একটি আগুণ উগরানো বোতল ও তার আনুষাঙ্গিক গল্প

সকাল ০৬ টা , যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা । প্রচন্ড শীতে গায়ের চাদরটিকে ভালোমত গায়ে জড়িয়ে ধোলাইপাড় মুখি রাস্তায় হাটা ধরল জসীম। রাস্তার উপর একরাশ কুয়াশা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে । মাঝে মঝে দু-একটা বাস বেপরোয়া গতিতে হাওয়ায় শব্দ তুলে তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে । শীতের মধ্যে এত সকালে রাস্তায় নামার কোনো ইচ্ছাই তার ছিলো না । কিন্তু উপায় নাই । হাটতে হাটতে ধোলাইপাড় এসে পৌছাল সে । রাস্তার পাশে নানা রংয়ের বাহারী সিগারেটের প্যাকেটে সাজানো টং দোকানের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল । পকেট হাতড়ে ২ টাকার একটা ঠান্ডা কয়েন বের করে দোকানীকে দিয়ে বলল :

“মামা, একটা স্টার দিয়েন”


সকাল ০৬ টা , যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা । প্রচন্ড শীতে গায়ের চাদরটিকে ভালোমত গায়ে জড়িয়ে ধোলাইপাড় মুখি রাস্তায় হাটা ধরল জসীম। রাস্তার উপর একরাশ কুয়াশা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে । মাঝে মঝে দু-একটা বাস বেপরোয়া গতিতে হাওয়ায় শব্দ তুলে তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে । শীতের মধ্যে এত সকালে রাস্তায় নামার কোনো ইচ্ছাই তার ছিলো না । কিন্তু উপায় নাই । হাটতে হাটতে ধোলাইপাড় এসে পৌছাল সে । রাস্তার পাশে নানা রংয়ের বাহারী সিগারেটের প্যাকেটে সাজানো টং দোকানের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল । পকেট হাতড়ে ২ টাকার একটা ঠান্ডা কয়েন বের করে দোকানীকে দিয়ে বলল :

“মামা, একটা স্টার দিয়েন”

দোকানদারের বয়স ৫০ এর উপর ,কালো ময়লা একটা চাদর গায়ে শীতে কাপছে । এত সকালে শীতের মধ্যে চ্যাংড়া একটা ছেলে তাকে মামা ডাকায় সে মোটেও প্রীত হোলো না । কাপা কাপা হাতে সিগারেটের প্যাকেট হতে জসীমকে একটা সিগারেট বের করে দিলো সে । পকেট হতে ম্যাচ বের করে সিগারেটটা ধরিয়ে একরাশ ধুয়া উগরিয়ে দিলো জসীম । হাওয়ায় নৃত্য করতে করতে ধুয়াগুলি কুয়াশায় মিশে গেল ।সিগারেট টানতে টানতে জসীম তার আশে পাশে তাকালো । রাস্তার অপর পাশে পার্ক করা ঠেলাগাড়িতে কয়েক স্তরের ছেড়া জামা কাপড় গায়ে জুবুথুবু হয়ে ঘুমাচ্ছে কিছু অল্প বয়সী ছেলে-মেয়ে । শীতের প্রহারে ব্যাথাক্লিষ্ট মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ছোট বোনটার কথা মনে পড়ে তার । এত শীতেও এখনো তাকে একটা গরম কাপড় কিনে দেয়া হয়নি ।

মাস কয়েক যাবৎ হাতে তেমন টাকা পয়সা নাই । গত দুইমাস একটা গারমেন্টসে কাজ করেছিল , কিন্তু বেতন না দিয়ে গতকাল হঠাৎ করেই মালিক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে । মাথায় আকাশ ভেংগে পড়েছিল তার । কিন্তু মালিকের ক্যাডার বাহীনির সামনে কিছু করতে না পেরে , অক্ষম আক্রোশে অনেক ক্ষণ তাকিয়ে ছিলো মালিকের এসি লাগানো নানা পদের বিদেশী আসবাব সজানো রুমের দিকে । বস্তির ঘর ভাড়া বাকী। ঘরের মালিক বুঝবে না তার চাকরী আছে কি নাই , তার দরকার টাকা । নানাবিধ চিন্তায় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে যখন সে বস্তি ঘরে ফিরছিল , তার নিকটতম প্রতিবেশী মুরাদ তাকে ডাকলো ।

মুরাদের সাথে কখনোই তার তেমন একটা কথা হয় নাই । এই বস্তিতে আসার পর থেকে সে কখনোই মুরাদকে কাজ করতে দেখে নাই, মাঝে মাঝে দেখেছে অনেক ছেলেপেলে নিয়া গাড়ি ভর্তি করে বড় বড় সমাবেশে নিয়ে যেতে । মুরাদ তাকে ডেকে নিয়ে তার ঘরে বসাল । জসীম তার ঘরে ঢুকে অবাক দেখল খাট, শোকেস, টিভি ইত্যাদি দিয়ে ঘর সাজানো । ঘরের এক কোণে অনেকগুলো ছোট বড় কাচের বোতল ,নানা রংয়ের স্কচটেপ ,দুই-তিনটা তেলের ব্যারেল।

মুখে আন্তরিক হাসি তুলে মুরাদ তাকে জিজ্ঞেস করলো :“ কি মিয়া ,মন খারাপ নাকি ?”

কি বলবে খুজে পাচ্ছিল না জসীম ।

“আরে মিয়া বুঝি সবি বুঝি, তোমার চেহারা দেইখাই বুঝছি সমস্যায় আছো, কি সমস্যা কও দেহি ? ট্যাহা পয়সার সমস্যা বুঝি ? ”

যার সাথে কখনো ভালোভাবে কথা হয় নি, তেমন লোকের অযাচিত আন্তরিকতায় গল গল করে তার দুঃখের ফিরিস্তি দিতে শুরু করল জসীম। সব শুনে মুরাদ তার হাত ধরে বলল:

“ বুঝিরে ভাই, গরীবের দুঃখ তো গরীবই বুঝবো, নাকি? এই দেশে তো মনে কর সৎ থাইকা কোনো লাভ নাই, এমপি-মিনিষ্টার থেইকা ট্রাফিক সার্জেন-চায়ের দোকানদার পর্যন্ত সবাই আছে ধান্দার উপরে । কে কারে মাইরা কত উপরে উঠতে পারে, তুমি আমি বাদ যামু ক্যান? অহন তো ধান্দার বাইরে থাকলেই বিপদ । শুনো, আমার হাতে কাম আছে । নগদ কাম, নগদ পয়সা। কোনো ধানাই পানাই নাই ।”

আশাবাদী হয়ে জসীম তাকে জিজ্ঞেস করলঃ “ কি কাম ভাই ?”

গোপন কিছু বলবে এমন ভাব নিয়ে মুরাদ তার আরো নিকটবর্তী হয়ে বললঃ “ দেখতেই তো আছো দ্যাশে গ্যাঞ্জাম লাইগা আছে । সবাই সবার ভাগের লাইগা কামড়া-কামড়ি করতাছে। আমি ছোড মানুষ । এত কারবার বুঝার চেষ্টা নাই, আমি খালি বুঝি ক্যামনে আমার হাতে ট্যাহা আইবো । আমার কাছে সরকারি-বিরোধী উভয় দলই আহে , আগে আইতো সমাবেশে লোক সাপ্লাইয়ের লাইগা, অহন আহে বোতলের লাইগা ”

“কিয়ের বোতল ভাই?” বুঝতে না পেরে জসীম তাকে জিজ্ঞেস করলো।

মুরাদ হেসে বললঃ “ আরে দেখো না যে চারিদিকে খালি বুতল ফাডে আর আগুণ ধইরা যায়, আমি এই বোতল বানাই , আর লোকজন দিয়া অর্ডার অনুযায়ী ফাডাই ”

জসীম আতংকিত হয়ে বললঃ “ কন কি ভাই , আপনে এই মানুষ মারার ব্যাবসা করেন ,এই গুলানতো ভাই ঠিক না । ”

মুরাদ একটু নড়ে-চড়ে বসে বললঃ “ আরে তোমার ঠিক ব্যাঠিক দিয়া মুড়ি মাখায়া খাও, তুমি আমি মরলে কেউ দ্যাখে ? আমগো এত দেইখা লাভ কি , তুমি গারমেন্টসে এক মাস কাম কইরা যে বেতন পাও, একটা বুতল মারলেই তো সেই ট্যাহা কামাইবা ৫ মিনিটে ,এই ট্যাহা তুমগো মালিকের মত লোকজনই সাপ্লাই দেয়, হেরা সব কামে ট্যাহা দিবার পারে খালি তুমগো বেতনের সময় একটু কাইন্ঠামি করে । আর অহন যাও, চিন্তা ভাবনা কইরা দেখা কর তবে মাথায় রাইখো কাম করলে করবা না করলে না খাইয়া থাকবা সবই তোমার বিবেচনা, তবে কম কথা বলবা ” বলে মুরাদ রিমোট হাতে নিয়ে টিভিতে হরতালের লাইভ খবর দেখতে লাগল।

মুরাদের ঘর থেকে বের হয়ে জসীম তার ঘরে গেল । ময়লা ছেড়া বিছানায় বসে হাটুতে মাথা রেখে সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল । বহু আশা নিয়ে সে তার বাপ মা মরা বোনটারে সরকারি স্কুলে ভর্তি করেয়েছিল । কিন্তু ঠিক মত কাগজ কলম কিনে দিতে না পারায় তার পড়াশোনা ঠিক মত হয় না । এদিকে ঘর ভাড়া বাকি, মুদি দোকানে টাকা বাকি এই সব নিয়া ভাবতে গেলেই তার চোখে শুধু কাচের বোতল গুলা ভেসে উঠছে । কি করবে বুঝতে পারছে না জসীম। এই কাজ করতে গেলে মানুষ মরতে পারে। তাছাড়া তার হাতে কেউ মরলে তার নিজের মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে সে কি জবাব দেবে? পরক্ষণেই তার মনে হলঃ “ ধুর বাল ! যে আল্লা আমার রিযিকের ব্যবস্থা করে নাই, তার সন্তুষ্টি দিয়া আমি কি করব ? যে মালিক এত গুলা শ্রমিকের বেতন মাইরা খাইলো তারে আল্লা আরো সম্পদশালী করব, আর আমি যে কোনোদিন কারো কিছু মাইরা খাই নাই তারে বিপদে ঠেইলা দিব? তাছাড়া এই বোতলতো মারতে হইবো বড়লোক নেতাগো লাইগা, এই কামে যদি মানুষ মরে আর তাতে যদি তাগো কোনো পাপ না হয় তাইলে আমারও কোনো পাপ হইবো না । এত চিন্তায় কাম নাই আমার অহন বুইনডারে লইয়া খাইয়া পইড়া বাচন লাগবো”

সে উঠে মুরাদের ঘরে চলে গেল । মুরাদ তাকে দেখে সমাঝদারের হাসি হেসে বললোঃ

“কি মিয়া, বুঝছো তাইলে, শুনো কাইলকা তো হরতাল। কাইল সকাল ৬টা বাজে আমার থেইকা ১টা বুতল নিয়া ধোলাইপাড় বাসস্ট্যান্ডে চইলা যাবা। বাস-ট্যারাক যাই পাও খালি ধরাইয়া মাইরা দিবা, আমি নেতারে ফোন দিয়া দিবানে, সে মিডিয়ার লোকজনরে জানাই দিবো। আর এই লও ১৫০০ ট্যাহা রাখো কাইলকা কাম শেষে আরো দিবানে।”

জসীম ধীর পায়ে হেটে মুরাদের থেকে টাকাটা নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো।

দূর থেকে একটা গাড়ির হর্ণ শুনতে পেলো জসীম। হাতের সিগারেটটা ফেলে উৎকীর্ণ হয়ে চাদরের ভেতর থেকে ঠান্ডা বোতলটা বের করে আনে । আশে পাশে ক্যামেরা হাতে ছোট ছোট মাইক্রোবাসে বসে থাকা লোকগুলোর দিকে এক নজর তাকিয়ে, বোতলের বেড়িয়ে থাকা সলতায় সতর্কতার সাথে অগ্নিসংযোগ করে সে । গাড়ির শব্দ তখন আরো নিকটবর্তী হল। সাদা কুয়াশায় জসীম শুধু হলদেটে হেডলাইট দুটো দেখলো, তারপরেই ছুড়ে মারলো বোতলটি । ঝন ঝন শব্দে ভেঙে আগুণ উগরে দিল ছোট্ট বোতলটি । এক পলকের জন্য আগুনের পেটে যেতে থাকা আম্বুলেন্সটি দেখে উলটো পথে দৌড়াতে শুরু করলো জসীম । শেষ মুহুর্তে বেজে ওঠা সাইরেনে জসীমের দৌড়ানোর পথটা তার নিজের কাছেই অনেক বেশী অচেনা আর এবড়ো-খেবড়ো মনে হয় ……

৭ thoughts on “একটি আগুণ উগরানো বোতল ও তার আনুষাঙ্গিক গল্প

  1. জাকারিয়া ভাই, আপনাকে স্বাগতম
    জাকারিয়া ভাই, আপনাকে স্বাগতম ইস্টিশনে,
    লেখাটা আগেই পড়েছি… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    ধন্যবাদ চালিয়ে যান… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *