তোমরা যারা হরলিক্স পান কর!

তোমরা যারা সকাল বিকাল হরলিক্স আর কমপ্ল্যান পান করতে বাধ্য হও, তাদের জন্যই আমার এই লেখা। হাড়গোড় ঠিকঠাক রাখা, লম্বা হওয়া, স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, ‘ব্রেইন শার্প’ করা ইত্যকার নানা প্রলোভনে তোমাদের বাবা মা তোমাদের এসব নামকরা ‘হেলথ ড্রিংক’ পান করতে বাধ্য করেন। শৈশবে মায়ের বুকের দুধ আর কৈশোরে গরুর খাঁটি দুধ, মুক্ত বাতাসে বেড়ে উঠা, মাঠে ধূলোবালিতে খেলা, নদীতে বা পুকুরে সাঁতার কাঁটা, টাটকা শাক-সবজি ও মাছ মাংস বঞ্চিত তোমাদের এই প্রজন্মের প্রতি আমি কোন অভিযোগ হাজির করছি না, বরং সমবেদনা জানাচ্ছি। তোমরা যে দারীদ্রের কারণে এসব বঞ্চিত তাও না। অবশ্য, কেন তোমরা এসব ছাড়াই এবং কিভাবে বেড়ে উঠছ সেটাও এক দূর্বোধ্য ধাঁধা।

তোমাদের এই যে প্রতিদিনকার ‘জীবন সংগ্রাম’ যেটা কাঁকডাকা ভোরে শুরু হয়ে মাঝরাত অবধি চলে, সেটা ঠিক কোন কারণে, কোন উদ্দেশ্যে, এটাও আরেক বড় ধাঁধা। তোমারা বড় চাকুরে হবে, তোমাদের বড় বাড়ি আর একাধিক গাড়ি হবে, সমাজে তোমাদের জয়জয়কার হবে, ট্রাফিক পুলিশ তোমার নাম শুনলেই গাড়ি ছেড়ে দেবে, থানার এসআই ছেড়ে দেবে আটক করা কোন সন্দেহভাজন আসামী, মোটামুটি তোমাদের হরলিক্স গেলার পেছনে কারণ এগুলোই। তোমরা সুস্থ সবল দেহ, চোখ ও মস্তিস্ক নিয়ে বড় হবে, নিজের যোগ্যতায় ও কর্মনিষ্ঠায় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে পৌছাবে, দেশপ্রেম আর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করবে, এসব ফালতু ব্যাপার। হরলিক্স, কমপ্ল্যান বা পৃথিবীর কোন ‘হেলথ ড্রিংক’ এসবের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এসবের জন্য বাজারে কোন ‘ড্রিংক’ পাওয়া যায় বলেই জানি না। পাওয়া যায় না তার কারণ কোন মা বাবা’র কাছেই এসবের কোন কদর নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সে পন্যই উৎপাদিত ও বাজারজাত হয় যার চাহিদা আছে, ভোক্তা আছে। তোমাদের মা বাবা’র কাছে এসবের কোন চাহিদা নেই, তাই স্বাভাবিকভাবেই তোমরাও এসবের ভোক্তা নও।

তোমাদের ছোট মাথায় খেলাধূলা, বন্ধুদের সাথে খুনসুটি ছাড়া তো এসব কুটিল চিন্তা ঢোকার কথা না। যে বয়সে হরলিক্স বা কমপ্ল্যানে দু চুমুক দিয়েই স্কুলের বাসে চড়ছ, সে বয়সে তো ভবিষ্যতে তোমার কয় ব্যাংকে কতগুলো একাউন্ট হবে এবং সেগুলো ব্যালেন্স কিরকম হবে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন সম্ভাবনাই নেই। তাহলে এসব আসে কোত্থেকে? পাশের বাসার ‘অমুক আংকেলের ছেলে’ বা ‘অমুক আন্টির মেয়ে’ তোমার চেয়ে ভাল ফলাফল করলে বা একটা বেশী ‘প্রাইভেট’ বা ‘কোচিং’ করলে তো তোমার মাথা হেঁট হয়ে যায় না। তোমাদের এই কাঁকডাকা ভোরে ঢাল তলোয়ারে সাজিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠাচ্ছেন কারা? কি উদ্দেশ্যে পাঠাচ্ছেন? তোমরা শুধু ‘মানুষের মত মানুষ হবে’ এজন্য? মা বাবা’র চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন কর! নিশ্চিতভাবেই উত্তরটা হচ্ছে ‘উনাদের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করতেই তোমাদের অমূল্য শৈশব বলি দেওয়া হচ্ছে’! এখানে তুমি, তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার সাধ আহ্লাদ, তোমার স্বপ্ন কিছুই নেই, কোথাও নেই। স্কুলে ‘এইম ইন লাইফ’ নামে প্রবন্ধ রচনা’র জন্য তোমাদের সময় লাগে অন্তত একদিন। মা বাবা’কে জিজ্ঞেস না করে তো কিছু বলা যাচ্ছে না!

বাংলাদেশে জন্মেও তোমরা বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস কিছুই পড়ছ’না, জানার তো প্রশ্নই আসে না। যাদের এসব ‘নিরামিষ’ বিষয় পড়তে ও জানতে আগ্রহ নেই তাদের কথা আলাদা (পাসপোর্টে ভিসা লাগতে দেরী শুধু), কিন্তু যাদের আগ্রহ আছে, পড়তে চাও তাদের তো কোন সুযোগ নেই। স্কুলের বই ছাড়া বা তোমাদের সম্মানিত শিক্ষক শিক্ষিকা দ্বারা সত্যায়িত না হলে তার নাম হয়ে যাচ্ছে ‘আউট বই’ যেটা মা বাবা বা ‘মিস্’দের কাছে ‘চটি বই’র মত কুরুচিপূর্ণ, জঞ্জাল, মূর্তিমান আতঙ্কের বস্তু, এর সংস্পর্শে তোমার কুষ্ঠ হতে পারে! যা করলে ও পড়লে তোমার ‘সিজিপিএ’ বাড়বে না, রোল নাম্বার এগুবে না সেসব পড়ার বা করার দরকারটা কি?

আগেই বলেছি, আমি কোন অভিযোগ হাজির করছি না তোমাদের বিপক্ষে, শুধু সমবেদনা জানাচ্ছি। হরলিক্স কমপ্ল্যান পান না করে, ‘প্রাইভেট’, ‘কোচিং’ না করেও অনেকেই মেডিক্যাল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নিয়মিত পাস করছে (বাসায় দূরদর্শন না থাকায় তারা হরলিক্স বা কমপ্ল্যান নামে কোন পন্য আছে সেটাই জানে না), নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে উপরে উঠছে, ভাল মানুষ হচ্ছে! এসব তথাকথিত ‘হেলথ ড্রিংক’ তোমাকে হয়ত ভাল অর্থ উপার্জন করতে বা ভাল ছাত্র হতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু একজন ভাল মানুষ হতে দেবে কি? তুমি কি আদৌ একজন ভাল মানুষ হতে চাও? তোমার মা বাবা অবশ্য একজন ভাল ছাত্রীর বা ছাত্রের মা বাবা হয়েই বেশী সন্তুষ্ট হবেন। তোমরা হয়ত এখন বাধ্য হচ্ছ মা বাবা ও মিস্ দের এই সম্মিলিত আক্রমণ মেনে নিতে, কিন্তু তুমিও একদিন সন্তানের জননী বা জনক হবে। তুমি কি একটা ভাল মানুষের মা বা বাবা হতে চাও?

৫ thoughts on “তোমরা যারা হরলিক্স পান কর!

  1. বুঝলাম না।
    হরলিক্স খাওয়া আর

    বুঝলাম না।
    হরলিক্স খাওয়া আর “কৈশোরে গরুর খাঁটি দুধ, মুক্ত বাতাসে বেড়ে উঠা, মাঠে ধূলোবালিতে খেলা, নদীতে বা পুকুরে সাঁতার কাঁটা, টাটকা শাক-সবজি ও মাছ মাংস বঞ্চিত” হওয়ার সাথে ভালো মানুষ হওয়ার কি সম্পর্ক?

    1. ‘কৈশোরে গরুর খাঁটি দুধ, মুক্ত
      ‘কৈশোরে গরুর খাঁটি দুধ, মুক্ত বাতাসে বেড়ে উঠা, মাঠে ধূলোবালিতে খেলা, নদীতে বা পুকুরে সাঁতার কাঁটা, টাটকা শাক-সবজি ও মাছ মাংস’ না খাওয়ার অভাব পূরণের জন্যই হরলিক্স ও কমপ্ল্যানের উপর নির্ভরতা- বুঝানোর জন্যই কথাটা বলা, ভাল মানুষ হওয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আর, ভাল মানুষ হওয়ার গুরুত্বটা ‘ভাল ছাত্র/ছাত্রী’ হওয়ার তাগিদের কাছে প্রতিযোগীতায় টিকতে পারছে না। ধন্যবাদ রায়ান ভাই আপনার মন্তব্যের জন্য।

Leave a Reply to নিঃসঙ্গ প্রেতাত্মা Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *