শিক্ষাঙ্গন না শিক্ষক নামধারী বর্বরদের গ্রাম: কোন পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়?

উপাচার্যের বাস ভবন থেকে নিজের ব্যবহার করা ব্যক্তিগত মালপত্রও নিতে পারবেন না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদত্যাগী উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন? পদত্যাগের পর তিনি নিজের ব্যবহার করা মালপত্র (তার ব্যক্তিগত সম্পদ, যেগুলো তিনি ঢাকার বাসা থেকে উপাচার্যের বাস ভবনে নিয়েছিলেন ব্যবহারের জন্য) আনতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে গেলে বাস ভবনের নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে চাবি কেড়ে নিয়ে যান সেই আন্দোলনকারী শিক্ষকরা এবং সভ্য সমাজে অনুচ্চারণযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এই আন্দোলনকারী শিক্ষকরা এরই মধ্যে ধারাবাহিক অসভ্য, নোংরা আচরণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজের সম্মান অনেকটাই ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।

উপাচার্যের বাস ভবন থেকে নিজের ব্যবহার করা ব্যক্তিগত মালপত্রও নিতে পারবেন না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদত্যাগী উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন? পদত্যাগের পর তিনি নিজের ব্যবহার করা মালপত্র (তার ব্যক্তিগত সম্পদ, যেগুলো তিনি ঢাকার বাসা থেকে উপাচার্যের বাস ভবনে নিয়েছিলেন ব্যবহারের জন্য) আনতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে গেলে বাস ভবনের নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে চাবি কেড়ে নিয়ে যান সেই আন্দোলনকারী শিক্ষকরা এবং সভ্য সমাজে অনুচ্চারণযোগ্য অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এই আন্দোলনকারী শিক্ষকরা এরই মধ্যে ধারাবাহিক অসভ্য, নোংরা আচরণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজের সম্মান অনেকটাই ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।
গত প্রায় বছর জুড়ে এই শিক্ষকরাই ক্লাস না নিয়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন বিপন্ন করে তাদের ভাষায় ‘উপাচার্য খেদানো’র আন্দোলন করেছেন। আন্দোলন বলে আন্দোলন! একেবারে ভিলেনী কায়দায় উপাচার্য কে অফিস কক্ষে আটকে রেখে বাইরে লাঠি-সোটা নিয়ে পাহারা বসিয়ে শিক্ষকরা প্রমাণ করেছেন, শিক্ষকরা শুধু দূর্বীণীত নয়, দুর্বৃত্তও হতে পারেন নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের প্রয়োজনে। আর তাদের মুখের ভাষা! আমার ধারনা এই আন্দোলনকারী শিক্ষকরা মিছিলে-শ্লোগানে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, রাস্তার কোন ছিঁচকে মস্তানেরও এতটা নোংরা শব্দ উচ্চারণে রুচিতে বাঁধবে। তবে ক্লাস-পরীক্ষা না নিয়েও মেহনতি মানুষের শ্রমে-ঘামে উপার্জিত টাকা থেকে বেতন নিতে এতটুকু লজ্জাবোধ করেননি!
স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন তো আছেই, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন কেন এতদিন পদ আঁকড়ে থেকে এভাবে অপমানিত হলেন? তিনি পদ্যতাগ না করার কারনেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট দীর্ঘায়িত হয়নি? এই প্রশ্নের সরল জবাবটা আন্দোলনের চরিত্রের ভেতরেই পাওয়া যাবে। এই আন্দোলনের শুরু থেকেই আন্দোলনকারী শিক্ষকদের স্পষ্ট কোন দাবি ছিল না। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন শিক্ষকদের কটুক্তি করেছেন, এমন অভিযোগেই এবারের আন্দোলনের শুরু। এরপর ২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের নেতা সৈয়দ কামরুল আহসান উপাচার্যের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ তুললেন। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে ‘ক্যাম্পাসের ভূ-দৃশ্য নষ্ট করা ও জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস’। এর পাশাপাশি অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগও করেন তারা। তবে শিক্ষক নিয়োগ এবং ভর্তি পরীক্ষায় ঠিক কি ধরনের অনিয়ম হয়েছে তার কোন সদুত্তর তারা ওই সংবাদ সম্মেলন শুধু নয়, আন্দোলনের শেষ দিন পর্যন্তই দিতে পারেননি। ক্যাম্পাসের ভূপৃষ্ঠের ঠিক কোথায় কোথায় আঘাত করে কিংবা কোন বৃক্ষের বাকল তুলে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন পরিবেশের চরম বিপর্যয় সৃস্টি করেছেন তারও কোন সুনির্দিষ্ট উদাহরণ আন্দোলনকারীরা দিতে পারেননি। ফলে এমন একটি অস্পষ্ট দাবির আন্দোলনে ঠিক কেন পদত্যাগ করতে হবে সেটি সম্ভবত বুঝতে পারছিলেন না, আবার অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকারেও মন সায় দিচ্ছিল না মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের। কিন্তুু আরও আগে পদত্যাগ করলে হয়ত ‘দুষ্টচক্রের নষ্ট নীড়ে’ অনেক অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেতেন তিনি।
আসলে এবারের আন্দোলনটি’র প্রেক্ষাপট অন্য এক কর্তৃত্ব রক্ষার লড়াই, দীর্ঘ সময়ে অপশক্তির সাম্রাজ্য হারানোর তীব্র আতংক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময়ে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে ক্যাম্পাসের নেপথ্যের ‘কর্তৃত্ব-বাস্তবতা’র অনেক কিছুই দেখতে হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র যারা সচেতনভাবে রাজনীতি কিংবা সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারাও প্রায় সবাই এই আধিপত্যের লড়াই এর কথা জানেন। বর্তমান আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে হলে পেছনের দিকে চোখ রাখতেই হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক আদর্শের বিভাজন বড় কিছু নয়, আধিপত্যবাদী দুই গ্রুপের বিভক্তি কিংবা কখনও কখনও অশুভ ঐক্যই এখানকার শিক্ষক রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আমরা যখন ছাত্র, তখনই দেখেছি দুই গ্রুপেই আওয়ামীলীগ, বিএনপি,বামপন্থী, এমনকি জামায়াত শিক্ষকরাও একসঙ্গে গলাগলি করে ছিলেন। সেই বাস্তবতার অবসান আজও হয়নি। সরকারে বিএনপি থাকলে বিএনপি সমর্থক মুখ চেনা শিক্ষক নেতারা দুই গ্রুপের সামনে চলে আসেন। আবার আওয়ামীলীগ সরকারে থাকলে আওয়ামীলীগ সমর্থক মুখচেনা শিক্ষক নেতারা দুই গ্রুপের সামনে চলে আসেন। নেপথ্যে বিশ্ববিদ্যালয় দখলে রাখার মূল কাজটি করেন দুই গ্রুপের সুবিধাভোগী আধিপত্যবাদী শিক্ষক নেতারা। এ কারনে সরকার বদল হলেও তারা কখনও পদ কিংবা সুবিধা বঞ্চিত হন না। এবার সেই আধিপত্যে বড় আঘাত এনেছিলেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। দুই-তিন যুগ ধরে যারা হাউস টিউটর থেকে ‘সিন্ডিকেট’ পর্যন্ত প্রশাসনের নানা পদ ঘুরে ফিরে অলংকৃত করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের রেজিস্ট্রি করা তালুক ভেবেছেন তাদের সরিয়ে কিছু নতুন মুখের সন্ধান করেছেন। কিছু ব্যক্তিকে প্রশাসনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া শুরু করেন, যারা আগে যোগ্য বিবেচিত হলেও কখনও কোন দায়িত্ব পাননি।
বিশ্ববিদ্যালরেয় আধিপত্যবাদী শিক্ষক রাজনীতির খোল নলচে পাল্টানোর ঝুঁতিপূর্ণ পথে পা দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি নি:সঙ্গ হয়ে পড়েছেন। আধিপত্যবাদী দুই গ্রুপের কেউকেটা শিক্ষকরা ‘ঐক্যবদ্ধ’ হয়ে আন্দোলনের নামে একেবাওে পৈশাচিকতায় মেতে উঠলেন। অফিস কক্ষে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কখনও উপাচার্য, কষনও রেজিস্ট্রারকে আটকে রেখে বাইরে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করলেন। লাঠিয়াল বাহিনী পাশে নিয়ে কামরুল আহসান টিটো, আমীর হোসেনরা শিক্ষক সমাজের সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে যত রকম অশ্লীল শব্দ বাংলা ভাষায় আছে তার সার্থক প্রয়োগের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠলেন। সেই পৈশাচিকতা অব্যাহত থাকল অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন পদত্যাগের পর বাসভবন থেকে মালামাল নিয়ে আসা পর্যন্ত। অন্য দিকে যাদের ‘ভালমানুষী’ এবং লড়াকু মনোভাবের উপর আস্থা রেখে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন আধিপত্য ভাঙ্গার যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, দেখা গেল সেই নিরপেক্ষ শিক্ষকরা তার অসহায় অবস্থায় অদ্ভুত নিরবতায় মগ্ন থাকলেন। মাঝে মধ্যে দু’একটা ‘টু’ শব্দে মৃদু প্রতিবাদের একটা ভাব চোখে মুখে আনার চেষ্টার মধ্যেই ছিল তাদের এবারের প্রতিবাদী অবস্থান। কারন তারাও অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন শেষ পর্যন্ত সফল হবেন, এমন আত্মবিশ্বাস পাননি, এ কারনে আধিপত্যবাদী, বর্বর শিক্ষক রাজনীতির কুশীলবদের সরাসরি মুখোমুখি হতেও চাননি।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন এর আগে পদ্যতাগে বাধ্য হওয়া আর এক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর গ্রুপের সমর্থন নিয়ে। নির্বাচিত হওয়ার প্রথম দিকে শরীফ এনামুল কবীর গ্রুপের আমলে ‘যেনতেন’ ভাবে নিয়োগ পাওয়া তরুন শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে নিজের একটা বলয় তৈরির চেষ্টাও করেছেন। চেষ্টা করেছেন ছাত্রলীগের একটি গ্রুপকে ‘প্রশয়’ দিয়ে ক্ষমতা সুসংহত করারও। এমনকি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একজন ছাত্রের অসুস্থাজনিত মৃত্যুর কারনে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ উত্তেজিত কিছু শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে তার বাসভবনে হামলা করার পর মুহুর্তের মধ্যে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বিবৃতি দিলেন, ‘তার বাসায় ছাত্র শিবির হামলা করেছে।’ তখন তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন না, ছিলেন পাবনায়। অথচ তারপরও তিনি প্রাথমিক তথ্য যাচাই ছাড়াই এমন একটা অসত্য বিবৃতি দিলেন যেটা তার ব্যক্তিত্বের জন্যই চরম হানিকর। ১৯৮৯ সালে ছাত্র শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান কবীর নিহত হওয়ার পর ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীত নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১৯৯৫ সালের ৯ নভেম্বর ও ১৯৯৬ সালের পহেলা জুলাই দু’দফা হামলা চালিয়েও শিবির ছয় ঘন্টাও ক্যাম্পাসে টিকতে পারেনি সাধারন শিক্ষার্থী আর প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের পাঁচ বছরও বাংলাদেশের একমাত্র শিবির মুক্ত ক্যাম্পাস ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ক্যাম্পাসের উপাচার্যের বাসায় শিবির প্রকাশ্যে হামলা চালানোর অভিযোগের অর্থ কি দাঁড়ায়? জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস শিবির মুক্ত রাখার ঐতিহ্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের আমলে এসে শেষ হয়ে গেছে? আর তার বাসায় যারা হামলা করেছিলেন, তারা কেউ অচেনা ছিলেন না। শিক্ষার্থীরা এর আগেও এ ধরনের ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে, বাইরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভাংচুর করেছে। এবার উপাচার্যের বাসভবন ভাংচুরের ঘটনাটি ঘটেছে তার একটাই কারন, যে আধিপত্যবাদী শিক্ষকরা শুরু থেকে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে তাড়ানোর জন্য একাট্টা হয়েছিলেন, তারা ওই ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে তার বাস ভবনে হামলার ইন্ধন দিয়েছেন। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন অসত্য বিবৃতি দিয়ে হামলাকারীদের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে তাদের রক্ষাও করেছেন, নিরজর বিরুদ্ধে অপপ্রচারেরও সুযোগ করে দিয়েছেন।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে কতিপয় শিক্ষক এবং কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ কয়েকবার শুনেছি পরিচিতদের কাছ থেকে। একজন কর্মকর্তা যিনি পত্রিকায় মাঝে মধ্যে নিরীহ গোছের কিছু কলাম লিখতেন, তাকে না’কি লিখতে কড়া ভাষায় নিষেধও করেছিলেন তিনি। এসব নানা অভিযোগ চাউর হচ্ছিল এবং অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে হটাতে আধিপত্যবাদীদের অপপ্রচার, ঐক্য দু’টোই দৃঢ় হচ্ছিল। তবে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যে অকল্পনীয় নোংরা আচরণ সৈয়দ কামরুল আহসান-আমির হোসেন বাহিনী প্রকাশ্যে করেছে তার বিচার করলে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নেপথ্যের দুর্ব্যবহার ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।
যখনই অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীরের পছন্দের বাইরে গিয়ে অধ্যাপক আনোয়ার শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন শুরু করেছেন তখন তার বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদীদের ঐক্য দ্রুত দৃঢ় হয়েছে, কারন অধ্যাপক শরীফ সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন অনেকটা প্রকাশ্যেই। আর অধ্যাপক শরীফের গ্রুপ মানে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদের গ্রুপ। আর অধ্যাপক আলাউদ্দিনের গ্রুপ মানে অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান গ্রুপের আধিপত্য। মাঝখানে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর উপাচার্য হওয়ার পর কিছু সময় অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমান গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মধুচন্দ্রিমায় ভাটার টান এসেছিল। অধ্যাপক শরীফ ছাত্রলীগের গ্রুপিং বহাল রাখার কুটিল রাজনীতির মাধ্যমে আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতে গিয়ে তার আমলে ক্যম্পাসকে গুন্ডামি, মস্তানি, অস্ত্রবাজি আর গা শিউরে ওঠার বর্বরতার অভয়ারণ্য করে তোলেন। সর্বশেষ মেধাবী ছাত্র জুবায়ের আহমেদের নির্মম খুনের ঘটনা এবং খুনী হিসেবে অভিযুক্ত দু’জনকে প্রশাসনে চাকরি দিয়ে যখন সাধারন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চরম তোপের মুখে অধ্যাপক শরীফ, তখন অধ্যাপক মুস্তাহিদ গ্রুপের কেউকেটা কামরুল আহসান টিটো, আতিকুর রহমান সহ সবাই প্রকাশ্যেই অধ্যাপক শরীফের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি উদারপন্থী বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে কট্টরপন্থী বিএনপি এবং বিএনপি পরিচয়ধারী জামায়াতি শিক্ষকরাও তখন আশ্চর্যজনকভাবে নিরাবতা পালন করেন। এর একটা কারন হতে পারে, অস্ত্রবাজি, বর্বরতা, খুন যেহেতু জামায়াতিদের তথাকথিত মওদুদীবাদী আদর্শের প্রধানতম উপাদান, সে কারনে বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে তারা নিরব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক! অবশ্য অধ্যাপক শরীফের পদত্যাগের খবর প্রচারিত হওয়ার পর ওই গ্রুপের নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ খান একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন বটে! মজার বিষয় ছিল কট্টরপন্থী বিএনপি জামায়াত-গ্রুপ সে সময় অধ্যাপক শরীফ বিরোধী আন্দোলনে নিশ্চুপ থাকলেও অধ্যাপক শরীফ একাধিকবার তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতপন্থী কিছু শিক্ষক আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন, এমন অভিযোগ করেন। অসত্য তথ্য দানে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না। অসত্য তথ্য প্রদান সম্ভবত ক্ষমতার একটি অবশ্যপালনীয় শর্ত। কারন ক্ষমতাবান প্রায় সবার মধ্যেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ার প্রবণতা প্রায় সমানভাবেই দেখা যায়।
অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদ গ্রুপের সঙ্গে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর গ্রুপের সখ্যতা নতুন করে দেখা গেল অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্দোলনে। এই আন্দোলনে কট্টরপন্থী বিএনপি বা জামায়াতপন্থীদের গ্রুপও প্রায় সমান সক্রিয় ছিল। এর কারন একটাই হতে পারে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা। আধিপত্যবাদীদের বৃহৎ ঐক্যের সামনে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের ‘সুশীল’ সমর্থকরা অনেকটাই ক্ষুদ্র হয়ে পড়েছিলেন। এ কারনে তার পক্ষে শক্তভাবে দাঁড়ানোর সাহস এবং যুক্তি কোনটাই পাননি।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষক আন্দোলন দেশের শিক্ষক সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা পদের লোভে কতটা নীচে নামতে পারেন, কত নোংরা হতে পারেন, কিভাবে তারা শিক্ষার্থীদের বছর জুড়ে পাঠদান থেকে বঞ্চিত রেখে সেসন জটে ফেলতে পারেন, সেটা এখন আর কাউকে ব্যাখা করে বোঝাতে হবে না। অফিস কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ রাখার ‘ পৈশাচিক সংস্কৃতি’ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের আন্দোলনকারী শিক্ষকরা চালু করেছেন। যে সংস্কৃতি অল্প সময়ের মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংক্রামিত হয়েছে, অচিরেই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সংক্রামিত হওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারনেই প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের মনুষ্যত্ববোধহীন শিক্ষকদের রেখে স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারবে?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই যুগের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করে কারা কিভাবে এখানে শিক্ষক হয়েছেন, অতীতে কোন ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা শিক্ষক হয়েছেন কি’না তার একটা খতিয়ান বের করা উচিত। কারন আধিপত্যবাদী শিক্ষকরা নিজেদের গ্রুপের ভোটার বাড়ানোকে শিক্ষক নিয়োগের প্রধান শর্ত মনে করেন। অধ্যাপক জসীমউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমান এবং অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর উপাচার্য থাকার সময়ে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যেভাবেই ক্ষমতার চর্চা করুন না কেন শিক্ষকদের চেয়ে ক্ষমতাবান কেউ নন। সেটা হওয়াটা হয়ত স্বাভাবিকও। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের নামে বার বার দলীয় ক্যাডার, অনুগত ভোটার নিয়োগ করতে গিয়ে বিশ্বব্যিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা কোথায় টেনে নামানো হয়েছে, কল্পনা করা যায়? এ অবস্থার নিরসনে অবশ্যই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা অনিয়ম ও যোগ্যতার সঠিক মাপকাঠির বাইরে অনুকম্পা কিংবা আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে শিক্ষক হয়েছেন, তাদের চাকরিচ্যুত করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তা হলে এই বিশ্ববিদ্যালয় পবিত্র শিক্ষাঙ্গন হওয়ার পরিবের্তে শিক্ষক নামধারী বর্বরদের গ্রামে পরিণত হওয়ার আশংকাই তীব্র হবে।

রাশেদ মেহেদী
সাংবাদিক
https://www.facebook.com/rased.mehdi
rasedmehdi.blogspot.com

৪ thoughts on “শিক্ষাঙ্গন না শিক্ষক নামধারী বর্বরদের গ্রাম: কোন পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়?

  1. তথ্যবহুল লেখা নিঃসন্দেহে।ঢাকা
    তথ্যবহুল লেখা নিঃসন্দেহে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগরে আসার পর অধ্যাপক আনোয়ারকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল।
    অধ্যাপক আনোয়ার দেশে বিদেশে ক্লীন ইমেজধারী হলেও প্রশাসক হিসেবে তার সামগ্রিক আচরণে মনে হয়েছে, তাকে ক্ষমতা ছাড়াই ভাল মানায়। বিরোধীদল হিসেবেই তিনি উপযুক্ত। আবেগ আর বক্তব্য দিয়ে প্রশাসন পরিচালনা সম্ভব নয়। দরকার বাস্তবতার নিরিখে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
    স্যারের বড় ভুল ছিল, আবাসিক এ ক্যাম্পাসটিতে যেসব শিক্ষক, নিজেদের স্বকীয়তা, আদর্শ আর প্রেস্টিজ বিসর্জন দিয়ে যুগে যুগে ক্ষমতাসীনদের অধীনস্ত হয়ে থেকেছেন, তাদেরই পরামর্শক আর আপনজন হিসেবে গ্রহণ করা। স্বার্থকেন্দ্রিক তাদের ভুল পরামর্শ বাইবেলের বাণীর মত গ্রহণ করেছিলেন প্রথমবারের মত উপাচার্য পদ পাওয়া আনোয়ার। জামায়াত শিবির ম্যানিয়াও তার পরাজয়ের অন্যতম একটি কারণ। একাধিক গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে তিনি রায়হান রাইন স্যার, নাসিম আখতার ম্যাডামকে জামায়াতের এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও পরে দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়। অধ্যাপক খবিরকে তিনি জামায়াত নেতা আখ্যায়িত করে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বক্তব্য দেন।
    তিনি কখনোই কোনোভাবেই নিজের সমলোচনা সহ্য করতে পারতেন না। খুব কাছের শিক্ষক, কর্মকর্তা আর গণমাধ্যম কর্মী যদি বিনীতভাবেও তার সিদ্ধান্ত ভেবে দেখার অনুরোধ করেন, তবে বিষয়টি শুধু ভুলই নয়, সেই হয়ে যায় জামায়াত শিবির। স্যারের আরেকটা সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, প্রোভিসি আর ট্রেজারার নিয়োগ।

  2. বেশ তথ্যবহুল লেখা । সেজন্য
    বেশ তথ্যবহুল লেখা । সেজন্য ধন্যবাদ , এক্ষেত্রে সরকারের কি কিছুই করার ছিল না ? সরকার কি করলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া যাবে সেই বিষয়ে কিছু লিখলে ভাল হতো বলেই আমার মনে হয় । আমরা সাধরনরা কিন্তু অন্ধকারি আছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *