একটি কাল্পনিক প্রস্থান

সাদা কাপড়ের উপর মাথা রেখে তৃণা এখনো খুব কাঁদছে । কাপড়ের ভিতর আরেকটা আমি । ঘুমন্ত, চিরঘুমন্ত । পার্থিব ভাষায় যেটাকে বলে লাশ, মৃতদেহ সেটা । না না, জীবন্ত লাশ না । ওটা সত্যিকারের লাশ । ওই আমি আর কথা বলবো না । ওই আমি আর নিকোটিন হাতে বিপ্লবের কথা বলবো না, আর কবিতা লিখবোনা । মধ্যরাতে হঠাৎ জেগে উঠে অবাক হয়ে পঞ্চমীর চাঁদ দেখবো না আর । ওই আমি আর বৃষ্টিস্নানে যাব না, বৃষ্টিভেজা কদম তুলতে যাব না । ওই আমি পার্থিব ছেড়ে এখন অপার্থিবের দ্বারে । আমার সব উল্লাস কেড়ে নিয়েছে ওই ঐশ্বরিক শক্তি ।

সাদা কাপড়ের উপর মাথা রেখে তৃণা এখনো খুব কাঁদছে । কাপড়ের ভিতর আরেকটা আমি । ঘুমন্ত, চিরঘুমন্ত । পার্থিব ভাষায় যেটাকে বলে লাশ, মৃতদেহ সেটা । না না, জীবন্ত লাশ না । ওটা সত্যিকারের লাশ । ওই আমি আর কথা বলবো না । ওই আমি আর নিকোটিন হাতে বিপ্লবের কথা বলবো না, আর কবিতা লিখবোনা । মধ্যরাতে হঠাৎ জেগে উঠে অবাক হয়ে পঞ্চমীর চাঁদ দেখবো না আর । ওই আমি আর বৃষ্টিস্নানে যাব না, বৃষ্টিভেজা কদম তুলতে যাব না । ওই আমি পার্থিব ছেড়ে এখন অপার্থিবের দ্বারে । আমার সব উল্লাস কেড়ে নিয়েছে ওই ঐশ্বরিক শক্তি ।
তৃণার চোখে কাজল ছিল । ও কাজল খুব পছন্দ করত । আমারো খুব ভাল লাগতো ওর কাজলমাখা চোখ দু’টো দেখতে । কান্নার জলে কাজল লেপ্টে গেছে । ভয়ংকর লাগছে এখন । ওকে মনে হয় আজ খুব সুন্দর লাগছিলো । মেয়েটাকে দেখে খুব মায়া হচ্ছে । কাঁদলেও যে একটা মানুষকে এত সুন্দর লাগে আগে জানতাম না । ইচ্ছে করছে, ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘এত কাঁদেনা মেয়ে। ‘ কিন্তু এটা বলার ক্ষমতা আমার আর নেই । কেড়ে নিয়েছে । কাঁদছে, কাঁদুক না একটু ।

ওপাশে মা নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে । এটাকেই মনে হয় পাথর হওয়া বলে । পাশে বসে ফুপু মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে । আর কোনদিন মায়ের বকা শোনা হবে না । শোনা হবে না মায়ের কোন ডাক আর । মা এখন কাকে খোকা করে ডাকবে ??? মা, মাগো, কেঁদো না মা । আমার কোন শব্দ মায়ের কানে যাবে না, আমি জানি । বাবাকে দেখতে পাচ্ছি না ।
আশে-পাশে অনেক মানুষজন । কারো কারো চোখে পানি । কেও আবার রাজ্যের বিরক্ত কিংবা বিস্ময়ভরা মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে । কেন তা বুঝলাম না । কয়েকজন ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক ওদিক দৌড়াদোড়ি করছে । বুঝলাম এদের উপর সব দায়িত্ব পড়েছে, কিভাবে আমার পার্থিব অংশটাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে, কিভাবে সব আলোর পথ রুখে দিবে । ভেসে থেকে সব কিছু দেখতে কেমন জানি লাগছে । আবার এই আমিকে কেও দেখছে না, কিন্তু আমি সবাইকে দেখছি ।
একটা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে তৃণাকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়লো । মেয়েটাকে চেনা যাচ্ছে না । ও হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি । ওটা অনন্যা । মেয়েটা খুব সুন্দর গায় । ওঁর খুব মায়াবী গলাটা দিয়ে যখন রবীন্দ্র সংগীত গাইত, চোখে পানি চলে আসতো ।

একটুপর স্বদেশদা এসে ঢুকল । সাথে বরাবরের মতই দু’তিনজন আছে । স্বদেশদাকে আড়ালে আমরা ‘নকশাইল্যা’ করে ডাকতাম । উনার মুখে সবসময় বিপ্লবের বড় বড় কথা আর হরেক রকম তত্ত্ব শোনা যেত । কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁর দ্বারা কোন বৈপ্লবিক কিছু হতে দেখলাম না । এমনকি শাহবাগ আন্দোলন শুরু করে যখন আমরা এক বড় বিপ্লবের পথে তখনও নিজে বিপ্লব শুরু করতে পারেননি বলে চিকিৎসার নাম করে তিনি কলকাতায় চলে গেলেন । মানুষটা বড়ই আজব কিসিমের ।
সবুজরা এসে ঘুমন্ত আমিকে দেখেই কিসব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । একসাথে মশাল হাতে মিছিলে যেতাম আমরা, শ্লোগানে গলা মেলাতাম, ছবিরহাটে আড্ডা দিতাম । ওরা আমাকে খুব পছন্দ করত । কিন্তু কারণটা আজো অজানাই রইলো । আমার বেশকিছু পুরাতন বন্ধুকেও দেখা যাচ্ছে । বিপ্লবী বলে যাদের অনেকে আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল । ওদেরও দেখা যাচ্ছে । সব বন্ধুদের মাঝে একটা ‘রি-ইউনিয়ন’ টাইপ ব্যাপার ঘটছে । এটা দেখতেও ভাল লাগছে । তবে একটা অভিমানী বন্ধুকে আজো দেখছি না । আমার শেষটুকু দেখতেও ও আসবে না !!! জানি না, মানুষ বড়ই বিচিত্র ।

***************************************

হাতে খুব বেশি সময় নেই । আমার খুব পরিচিত কয়েকটা জায়গায় খুব যেতে ইচ্ছা করছে ।শেষবারের মত । যাই একটু দেখে আসি । প্রথমেই শাহবাগ । এহ কারওয়ান বাজারের জ্যাম । জ্যাম ছাড়া জায়গাটা যেন কল্পনাই করা যায় না ।
শাহবাগ বরাবরের মতই ব্যাস্ত । এপ্রোন পড়া তরুণ বা সদ্য এপ্রোন গায়ে চড়ানো সুন্দরী মেয়ে ডাক্তার, ভার্সিটিতে পড়ুয়া লাজুক মেয়েটি কিংবা খুব মেধাবী ছাত্রটির পদচারণায় মুখর চারপাশ । চায়ের কাপে চুমুক চলছেই । জাদুঘরের গেটের সামনে বরাবরের মতই মাইক বাঁজছে । সভা ঘিরে প্রগতিশীলদের আনাগোনা । কোন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি আসর বসিয়েছে । আসর ভালই জমেছে । সেই একই কাহিনী । যে বক্তৃতা দিচ্ছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি মাইক্রফোনটা নিংড়ে খেয়ে ফেলবে । আচ্ছা, এরা কি সারাজীবন এভাবেই মাইক সামনে নিয়ে গলা শুকিয়ে ক্ষণিকের জন্য বাতাস কাঁপিয়ে যাবে ??? আর কিছু কি করবে না কখনো ? খুব জানতে ইচ্ছা করে ।
চারুকলার বকুলতলা গেটে এলাম । কে যেন করুণ সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে । “কাছের মানুষ দূরে থুইয়া, মরি আমি….” ছবির হাটের গেটে কিসের জানি জটলা । কোন বিষন্ন, ক্লান্ত আঁকিয়ের ছবি প্রদর্শনী চলছে মনে হয় । শিল্পীদের বিষন্ন ক্যানভাসে নিজেকে ভাবতে খুব ভাল লাগছে আজ ।

ছবির হাটের ভিতরে গেলাম । ভিতরে কিসের জানি স্টেজ হচ্ছে । মনে এল এখানেই তৃণার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো । চায়ের দোকানগুলো সব ব্যস্ত । সবাই চায়ের কাপে চুমুক আর নিকোটিন চুম্বনে ব্যস্ত ।
একটু মুক্তমঞ্চের দিকে যাই । সামনে এগুতেই একটা পরিচিত ঘ্রাণ আচ্ছন্ন করে দিল । আচ্ছা মৃতও কি ঘ্রাণ পায় ?? আমিতো জানতাম পায় না । তাহলে আমি পাচ্ছি কিভাবে !!! মাথায় ঢুকছে এখন ।
লালন মঞ্চে চলছে মানবতার সুর । “…লালন বলে জাত কারে কয়…এ ভ্রম তো গেল না…” চারপাশে নানা বাদ্যযন্ত্রের সেই পরিচিত আওয়াজ ।

শিখা অণির্বান এখনো ঠিক সেভাবেই জ্বলছে, যেভাবে জ্বলতো । এ আগুন নিভবে না কোনদিন । এ আগুন ৩০ লক্ষ শহীদের দ্রোহের আগুন । বাঙালী স্বত্ত্বার সাথে মিশে আছে এ আগুনের প্রতিটা শিখা, প্রতিটা ফুলকি । মুক্তমঞ্চটা, যেখানে একদিন বঙ্গবন্ধু ঝড় তুলেছিলো, সেটা তেমনি আছে । পাশ দিয়ে একটা আলোর প্রভা বেশ উঁচুতে উঠে গেছে । যেন বাংলার বিশালতা, একাত্তরের বিশালতা বুঝিয়ে দিচ্ছে ।
এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না । একটু মধুর ক্যান্টিনে যাই । নানান নেতাদের পদচারণায় ব্যস্ত বাতাসের প্রতিটি ইঞ্চি-কোণা । আর থাকা সম্ভব না ।
আবার পার্থিব আমির কাছে ফিরে এলাম । এখন লোকজন একটু বেড়েছে । তৃণা এখনো কাঁদছে । মাকেও কাঁদতে দেখলাম । আমাকে মনে হয় এখন সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হবে । এইতো সবাই এসে শেষ দেখা দেখা যাচ্ছে ।

*********************************

মাংস চামড়ায় মোড়ানো আমার পার্থিব অংশটুকুকে মাটির ঘরে ডুবিয়ে রাখার সব আয়োজন সম্পন্ন । আর ওটাকে কেও দেখতে পাবে না । কি লাভ ওটা ওখানে রেখে? তারচেয়ে এটা যদি কোন মেডিকেল কলেজে দেয়া হত তবে শিক্ষার্থীরা হয়ত উপকৃত হত । কি আর করা! এক এক করে সবাই চলে যাচ্ছে এই জঙ্গলঘেরা জায়গাটা থেকে । ওদেরও সময় ফুরিয়ে এসেছে ।
আমাকে এখনই চলে যেতে হবে উপরে, ওপারে । আর এ মাটির ঘ্রান নেয়া হবে না । আর বৃষ্টি দেখা হবে না । আর হাঁটা হবে না নিয়ন আলোয় । শেষবারের মত তৃণাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করলো । ও কি এখনো কাঁদছে ?? নাহ দেখা হবে না । হাতে সময় নেই । ওপারের ডাক শোনা যাচ্ছে ।
তোমরা ভালো থেকো ।

ভালো থেকো প্রতিটা ধূলিকণা
ভালো থেকো প্রতিটা জলকণা…

প্রস্থান সম্পূর্ণ

৬ thoughts on “একটি কাল্পনিক প্রস্থান

  1. লেখার ধরন এবং উপমাগুলো চমৎকার
    লেখার ধরন এবং উপমাগুলো চমৎকার হয়েছে৷ পাঠক হিসেবে বলি, এটাকে শুধুমাত্র লেখা হিসেবে রাখলেই ভাল হত৷ নিজের মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করে লেখাটাকে কলুষিত করা হল বলেই আমার মনে হয় 🙁

  2. খুব ভাল লেগেছে…।
    কিছুটা

    খুব ভাল লেগেছে…।
    কিছুটা কষ্টও পেয়েছি। চিরাচরিত বাস্তবতা। যাকে মেনে না নিয়ে কোন উপায় নেই।
    লেখার ধরনকে বজায় রাখুন…

  3. ধন্যবাদ…
    লেখাটার প্রতিটা

    ধন্যবাদ…
    লেখাটার প্রতিটা শব্দ বাস্তব এবং আমার জীবনের সাথে মিল রেখে এটা লেখা । তাই মতাদর্শের হের-ফের হতেই পারে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *