আমার বর্ষারানী (পর্ব-৫)


রাত সাড়ে দশটা।


রাত সাড়ে দশটা।
বাংলা মদের প্রভাবে শরীর দুলছে। আনন্দের দুলুনি। কিছুসময় পূর্বে আমরা এক অসাধারণ ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছি। ভবিষ্যত প্রজন্মকে বলতে পারব আমরা পেরেছিলাম, বাকীটুকু তোমরা কর। বাকী আর কি কিছু থাকবে ? থাকতেও পারে। শোষণহীন সমাজ, সমাজতন্ত্র, আমরা কি এক জীবনে দেখে যেতে পারব ? মনে তো হয়না। আমাদের অগ্রজ যারা তারাও একইভাবে এতদিন বলতেন আমরা “পেরেছিলাম, বাকিটুকু এখন তোমাদের শেষ করতে হবে।“ সংশয়বাদীদের এতদিন আমরা বুঝিয়েছি, “হয়নি সকাল তাই বলে কি সকাল হবে না কো ?” শেষ পর্যন্ত আঁধারকে পরাজিত করে উজ্জল হয়ে উঠেছে চারিদিক । আমরা বিজয়ী হয়েছি। রাজপথের ধুলিকনায়, লেখকের খাতায়, শিল্পীর কন্ঠে আবারো রচিত হয়েছে ইতিহাস। বিভিন্ন স্থান থেকে অবিরাম ফোন আসছে।ঊর্দ্ধতন নেতারা ফোন দিচ্ছেন বাসায় ফিরে যেতে। যেকোন সময় বিপদ ঘটতে পারে। গ্রামে এখন গভীর রাত্রি। মা-বাবা নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে। নইলে ফোন করে অস্থির করে ফেলত। তবে আমাদের কারও মধ্যেই বাসায় ফেরার কোন লক্ষনই নেই। ঢাক-ঢোল রেডি ছিল। তাই নিয়ে আমরা নেচে নেচে বেড়াচ্ছি পুরো শহর। শেষ পর্যন্ত পাঁচজনের দলটি কয়েকগুন বৃদ্ধি পাওয়ায় মনে হল আমাদের চাইতে অনেক বড় বড় সেলিব্রেটি আছেন, তাদের রেখে কেউ আমাদের মারতে আসবে না। স্টক ফুরিয়ে যাওয়ায় আরও বাংলা মদ আনার ব্যবস্থা হল। দু-তিনজন শহরের বাইরে থাকায় ফোনে হা-হুঁতাশ করতে লাগল। এরই মাঝে আমার বর্ষারানীর ফোন।
-তুই এখনো বাইরে ?
-মজা করছি রে……নাচানাচি করছি প্রচুর। একা নই পনের-বিশজন।
-বাসায় যা তাড়াতাড়ি, যেকোন সময় কিছু হতে পারে! ওর কন্ঠে ভয়।
-আরে কিছুই হবে না। এতজন মানুষ দেখে কি কেউ কিছু করার সাহস পাবে ?
-ড্রিংক করেছিস !!
-এই একটু…….মানে আজকের দিনটা তো স্পেশাল……..তাই আরকি…………
-তুই আমাকে এতটুকু ভালবাসিস না, বাসলে আমার কথাটা একটু ভাবতি।
-কোন শালা বলে ভালবাসি না তাকে ফাঁসিতে ঝোলাব….!
-তোর সাথে কথা বলে লাভ নেই। আমি রাখলাম। তুই মর।
-আরে আরে শোন না, যাচ্ছি তো……..
ফোন কট করে কেটে গেল। তাতে কি আর মোহভঙ্গ হয় ? যখন রাজপথে নেমেছিলাম তখন মায়ের অশ্রু, বাবার আশা, প্রেমিকার বাহুবন্ধন সবকিছুই কেমন যেন মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল। কেবলি মনে হতো কোটি কোটি মা মাথা কুটে মরছে, কোটি কোটি পিতার চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে, কোটি কোটি বালিকা ধর্ষিতা হবার অপেক্ষায়। এদেশে আজকাল ধর্ষণ করেও বুক ফুলিয়ে চলা যায়, তবে ভালবেসে বিয়ে করলে তা হয় লজ্জাকর!! আমার বর্ষারানী সবই বোঝে। দেশমাতার কোন ক্রান্তিলগ্নে ফোন করে আমাকে ঝাড়ি দেয় “এখনো ঘরে বসে আছিস ??” ভালবাসা শুধু মনের সাথে মন, দেহের সাথে দেহ কিংবা হাতের সাথে হাতকেই মিলিয়ে দেয়না, মেলায় প্রাণের সাথে প্রাণকে। তাই ভালবাসার মানুষের গায়ে আঘাত লাগলে সেটা নিজের গায়ে লাগে, মরে গেলে নিজকেও মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে। শুনতে নিষ্ঠুর মনে হলেও বলতে হয়, আমার ভালবাসার অফুরন্ত ভান্ডার উত্সর্গ করেছি বাংলা মায়ের জন্যে। আর কারো জন্যে এত ভালবাসা মজুদ নেই।

পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। স্বল্প ঘুম কিংবা মদের নেশায় মাথা ভারী হয়ে আছে। খুব কষ্টে বিছানা থেকে উঠে বসলাম। কত রাতে ফিরেছিলাম মনে নেই। ব্যালকনিতে পৌছতেই শীতের হাওয়া শরীরে এসে লাগল। এক অন্যরকম অনুভূতি। ফোন করলাম আমার বর্ষারানীকে। সে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর ঘুম ঘুম কন্ঠ শুনতে বেশ লাগে। সব মেয়েরই কি ঘুম ঘুম কন্ঠ এত সুন্দর ? তৃতীয়বারে ও ফোন ধরল
-শুভ সকাল সোনা
-হুঁ
-এবার ওঠ ঘুম থেকে।
-উঁহু
-ওঠ না, একটা জটিল নিউজ আছে !
ওর ঘুম কিছুটা কেটেছে। বলল
-কি নিউজ?
-বলব না, আগে চুমু দে
ওপাশ থেকে অনেকগুলো চুমুর শব্দ আমার কান ভেদ করে হৃদয়ে স্থান অধিকার করে নিল। চুমু শেষ হতেই বলে উঠলাম
-শুভ জন্মদিন সোনা !
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা গেল। এবার বর্ষারানী স্পষ্ট করে বলে উঠল
-এতক্ষণে তোর রাত বারোটা বাজল ?
-না রে পাগলী, গতকাল ড্রিংক করলেও ঠিকই খেয়াল ছিল। আমি চেয়েছিলাম আমার সোনামনিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাব কসাই রাজাকার কাদের মুক্ত এক সকালে। বাইরে গিয়ে দেখ, আকাশটা আজ অনেক বেশি উজ্জল। সূয্যিমামা আরও বেশি করে হাসছে। পাখিরা আরও উচ্চস্বরে গান গাইছে। এবার ওঠ না সোনা, একবার ব্যালকনিতে যা। দেখ রাজাকারমুক্ত সোনার বাংলা কেমন দেখায় ? একবার চোখ বুজে অনুভব কর, ত্রিশ লাখ শহীদ আমাদের আশীর্বাদ করছে। একবার দেখ না সোনা…….

ওপাশ থেকে বিছানা ত্যাগ করার শব্দ পাওয়া গেল। সেই সাথে ভেসে এল আরও অনেকগুলি চুমু।

৪ thoughts on “আমার বর্ষারানী (পর্ব-৫)

  1. আমি চেয়েছিলাম আমার সোনামনিকে

    আমি চেয়েছিলাম আমার সোনামনিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাব কসাই রাজাকার কাদের মুক্ত এক সকালে। বাইরে গিয়ে দেখ, আকাশটা আজ অনেক বেশি উজ্জল। সূয্যিমামা আরও বেশি করে হাসছে। পাখিরা আরও উচ্চস্বরে গান গাইছে। –

    মন থাকলে মন ছুয়ে যেতো কিন্তু আফসুস আমার মন নেই …… সুন্দর হয়েছে বলা প্রয়োজন মনে করছি না :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *