প্রেম-অপ্রেমের গল্প : অপমৃত্যু

 photo Opomrittu_zpsbcf5d983.jpg

‘কি পড়া দেয়া ছিলো ?’
‘স্যার, কবিতা— ট্রেন । ৮ লাইন, প্রথম ৮ লাইন ।’
‘বলো ।’
‘বলছি স্যার—
ট্রেন
শামসুর রহমান
ঝক্ ঝকা ঝক্ ট্রেন চলেছে
ট্রেন চলেছে ওই
ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই ?
একটু জিরোয় ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন
পুলের ওপর বাজনা বাজায়
ঝন্ ঝনা ঝন্ ঝন্ ।’


 photo Opomrittu_zpsbcf5d983.jpg

‘কি পড়া দেয়া ছিলো ?’
‘স্যার, কবিতা— ট্রেন । ৮ লাইন, প্রথম ৮ লাইন ।’
‘বলো ।’
‘বলছি স্যার—
ট্রেন
শামসুর রহমান
ঝক্ ঝকা ঝক্ ট্রেন চলেছে
ট্রেন চলেছে ওই
ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই ?
একটু জিরোয় ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন
পুলের ওপর বাজনা বাজায়
ঝন্ ঝনা ঝন্ ঝন্ ।’

আমি চোখ দু’টো ঘুরিয়ে নিই অন্য দিকে । ভেতরের চোখটাও ফেরে অন্য কোথাও । সে চোখে আমি দেখতে পাই— অগণন কাঠের স্লিপার, সুদীর্ঘ লৌহপাত । একটা চলমান ট্রেন । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । …
‘স্যার !’
প্রাইভেট স্টুডেন্টটার ডাকে চোখ জোড়া আমি ফিরিয়ে আনি, ওর দিকে । একটু ইতস্তত করি । তারপর বলি— ‘হু ?’
‘বলা শেষ, স্যার ।’
‘কখন ?’
‘এই তো, স্যার— এই এখন ।’
একটু ক্ষণ পর, উঠে পড়ি, ওকে পড়া দেখিয়ে দিয়ে, পড়া বুঝিয়ে দিয়ে । হাঁটা শুরু করি, বাড়ির উদ্দেশে । অন্যমনা হয়ে যাই আমি আবার— চলমান ট্রেন । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । …

হাঁটতে হাঁটতে মুদি দোকানটা পার হয়ে এসেছি মাত্র, এমন সময় কেউ ঠাট্টা করে পেছন থেকে ডাকে আমায়— ‘সান্তনা !’
আমি দাঁড়িয়ে পড়ি হঠাৎ, কিন্তু পিছু ফিরি নে । আবার হাঁটা শুরু করি পরক্ষণে ।
‘সা-ন্ত-না- !’
সারেগামার মতো সুর করে আবার ডাকে কেউ । আমি এবার দাঁড়াই এবং ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই । দেখি, দোকানের বেঞ্চে বসা কয়েক জন বালক, চোখে মুখে কৌতুক নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।
ওরা আমারই সহপাঠী । আমি ওদের দিকে তাকাতেই ওরা অন্য দিকে তাকিয়ে ‘হা’ ‘হা’ ‘হি’ ‘হি’ করে ফেটে পড়ে হাসিতে । ওদের ‘সান্তনা’ ডাকে আমি ফিরে তাকিয়েছি, এই জন্যে । অথচ, সান্তনা আমার নাম না— একটা মেয়ের নাম । সেও সহপাঠী আমারই । মেয়েটার সাথে একবার এক ঘটনা ঘটে । ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে আমার—
আমি ক্লাসরুমে ঢুকছি, ও বের হচ্ছে । হঠাৎ যেনো কী একটা হয়ে গেলো, কীসের যেনো একটা প্রচন্ড আঘাত পেলাম পায়ে, এবং পড়ে গেলাম সংগে সংগে । এবং স্বাভাবিক হতেই লক্ষ করলাম, আমি পড়ে আছি উবু হয়ে । পড়ে আছি, তাও আবার একটা মেয়ের সম্মুখ দেহের উপর । হঠাৎ ঘটনায়, বুক থেকে ওড়না-টোড়না সরে গিয়ে, দেহের চাপে নিচে পড়ে আমার শরীরের সাথে বেশ ভালোভাবেই লেপ্টে আছে মেয়েটা— সান্তনা ।
ব্যাপারটা আপত্তিকর মনে হতেই ঝট্ করে উঠে দাঁড়ালাম আমি কোনোভাবে । হাত থেকে ছিটকে পড়া বই-পত্র গোছাতে গিয়ে দেখলাম, পায়ের কাছে একটা পাকা কলার খোসা, থেবড়ে পড়ে আছে একেবারে । বুঝলাম, দোষটা আর কারো না— এই কলার খোসাতে পা পড়েই হয়েছে এমনটা । ততোক্ষণে ঠিকঠাক হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সান্তনা । এবং ততোক্ষণে ব্যাপারটা দেখেও ফেলেছে অনেকে, এবং তারা অবাক তাকিয়ে আমাদেরই দিকে— ছি, কী লজ্জা, মুখ লুকিয়ে মরে যাবার মতো লজ্জা !
এই ঘটনার পর থেকেই আমি ‘সান্তনা’ । সবাই আমায় ‘সান্তনা’ বলেই ডাকে, কৌতুক করে মজা পায় ।
আমি, প্রথম প্রথম ক্ষেপতাম খুব, গা জ্বলে যেতো রাগে । এখন একেবারে সহজ হয়ে গেছি— রাগ করিই তো না, বরং মনে মনে বেশ আনন্দ পাই, উৎফুল্ল হয়ে উঠি । ভাবি, প্রত্যেক দিনের সবটা সময় যদি কানের কাছে বাজতো নামটা— সান্তনা সান্তনা … , আমি মরে যেতাম— প্রশান্তিতে, আনন্দে, সুখে ।
কী জানি— এই অনুভূতিটাই হয়তো প্রেম । ভালোবাসা ।

আমি ঘাড় ফিরিয়ে নিই, এবং হাঁটা শুরু করি পরক্ষণেই । আমার বুকের ভিতর থেকে চোখে মুখে উঠে আসে হাসি, প্রোজ্জ্বল হাসি । হ্যাঁ, এটাই প্রেম, ভালোবাসা একেই বলে । নয়তো বন্ধুরা ওর সাথে আমাকে জড়িয়ে ঠাট্টা করবে, কিন্তু আমি উপচে পড়া প্রশান্তিতে মুচকি হাসবো; সবাই ওকে আমাকে এক করে লজ্জা দেবে সামনে পেলেই, তবু আমি মেনে নেবো সাদরে, অনায়াসে; ওর সুশ্রী মুখটা স্রেফ দেখবো দু’চোখে, অথচ বুকটা আমার ভরে যাবে সুখে ! কেনো ? নিশ্চিত, আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি ওকে— সান্তনাকে !

বাড়ির উঠোনে এসে পা রাখতেই শুনি ট্রেনের শব্দ— সকাল ৮ টায় ছেড়ে আসা খুলনা টু বেনাপোল রুটের ট্রেন । ট্রেনের সে শব্দ মিলিয়ে যেতেই বুকের মধ্যে জেগে ওঠে আরেক সকাল আটটা— নিচে পাথর খন্ডের স্তুপ । একটার পর একটা সাজানো স্লিপার । দিগন্ত ছোঁয়া লৌহপাত । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । …

গতকাল সবচেয়ে কাছের বন্ধুটা এসে হসি হাসি মুখে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘আজ আমার খুব মরতে ইচ্ছে করছে । কেনো জানিস ?’
আমি নির্লিপ্তভাবে বন্ধুটার দিকে তাকাই শুধু— বলি নে কিছুই ।
ও আগের মতোই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, ‘কারণ— ও । ওর জন্যে মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার ।’
ওর দিকে সেভাবেই তাকিয়ে থাকি আমি— মুখ খুলি নে ।
ও সামান্য রেগে যায় । আমার দিকে ঝুকে এসে বলে, ‘তুই একটা কিছু জিগ্যেস কর— কেনো, কি ঘটেছে— এমন কিছু !’
আমি আগের মতোই নির্লিপ্ত । বলি, ‘কার জন্য ?’
‘যাকে ভালোবাসতাম এতোদিন ।’
‘কেনো ?’
‘আজ ও কি বলেছে জানিস ? আমার প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত ও অপেক্ষা করবে ।
একটু অবাক হলাম আমি । বললাম, ‘তাই না কি !’
ও বললো, ‘হুঁ । বল, এই উপলক্ষে তুই আমার কাছে কি চাস ? তোর সব চাওয়া আজ আমি পূরণ করবো ।’
হঠাৎ করেই যেনো সজাগ হয়ে উঠি আমি । যে কথাটা প্রায় দু’বছর ধরে নিজের মাঝেই রেখেছি, বলতে পারিন নি কাউকে, ঝট্ করে বলে ফেলি তা ওকে— ‘আমি— আমি একজনকে খুব ভালোবাসি রে ।’
‘কাকে— সান্তনাকে ?’
‘হ্যাঁ ।’
ও স্বাভাবিক হয়ে যায়— ‘বল— আমাকে কি করতে হবে ?’
‘ভালোবাসি, কিন্তু আজ অব্দি কথাটা ওকে বলতে পারি নি ।’
‘বুঝেছি— কথাটা ওকে পোষ্ট করে দিতে হবে, এই তো ?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ ।’ আমিও যেনো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছি, আস্তে আস্তে ।
‘আচ্ছা ঠিক আছে ।’
বন্ধুটার কথা শেষ হবার সাথে সাথে, আমার ভেতরটায় প্রচন্ড এক ঝড় বয়ে যায় । মুহূর্তে বুকটা হাল্কা হয়ে যায় একেবারে । বন্ধু জানে না— সে কতো বড়ো একটা উপকার করতে যাচ্ছে আমার ।

টেবিলের উপর বই খোলা । পড়ছি নে— একটা করে পৃষ্ঠা উল্টোচ্ছি, আর ভাবছি সান্তনাকে । বারংবার মনে পড়ছে বন্ধুর কালকের সে প্রতিশ্রুতির কথা ।
বন্ধুটা ভালোবাসাকে পাবার নিশ্চয়তা পেয়েছে, তাই তার মরে যেতে ইচ্ছে করেছে— শুধু ইচ্ছে । আর আমি— পাই নি কিছুই, কিন্তু হাজার বার মরেছি ইতিমধ্যে !
হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এসে ঘরে ঢোকে ভাতিজাটা । বলে, ‘তাতু- তাতু-’
আমি বলি— ‘জ্বী চাচু ।’
ও কাছে সরে আসে, আহ্লাদে মাথাটা এলিয়ে দেয় আমার উরুর উপর । তারপর অল্প অল্প কথা শেখা কণ্ঠে বলে, ‘তাতু- আমি না- এ্যাত্তা দল্প থিতেথি-!’
‘গল্প শিখেছো ?’
‘হ্যাঁ— দল্প থিতেথি !’
‘বলো তো, শুনি- কী গল্প শিখেছো ।’
‘ধত্ ধতা ধত্ ত্লেন তলেথে
ত্লেন তলেথে ওই
ত্লেন তলেথে ত্লেন তলেথে
ত্লেনেল বালি তই ?’
আমি মুখটা ঘুরিয়ে নিই অন্য দিকে, মনটাও— একটা চলমান ট্রেন । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । ভেতরে তার একটাই বার্তা, একটাই সংবাদ— ভালোবাসি । গন্তব্য— সান্তনা । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । …

মাঠের ঠিক মধ্যখানটায় বসে আছি আমি— একা, নিঃসঙ্গ । বিকেলের রোদ মরে এসেছে । মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে বাতাসে, বারংবার ।
একসময় ট্রেনের হুইসেল শুনে মাথা উঁচু করে তাকাই আমি— দূরে ট্রেন লাইন । একটা চলমান ট্রেন । ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । এবং একসময়, মিলিয়ে যায় দূরে কোথাও— ট্রেনের চিণ্হ, ট্রেনের শব্দ । কিন্তু চোখ ফিরোই নে আমি । শুধু মন ফেরে অন্যথা— ঝকঝক । ঝকঝক । ঝকঝক । চলমান ট্রেন, নিচে তার বুকের পাঁজরে গড়া পাত । তারপর স্লিপার, সে স্লিপার পায়ে পিষে এগিয়ে চলেছে ট্রেন … ।

এখন আমার চোখে জল, বুকের মধ্য থেকে উপচে পড়ছে সে জল, উঠে আসছে চোখে, অশ্রু হয়ে, গড়িয়ে পড়ছে তা, চুইয়ে চুইয়ে, দু’গাল বেয়ে, … ।
চলমান ট্রেন । ঝকঝক ঝকঝক ঝকঝক … । নিচে তার পাঁজর-পাত । তারও নিচে স্লিপার— সে বক্ষ-স্লিপার । চিতার আগুনে পোড়া শরীরের মতো ক্রমশ দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সে স্লিপার— কষ্টে, অসহ্য যন্ত্রনায় ।

কাল বরপক্ষ তুলে নিয়ে গেছে সান্তনাকে !!

 photo Opomrittu2_zps25dcef12.jpg
অপমৃত্যু । সুপণ শাহরিয়ার
(রচনাকালঃ ১৩ এবং ১৪ মে, ২০০২)
মিস্ত্রীপাড়া, খুলনা

১২ thoughts on “প্রেম-অপ্রেমের গল্প : অপমৃত্যু

  1. (No subject)
    :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন: :ভাঙামন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *