নিশীর ডাক…পরাবাস্তব গল্প….

রোজ রাতে দরোজার ঠকঠক আওয়াজ আমার মনে ভয় ধরায়,পাতার উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ইদুর অথবা বেড়াল অথবা কুকুরের অথবা অন্যকিছুর সরসর শব্দ আমার মনে ভয় ধরিয়ে যায়,দখীনা ঠান্ডা হাওয়া যখন জানলার কপাট স্বশব্দে লাগিয়ে দিয়ে যায় আমার ভয় করে,বাথরুমের কল থেকে ঝরে পড়া ফোটা ফোটা জল,ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ,আমার নিজের নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত আমি এখন ভয় পাই।আগে আমি এতো ভয় পেতাম না।রাতে আমার ঘুম হয়না।সারারাত শত শত মোম জ্বেলে বসে থাকি।মোমের শিখারা অদ্ভুত ছন্দে দোলে,নাকি হাসে? শুনেছি ওরা আগুন ভয় পায়।আর আমি ভয় পাই ওদের।নাকি ওকে?সেই ছায়াটাকে?ছায়াটা আগুন ভয় পায়।আর আমি ছায়াটাকে ভয় পাই! তাই আগুন আজকাল পরম বন্ধু আমার।দিনে যদিও আমার তন্দ্রামতো হয়!তখন ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখি,এক মুহূর্ত ঘুমুতে পারিনা আমি।
গত সপ্তাহে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম,নিজেকে চিনতে পারিনি।চোখ দেখা যায়না এমন অন্ধকার চোখের চারপাশে।মুখের হাড়গুলো শুধুই চামড়ায় ঢাকা,আমার সেই সৌন্দর্য যা দেখে লোকে ইর্ষা করতো তা এখন আর নেই।আমি আমার প্রতিচ্ছবি হিসেবে এখন শুধুমাত্র একটি কংকাল দেখতে পাই,কংক্রিটের শহরে আজ আমার কেউ নেই,আমি নিজেকে নিজে ভয় পাই।আমি কে?কি আমি?আমি কি শয়তান?অভিশপ্ত?

ছায়াটা প্রথম আসে সেদিন,যেদিন ইন্সপেক্টর আরাফ আমাকে বলেছিলেন,নিশীকে কে বা কারা ধর্ষন করে মেরে ফেলেছে তা তারা বের করতে পারেননি,তাই আপাতত নিশীর ফাইল তারা স্তগিত রেখেছেন।যদি কিছু জানতে পারেন তারা তা সাথে সাথে জানাবেন।
আমি জানি সেটা সম্ভব ছিলোনা,সুখবরটা শোনার পর আমি ইশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।কিন্ত ভুলে গিয়েছিলাম,ইশ্বর শুধুই আমার একার নন অথবা আমি ইশ্বরের সৃষ্ট একমাত্র মানুষ নই।ইশ্বরকে সবার কথা রাখতে হয়।নালিশ শুনতে হয়।
তবুও সেদিন বিকেলে আমি ইশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে শহরের সবচে বড় শপিং মল থেকে সেখানের সব’চে সুন্দর সব’চে দামী পাঞ্জাবীটা কিনে এনেছিলাম।বাসায় এসে স্নান করে সেটা পরে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম,অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছিলো আমাকে।সাদা পাঞ্জাবীতে আমাকে দেখাচ্ছিলো রাজপুত্রের মতো।নিশী বেঁচে থাকলে সেদিন সে মনে মনে কি বলতো?যদিও ছায়াটা সে রাতে এসেছিলো, সমস্ত ঘরে প্রতিধ্বনি তুলে বলেছিলো, আ..মি..নি..শী…।আ..মা..র..,ভু..খ,..লা..গ..সে,আ..মা..রে,.. খা..ই..তে,.. দে..ন..,স্যা..র।
আমি বিশ্বাস করিনি।আমি বলেছিলাম, তুমি নিশী নও!তুমি নিশী হতেই পারোনা।তুমি কল্পনা।তুমি আমার হ্যালুসিনেশন! নিশীকে আমি নিজের হাতে খুন করেছি,তার আগে তার সমস্ত শরীর ভোগ করেছি।
কোনই প্রমান রাখিনি আমি,একটা চুল অথবা একফোটা বীর্য,একদলা থুথু।কিছুই না।ডি এন এ টেষ্ট করে কিছু পেয়ে যাবার কোনো প্রমান আমি রাখিনি।কিন্ত আমি হয়তো বুঝতে পারিনি কাকে মেরে আমি কার মৃত্যু ডেকে আনলাম।আমি কি মারা যাচ্ছি?

আমি একা মানুষ, বাবার প্রচুর সম্পত্তি আর শহরে কেনা তিনটা বাসা ভাড়া দিয়ে রাজার হালে চলছিলাম।
একটা কাজের মেয়ের দরকার ছিলো খুব,পাশের বাসার আলতাফ সাহেব বললেন,তিনি নাকি ফু দিলেই বুয়া নাজিল হয়।আমি তাকে বলেছিলাম ফু দিতে হবেনা ভাইসাহেব, যেভাবেই হোক একটা বুয়া আমার চাই ই চাই।
পরদিনই মেয়েটা এসেছিলো, নাম জিজ্ঞেস করতেই হরবর করে বলেছিলো, ‘মোর নাম নিশী,পাশের বাসার আলতফ স্যারের বাসায় যে কাম করে হেইয়া মোর ভইন শশী।’
মেয়েটার রূপ ছিলো, আগুনের মতো রূপ,সক্ষম পুরুষ মাত্রই পুড়তে হয় এমন রূপ।আমার উনত্রিশ বছরের জীবনে এতো রূপ আমি দেখিনি।
বাসায় আমি একা,একটা সুন্দরি কাজের বুয়া নিয়ে থাকছি।লোকে অনেক কিছুই বলতে পারতো।আমি অসব চিন্তা করে কখনোই চলিনি।
তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো নিশী,তার হাঁটা চলা কথা বলা সব আমাকে জাগিয়ে দিতো।নিজেকে অনেক কষ্টে সামলাতাম আমি।

কিন্ত সেদিন রাতে আমি পারিনি,আমার বন্ধু রফিক আমাকে সিডিটা দিয়েছিলো।সে বলেছিলো এটা ইতালীয় কবি দান্তের জিবনী নিয়ে বানানো একটি ক্লাসিক ছবি।দান্তেকে নিয়ে আমি প্রচুর পড়ছিলাম তখন।যদিও সিডিটা প্লে করে আমি ভড়কে গিয়েছিলাম।পর্নোগ্রাফীর দৃশ্যগুলো পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছিলো,ভেতরের আমিটা পুরোপুরি জেগে উঠেছিলাম। এমন উষ্ণতা যে নিয়ন্ত্রন সম্পূর্ন রিপুর হাতে চলে যায়।
আমি নিশীর ঘরে কড়া নেড়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেছিলাম যে দেখো,এসব খুব একটা পাপ নয়।আমি তোমার একটা ব্যাবস্থা করে দেবো। সে রাজি হয়নি তাই সে রাতে জোর করে তার সাথে তিনবার আমি ওই কাজটা করেছিলাম।আমি ভাবতেও পারিনি কোনো রক্তপাত কোনো আঘাত ছাড়া মেয়েটা এভাবে মরে যাবে।মেয়েটা আমাকে শ্রদ্ধা করতো।তাহলে কি শ্রদ্ধার মানুষের কাছে থেকে অপমানের অভিমানে সে মরে গেল?তবুও আমি শান্ত ছিলাম না,আমি সেই নিষ্প্রাণ মৃতদেহের সাথে আরো কয়েকবার সঙ্গম করেছিলাম।আমার মাথায়ও আসেনি যে,নিশী আর নিশী নেই নিশী এখন লাশ হয়ে গেছে।

আমি সেই লাশটাকে মুছে পরিষ্কার করে সাবধানে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নিয়ে রেখে দিয়েছিলাম।ইশ্বর হয়তো সেই শেষবারের মতো আমার সাথে সহায়তার খেলা খেললেন।
পরদিন সকালে তুমুল শোরগোলের একাংশ আমার ফ্ল্যাটে এসে আমার দরজা খোলা পেলো।আমার ঘুম ভাঙিয়ে তারা বলেছিলো গ্রাউন্ডে আপনার মেইডের লাশ পড়ে আছে স্যার, আপনি জলদি চলুন।আর কাকতালীয়ভাবে আমি জেনেছিলাম,পাশের বাসার ভারাটিয়ার কাজের ছেলেটা বেশ কিছু টাকা পয়সা নিয়ে গতরাতেই পালিয়েছে।কেউ তার আসল নাম বা ঠিকানা জানেনা।নিশীর বোন শশী বলেছিলো,তার বোন নাকি প্রায়ই বলতো ওই ছেলেটা তাকে উত্তক্ত করে।
মামলার মোড় ঘুরে গেলো ঠাস করে,বিন্দু মাত্র সন্দেহ কেউ আমাকে করলোনা।ওই ছেলের সন্ধান না মেলায় পুলিশ কেস স্তগিত হয়ে গেলো।কিন্ত ওই ছায়াটা আমার জীবন পাল্টে দিলো।

আজ রাতে সে আসবে।সেই ছায়াটা আসবে।ছায়া নাকি নিশী?সে যাই হোক সে আসবে।নির্মম নিয়তির মতো সে আসবে।আমি গাছের পাতায়,মৃদু তালে বয়ে যাওয়া বাতাসে,মোমের কম্পমান শিখায় অশুভ গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলাম।শুনেছি বিভ্রান্ত আত্মারা মুক্তির কাছাকাছি এসে একসময় আলো ও আগুনকে অগ্রাহ্য করতে শিখে যায়।
আমি স্থবির বসে দেখতে পাচ্ছিলাম একটি ছায়া আমার দিকে এগিয়ে আসছে,মোমের আলোয় কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে নিশীকে।নিশী অসম্ভব মিষ্টি স্বরে আমার নাম ধরে ডাকলো, সাথে সাথে শত শত জ্বলন্ত মোম ছিটকে ছড়িয়ে পড়লো ঘরের চারপাশে।দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো সবুজ কার্পেট, সোফার কোশন,জানলার পর্দা।আমি উঠে দাঁড়াবার শেষ চেষ্টা করলাম যখন আগুন এসে আমার ছড়িয়ে দেয়া পায়ের পাতা ষ্পর্শ করলো।রেফ্রিজারেটরের গ্যাস চ্যাম্বার যখন বিকট শব্দে ফাটলো তখন আমি অগ্নিকুন্ডলীতে নিশীকে মিশে যেতে দেখলাম।সে হাসছিলো।
নীচের তলায় আগুন! আগুন! চিৎকার আর দমকলের গাড়ির শব্দের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম আমি মারা যাচ্ছি।পৃথিবীতে থাকতেই আগুনে পুড়ে আমি রওনা দিচ্ছি নরকের পথে।

২১ thoughts on “নিশীর ডাক…পরাবাস্তব গল্প….

  1. বরাবরের মতই মুগ্ধ হলাম …
    বরাবরের মতই মুগ্ধ হলাম … :তালিয়া: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :মাথানষ্ট: লগে ভয়ও পাইছি… :দেখুমনা: :আমারকুনোদোষনাই:

    :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: এবং অশেষ :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: এর শুভেচ্ছা… :বুখেআয়বাবুল:

  2. খুব ভালো লাগলো। তবে আজ
    খুব ভালো লাগলো। তবে আজ ঘুমানোর সময় আমি যদি ভয় পাই তাইলে কিন্তু… :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: সব দোষ রাজু দার… :ভেংচি: :ভেংচি:

  3. ধন্যবাদ পথিক ভাই,তবে আজ রাতেই
    ধন্যবাদ পথিক ভাই,তবে আজ রাতেই আমি আমার জীবনের ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা পোষ্ট করবো।অনেক কষ্ট করে লিখে রাখছি আশা করি আপনারা পড়বেন ♥♥♥♥

    1. অবশ্যই পড়বো রাজু দা আজ রাত
      অবশ্যই পড়বো রাজু দা আজ রাত থেকে আমিও কিছুদিনের জন্য হাওয়া হয়ে যাবো তাই আপনার লিখা পড়েই হাওয়া হতে চাই আর ফাতেমা দি অপেক্ষায় আছে দেখে কষ্ট লাগছে আমিও আমার অভিজ্ঞতা শেওয়ার করার প্রস্তুতি নিচ্ছি দিদি ……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *