25th Hour: সেলুলয়েডের ফিতায় অপরাধবোধের কবিতা

মূল লেখাঃ মুখ ও মুখোশ সিনে ম্যাগাজিন
[http://mukhomukhoshmag.com/2014/01/04/25th-hour/]


মূল লেখাঃ মুখ ও মুখোশ সিনে ম্যাগাজিন
[http://mukhomukhoshmag.com/2014/01/04/25th-hour/]

25th hour ছবিটি শুরু হয় অদ্ভুতভাবে।কুকুরের ডাক দিয়ে। একটা আহত কুকুরকে আপন করে নেয় মূল চরিত্র মন্টি। গাড়িতে কুকুরটিকে নিয়ে রওনা দেয় সে।এভাবেই অসাধারন একটা দৃশ্য দিয়ে সিনেমার শুরু।। দৃশ্যায়ন,ক্যামেরার কাজ সেই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে চমক দিয়ে যাবে।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক অসাধারন দৃশ্য আসতে থাকবে আর সেগুলো এতটা সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর।আর সিনেমাতে অভিনতা হিসেবে আছেন এডওয়ার্ড নর্টন(আমেরিকান হিস্টরি এক্স,ফাইট ক্লাব), বেরি পেপার(দি কেনেডিস,সেভিং প্রাইভেট রায়ান,দি লোন রেঞ্জার), ফিলিপ সেইমুর হফম্যান(ক্যাপোট,দি মাস্টার,ম্যারি এন্ড ম্যাক্স), রোসারিও ডসন(ঈগল আই,সেভেন পাউন্ডস) এছাড়াও রয়েছেন আনা পাকুইন(দি পিয়ানো,এক্স মেন,স্ট্রেইট এ’স), ব্রায়ান কক্স(দি এসকেপিস্ট,ট্রয়,L.I.E)। নিঃসন্দেহে বেশ তারকাবহুল ছবি এক ছবি। অন্যান্য তারকাবহুল সিনেমার মতন এটি কোন ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়নি। সিনেমাটির ডিরেক্টর প্রখ্যাত আফ্রিকান আমেরিকান পরিচালক স্পাইক লি(ম্যালকম এক্স,ডু দা রাইট থিং,দি ইনসাইড ম্যান)।
25th hour এর প্রতিটা বিভাগই সমান শক্তিশালী।অনেক নিপুন হাতে শক্ত করে গভীর ভাবে বানানো হয়েছে সিনেমাটি। এটি ডেভিড বেনিওফের ঐ একই নামের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বানানো। চিত্রনাট্য ও তার লেখা। তবে বই থেকে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে সিনেমাটিতে । সিনেমার গল্পটা এক কথায় বলতে গেলে “জেলে যাওয়ার আগের ২৪ঘন্টায় মন্টির জীবন” ।
মন্টগোমারি ব্রোগান বা মন্টি একজন ড্রাগ ডিলার। DEA এর কাছে ধরা পড়ে সাত বছর সাজা হয় তার। কারা জ়ীবন শুরু করার ঠিক আগের ২৪ ঘন্টা সে যা যা করে তার উপরেই বানানো সিনেমাটা, ভিন্ন স্বাদের কাহিনী। হলিউডে প্রচুর সিনেমা রয়েছে যা জেল থেকে পালানোর উপর ভিত্তি করে বানানো আর এই সিনেমা জ়েলে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সিনেমা।

সিনেমাটিতে বন্ধুত্বের একটা দারুন মাত্রা দেখতে পাই।ব্যাক্তিগত মত দিয়ে বলতে গেলে বলা যায় কিছু কিছু জায়গায় এটা থিম্যাটিক্যালি শশাংক রেডেম্পশনের উলটো দিকে এগিয়ে চলা একটি ছবি। কাহিনীতে দেখা যায়, মন্টি রাশান মাফিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে ড্রাগসের ব্যবসা করে হাইস্কুল থেকে। তার বাবা এক মাতাল ফায়ার ম্যান। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাবার এই অবস্থা। চারদিকে ধারদেনা কিন্তু শোধ করার অবস্থা নেই। তাই মন্টি পড়ালেখা, বাস্কেটবল ছেড়ে সোজা বাংলায় এই ‘অন্ধকার’ পথে নামে।তার দুইজন বন্ধু। একেবারে ছোটবেলার, জ্যাকব আর ফ্র্যাংক। জ্যাকব হাইস্কুল টিচার আর ফ্র্যাংক ওয়াল স্ট্রিটের সফল স্টক ব্রোকার। জেলে যাওয়ার আগের রাতে মন্টি, মন্টির গার্লফ্রেন্ড, জ্যাকব আর ফ্র্যাংক রাশান মাফিয়ার ক্লাবে যায় একসাথে সময় কাটাতে। এখান থেকেই ধীরে ধীরে সিনেমার কাহিনীর মূল রূপ প্রকাশ পেতে থাকে ।ডেভিড বেনিওফের লেখা অসাধারন এক গল্প, সেইসাথে অসাধারণ এক স্ক্রিপ্ট। অসাধারন সব ডায়ালগের কারনে কাহিনী এক ভিন্নমাত্রা লাভ করে। এই সিনেমার একটা বিখ্যাত মনোলগ আছে। ইন্টারনেটে যা “Fuck you monologue/mirror scene” নামে পরিচিত। মন্টির সব কিছুর উপর রাগ-অভিমান-ঘৃণার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এবং সবশেষে নিজের উপর হতাশা থেকে সৃষ্ট অপরাধবোধ মেনে নিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই ৫মিনিটের মনোলগের। অসম্ভব শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে এডওয়ার্ড নর্টন আবারো প্রমাণ করলেন নিজেকে।পুরো সিনেমাতে অপরাধবোধের পাহাড় বয়ে বেড়ানো যুবকের চরিত্রটি তার মতন নিখুত ভাবে কেউ পারবেনা। ফ্র্যাংকের সাথে মন্টির গার্লফ্রেন্ড ন্যাচেরেলের তর্ক বিতর্ক, জ্যাকব এবং ফ্র্যাংকের মাঝে মন্টির ভবিষ্যত নিয়ে তর্ক, অসাধারণ কিছু সিকোয়েন্স। সংলাপগুলোতে কোনো প্রকার বাহুল্য খুজে পাওয়া যাবেনা। ডেভিড বেনিওফের এই চিত্রনাট্যে কোন ফাক-ফোকড় ও রাখা হয়নি।যা যা জানা দরকার সিনেমাটিকে আত্মস্থ করার জন্য তার সবই আছে।
পরিচালক হিসেবে স্পাইক লি তার দক্ষতার পরিচয় আবারো দিলেন। প্রথমতঃ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাছ থেকে তিনি সেরাটাই বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সিলেকশন ছিল চমৎকার। প্রত্যেকে তাঁদের নিজনিজ চরিত্রগুলোতে ছিলেন অসাধারন। এক্সপ্রেশন,ডায়ালগথ্রোয়িং,আবেগের প্রকাশ সবকিছুই ছিল মানসম্মত। এমনকি ছোট চরিত্র জ্যাকবের ছাত্রী/ক্রাশ মেরির রূপে আনা পাকুইনও ছিলেন সাবলীল। ছাত্রীকে ভালোলাগা নিয়ে যে দ্বিধা-অপরাধবোধ তা তুলে আনতে ফিলিপ সেইমুর হফম্যান ছিলেন ১০০% সফল। মন্টির বাবার চরিত্রে ব্রায়ান কক্স, মন্টির গার্লফ্রেন্ড নেচেরেল এর চরিত্রে রোসারিও ডসনও বেশ ভালো করেছেন। আবারো বলি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অসাধারন অভিনয় করে এডওয়ার্ড নর্টন আবারো যেন ব্যাঙ্গ করলেন অস্কারকে। উল্লেখ্য, এডওয়ার্ড নর্টন দুইবার নমিনেশন পেলেও এক বারো অস্কার জিতেননি। আর ফ্র্যাংকের অভিনয়ে বেরি পেপার পুরো সিনেমাতে ঠান্ডা একটা চরিত্র করলেও সিনেমার শেষের দিকের ক্লাইমেক্সে এসে সুঅভিনয় দিয়ে দৃশ্যটির ডাইনামিক্স সম্পূর্ণরূপে নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন। পুরো সিনেমাতে সবগুলো চরিত্রকে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা অপরাধবোধ সেলুলয়েডের ফিতায় মায়া এঞ্জেলোর কবিতার মতন করে আটকাতে পরিচালক স্পাইক লি , প্রতিটি অভিনেতা, অভিনেত্রী, সিনেমাটোগ্রাফার ও মিউজিক ডিরেক্টর নিজেদের শতভাগটাই যেনো উজাড় করে দিলেন।
সিনেমাটোগ্রাফি এই সিনেমার প্রধান আকর্ষনগুলোর একটি। সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন মেক্সিকান সিনেমাটোগ্রাফার রডরিগো প্রিয়েতো। সমালোচক, মুভিবোদ্ধা থেকে শুরু করে অনেকেরই খুবই প্রিয় সিনেমাটোগ্রাফার । ২০১৩ সালের অস্কারজয়ী আরগোর সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন এই রডরিগো প্রিয়েতো। তার সত্যিকারের আত্মপ্রকাশ হয়েছিল আলেক্সাজান্দার গঞ্জালেজ ইনারিতুর “আমোরেস পেরোস” ছবির সিনেমাটোগ্রাফির কাজ দিয়ে। এরপর তিনি আস্তে আস্তে হলিউডে জায়গা করে নিয়েছেন। এই সিনেমাতে তিনি অসাধারন কিছু কাজ দেখিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে সৎ, প্রাণবন্ত ও গোছালো ক্যামেরার কাজ, লাইটিং আমরা এখানে দেখতে পেয়েছি। একই দৃশ্য একই সময়ে বিভিন্ন এংগেল থেকে রং এবং আলোর খেলায় বুঝানোতে রডরিগো প্রিয়েতো কে এ+ দেওয়া যায় নিঃসন্দেহে।

আলো ছায়ার খেলার উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ অসাধারন। বিখ্যাত আয়নার দৃশ্যতো আছেই, একটি দৃশ্যে জ্যাকব ও ফ্র্যাংক জেলে গিয়ে মন্টির কি কি পথ খোলা আছে সেটা বলতে থাকে আর জানালা দিয়ে ৯/১১ এর ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে থাকে, অসাধারন ভাবে দেখানো হয়েছে। আবার জ্যাকব তার ছাত্রীকে চুমু খেয়ে যেন আকাশে ভাসছে এই ব্যাপারটা ফুটিয়ে তোলার জন্য ক্যামেরা এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন জ্যাকব আসলেই ভেসে আছে। নিউইয়র্ক শহরকে ক্যামেরার চোখে এতটা প্রাণোচ্ছল আগে কখনো লাগেনি। শুধু শহর নয়, মন্টির বাবার কল্পনার দৃশ্যে মরুভূমির দৃশ্যগুলো, গ্রামীন এলাকার দৃশ্যগুলোর চিত্রায়ন ছিল অসাধারন। সিনেমার এডিটিংটাও ছিল অনেক পরিকল্পিত।
সিনেমার আবহ সংগীত ও শব্দের মিলন ছিল বেশ প্রফেশনাল।আবহ সংগীতের কাজে ছিলেন টেরেন্স ব্লাঞ্চার্ড। এই সিনেমার আবহ সংগীতের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোবের নমিনেশন পেয়েছিলেন।আবহ সংগীত ছিল মূলত জ্যাজ, ব্লুজ় ও কিছুটা প্রাচ্যের সংগীত নির্ভর। পুরো সিনেমার আবহের সাথে সংগীত এবং তাঁর কম্পোজিশন ছিল বেশ মানানসই। এক মূহুর্তের জন্যেও বাহুল্য মনে হয়নি। মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে টেরেন্স ব্লাঞ্চার্ড সফল। তিনি সিনেমার শিল্পগত মান, ভাবের গভীরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।
frank and naturel arguing about montyসিনেমাটি সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল দর্শককে নিজের জীবনের দিকে একবার হলেও তাকাতে বাধ্য করা।আয়নায় নিজের দিকে ভিন্ন ভাবে তাকাতে বাধ্য করবে।এই সিনেমার থিম ছিল মূল দুইটি , চরিত্রগুলোর আত্মগ্লানি আর অপরাধবোধ। ফ্র্যাংক, জ্যাকব, মন্টির বাবা, নেচেরেল সবার মন্টির প্রতি দায়িত্ব পালন করতে না পারার অপরাধবোধ।মন্টির নিজের অতীত নিয়ে যত অপরাধবোধের চিন্তা, আফসোস। ফ্র্যাংক মন্টিকে সাহায্য করতে না পারার, নেচেরেলের মন্টির ড্রাগসের টাকা খরচ করার, মন্টিকে সৎ পথে না আনতে পারার, মন্টির বাবার মন্টির ড্রাগসের টাকা দিয়ে বার খোলার, পিতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার অপরাধবোধ স্পাইক লি অসাধারন সুন্দর ভাবে তুলে নিয়ে এসেছেন পর্দাতে। দর্শকের মনে স্পষ্টত প্রভাব ফেলার মতন।আরেকটি থিমের কথা না বললে নয়, সেটা হল জাতিগত সমতা। প্রথমত মন্টির প্রেমিকা লাতিনো আর মন্টিকে ধরে নিয়ে যায় কালো এজেন্টরা।যাদের দেখানো হয়েছে বেশ শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল হিসাবে। যদিও একটু ভিলেনিয়াস ভাবে।তবু এক সাদাবর্ণের ক্রিমিনালকে কালো লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে এই দৃশ্য আমেরিকাবাসীদের কাছে অনেক তাৎপর্যময়। এরপর আয়নার সিনে মন্টি যাদের প্রতি তার ঘৃণার চরম বহিঃপ্রকাশ দেখায় সেই কালো,কোরিয়ান,পাকিস্তানি-ভারতীয়রাই সে যখন জেলে যায় তার দিকে হাত নাড়ে। যেন মন্টিকে আশ্বস্ত করছে আমরা আছি,কোন চিন্তা করোনা সব ঠিকঠাক থাকবে। কি যে চমৎকার দৃশ্যায়ন না দেখলে বোঝার মতন না। অদ্ভুত এক প্যারাডক্স সৃষ্টির জন্য পরিচালক,চিত্রনাট্যকার কে সম্মান না জানালেই নয়।
পাঠকদের প্রতি অনুরোধ সিনেমাটি দেখে ফেলুন অতিসত্বর। দেরী করবেন না। সিনেমাটি দর্শক থেকে শুরু করে সমালোচকদের দৃষ্টিতেও অসাধারন বলে বিবেচিত। প্রখ্যাত সিনেমা ক্রিটিক রিচার্ড রোএপার, রজার এবার্ট উভয়ের লিস্টেই এই সিনেমা গত দশকের সেরা ছবিগুলোর লিস্টে স্থান করে নিয়েছে। অনেকের প্রিয় এডয়ার্ড নর্টন এর অসাধারন অভিনয় তো আছেই। সিনেমাটি দেখুন আর নিজেকে আবিষ্কার করুন নতুন ভাবে,নতুন করে।
25th hour
Directed by-Spike Lee
Screenplay- David Benioff
Starring- Edward Norton,Phillip seymore Hoffman,Barry Pepper, Rosario Dawson
IMDB Rating- 7.7/10
Rottentomatoes- 78%
শেয়ার!

১ thought on “25th Hour: সেলুলয়েডের ফিতায় অপরাধবোধের কবিতা

  1. ভাইজান কিঞ্চিৎ ধীরে পোষ্ট
    ভাইজান কিঞ্চিৎ ধীরে পোষ্ট করেন আপনার লেখার হাত ভাল কিন্তু বিধি মোতাবেক না চললে যে মাষ্টার সাহেব মাইন্ড খাবেন …… 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *