রান্তে মসজিদের

    দেশের এক প্রান্তে মসজিদের মাইককে ব্যাবহার করা হয় নাশকতা সৃষ্টি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আর অন্য প্রান্তে ব্যাবহার করা হল কোটি টাকার মালামাল বাঁচানোর জন্য।

    এমন বাবা-মা ছিল বলেই বীর দর্পে যুদ্ধে যেতে পেরেছিল আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যারা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলো।

    চুতিয়া ইজ এভরিহয়্যার। এইসব চুতিয়া বসুন্ধরা সিটির অগ্নিকান্ডে দেখেছি, চুতিয়াদের ভীর ঠেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারছিলোনা। এইসব চুতিয়াদের আরও দেখেছি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময়। উৎসুক চুতিয়াদের কারনেই উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছিলো, তাঁদের দূরে সরানোর জন্যে দেখেছি সেনাবাহিনিকে পাহারা দিতে।

    চমৎকার বলেছেন।

  2. আপনার প্রতিবেশীর সাথে
    আপনার প্রতিবেশীর সাথে যোগাযোগটা ভালো রাখুন। আপনার বিপদে আপনার আত্মীয়-স্বজনদের চেয়ে আপনার প্রতিবেশীরাই আগে আসবে। তাই নিজের প্রয়োজনে, নিজের ভালোর জন্যেই আপনার প্রতিবেশীর সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন। – See more at: http://www.istishon.com/node/6614#sthash.47K56UzM.dpuf

  3. চুতিয়া ইজ এভরিহয়্যার। এইসব

    চুতিয়া ইজ এভরিহয়্যার। এইসব চুতিয়া বসুন্ধরা সিটির অগ্নিকান্ডে দেখেছি, চুতিয়াদের ভীর ঠেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারছিলোনা। এইসব চুতিয়াদের আরও দেখেছি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময়। উৎসুক চুতিয়াদের কারনেই উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছিলো, তাঁদের দূরে সরানোর জন্যে দেখেছি সেনাবাহিনিকে পাহারা দিতে। এসব দেখেছি টিভিতে আর আজ তো চোখের সামনেই দেখলাম। একদল লোক কাজ করে যায় নিরলস ভাবে আরেকদল চুতিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে –

    এই বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর। এমন পরিস্থিতিতে এগুলারে ধইরা খালি থাপড়ানো উচিৎ। :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি:

  4. দেশের এক প্রান্তে মসজিদের

    দেশের এক প্রান্তে মসজিদের মাইককে ব্যাবহার করা হয় নাশকতা সৃষ্টি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আর অন্য প্রান্তে ব্যাবহার করা হল কোটি টাকার মালামাল বাঁচানোর জন্য। আমি জানি দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এভাবে ভালোকাজে মসজিদের মাইক ব্যাবহার করা হয়। দুনিয়াটাকে মানুষ খারাপ করেছে, একে ভালো করতে মানুষই পারে।

    :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

  5. এই যে মসজিদের মাইকে ঘোষণা
    এই যে মসজিদের মাইকে ঘোষণা শুনে মায়ের আহাজারি, সবাই মিলে এক যোগে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া -এর মধ্যে যে আত্মার অনুপ্রেরণা আছে সেটা সবাই অনুভব করতে পারবে না আর সেটাই স্বাভাবিক। এইসব চাদর-ওয়ালার মতো আত্মসম্মানবোধহীন চালবাজ লোকগুলো ততদিন আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না যতদিন পর্যন্ত আমরা আমদের নিজেদের নীতি আর মনুষ্যত্ব থেকে বিচ্যুত না হবো।

Leave a Reply to নাভিদ কায়সার রায়ান Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *