নোনতা জলের পাহাড়ে

বান্দরবান যাওয়ার কথা ছিলো। শেষ মূহুর্তে মত পাল্টে চলে গেছি রাঙামাটি। সাথে আরেক বন্ধু। দুই দিনের প্রোগ্রাম। প্রথমদিন শহরটা ঘুরেফিরে দেখা। দ্বিতীয়দিন কাপ্তাই, এই হচ্ছে চিন্তা ভাবনা। কিন্তু আমি চাইলেইতো হবেনা, প্রকৃতিও চাওয়া লাগবে।


বান্দরবান যাওয়ার কথা ছিলো। শেষ মূহুর্তে মত পাল্টে চলে গেছি রাঙামাটি। সাথে আরেক বন্ধু। দুই দিনের প্রোগ্রাম। প্রথমদিন শহরটা ঘুরেফিরে দেখা। দ্বিতীয়দিন কাপ্তাই, এই হচ্ছে চিন্তা ভাবনা। কিন্তু আমি চাইলেইতো হবেনা, প্রকৃতিও চাওয়া লাগবে।

ঘোরাঘুরি করার জন্য শরীর সুস্থ থাকা চাই। শরীরের সুস্থতার জন্য দরকার শান্তিপূর্ণ ঘুম এবং পর্যাপ্ত খাওয়া দাওয়া। হোটেলে ব্যাগ রেখে শরীর সুস্থ রাখার জন্য প্রথমেই পেট ভরে খাওয়া দাওয়া করে ফেললাম। তারপর একটা লম্বা ঘুম। ঘুম ভাঙ্গছে বিকেল চারটায়। রুম ভাড়া দিই নাই তখনো। অল্প কিছু টাকা দিয়ে শুধু চেক ইন করছি। বাকিটা বিকালে এটিএম বুথ থেকে তুলে দিয়ে দিবো এরকম কথা হইছে। এরপর টাকা উঠানোর জন্য তবলছড়ি থেকে বনরূপা পুরা রাঙামাটি চষে বেড়াইছি। কিন্তু কোথাও এটিএম বুথ পাওয়া গেলোনা। ঠিক সন্ধ্যা নামার মূহুর্তে চরম দুঃসংবাদটা পাইছি, রাঙামাটিতে কোনো এটিএম বুথ নাই! ট্রাস্ট ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের আছে, কিন্তু এর কোনোটাই আমার কাজে দিবেনা। দুজনের পকেটে যে টাকা আছে ঐ টাকা দিয়ে ঐদিনের হোটেল ভাড়াও মিটানো যাবেনা। খাওয়াদাওয়া কিংবা ঘোরাঘুরিতো অনেক পরের ব্যাপার।

হঠাৎ খবর পাওয়া গেলো রাউজানে ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটা এটিএম বুথ আছে। বনরূপা থেকে লোকাল সিএনজি যায়। একটাতে উঠে রওয়ানা দিলাম। সিএনজি বলতে আসলে ডিজেল, রাঙামাটিতে কোনো সিএনজি নাই। রিকশাও নাই, সব অটোরিকশা। মানে ডিজেলচালিত সিএনজি। শহরটা এমনভাবে ছড়ানো ছিটানো এক যায়গা থেকে আরেক যায়গায় হেঁটে যাওয়ার উপায় নাই। ছোট্ট শহর কিন্তু এ মাথা থেকে ঐ মাথার দূরত্ব পাঁচ সাত কিঃ মিঃ হবে। সিএনজিতে উঠা ছাড়া উপায় নাই। রাঙামাটি থেকে রাউজান ৪০ কিঃমিঃ। পাহাড়ি ৪০ কিঃমিঃ মানে আসলে ৮০ কিঃমিঃ, তাও আবার সন্ধ্যার পর। রাউজানের কাছাকাছি যাওয়ার পর আবার খটকা লাগলো, লোকটা রাউজান বলছে নাকি রাঙ্গুনিয়া বলছে মনে নাই! রাত বাড়তেছে। এই শীতে রাতভর রাঙ্গুনিয়া রাউজান করা অসম্ভব। তার উপর পকেটে নাই টাকা। যাই হোক শেষ পর্যন্ত রাউজানেই মুক্তি মিলছে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য এবার রাউজানেই আবার পেট ভরে খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর আবার রাঙামাটি। হোটেলে পৌঁছাতে রাত দশটা। একটা নির্মম দিনের সুন্দর পরিসমাপ্তি।

পরদিন কাপ্তাই। রাঙামাটি থেকে আসামবস্তি হয়ে কাপ্তাই যাওয়ার রাস্তাটা পুরা স্বর্গীয়। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ণ হ্রদ। আসলে রাঙামাটির বেশিরভাগ যায়গাই পানির নিচে। প্রত্যেকটা পাহাড়কে মনে হয় এক একটা দ্বীপ। যাওয়ার পথে পড়বে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয়গুরু শ্রীমত্‍ সাধনানন্দ মহাস্থবির মহাথেরর (বনভান্তে) জন্মস্থান। যেটা এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির মাঝখানে উনার জন্মভিটায় শুধু একটা পিলার দেওয়া। ঐটার উপর একটা বিরাট পাতিল, লাল কাপড়ে মোড়ানো। খুব সম্ভবত পূজা দেওয়ার জন্য।

সিএনজিওয়ালাকে বললাম কাপ্তাইয়ের সবচেয়ে সুন্দর যায়গাগুলাতে নিয়ে যাবা। সে আমাদেরকে আশ্বস্ত করলো। এরপর সে সুন্দর যায়গা দেখানোর প্রকল্প হিসেবে আমাদেরকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে চলে গেলো! জুম রেস্তোরা নাম। তার মতে এটা খুবই দর্শনীয় যায়গা। লেকের ধারে রেস্তোরা। লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বোট টোট আছে। পাহাড়ের ধারে বসার যায়গা আছে। ছোটখাটো পার্কের মত। পুরাই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। আরে ব্যাটা এসব পার্ক রেস্তোরায় ঘোরার জন্য কাপ্তাই আসছি!? পাহাড় বাইতে হবে, পাহাড়।

সিএনজিওয়ালাকে বললাম কোন দর্শনীয় স্থান টান দেখার কোন ইচ্ছা নাই আমার। একটা উঁচু পাহাড়ের কাছে নামাইয়া দাও। পাহাড়ে ট্রেকিং চলবে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করবো। মন চাইলে পাহাড় থেকে নেমে লেকের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকবো কিছুক্ষন। ফাঁকে ফাঁকে বিড়ি ব্রেক। কিন্তু তার কথা হচ্ছে পাহাড়ে দেখার কিছু নাই! দেখার বিষয় হচ্ছে জলবিদ্যুত কেন্দ্র! সে একটানে জলবিদ্যুত কেন্দ্রে চলে গেলো। যে যায়গায় নামাইছে ঐখান থেকে কাপ্তাই বিদ্যুতকেন্দ্রের বাঁধে যাইতে দুই মিনিট লাগে। আমি ঐ দিকে না গিয়ে বরং উল্টা দিকে চলে আসছি। এদিকটা মারাত্নক।

যাই হোক এতক্ষনে প্রকৃতির কাছাকাছি আসছি। ড্রাইভারের উপর ক্ষোভ কিছুটা কমছে। গন্তব্য এবার নেভির সংরক্ষিত এরিয়া। এইটা নাকি দেখার মত। নাম শুনেই আমার যাইতে ইচ্ছা করলো না। কোনো গৃহপালিত যায়গায় যাইতে ভাল্লাগে না। বন্ধুর আগ্রহ থাকায় শেষ পর্যন্ত গেলাম। যাওয়ার পর মনে হইছে না গেলে বিরাট মিস করতাম।

সিএনজিওয়ালাকে রেখে ভিতরের দিকে রওয়ানা দিলাম। পাহাড় বেয়ে শুধু সামনে যাওয়া। লেকের পাড়ে একটু বসা। তারপর এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় এভাবে হাঁটতে থাকা। এমন একটা যায়গায় এসে থামছি এরকম যায়গা শুধু ছবিতে দেখা যায়, টিভিতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এত সুন্দর যায়গা আছে চোখে দেখেও অবিশ্বাস হয়! মুগ্ধ থাকতে থাকতে অনেকটা সময় কেটে গেছে। এবার ফেরার পালা।

নয়নাভিরাম কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন। বারবার ফিরে আসতে চাইবেন। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে আছে এক নোনতা ইতিহাস। পাহাড়িদের চোখের জল মিশে আছে লেকের জলে। ১৯৬২ সালে বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্য কাপ্তাই বাঁধ নির্মান করা হয়। এর ফলে পানিতে তলিয়ে যায় ৫৪ হাজার একর জমি! ঘরবাড়ি হারায় এক লাখেরও বেশি আদিবাসী! জীববৈচিত্র ধ্বংসের কথা বাদই দিলাম। বিনিময় হিসেবে পাওয়া গেছে ৯২ মেঘাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতকেন্দ্র। যেটা এখন বেড়ে ২৩০ মেঘাওয়াট হইছে। মূল্যটা অনেক বেশি দিতে হইছে। টিপাইমুখ বাঁধটা যদি বাস্তবায়িত হয় তাইলে সিলেটের মানুষের কি অবস্থা হবে জানতে একবার রাঙামাটি থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

রাঙামাটি গিয়ে রাজবন বিহারে যাবোনা এটাতো হয়না। এটা বৌদ্ধদের অন্যতম পবিত্র স্থান। আমার জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিলো ২০১২ সালে মারা যাওয়া রাজবন বিহারের প্রধাণ বাংলাদেশের বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয়গুরু শ্রীমত্‍ সাধনানন্দ মহাস্থবির মহাথেরর (বনভান্তে) সংরক্ষিত দেহ!

দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত! বিহারের ভিতর বনভান্তে বিশ্রামাগারের দোতলায় বনভান্তের দেহ রাখা। কাঁচ ঘেরা একটা বক্সের ভিতর বনভান্তে। পাশে একটা চেয়ারে উনার মূর্তি রাখা। দেখে একেবারে জীবন্ত মনে হয়। আমি প্রথমে জীবন্তই ভাবছিলাম। সাউন্ড সিস্টেমে করুন সুরে সারাক্ষন প্রার্থনা সংগীত বেজেই চলছে। সামনে প্রার্থনার জন্য কিছুটা স্পেস। যায়গাটা এতটাই নিস্তব্ধ অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়। ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই নিশ্চুপ ভাবে অসছে যাচ্ছে। বিষয়টা ধারণ করতে পারলে দেশে রামু কিংবা অভয়নগর ট্র্যাজিডি ঘটেনা।

রাজবন বিহারের এক কিঃমিঃ এর ভিতরই চাকমা রাজবাড়ী। কাপ্তাই বাঁধের জন্য পুরাতন রাজবাড়ি ডুবে যাওয়ায় ১৯৬০ সালে এটা বানাইছে। ভাবলাম এতকাছে যখন আছি একবার ঢুঁ মেরে আসা যাক। নৌকায় ছোট্ট একটা লেক পার হলেই রাজবাড়ী। দ্বীপমত একটা যায়গা। রাজদ্বীপ নামে পরিচিত। এখানে এখন নতুন ঘর উঠতেছে। চাকমা রাজার পুরাতন ঘরটা বছর তিনেক আগে পুড়ে গেছে। জুম্ম জাতির অবিসংবিদিত নেতা এমএন লারমার মৃত্যু বার্ষিকীতে ওড়ানো একটা ফানুস বাড়িতে এসে পড়ে। যায়গাটা দ্বীপমত হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দ্রুত যেতে পারেনি। মুহুর্তেই ইতিহাস ছাইয়ে পরিণত হয়। চাকমা রাজের কার্যালয়, এখানেই নিয়মিত অফিস করেন চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। রাজার কোর্ট, ফতে খাঁ নামে একটা কামান সহ এখনো অনেক কিছুই আছে দেখার মত।

আমাদের ঘোরাঘুরিকে পূর্ণতা দিতে রাজবন বিহার থেকে রাজবাড়িতে আসার পথে একটা পাহাড়ের উপর দেখা মিলছিলো এক ঝাঁক বান্দরের। তাদের জন্য বরাদ্ধ করছিলাম এক প্যাকেট ম্যারেডিয়ান চিপস! নিজ হাতে খাওয়াইছি। খা ব্যাটা খা, ঘোরাঘুরি করস শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য খাওয়া দাওয়া করা দরকার!

বিদায় রাঙামাটি। আবার দেখা হবে। ও হ্যাঁ, রাঙামাটিতে গিয়ে ঝুলন্ত ব্রীজটা না দেখে চলে আসাটা একটা প্রেস্টিজ ইস্যু! শেষ মূহুর্তে ঝুলন্ত ব্রীজ থেকেও ঘন্টা দুয়েকের জন্য ঘুরে আসছি। শুধু ছবি উঠানোর জন্য ঐখানে গেছি। ব্রীজের উপর নিজের কয়েকটা ছবি তুলে ব্রীজটাকে অমর করে রাখলাম 😉

১২ thoughts on “নোনতা জলের পাহাড়ে

    1. রাঙামাটি দেশের সবচেয়ে বড়
      রাঙামাটি দেশের সবচেয়ে বড় জেলা। এত দূর্গম কিছু যায়গা আছে অর্ধেকটা ঘুরাও অসম্ভব। অল্প একটু ঘুরছি ঐটাই অসাধারণ ছিলো।

  1. আহ হা রাঙামাটি যাওয়ার ইচ্ছাটা
    আহ হা রাঙামাটি যাওয়ার ইচ্ছাটা আবার জেগে উঠলো । চমৎকার লিখেছেন….
    ***************************************
    ♦ আমি বাঙালি, বাংলা আমার….

  2. চমৎকার অভিজ্ঞতার চমৎকার
    চমৎকার অভিজ্ঞতার চমৎকার বর্ণনা… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: :থাম্বসআপ: খুব ভালো লাগলো ভাই… :ধইন্যাপাতা: :ফুল: :বুখেআয়বাবুল:

  3. পারলে একবার কাপ্তাই এর ভেতর
    পারলে একবার কাপ্তাই এর ভেতর থেকে ঘুরে আসবেন। ভালো লাগবে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না কিন্তু বাঁধের ভেতরটা দারুণ সুন্দর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *