বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার – দ্বিতীয় পর্ব

এই সিরিজটি শুরু করার সময় কসাই কাদেরের ফাঁসি আমরা সবাই প্রত্যাশা করেছিলাম, ক’দিন পরেই বাংলাদেশের ৪২ বছরের কলঙ্ক মোচনের প্রথম ধাপ অতিক্রম করল।..এক রাজাকারের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলল। লাখো শহীদ পরিবারের বুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এলো। এখানেই আমাদের দাবী শেষ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজাকার এই বাঙলার মাটিতে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বিচার কার্য চালিয়ে যেতে হবে এটাই আমাদের এবং শহীদ পরিবারের দাবী।


এই সিরিজটি শুরু করার সময় কসাই কাদেরের ফাঁসি আমরা সবাই প্রত্যাশা করেছিলাম, ক’দিন পরেই বাংলাদেশের ৪২ বছরের কলঙ্ক মোচনের প্রথম ধাপ অতিক্রম করল।..এক রাজাকারের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলল। লাখো শহীদ পরিবারের বুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এলো। এখানেই আমাদের দাবী শেষ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজাকার এই বাঙলার মাটিতে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বিচার কার্য চালিয়ে যেতে হবে এটাই আমাদের এবং শহীদ পরিবারের দাবী।

বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারের আগে অনেক দেশেই এই বিচার কার্য সম্পন্ন হয়েছে, বিশ শতকের আগে যুদ্ধকালে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের জন্য বিচারের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে। ঐতিহাসিক বাসিয়োনির মতে যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রথম বিচারের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতালি থেকে। ১২৬৮ সালে নেপলস-এর কনরাডিন ভন হোহেনস্টেফানের বিচার হয়েছিল যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য এবং তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছিল। এর এগারো বছর পর ১২৭৯ সালে ইংল্যান্ডে ‘ওয়েস্টমিন্স্টার আইন’ (স্ট্যাটিউট অব ওয়েস্টমিন্স্টার) পাস হয়, যেখানে আইন ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনীর বিচারের ক্ষমতা রাজাকে দেয়া হয়েছে। এই আইনের অধীনে ১৩০৫ সালে স্কটল্যান্ডের স্যার উইলিয়াম ওয়ালেসের (১২৭২-১৩০৫) বিচার হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের। এ ছাড়াও ওয়ালেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যুদ্ধের সময় বয়স ও নারীপুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যার জন্য। ইংল্যান্ডের আদালত তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করলেও স্কটল্যান্ডে স্যার উইলিয়াম ওয়ালেস স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও জাতীয় বীর হিসেবে আজও সম্মানিত।

ইতালিতে হোহেনস্টেফান এবং ইংল্যান্ডে উইলিয়াম ওয়ালেসের বিচার হয়েছিল সেই সব দেশের রাজার আইনে, যা ছিল নির্দিষ্ট দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত স্থাপনের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অস্ট্রিয়া ১৪৭৪ সালে স্যার পিটার ভন হাগেনবাখের (১৪২০-১৪৭৪) বিচারের ক্ষেত্রে। বার্গান্ডির ডিউক চার্লস (যিনি ‘চার্লস দি টেরিবল’ নামে বেশি পরিচিত) ব্রেইসাখের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন হাগেনবাখকে। অস্ট্রিয়া তখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ব্রেইসাখের শাসক হিসেবে হাগেনবাখ হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। হাগেনবাখের দখল থেকে ব্রেইসাখকে মুক্ত করে অস্ট্রিয়া ও তার মিত্ররা। হাগেনবাখকে বিচারের নির্দেশ দেন রোম সম্রাট। এই বিচারের জন্য রোমান সাম্রাজ্যের ২৮টি দেশ থেকে বাছাই করা ২৮ জন বিচারকের সমন্বয়ে একটি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছিল। এই আদালতে হাগেনবাখের বিচার হয়েছিল ঈশ্বর ও প্রকৃতির আইন লঙ্ঘনের জন্য। তার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, অবৈধ কর আদায়, সম্পত্তি দখল ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছিল। হাগেনবাখ অবশ্য আদালতে বলেছেন, তিনি সবই করেছেন তার নিয়োগদাতা বার্গান্ডির ডিউকের নির্দেশে। এই বিচারকার্য শুরুর এক বছর আগে ডিউক চার্লস মারা গিয়েছিলেন। আদালত হাগেনবাখের যুক্তি খারিজ করে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে। রায়ে তার নাইট উপাধি বাতিল করে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ৯ মে ১৪৭৪ তারিখে হাগেনবাখের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। হাগেনবাখের এই বিচারের মাধ্যমে যুদ্ধআইনে ‘অধিনায়কের দায়বদ্ধতা’র (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে এ ধরনের বিচারের সূত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই বিচার ‘আন্তর্জাতিক আদালত’-এর ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিশ শতকের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত মামলা হচ্ছে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেনরি রীযের বিচার। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-১৮৬৫) হেনরি একটি কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। এই গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩,৫৯,৫২৮। কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দী মৃত্যুর সংখ্যা ২৪,৮৬৬। ক্যাপ্টেন হেনরির বিরুদ্ধে ১৩টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার ভেতর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও আঘাত অন্যতম। ক্যাপ্টেন হেনরির বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে, যার প্রধান বিচারক ছিলেন মেজর জেনারেল লিউ ওয়ালেস (‘বেনহুর’ উপন্যাসের রচয়িতা)। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিচারে ক্যাপ্টেন হেনরিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
যুদ্ধের ব্যাপক নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকা গত শতাব্দীতে আমরা প্রথম প্রত্যক্ষ করি প্রথম মহাযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮)। চার বছরের এই মহাযুদ্ধ মানব জাতির বিবেককে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ছবি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫)হল যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠিত এক আঞ্চলিক বিরোধ যা মূলত মার্কিন ফেডারেল সরকার আর বিপ্লবী ১১ টি দাস-নির্ভর প্রদেশের মাঝে সংগঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জেফারসন ডেভিস এর নেতৃত্বে এই ১১ টি প্রদেশ পুর্বেই নিজেদেরকে মূল যুক্তরাষ্ট্র হতে আলাদা ঘোষণা করেছিল এবং নামকরণ করেছিল কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা। এদের বিরুদ্ধে ছিলো রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন-এর ইউনিয়ন সরকার আর মার্কিন রিপাবলিকান দল, যারা দাস-প্রথার বিস্তারের ঘোর বিরোধী ছিল

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ চলাকালে পৃথকভাবে দাবি করেছে- যারা স্থলে ও সমুদ্রে যুদ্ধ ও মানবতার আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ১৯১৮ সালে ৫ অক্টোবর ফরাসী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল- আন্তর্জাতিক আইন ও মানব সভ্যতার মূলনীতি অগ্রাহ্য করে যারা যুদ্ধ করেছে তারা শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী লুই বারথু ১৯১৭ সালের ৩ নবেম্বর বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে এবং এটা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
১৯১৮ সালের ১১ নবেম্বর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের লর্ড হাই চ্যান্সেলর ভাইকাউন্ট বিরকেনহেড দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনা সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রণয়ন করা। এরপর ভার্সাইতে মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানির বৈঠকে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এই চুক্তি সম্পর্কে জার্মানি পরে বলেছে তাদের এতে স্বাক্ষর প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল।
ভার্সাই চুক্তির ৪৪০টি অনুচ্ছেদের ভেতর জার্মানির প্রতি শাস্তিমূলক বহু ধারা রয়েছে। এই চুক্তির সপ্তম পর্বে ২২৭, ২২৮ ও ২২৯ অনুচ্ছেদে জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম হোহেনযোলেনসহ তদন্তে অভিযুক্ত সকল জার্মান যুদ্ধাপরাধীকে সামরিক আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে।

ভার্সাই চুক্তির স্থান: মিরর হল, ভার্সাই প্রাসাদ, ভার্সাই নগরী, ফ্রান্স। সম্পাদনের করেছিল: জুন ২৮, ১৯১৯, আর তা কার্যকর করেহিল: জানুয়ারি ১০, ১৯২০।

ভার্সাই চুক্তি একটি শান্তিচুক্তি যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর যুদ্ধের মিত্রশক্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট শক্তিসমূহ এবং জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত হয়। জার্মান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনকে ১৯১৮ সালের অক্টোবরের মাসে একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। এর প্রেক্ষাপটে উড্রো উইলসন তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা পেশ করেন যাকে সঠিক শান্তির একমাত্র উপায় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দফা ছিল জার্মানির কাছে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সকল মিত্রপক্ষের ক্ষতিপূরণ দাবী। এর মধ্যে নয়টি দফা ছিল নতুন রাষ্ট্রীয় প্রেষিতক বিষয়ে। বেশ কয়েকটি গোপন চুক্তির কারণে এই দফাগুলোর ধারণা জটিল আকার ধারণ করেছিল। এর মধ্যে আছে যুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে গ্রিস এবং রুমানিয়ার সাথে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং ইতালির সম্পাদিত চুক্তিসমূহ।

১৯১৯ সালের বসন্তে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারিস শান্তি সম্মেলনে চুক্তির খসড়া করা হয়। খসড়ার মূল নকশা করেন চারজন নেতা যারা ইতিহাসে বিগ ফোর হিসেবে খ্যাত। এরা হলেন বৃটেনের ডেভিড লয়েড জর্জ, ফ্রান্সের জর্জেস ক্ল্যামেনকু (Georges Clamenceau), যুক্তরাষ্ট্রের উড্রো উইলসন এবং ইতালির ভিটোরিও অরল্যান্ডো। মূলত প্রথম তিনজনই নকশা তৈরি করেন। কোন পরাজিত জাতি চুক্তির খসড়া তৈরিতে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি, এমনকি মিত্রশক্তির সহযোগী জাতিসমূহেরও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিলনা। ২৮ জুন তারিখেই এই চুক্তি অনুমোদিত হয়। কিন্তু এতে উপস্থিত জার্মান প্রতিনিধিদল অসন্তোষ প্রকাশ করে, কারণ তাদের মতে এতে সম্মেলন চলাকালে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের ব্যত্যয় হয়েছে এবং মূল সমস্যা ছিল এই যে এই চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভার্সাই চুক্তির প্রধান দিকসমূহঃ
*এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির রাষ্ট্রীয় সীমা এবং জনসংখ্যা শতকরা দশভাগ কমিয়ে আনা হয়।
*উত্তরের তিনটি ছোট ছোট এলাকা বেলজিয়ামের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত হয়, কিন্তু স্ক্লেসভিগে (Schleswig) একটি গণভোটের ফলাফলের সাপেক্ষে এই অঞ্চলের উত্তরাংশটিকে ডেনমার্কের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
*ড্যানজিগকে একটি মুক্ত শহর ঘোষণা করা হয়। চীন, প্রশান্ত মহাসাগর এবং আফ্রিকায় অবস্থিত সকল জার্মান কলোনিসমূহ বৃটেন, ফ্রান্স, জাপান এবং অন্যান্য মিত্রশক্তির কুক্ষিগত হয়।
*জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহে সংঘটিত জীবন, অর্থ ও অবকাঠামোগত সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য জার্মানিকে দায়ী করা হয়।

ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তি প্রথমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯ হাজার ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছিল। এই তালিকা বলা বাহুল্য জার্মানির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। জার্মান প্রতিনিধিরা বলেছেন এত বেশি ব্যক্তির বিচারের যেমন সমস্যা রয়েছে- এই বিচার শুরু হলে জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে। মিত্রশক্তি এই যুক্তি মেনে নিয়ে যাচাই বাছাই করে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৯৫ জন এবং শেষে চূড়ান্তভাবে ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর একটি তালিকা জার্মানিকে প্রদান করে।

জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেদারল্যান্ডে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ছিল। এ ছাড়া কাইজার উইলিয়াম আত্মীয়তার সূত্রে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ইউরোপের অধিকাংশ রাজ পরিবার একটি অপরটির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল।
মিত্রশক্তি আশা করেছিল কাইজারের বিচার সম্ভব না হলেও ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার জার্মানি করবে। কিন্তু সমস্যা ছিল বিচারের আইন ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে এবং জার্মান সরকারের সদিচ্ছার। জার্মানির আইন এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকার আইন এক নয়। এ ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে জার্মান ভাষায়, মিত্রশক্তির সাক্ষীদের জন্য যা ছিল অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর। বিচারে জার্মান সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করে কিছু ব্রিটিশ সাক্ষী শেষ পর্যন্ত লাইপযিগের আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
জার্মান সুপ্রীমকোর্ট শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ জন যুদ্ধবন্দীর বিচার করেছিল যাদের ভেতর সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছর কারাদ-। যার এই শাস্তি হয়েছে তার অপরাধ ছিল সে মিত্রশক্তির একটি সমুদ্রগামী হাসপাতাল জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবিয়ে দিয়েছিল- যে জাহাজে দুই শতাধিক আহত ও অসুস্থ সৈন্য এবং সাধারণ রোগী ছিল। ঠান্ডা মাথায় দুই শতাধিক নিরস্ত্র, আহত ও অসুস্থ মানুষকে হত্যার জন্য ওবেরলেফট্যানেন্ট সি প্যাটজিগকে মাত্র তিন বছরের কারাদন্ড প্রদান করে ‘লাইপজিগ ট্রায়াল’ ন্যায়বিচারের ইতিহাসে কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের একটি ছবি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে সাধারণ কিছু কথা — প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে সংঘটিত হয় এবং তখন পর্যন্ত এটিই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ যুদ্ধ। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এক সার্বিয়াবাসীর গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রিয়া এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ওই বছরের ২৮ জুন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দুদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সূচনা হয়। তবে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ হত্যাকাণ্ডই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্পে বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা এবং আগের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদিও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে ছিল অস্ট্রিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া। যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেনে, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি ও আমেরিকা। যাদের বলা হতো মিত্রশক্তি।

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার – প্রথম পর্ব

১৩ thoughts on “বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার – দ্বিতীয় পর্ব

    1. ছবি ভালো ভাবে দেবো বলে এক
      ছবি ভালো ভাবে দেবো বলে এক সাপ্তাহ দেরি হল। কিন্তু আমার সমস্যা সমাধান হল না। পড়ে আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।

  1. চমৎকার পোস্ট যাত্রীভাই……
    চমৎকার পোস্ট যাত্রীভাই…… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    …..তবে ছবিগুলোর অবস্থা একেবারেই যাচ্ছেতাই!!!!!!যদি সম্ভব হয় তবে চিত্রগুলো পরিবর্তন করে দেওয়ার অনুরোধ রইল।

    1. অনেক কষ্ট করে অন্য একটি
      অনেক কষ্ট করে অন্য একটি ব্লগের সাহায্য নিয়ে অবশেষে ছবি ঠিক করলাম।
      ইস্টিশনে ছবির সাইজের জন্য শর্ত দিয়ে দেওয়ার কারনে এমনটা হয়েছে।

  2. অসাধারণ পোস্ট। সম্ভব হলে
    অসাধারণ পোস্ট। সম্ভব হলে পোস্টটি স্টিকি করার অনুরোধ জানাচ্ছি। আর অন্ধকারের যাত্রী ভাইয়ের প্রতি অনুরোধ, এই বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য ঘাটাঘাটি করে সিরিজটি আরও সমৃদ্ধ করুন। শেষ হলে ইস্টিশনের পক্ষ থেকে একটা ই-বুক করার জন্য আমরা সবাই মিলে মাস্টাররে চাইপা ধরুম। দারুণ একটা কাজ হবে। কি বলেন? 😀

    1. হ্যাঁ আমিও চাই একটু বিস্তারিত
      হ্যাঁ আমিও চাই একটু বিস্তারিত করে লেখার জন্য, এই জন্যই সময় বেশি যাচ্ছে,
      ই-বুকের চিন্তাটা আমারও মাথায় আছে, এমনকি ভিবিন্ন ব্লগও কয়েকটি গুরুত্বপুর্ন লেখা দিয়ে ই-বুক তৈরী করে। ইস্টিশন করলে তো ভালোই হবে।

  3. অন্ধকারের যাত্রী ভাই, লেখা
    অন্ধকারের যাত্রী ভাই, লেখা ভাল লাগলো ।

    এখানেই আমাদের দাবী শেষ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজাকার এই বাঙলার মাটিতে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বিচার কার্য চালিয়ে যেতে হবে এটাই আমাদের এবং শহীদ পরিবারের দাবী।

    ব্যাক্তি রাজাকারের বিচার করলেই কি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে ? তাদের তত্ত্ব ও চিন্তার শাস্তি না দিলে তারা আবার রাজাকারের কর্ম করবে ও দেশে নতুন নতুন রাজাকারের জন্ম নেওয়াটা কি বন্ধ হবে ? তাইলে ?

    1. ভালো প্রশ্ন করেছেন,
      ব্যক্তি

      ভালো প্রশ্ন করেছেন,
      ব্যক্তি রাজাকারের বিচার করলেই আন্দোলন শেষ হবে না, রাজাকার নিধন পর্যন্ত প্রজন্মরা সংগ্রাম করে যাবে। তাঁদের তত্ত্ব কে এই দেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন করতে হবে।

  4. চমৎকার একটি পোস্ট …।
    চমৎকার একটি পোস্ট …। :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:
    সম্পূর্ণ কলঙ্ক মুক্তির জন্য সবকটি রাজাকারের বিচর করতে হবে। এক ফোঁটা নোংরাও যেন না থাকে বাঙলার মাটিতে।

  5. চমৎকার একটি তথ্যপূর্ণ পোস্ট,
    চমৎকার একটি তথ্যপূর্ণ পোস্ট, যাত্রী ভাই… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    এখানেই আমাদের দাবী শেষ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজাকার এই বাঙলার মাটিতে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বিচার কার্য চালিয়ে যেতে হবে এটাই আমাদের এবং শহীদ পরিবারের দাবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *