চাদর মোড়া শীত আর আমি (পর্ব ১)

‬কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে আসে শীত ।
শীত আর শীতরাতের সাথে আমার কিছু বিশেষ ভালবাসা আছে ।শীতের রাত আর ভোরগুলো আমার কাছে অন্যরকম । খুব নিবিড় সম্পর্ক । অন্যান্য ঋতুর স্মৃতিগুলো খুব কম মনে আছে । কিন্তু শীতের স্মৃতিগুলো ঠিকঠাক মনে আছে । কিছু স্মৃতি রোমন্থন করি । তবে বেশি পুরনোতে গেলাম না ।

‪#‎শীত_ভোর

‬কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে আসে শীত ।
শীত আর শীতরাতের সাথে আমার কিছু বিশেষ ভালবাসা আছে ।শীতের রাত আর ভোরগুলো আমার কাছে অন্যরকম । খুব নিবিড় সম্পর্ক । অন্যান্য ঋতুর স্মৃতিগুলো খুব কম মনে আছে । কিন্তু শীতের স্মৃতিগুলো ঠিকঠাক মনে আছে । কিছু স্মৃতি রোমন্থন করি । তবে বেশি পুরনোতে গেলাম না ।

‪#‎শীত_ভোর
‬আমাদের ঠাকুরগাঁও শহরটা বলা যায় হিমালয়ের কোল ঘেঁষে । স্বভাবত শীতটা এখানে একটু বেশিই অনুভূত হয় । শীতের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বলা যায় ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস । এটা নরমাল । যখন তাপমাত্রা নামার ইচ্ছা হয় তখন তা বিনা দ্বিধায় ৬ এরও নিচে নেমে যায় । তো যাই হোক, ভোরবেলা সবসময় শীত একটু বেশি । আর তার সাথে বিখ্যাত কুয়াশার চাদর তো আছেই । দু’হাত দূরে কি আছে তা দেখাই দুষ্কর হয়ে পড়ে ।

শীতের ভোরে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপারটা আমাদের কাছে ছিল, প্রাইভেট নামক বস্তুটি । ভোর ছ’টায় উঠে বাংলার ইকবাল মাস্টার তারপর ইংরেজি ইকবাল স্যার তারপর আবার দৌড় শঙ্কর স্যার । শীতের সকালে লেপ-কম্বলের ভিতর থেকে উঠার সময় মনে হয় জীবনে এরচেয়ে কষ্টের আর কিছু হতে পারে না । আমার মনে আছে বাংলার ইকবাল স্যার শীতে যতদিন পড়িয়েছে তার মধ্যে আমি ৬-৭ দিনের বেশি যাইনি । তাও যেতাম সকালে একটু সাইকেল নিয়ে ঘুরতে আর গরম গরম ভাপা পিঠা খেতে । বন্ধুরা এসে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেত । বিশেষ করে ‪#‎সাইমুম‬ আর ‪#‎উচ্ছাস‬ ।

একটা দিনের কথা খুব মনে আছে । সেদিন বরাবরের মতই শীত । জানুয়ারি মাস । ক্লাস টেন শেষ, সামনে এসএসসি পরীক্ষা ।
আগের দিন ঠিক করেছিলাম পরেরদিন সবাই বের হব । ভাপা খেতে । প্রথমে বের হয়ে প্রাইভেট গেলাম । স্যার পড়ালো না । এ ব্যাপারটায় আমরা তখন অভ্যস্ত । ভাপা খেতে গেলাম বিডিআর ক্যাম্পের ওদিকে । জম্পেশ খাওয়া হল । সবেমাত্র সাইকেলে উঠে প্যাডেল ঘুরিয়েছি । হঠাৎ বৃষ্টি !!! শীতকালেও বৃষ্টি ! বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন বরফ হয়ে শরীরে ঝরছিলো । সবাই পালালাম হুড়মুড় করে ।
ইংরেজির ইকবাল স্যারের কাছে যেদিন যেতাম, স্যার রুমেই ঢুকেই আগে বলতো, কিরে সামী তুই আসছিস !!!
— জ্বী স্যার মনে পড়ে গেল…
— যাক মনে পড়লে আসিস মাঝে সাঝে…

আর বাংলার ইকবাল স্যার তো আরেক আলসে । আমাদের প্রাইভেট ছিল ৬ টায় । গিয়ে দেখতাম স্যার পড়ানোর রুমে আসেনি । স্যার যখন আসতো তখন দেখা যেত ৬.৫০ বাজে । আর ৭ টার দিকে ছিল মেয়েদের ব্যাচ । স্বভাবতই তারা বাইরে দাঁড়িয়ে একটু বেশি চিল্লা-পাল্লা আর প্রাইভেট পড়তে চাওয়ার মিথ্যা উৎসাহ দেখাত । স্যারও প্রতিদিন বলতো, আজ যাও কাল ঠিক টাইমে আসবো ।
আবার কখনও সকাল সকাল কারো সাথে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম টাঙ্গন নদীর পাড়ে । আথবা রাস্তা বা অলিতে-গলিতেই ছিলো আনাগোনা । সময়গুলো ভালই কাটতো ।

আর বেশি রোমন্থন করলাম না । শীতের ভোরগুলো আমাদের এমনই ছিল । কুয়াশার চাদরে মোড়া ।
****************************

#‎শীত_রাত
‬সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাই মুশকিল ।
শীতের একটা ঐতিহ্য রাতে ব্যাডমিন্টন খেলা । মোটামুটি ভালই খেলি । তাই রাতে মাঠে খেলতাম প্রায়শই । মানে শরীরে উষ্ণতা আনার ব্যাপার আরকি … বাসায় এসেই কম্বলের ভিতরে, হাতে নিয়ে বই । যদিও খুব বেশি একটা পড়তাম না । বসে থাকতাম । কোন কোন রাতের তীব্র শীত দেখে মনে হত, “ইশ আমাদের দেশেও যদি ইউরোপের দেশগুলোর মত ফায়ারপ্লেসের প্রচলন থাকত …”
আর তারপর মধ্যরাতে !!!

“নিঝুম রাত । ঘড়ির কাঁটায় ৩টা বা একটু বেশি । পুরো শহর নিস্তব্ধ । মাঝে মাঝে দু’একটা রাত জাগা পাখি ডেকে উঠছে । কুয়াশার চাদরে সামনে কিছুই দেখা যায় না । কখনও দূরের কোন লন্ঠনের টিমটিমে আভা দেখা যাচ্ছে । পাতায় পাতায় শিশির, পানি হয়ে ঝরার মন মাতানো ধ্বনি । কখনও বা জেগে থাকা পাখিটির ডানা ঝাপটানির শব্দ রাতের স্তব্ধতাকে ম্লান করে দিচ্ছে । আকাশে চাঁদটা একা । কখনো গা হিম করা শিরশিরে হাওয়া বইছে । ”

বারান্দায় বা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতাম যখন, তখন প্রকৃতিটাকে এমনই লাগতো । ঠাণ্ডা লাগতো তবুও প্রতিদিনই এভাবে কাটাতাম । সে এক আশ্চর্যরকম ভাললাগা । ভাষায় প্রকাশ বেসম্ভব । আমার শীতের রাতগুলো এমনি ছিল । খুব একা আর খুব সুন্দর । আমি কখনই অপরাহ্নের আগে, মানে ৪টার আগে ঘুমাতাম না । না না, পড়াশুনা তএমন একটা করতাম না । তবে অভ্যেস ছিল কিছুটা । একটা-দেড়টার দিকে আব্বু-আম্মু ঘুমানোর পর কম্পিউটারের সামনে চাদর মুড়ে বসতাম । ফেসবুক আর গেম খেলে অথবা মুভি দেখে প্রতিটা রাত দিব্যি কাটিয়ে দিতাম । সময়টা কিভাবে পার হত টেরই পেতাম না । চারটার দিকেও যে ঘুম আসতো তা নয় । মনে হত ঘুমানো দরকার তাই ঘুম দিতাম । দুপুর ১টা-২টার আগে ঘুম থেকে উঠতাম না প্রাইভেট না থাকলে ।

মাঝে মাঝে বাসায় কাউকে কিছু না বলে চুপ করে বাইরে বের হতাম । হাঁটতে । মাঠের চারপাশে একটু ঘুরতাম । কি যে ভাল লাগতো !!! তবে যে রাতগুলোতে পূর্ণিমা থাকত, সেদিন রাতটা দেখার মত হয় । নিঝুম-নিস্তব্ধতার মাঝে একটা থালার মত চাঁদ চুপ করে বসে আছে !!!
শীতের শেষ দিনগুলোতে কোকিলের ডাক শোনা যেত । বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য তাদের স্বাগতম গীতি । অনেককেই তখন ফোনে বলতাম কোকিলের ডাক শুনতে পাচ্ছি কিন্তু কেও বিশ্বাস করত না । তবে আমি সত্যি শুনতে পেতাম । কত মধুর সুর…

ঘুমানোর আগে প্রতিদিন একটু বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে দাঁড়াতাম । প্রতিটা রাত এভাবে কাটলেও একটুকু বোরিং লাগতো না । মনে হত আমার রাতগুলো অন্য সবার থেকে সুন্দর আর আলাদা অনেক আলাদা । পৃথিবীটা অদ্ভুত লাগতো ।
খুব সুন্দর ছিল গভীর রাতগুলো । খুব সুন্দর…

২ thoughts on “চাদর মোড়া শীত আর আমি (পর্ব ১)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *