কাগজের নৌকাঃ বিষাদের তুলির ছোঁয়ায় টানাপোড়েনের আধুনিক চিত্র

আশীফ এন্তাজ রবি নামটির সাথে পরিচিত থাকলেও ‘কাগজের নৌকা’ উপন্যাসটির লেখককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। বইটি প্রকাশের আগেই বইটি সম্পর্কে ফেসবুকে জানতে পারি কিছুটা, পরিচিতরা বইটি নিয়ে উৎসাহী দেখে মনে মনে আমিও অপেক্ষা করতে থাকি কবে এই নতুন উপন্যাসটি পড়তে পারবো। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর ২০১৩-তে প্রকাশের পর আমার নিত্যকার ব্যস্ততা সামলে আমি যখন উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ পাই তখন ডিসেম্বর প্রায় শেষ। অর্ডার করেছিলাম রকমারি ডট কমে, তাই পেয়েও যাই সহজে (বলাই বাহুল্য বইপ্রেমীদের দারুণ ভালো সেবা দেয় এই প্রতিষ্ঠানটি)।


আশীফ এন্তাজ রবি নামটির সাথে পরিচিত থাকলেও ‘কাগজের নৌকা’ উপন্যাসটির লেখককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। বইটি প্রকাশের আগেই বইটি সম্পর্কে ফেসবুকে জানতে পারি কিছুটা, পরিচিতরা বইটি নিয়ে উৎসাহী দেখে মনে মনে আমিও অপেক্ষা করতে থাকি কবে এই নতুন উপন্যাসটি পড়তে পারবো। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর ২০১৩-তে প্রকাশের পর আমার নিত্যকার ব্যস্ততা সামলে আমি যখন উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ পাই তখন ডিসেম্বর প্রায় শেষ। অর্ডার করেছিলাম রকমারি ডট কমে, তাই পেয়েও যাই সহজে (বলাই বাহুল্য বইপ্রেমীদের দারুণ ভালো সেবা দেয় এই প্রতিষ্ঠানটি)।

এবার উপন্যাসের ভেতরে ঢোকার পালা। শুরুতেই যে জিনিসটি লক্ষ্য করলাম তা হলো লেখকের ভাষা বেশ সাবলীল, আমাদের রোজকার কথা বলার মতো করেই পুরো গল্পটা বলা হয়েছে, কিন্তু অতিআধুনিকায়নের সেই ‘খাইসি-গেসি-করসি’ টাইপ ব্যাপারটা নেই- এটা আমার জন্য দারুণ স্বস্তিদায়ক ছিলো। উপন্যাসের কিছু কিছু লাইন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতন। যেমনঃ “একটা পুরনো গল্পের বাঁধা চরিত্র হয়েই তো আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। বেঁচে থেকে আমরা সেই পুরনো এবং ছকবাঁধা গল্পের পাতায় পাতায় ঘুরি, নির্ধারিত সংলাপ আউড়ে যাই, এক সময় শেষ পৃষ্ঠায় এসে গল্পটা আচমকা শেষ হয়ে যায়। তারপর আবার, ইয়েস আবার, সেই গল্পটা প্রথম পাতা থেকে শুরু হয় এবং একই গতিপথে শেষ পাতা অবধি চলতে থাকে।” একটা নেশা ধরানো গাঁথুনি উপন্যাসটিতে রয়েছে যার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে লেখকের প্রাপ্য।

ফেসবুকের জগতে বেশ কিছুদিন ধরে ঘোরাঘুরি করার বদৌলতে উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি চরিত্রের নামই আমার পরিচিত। এজন্য উপন্যাসের পুরো কাহিনীটিকে কল্পনা করতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। হয়তো এইভাবে অতি পরিচিত নামগুলো ব্যবহার না করলে আরও ভালো হতো। ব্যাকরণগত কিছু রীতি মেনে চলার দিকটি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে, বিশেষভাবে বলতে হয় ‘কী’ এবং ‘কি’ এর ব্যবহারের কথা। প্রতিটি লাইনে বানানের প্রতিও লেখক বেশ সতর্ক ছিলেন যা আমার মতো বানান-ভুলে-অ্যালার্জি-ওয়ালা পাঠকের কাছে একটি অত্যন্ত দামী ব্যাপার। কিন্তু এতোটা সতর্ক থাকার পরেও একটি তথ্যগত ভুল আমাকে দারুণভাবে শক দিয়েছে। কারণ যে লেখক বানানের ব্যাপারে এতোটা দৃষ্টি রেখেছেন তিনি যে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ গানটির গীতিকারের নাম ভুল করবেন- কেন যেন আমি সেটা ঠিক মেনে নিতে পারি নি।

পড়তে পড়তে বারে বারে চোখে লেগেছে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় চেহারার প্রতি লেখকের পক্ষপাতিতা। অবশ্য এটা তাঁর দোষ আমি তা একবারও বলছি না। বরং একজন বাঙালি পুরুষ লেখক হিসেবে সুন্দরী ফরসা একটি নারীকে নায়িকা না বানালেই আমি চমকিত হতাম। আমার বয়স একেবারেই বেশি নয়, তবুও ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটা ‘নীল’-এর মতোই একজনকে আমি ভালো করে চিনি, তাই আমি জানি লেখক একটুও বাড়িয়ে লেখেন নি। উল্টো লেখকের ভাষায় ‘মারকুটে সুন্দরী’ মেয়েদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার পরীক্ষায় আমার দৃষ্টিতে তিনি একেবারে ফার্স্ট ক্লাস নিয়েই পাশ করে গেছেন।

উপন্যাসের প্লটটি সোজা ভাষায় পরকীয়া নিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমি যে কয়টি ব্যাপারকে প্রচণ্ড ঘৃণা করি, পরকীয়া সেগুলোর মধ্যে এক নম্বর। একজন মানুষ যতো খারাপ পরিস্থিতিতেই পড়ুক না কেন, একটি সম্পর্ক বিদ্যমান রেখে আরেকটি সম্পর্কে জড়ানোর মতো প্রতারণা আর দ্বিতীয়টি হয় না। তবু মানুষের জীবনে আর দশটা পাপের মতো পরকীয়াও ঘটে যায়- একথাও স্বীকার না করে উপায় নেই। আমাদের ইদানিংকালের সম্পর্কগুলোতে এই পরকীয়ার প্রভাব বহুগুণে বেশি করে পড়ছে, বেশিরভাগ সম্পর্ক ভেঙে যাবার পেছনেই দায়ী থাকছে একটি উড়ে এসে জুড়ে বসা তৃতীয় পক্ষ। তাই উপন্যাসের শেষে যখন দেখতে পাই রাজিব আর নীলের হঠাৎ গড়ে ওঠা সম্পর্কটি পরিণতি পায় না, বরং দুজনেই তাদের জন্য প্রতীক্ষায় থাকা আসল সঙ্গীটির কাছে ফিরে যায়, তখন আমার মতো তরুণ কিন্তু প্রাচীনপন্থী পাঠকের আত্মা শান্তি পায়। আর শান্তি পায় বলেই শেষ পর্যন্ত লেখক রবি হয়ে ওঠেন সার্থক।

৬ thoughts on “কাগজের নৌকাঃ বিষাদের তুলির ছোঁয়ায় টানাপোড়েনের আধুনিক চিত্র

  1. রবি সাহেবের লেখা আমি ফেসবুকে
    রবি সাহেবের লেখা আমি ফেসবুকে মাঝে মাঝে পড়তাম। যাহোক কিছুদিন আগে তার একটা স্ট্যাটাস দেয়া নিয়ে বেশ ঝড় বয়ে গেছে। মুনতাসির মামুন স্যার কাদের মোল্লার কে সাধারণ মানুষের সাথে কবর না দিয়ে আলাদা জায়গায় কবর দেয়ার দাবী করলে রবি সাহেব বিশাল প্রতিক্রিয়া দেখান। আমি রবি সাহেবকে নিয়ে এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দিলে তিনি আমাকে ব্লক করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *