যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না…

এরকম হাজারো বৃদ্ধ মানুষের কান্নারত ছবি দেখে দেখে এখন এসব স্বাভাবিক মনে হলেও এখানে কাহিনীটা একটু ভিন্ন। একটা অসহায়, নিপীড়িত জাতিকে বাঁচাতে একসময়ে যিনি এগিয়ে এসেছিলেন নিজের বুকে লিমপেট মাইন বেঁধে আজ তিনি নিজেই অসহায় আর নিপীড়িত। আজ তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এমন মানুষের সংখ্যাও হাতেগোনা কয়েকজন। দেশের আনাচে-কানাচের খবরে যেখানে দেশ উত্তাল থাকে সেখানে আজ এই লোকটির সংবাদ আমরা অনেকেই জানিই না।


এরকম হাজারো বৃদ্ধ মানুষের কান্নারত ছবি দেখে দেখে এখন এসব স্বাভাবিক মনে হলেও এখানে কাহিনীটা একটু ভিন্ন। একটা অসহায়, নিপীড়িত জাতিকে বাঁচাতে একসময়ে যিনি এগিয়ে এসেছিলেন নিজের বুকে লিমপেট মাইন বেঁধে আজ তিনি নিজেই অসহায় আর নিপীড়িত। আজ তার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এমন মানুষের সংখ্যাও হাতেগোনা কয়েকজন। দেশের আনাচে-কানাচের খবরে যেখানে দেশ উত্তাল থাকে সেখানে আজ এই লোকটির সংবাদ আমরা অনেকেই জানিই না।

গতরাতে হঠাৎ করে Ali Mahmed ভাইয়ের একটি পোস্ট দেখেই ভড়কে যাই। পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে নিজের অস্তিত্বটাকেই অনুভব করতে পারছিলাম না। যেই চোখ দিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজন মরলেও জল বেরোয় না, শরীরের অংশ কেটে-ছিঁড়ে গেলেও জল পড়ে না, সেই দু’চোখ ফেটে জল পড়তে লাগলো। ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কান্না করি, কোনভাবেই চোখের জল আটকাতে পারছিলাম না। নিজেকে কি পরিমাণ অসহায় মনে হচ্ছিল তা আর বোঝাতে পারবো না।

গতরাতেই ভেবেছিলাম যে করেই হোক উনার পাশে গিয়ে দাঁড়াবো, দাঁড়াবো অনলাইনের সকল মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা প্রেমী দেশপ্রেমিকদের নিয়ে। ভেবেছিলাম ইভেন্ট খুলবো কিন্তু না তা আর করা হয়ে উঠলো না। কেননা পুরো অনলাইন এখন ক্রিকেট জ্বরে কাঁপছে সেখানে আমার এই ইভেন্ট চালু করে কোন লাভ তো নেই বরং পক্ষান্তরে উনার অপমান করা হবে।

ও হ্যাঁ যার কথা বলছিলাম তিনি হলেন, নৌ-কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভূঁইয়া। আখাউড়া নিবাসী এই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে নাম লিখিয়েছিলেন “সুইসাইডাল স্কোয়াডে” আর ট্রেনিং পরবর্তী রণক্ষেত্রে বুকে লিমপেট মাইন বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি আর্মিদের জাহাজ।

অপারেশন জ্যাকপটের নায়কদের অন্যতম একজন বীর নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়া। উনার সম্পর্কে কমান্ডো মো: খলিলুর রহমান, তাঁর মুক্তিযুদ্ধ, নাবিক ও নৌকমান্ডোদের জীবন গাঁথা বইয়ের ২৪০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

“ফজলুল হক ভূঁইয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মৃত্যুঞ্জয়ী বীর।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার আম্রকাননে ‘সুইসাইডাল স্কোয়াডে’ নাম লিখিয়েছিলেন।
৩ মাস ঝুকিপূর্ণ ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে একজন চৌকশ নৌকমান্ডো হিসাবে প্রস্তুত করতে সমর্থ হন।
এর আগে ২৫ মার্চ পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য ২৭ মার্চ সকালে আখাউড়া ইপিআর ক্যাম্প শক্রমুক্ত করেন।
এরপর তিনি চুনারুঘাট যুদ্ধ, বাল্লা যুদ্ধে অংশ নেন। দুটি যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ এবং কয়েকদিন ব্যাপি বিরামহীন ভাবে চলে।

অত:পর মেজর শফিউল্লা (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) তাঁকে নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য পলাশী পাঠিয়ে দেন।
(ভয়ংকর কঠিন) প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নারায়নগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশন এবং জামালপুর ফেরীঘাট অভিযানে অংশ নেন।
ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর মিত্রবাহিনীর সাথে হোসেনপুরে একটি বড় ব্রীজ ধ্বংস করেন।”

এইরকম তথ্য পেয়ে তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন আলি মাহমেদ ভাই, যেহেতু উনার বাড়ীও একই অঞ্চলে সুতরাং পরম আগ্রহ নিয়ে উনি খুঁজে বের করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ী। কিন্তু হায় বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ীর দশা দেখে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি, খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবিক নির্বাহের তাগিদে ঠেলাগাড়ি চালান। কি নির্মম তাই না? দেশটাকে যারা জীবন বাজি রেখে স্বাধীন করলো আজ তারাই গৃহহীন অথচ স্বাধীনতা বিরোধীরা মন্ত্রীত্বের স্বাদ নিচ্ছে!!!

আলী মাহমেদ ভাইয়ের লেখা পোস্ট থেকে আরো জানতে পাই

… নাম লিখিয়েছিলেন, সুইসাইডাল স্কোয়াডে। সই করতে হয়েছে, “…যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না” এই কাগজে।
ভারতের কমান্ডার জি, এম, মার্টিস কেমন করে তাঁদের ট্রেনিং দিয়েছেন। প্রত্যেককে ১টা করে কাফনের কাপড়ও দেয়া হয়েছিল। অ্যামবুশ বা কোন কারণে সহযোদ্ধার মৃত্যু হলে যেন কাফনের কাপড় মুড়িয়ে কবরস্থ করা হয়।

আরেকটি লেখাতে “সুইসাইডাল স্কোয়াড”-এর ট্রেনিং সম্পর্কে কমান্ডো ফজলুল হক ভূঁইয়ার ধারাভাষ্য তুলে ধরেন আলী ভাই এভাবে

আমাদের কমান্ডো ট্রেনিং-এর সময় এইসবও শিখান হইত। খালি হাতে মারামারি (কমব্যাট ট্রেনিং)। একজন মানুষের শরীরের দুর্বল দিক কোনডা এইসব।
ডেইলি ২৪ ঘন্টার মইধ্যে ১৬ ঘন্টা ম্যালা ট্রেনিং চলত। ভোর ৫টা থিক্যা শুরু হইত ট্রেনিং। ২ ঘন্টা ধইরা চলত পিটি, খালি হাতে মারামারি (জুডো কারাত, আন আর্মড কমব্যাট)। গ্রেনেড মারা, রাইফেল ট্রেনিং, মাটিতে বোম ফুটানো, বোম ঠান্ডা করা (ডিফিউজ করা)।
এরপর নাস্তা এক মগ চা, দুইটা মোটা রুটি। নাস্তা শ্যাষ হইলে ঘন্টার পর ঘন্টা সাতার, নৌকা বাওয়া। পানির নীচে ডুব দিয়া দম বাড়ানো। সন্ধা ৬টা থিক্যা রাত ৯/ ১০টা পর্যন্ত পানিতে থাকতাম। ড্যাগার (কমান্ডো নাইফ) দিয়া জাহাজের নীচে (খোল) শ্যাওলা পরিষ্কার কইরা মাইন ফিট করা। মাইনের চুম্বুক জাহাজের নীচে আটকাইয়া যাইত। দিরং সুইচ(ডি-লে সুইচ)৩০ থিক্যা ৫০ মিনিট টাইম বাইন্ধা দেয়া। গামছা দিয়া লিমপেট মাইন…।

এতো কঠোর পরিশ্রম করে ট্রেনিংটা নিয়েছিলেন তিনি কেনো? দেশটাকে বাচানোর জন্যেই তো! অথচ আজ উনার কি দশা তা কি জানেন? যেই দেশটা বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে লড়াই করেছেন আজ সেই দেশটা বিনিময়ে কি দিয়েছে তাকে? অবশ্য উনি কিছুর জন্য দাবীও করেন না কিন্তু তাই বলে কি আমাদের কোনই দায়বদ্ধতা নেই?

এই এতো কিছু লেখার মূল কারণটাতে আসি। যেই বীর মুক্তিযোদ্ধা ভয় পাননি পাকিস্তানি আর্মিকে তরুণ বয়সে, সেই মুক্তিযোদ্ধা ভয় পাননি মাদক ব্যবসায়ীদের এই বৃদ্ধ বয়সে। প্রতিবাদ করে উঠেছেন তিনি সেই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আর এটাই তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। হুমকি-ধামকি, ঢিল ছোঁড়া থেকে শুরু করে বাড়ী উচ্ছেদের হুমকি আসতে থাকে। এসব নিয়ে তিনি থানাতে মামলা করলে থানা থেকে তাকে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে “সমঝোতা”(!) করার পরামর্শ দেয়া হয়। অবশ্য থানা থেকে এটাই আশা করা স্বাভাবিক আখাউড়ার মত এলাকা থেকে, কেননা সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়াতে এইসকল মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে তো থানার একটা ভালো আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবেই। পুলিশের এমন প্রস্তাবে রাজি না হলে গত পরশু উনার সেই জীর্ণ কুটিরে আগুন দেয় সেই সকল “শুয়োরের বাচ্চারা”। শুধু তো বাড়ীই পুড়েনি, পুড়ে গেছে অনেক কিছুই।

এখানেই ক্ষান্ত হয়নি হায়েনার বাচ্চারা, তাকে চিরতরে শেষ করে দিতে হামলে পড়ে তার উপরে গতকাল।

চেয়েছিলাম উনার পাশে গিয়ে দাঁড়াবো সকলের সহযোগিতা নিয়ে। যেহেতু বেকারত্বের ছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াই সর্বদা তাই আমার সহযোগিতা উনার কোনই কাজে আসবে না। একইভাবে একটি কাজ পেয়েছি বলেই অনলাইনে এসেছিলাম, ইতোমধ্যে কাজ শেষের পথে। কাজ শেষ হলে আবারো অনলাইন ছেড়ে যেতে হবে তাই এই মুহুর্তে নিজ থেকে ইভেন্ট ক্রিয়েট করে পরে তা শেষ না করেই চলে গেলে আমি হয়তো আপনাদের সামনে আর মুখ দেখাতে পারবো না। তাই অনুরোধ রইল আপনাদের কাছে, আপনারা যেনো উদ্যোগ নিয়ে উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ান, আমি যেনো ক্ষুদ্র কিছু নিয়ে এগিয়ে এসে নিজের মনকে স্বান্তনা দিতে পারি।

তথ্য সুত্রের জন্য আবারো আলী মাহমেদ ভাইয়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। নিচে লিংকগুলো তুলে ধরলাম যাতে আমাদের এই বীর কমান্ডো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারেন আপনারা।

মুক্তিযুদ্ধে, একজন ঠেলাওয়ালা!
আবারও অগ্নিপুরুষের মুখোমুখি
‘কমান্ডো, খবরদার, তোমার এক ফোঁটা চোখের জল যেন গড়িয়ে না-পড়ে…’।
ও কমান্ডো, এ দিনও দেখার ছিল!

৯ thoughts on “যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না…

    1. যে দেশে মুক্তিযোদ্ধারা না

      যে দেশে মুক্তিযোদ্ধারা না খেয়ে মরে সে দেশেতো রাজাকাররা মন্ত্রী হবেই।

      এর দায়টাও যে বর্তায় আমাদেরই উপরে।

  1. “যেই দেশটা বাঁচানোর জন্য
    “যেই দেশটা বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে লড়াই করেছেন আজ সেই দেশটা বিনিময়ে কি দিয়েছে তাকে? ”
    না আমরা তাঁদের লজ্জা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি….
    ************************************
    ♦ আমি বাঙালি, বাংলা আমার…

    1. না আমরা তাঁদের লজ্জা ছাড়া আর

      না আমরা তাঁদের লজ্জা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি…

      বোধ হয় লজ্জাটা উনিই আমাদের দিয়েছেন, অট্টহাস্য হাসছেন তিনি আমাদের অপারগতা দেখে। তার ভেতর থেকে হয়তো আওয়াজ আসছে যৌবন বয়সে তিনি পাঁচ কেজি ওজনের বিধ্বংসী লিমপেট মাইন বুকে বেঁধে যেই সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন সে তুলনায় আমরা কিছুই করছি না।

    1. পোস্টখানার মূল উদ্দেশ্য
      পোস্টখানার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, যদি কোন সহৃদয়বান ভাই নিজ উদ্যোগে একটি সম্মিলিত প্রয়াসের ব্যবস্থা নিতেন তাহলে সেখানে আমিও অংশ নিতাম।

  2. পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে

    পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার আম্রকাননে ‘সুইসাইডাল স্কোয়াডে’ নাম লিখিয়েছিলেন। – See more at: http://www.istishon.com/node/6606#sthash.zj1lS4ck.dpuf

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *