আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।


২১ জানুয়ারি ‘৬৯-এ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে মিছিল




২১ জানুয়ারি ‘৬৯-এ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে মিছিল

শহীদ আসাদকে নিয়ে আমাদের কবি শামসুর রাহমান একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতার নাম হল…

‘আসাদের শার্ট’

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়
বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।

ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চুড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী আসাদের বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। ঐ দিন‘পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ আইয়ুব সরকারের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রায় ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীর মিছিলে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে। আসাদ ছিল মিছিলের সামনেই । মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে তখন পুলিশ বাহিনী মিছিলে বাধা দেয় এবং হামলা চালায়। তখন মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, কিন্তু এখানেই পরাজয় মানতে নারাজ। আসাদ আবার ছত্রভঙ্গ মিছিলটি আবার সংগঠিত করে এগুতে শুরু করলো। এবার পুলিশের টার্গেট আসাদ। প্রথমেই আসাদের ওপর বেওনেট চার্জ করে। এতে আহত হয়ে আসাদ মাটিতে পড়ে গেলে, তারপর এক বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তা আসাদের বুকে গুলি করেন। শহীদ হন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) নেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ওরফে আসাদ। উনসত্তুরের গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সরকারি বাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা ৯৪ থেকে ৯৯ জন।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসাদের মৃতদেহ

আসাদের মৃত্যুই ছিল আইয়ুব শাসন অবসানের শেষ বুলেট। আসাদ-হত্যার প্রতিক্রিয়াতেই গণআন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যার চূড়ান্ত পরিণতি। এর পরের ইতিহাস সবার জানা। তার মৃত্যুর সংবাদ সারাদেশে বিদ্রোহের মত ছড়িয়ে পড়েছিল। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অফিস আদালত ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেয়। ঢাকা পরিণত হয় প্রতিবাদ ও মিছিলের নগরীতে। তখন সবাই শ্লোগান দেয় ‘আসাদের মন্ত্র: জনগণতন্ত্র’ এ স্লোগান হয়ে উঠে সে সময়ের সব থেকে জনপ্রিয়।

অভাক কান্ড হল এই যে, পুলিশ অফিসার(হত্যাকারী) ডিএসপি বাহাউদ্দীন তার রিভলভার দিয়ে আসাদকে গুলি করেছিলেন সেই পুলিশ অফিসার স্বাধীনতার পরও কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন মহলের দাবি উঠা সত্ত্বেও ঐসময়ের সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বা আসাদ হত্যার বিচারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি!

আসাদ আজ আমাদের কাছে নেই , কিন্তু তার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা আমাদের পথ দেখিয়ে দিবে। সেদিন সবাই আসাদের রক্তাত্ত শার্ট নিয়ে মিছিল করেছিল। আসাদের বুকের রক্ত সেই দিনই মুছে দিয়েছিল সারাদেশে আইয়ুবের নামের সব নিশানা। অনেক পরিশ্রম করে আইয়ুব ঢাকার মোহাম্মদপুরে নির্মাণ করেছিলেন ‘আইয়ুব গেট’, সতঃস্ফুর্ত জনতা তার নামকরণ করেন ‘আসাদ গেট’। একইভাবে ‘আইয়ুব অ্যাভিনিউ’ হয় ‘আসাদ অ্যাভিনিউ’ এবং ‘আইয়ুব পার্ক’ হয়ে যায় ‘আসাদ পার্ক’। আসাদ নেই! আসাদ আছে।

আসাদ কে নিয়ে ঐ সময়কার আরেকটি কবিতা…

এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
অথবা সুনীল-সাগর-জল-
সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
তাইতো রাখি না এ লাশ আজ
মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।

শ্রদ্ধাঞ্জলী :salute: :salute: :salute:

১৩ thoughts on “আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

  1. এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
    তেমন

    এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
    তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
    মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
    অথবা সুনীল-সাগর-জল-
    সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
    তাইতো রাখি না এ লাশ আজ
    মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
    হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।

    শ্রদ্ধাঞ্জলি শহীদ আসাদ। :salute: :salute: :salute:

  2. গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো

    গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
    জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
    উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।
    বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
    নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
    হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়
    বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
    উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।


    আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
    সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
    আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

    :salute: :salute: :salute: :salute: :bow: :bow: :bow: :bow:

  3. এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
    তেমন

    এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
    তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
    মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
    অথবা সুনীল-সাগর-জল-
    সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
    তাইতো রাখি না এ লাশ
    আজ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
    হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই –

    চমৎকার লিখেছেন… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :ফুল: শুধু বানানগুলো একটু ঠিক করে দেবেন… :বুখেআয়বাবুল:

    শহীদ আসাদ… :bow: :bow: :bow: :bow: :salute: :salute: :salute: :salute:

  4. এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ? তেমন

    • এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ? তেমন যোগ্য সমাধি কই ? মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো অথবা সুনীল-সাগর-জল- সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই ! তাইতো রাখি না এ লাশ আজ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে, হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই। –

    শ্রদ্ধাঞ্জলি… :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

    আসাদ আজ আমাদের কাছে নেই , কিন্তু তার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা আমাদের পথ দেখিয়ে দিবে।

    :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

  5. অভাক কান্ড হল এই যে, পুলিশ

    অভাক কান্ড হল এই যে, পুলিশ অফিসার(হত্যাকারী) ডিএসপি বাহাউদ্দীন তার রিভলভার দিয়ে আসাদকে গুলি করেছিলেন সেই পুলিশ অফিসার স্বাধীনতার পরও কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন মহলের দাবি উঠা সত্ত্বেও ঐসময়ের সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বা আসাদ হত্যার বিচারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি!

    কারনটা কি রাজনীতি ?

    এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?
    তেমন যোগ্য সমাধি কই ?
    মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
    অথবা সুনীল-সাগর-জল-
    সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !
    তাইতো রাখি না এ লাশ আজ
    মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
    হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *