ব্রথেল থেকে ফিরে…(যে গল্পের শুরু বা শেষ নেই)



এখনো রাত শেষ হয়নি,ভোর হতে বেশী বাকি নেই।শেষ রাতের অন্ধকার একটু ফিকে হয়ে আসছে।নিলীমা ঘুপচি গলি বেছে নিয়ে হাটছিলো।
এই সময়টা বরাবরই একটা রহস্য রেখে যায়,জেগে থাকা প্রতিটি মানুষের কখনো না কখনো একবার হলেও মনে হয়,যদি ভোর না আসে?যদি সকাল না হয়?
তবুও ভোর আসে,সকাল হয়।

প্রতিটি মানুষ রাত শেষে থাকে ভোরের অপেক্ষায়।আর নিলীমা রাত ভালোবাসে,দিনের আলোয় তার অস্বস্তি হয়।আর এই রাত তাকে খেতে দেয়,পরতে দেয়।তার সংসার চালায়।
সে কি আসলেই রাত ভালোবাসে?
তার মনে হলো সে রাত ভালোবাসে। শুধু রাতের মানুষগুলোকে ভালোবাসেনা।মানুষকে বদলে দেবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রাতের আছে।তাই রাতকে সবাই ভয় পায়।
নিলীমা সবচে ঘিঞ্জি গলিটা বেছে নিলো বাসায় যাওয়ার জন্য,রাত বাড়লে এদিকে লোকজন খুব একটা থাকেনা।নিলীমা হাত ঘড়ির দিকে তাকালো,চারটা কুড়ি মিনিট। রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা কুকুরগুলো ঝিমুচ্ছে।তন্দ্রাচ্ছন্ন কুকুরের মধ্যেও কি সুন্দর শীল্প লুকিয়ে আছে!নিলীমার আফসোস হলো কেনো সে চিত্র শিল্পী হলোনা।
একটা পাজেরো জিপ তার পাশ দিয়ে শা করে ছুটে গিয়ে আচমকা ব্রেক কষে কিছুক্ষন দাঁড়ালো,নিলীমার মনে হলো গাড়ির ভেতরে থাকা মানুষটা কিছু একটা ভাবছে,গাড়িটা পিছিয়ে এসে নিলীমার সামনে এসে এমনভাবে দাঁড়াল যে গাড়িটা অগ্রাহ্য করতে হলে একটু ঘুরে যেতে হবে।যদিও এই পেশায় অগ্রাহ্য করার নিয়ম নেই।তবুও শেষ রাতের ক্লান্তি মাঝে মাঝে নিয়মের তোয়াক্কা করেনা।নিলীমা স্বীদ্ধান্তহীনতায় ভুগলো।
গাড়ির সামনের বাঁ দিকের কাঁচটা নেমে যেতে সুদর্শন এক যুবকের মুখ দেখা গেলো,একটা মেয়েলী কোমলতা মাখা মুখ,সম্ভবত ইচ্ছে করে ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি রেখেছে ছোকড়াভাব কাটানোর জন্য।নিলীমাকে কে যেনো বলেছিলো, যে ছেলেগুলার মুখ সুন্দর তারা মটু হয় নয়তো বেটে হয়,আর যাদের কন্ঠ সুন্দর সেই ছেলেরা হয় কালো।

কিন্ত এই ছেলেটা কি চায়?যদিও উত্তরটা তার জানা।এই গভীর রাতে আর কিইবা চাইতে পারে সে?
ছেলেটা হাসি হাসি মুখ করে বললো,
‘ব্রেস্ট দেইখা তো থার্টি সিক্স মনে হইতেছে, ফিগারটাও তো কোকাকোলা!তা রেট কতো?গাড়ির ভেতরে কাম সারতে পারবা?’
নিলীমা এ বেলা ধাক্কা খেলো আচমকা,এ ধরনের ভাষা এই ছেলের মুখে সে আশা করেনি।এটাও সে ভেবে পেলোনা কেনো আশা করেনি!
সে একটু সময় নিয়ে দৃঢ়ভাবে বললো, ‘মাফ করবেন। আপনি ভুল করছেন।’
ছেলেটাকে বিভ্রান্ত দেখালো! নিজেকে সে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘এতো রাতে কি করতেসেন?বিপদ আপদ হইতে পারেনা?’
নিলীমা জবাব দিলোনা,চুপচাপ হেটে খানিকটা দুরে চলে গেলো।
গাড়িটা তীব্র হর্ন বাজিয়ে তার সামনে দিয়ে প্রায় উল্কার বেগে ছুটে গেলো।
নিলীমার প্রচন্ড ইচ্ছে হলো ছেলেটাকে গাড়ি থেকে বাইরে এনে দেখে ছেলেটা লম্বা না খাটো!ইচ্ছে হলো ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে,আপনি এতো রাতে এখানে কি করছেন?আপনার রেট কতো?
নিলীমা মনে মনে মজা পেলো।আসলেই যদি এভাবে সে জিজ্ঞেস করতো ছেলেটার অবস্থা কেমন হতো।
মানুষকে বিব্রত করার চেয়ে বড় বিনোদন আর হয়না।সেবার এক কম বয়েসী খদ্দেরকে সে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘আগে কখনো করেছো?’
সে জবাব দিয়েছিলো, না।
নিলীমা চোখে দুষ্টুমি এনে বলেছিলো, ‘খামাখা পয়সা দিয়ে সেক্স করতে এসেছো !যদিও তোমাকে ঢোড়া সাপের মতো লিকলিকে দেখাচ্ছে।আমার ঘরে তো ফুটোই নেই, সাপ ঢুকবে কি করে।’
নিলীমা হাসতে হাসতে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলো পারলে পালিয়ে যায় অবস্থা।
নিলীমা সেটা হতে দেয়নি,এরকম মালদার খদ্দের ঠকালে উপর থেকে নোটিশ আসে।কমপ্লেন এলে জরিমানা দিতে হয় কমিশনের পাশাপাশি।
বা পাশের স্তনে ব্যাথা টের পায় নিলীমা,বোটার একটু নিচে ফুলে আছে।বেশ ধকল গেছে আজ রাতে।কামড়ে ছেনে তাকে ছিবরা বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিলো মাঝবয়েসী লোকটা।
মাঝখানের বিরতিতে বলেছিলো, তার বউ নাকি রোমান্স জানেনা,একদম নিরামিষ। কাপড় খুলে মটকা মেরে শুয়ে থাকে।অনেক সময় নির্লিপ্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে লুব্রিকেন্ট লাগাতে হয়।নন ন্যাচারাল জেলি ছাড়া জায়গাটা ভিজেনা।এরোটিকাল সাউন্ড টাউন্ডের তো বালাই ই নেই।
নিলীমার ইচ্ছে হয়েছিলো থাপ্পড় মেরে লোকটাকে বলে,তোর এরকম কামড়া কামড়ি রোমান্সের পরও যে তোর বউ ভাগেনি সেটা তোর ভাগ্য।নিরামিষ হয়ে এই মাংসাশী জানোয়ারের সাথে মেয়েটা থাকছে কিভাবে!
ওই অজানা অচেনা মেয়েটার জন্য নিলীমা এক ধরনের মায়া অনুভব করলো।
লোকটার বিভৎস লোমশ শরীরের ঘাম এসে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো,লোকটা বললো এটাও নাকি এক ধরনের সেক্সুয়াল আর্ট,ঘাম থেকে নাকি সেক্সুয়াল স্টিমুলেশনের ফ্লুইড বের হয়ে আসে।
নিলীমার মনে হয়েছিলো গন্ধে তার নাড়িভুঁড়ি উল্টে যাবে।
ব্যাগে থাকা সবসময়ের সঙ্গী খানিকটা কড়া আতরের ফ্লেভার এর মতো সেন্টটা ছড়িয়ে দিয়েছিলো খদ্দেরের শরীরে,বলেছিলো, এ ধরনের এসেন্সও সেক্সুয়াল আর্ট স্যার।কামসূত্রে প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে সুগন্ধ অন্যতম।
ফেরার আগে বাথরুমের আয়নায় নিজের শরীরের স্থানে স্থানে লাল লাল ছোপ দেখেছিলো নিলীমা।চিনচিনে ব্যাথা ছিলো সেখানে।
এখন বাসা যেতে যেতে টের পাচ্ছিলো ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছে।নিলীমা স্বীদ্ধান্ত নিল বাসায় ফিরে দুইটা প্যারাসিটামল খেয়ে লম্বা ঘুম দিবে,বাকি দুদিন সব এপয়েন্টমেন্ট সে ক্যান্সেল করে দেবে।

বাসায় ফিরে নিলীমা দেখলো মা এখনো জেগে বসে আছেন!তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘কি এমন চাকরি রে মা! রাত বেরাতে ফিরিস!রাতেই কেনো সব কাজ করতে হয়?রাতের ডিউটিটা দিনে নিয়ে আসতে পারিস না?’
নিলীমা ভেনিটি ব্যাগটে টেবিলে রেখে বলে,’না মা পারিনা,প্রতি মাসে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা পাচ্ছি,কষ্ট তো একটু করতেই হবে।তুমি এখনো ঘুমাওনি?’
‘ঘুম তো আসেনা রে মা,পেটের ব্যাথাটা আজ বেড়েছে।দুপুরে ভাত খেতেই বমি হয়ে গেলো।আর…’
নিলীমা বললো,আর কি?
‘না কিছুনা!বাদ দে’
নিলীমা অধৈর্য হয়ে বললো, ‘প্লিজ মা এমন করোনা!কি হয়েছে বলো?’
মা ইতস্তত করে বলেন,’বমির সাথে রক্ত এসেছিলোরে…’
নিলীমা মায়ের পাশে এসে বসলো,মা নিলীমার দিকে তাকিয়ে বললেন,’আমি বাঁচবো তো রে মা?মরে গেলেই ভালো হয়।তোর বাবা মড়ার পর সব কেমন ওলট পালট হয়ে গেলো। এখন তোর বিয়ের বয়স আর তোকে চাকরি করতে হচ্ছে!’
নিলীমা মায়ের কোলে মাথা রেখে বললো,’ তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে মা তুমি আছো বলেই এখনো বেঁচে আছি’

নিলীমা বাথরুমে গিয়ে অনেক্ষন সময় নিয়ে গোসল করলো,আর একদিনও সে কাজ থেকে অবসর নেবেনা।বরং কাজটা বাড়িয়ে দিতে হবে।চাকরির আশায় অনেক হেঁটেছে সে।পায়নি।মায়ের পাকস্থলীতে টিউমার।সময় খুব কম।এগ্রেসিভ হবার আগেই মাকে মাদ্রাজে নিয়ে যেতে হবে।আরো টাকা চাই নিলীমার।আরো অনেক টাকা।
শরীর বিক্রি করা যায় মন যায়না,যদি সম্ভব হতো মায়ের জন্য সে মনটাই বেঁচে দিতো।

৭ thoughts on “ব্রথেল থেকে ফিরে…(যে গল্পের শুরু বা শেষ নেই)

  1. ধন্যবাদ স্বপ্নদা,মজার ব্যাপার
    ধন্যবাদ স্বপ্নদা,মজার ব্যাপার হলো এই গল্পটা লিখার পর নিজের কাছেই ভালো লাগেনি তাছাড়া কমন থিম নিয়ে লেখা।আমি বর্তমানে একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।পরীক্ষামূলক কিছু একটা বলতে পারেন।কবিতা থেকে ডাইরেক্ট কথা সাহিত্যে ডাইভার্ট হয়েছি।এখন যা করছি তা হাত পাকানো।
    এ ক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগীতার অনেক দরকার।আলোচনা সমালোচনা চাই ভাইয়া।আর চাই কাঁধে হাত।এক সাথে লড়াইয়ের।

  2. আগের গল্প গুলো চমৎকার ছিলো
    আগের গল্প গুলো চমৎকার ছিলো রাজু দা।সেগুলোর তুলনায় একটু কম পড়ে গেছে।আমার মনে হয় একটু সময় নিয়ে লিখলে আরও ভাল হবে।

    ….যাই হোক চালিয়ে যান। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. গল্পটা আগে পড়েছি বলে মনে
    গল্পটা আগে পড়েছি বলে মনে হচ্ছে রাজু দা যাই হোক আগে আর পড়ে কিছু না আমার কাছে ভালোয় লেগেছে যদিও থিমটা পুরোনো কিন্তু প্রিয় মানুষের কাজ সবসময় ওল্ড ইজ গোল্ড আমার কাছে …… :তালিয়া: :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *