যুবক বয়সে…গল্পটা তোর আমার তোদের নিয়ে লেখা….

রাতুলের ধারনা কিছু কিছু মানুষ ব্যাক ইয়ার্ডে জন্মায়। বড় হয় বস্তিতে,বেশিরভাগের বাপের ঠিক নেই,হয়তো জীবনটা রাস্তাতেই এটা ওটা ফেরী করে পার করে দেয়,তার মতে এদের জাতে তুলতে হয়না। সম্মান দিলে বিপদ বাড়ে।সে কট্ররভাবে বুর্জোয়াদের পক্ষে,সাম্রাজ্যবাদই হলো সুখের আসল ঠিকানা।তার কাছে সমাজতন্ত্র বা বাম রাজনীতি মানে জাষ্ট একটা ধারা,যা শুধু নিঃস্ব লোকেরাই করে থাকে অন্যের দৃষ্টি নিজের দিকে নিবদ্ধ করার জন্য।এটা কোনো সুফল কখোনই বয়ে আনে না।এ দিয়ে নেতা হওয়া যায় কিন্ত ফর্মে আসা যায়না।
রাতুলের কথায় বাঁধা দেয় আমান,

রাতুলের ধারনা কিছু কিছু মানুষ ব্যাক ইয়ার্ডে জন্মায়। বড় হয় বস্তিতে,বেশিরভাগের বাপের ঠিক নেই,হয়তো জীবনটা রাস্তাতেই এটা ওটা ফেরী করে পার করে দেয়,তার মতে এদের জাতে তুলতে হয়না। সম্মান দিলে বিপদ বাড়ে।সে কট্ররভাবে বুর্জোয়াদের পক্ষে,সাম্রাজ্যবাদই হলো সুখের আসল ঠিকানা।তার কাছে সমাজতন্ত্র বা বাম রাজনীতি মানে জাষ্ট একটা ধারা,যা শুধু নিঃস্ব লোকেরাই করে থাকে অন্যের দৃষ্টি নিজের দিকে নিবদ্ধ করার জন্য।এটা কোনো সুফল কখোনই বয়ে আনে না।এ দিয়ে নেতা হওয়া যায় কিন্ত ফর্মে আসা যায়না।
রাতুলের কথায় বাঁধা দেয় আমান,
‘বাদ দে তো ওসব! মাথার উপর দিয়ে যায়!রাজনীতি ফাজনীতি, যত্তসব বাল ছাল’
আমান ডান বাম কোনো রাজনীতিই বোঝেনা,সে বুঝে ক্রিটিক।প্রতি বছর পকেটের পয়সা খরচ করে বই বের করে সে।সমাজের দুষ্ট লোকেরা তার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র।তার বহুল পঠিত বই “একালের অসুরেরা”দ্বিতীয় মুদ্রনে। আমান বললো সে এর সিক্যুয়েল বের করবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
সিক্যুয়েল মানে?কাকাবাবু টাইপ?তাছাড়া এই যে বই বের করিস খরচ উঠে আসে তো?আসল টাকাটা পাস?নাকি তাও না?
আমান হাসে,
‘তাহলে সংসার চলে কিভাবে বন্ধু!সাহিত্যের চেয়ে ভালো ব্যাবসা আর হয়না।বড় লেখকেরা বড় ব্যাবসায়ী, আমরা ছোট।আমাদের কোম্পানি এখনো কেউ চিনেনা তাই সেভাবে মালও বিকেনা।আমি শব্দ জোগাড় করি ইটের মতো তারপর সাজিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিই।সব ইমেজ টিমেজ ঝুটা হ্যায়।এই বই আর টিউশনিটা না থাকলে….’
আমি হাসি।রাতুল সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলে, ভরাডুবি হবে।
তার দৃষ্টি সীমানায় কয়েকটা গাছ আর কিছু কাক ছাড়া আর কিছু গোচর হয়না।আমরাও জিজ্ঞেস করিনা কার ভরাডুবি হবে।রাতুল আনমনা হয়ে বসে থাকে।
দূর থেকে একটা সুর ভেসে আসে,”কি আশায় বাঁধি খেলাঘর, দুরাশার বালুচরে…”
‘কার গান?ইন্দ্রনীল? মনে পড়ছেনা।’
ধ্যান ভাঙে আমানের কথায়,
‘শ খানেক কবিতা বুঝলি,ঘরের কোনায় পরে আছে!কষ্ট লাগে ওদের জন্য!জন্ম দিয়ে ফেলে রেখেছি….কেমন বাবা আমি?’
আমান অদূরে কৃষ্ণচুড়ার নিচে গিয়ে দাঁড়ায়, ফুলের পাপড়িগুলো তার উপর ঝরে পরে।
আমি জিজ্ঞেস করি, মন খারাপ?
‘এই শালার তো চব্বিশ ঘন্টাই মন খারাপ,শালা বালের রাইটার’
রাতুল কপট রাগ দেখিয়ে জবাব দেয় তারপর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে কাঁধে।
‘বুঝলি শুভ,কষ্টের দিনে হাসতে আমার খুব ভালো লাগে…খুব!”রাতুলের চোখে জল দেখে অবাক হই।
আমি জিজ্ঞেস করি,তুই কাঁদছিস রাতুল?
আমার কথা শুনে আমান ঘুরে দাঁড়ায় দৌড়ে কাছে এসে কাঁধে ঝাকুনি দিয়ে বলে,’কি হয়েছে বল!’
রাতুল শার্টের হাতায় চোখ মুছে বলে,
‘কাঁদবো কেনো!বেশী হাসলে আমার চোখে জল আসে!ফুল হাতা শার্ট কত্ত ভালো তাইনা রে শুভ?কতো অশ্রু জমিয়ে রাখে হিসেব নেই।ঠিক আমার মতো’
রাতুল ঢুকরে কেঁদে ওঠে।
‘আনিকা আমায় ডিভোর্স দিয়েছে রে…।মেয়েটা ভালোবাসা বুঝলনা!’
আমি আর আমান খানিক্ষন স্তব্দ হয়ে বসে রইলাম!
শান্তনা জানাবার ভাষাও যেনো হারিয়ে ফেললাম আমরা।
‘কি সেন্টিমেন্টাল সিন ক্রিয়েট করলাম!যাশশালা!এই আমান একটা সিগারেট দে না দোস্ত’রাতুল সিগারেট চাইতে আমান একটা ডার্বি তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।তিনটি কাঠি পুড়াবার পর সিগেরেট ধরিয়ে রাতুল বলে,
‘বুঝলি শুভ জীবনটা এমনই রে!এই আমান একটু বোসনা পাশে…উপন্যাসের প্লট নিয়ে নাহয় পরে ভাবিস…।’
‘আরে কিসব বলছিস!’
আমান পাশে এসে বসে। রাতুলের একটা হাত মুঠোয় নিয়ে বলে,’মন খারাপ করিসনা পাগল,আমরা তো আছি’
আমিও আমানের কথায় সায় দি।
রাতুল দুজনের দিকে খানিক্ষন তাকিয়ে বলে,
‘কম বয়েসে লো ফ্যামিলির মেয়ে বিয়ে করে ভুল করেছিলাম রে!কিছুই বুঝতে চায়না।বলে আলাদা ফ্ল্যাট নিতে।এইবার তোরা বল আমার বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা মা ছেড়ে কিভাবে আলাদা থাকি আমি?মেয়েটাকে ভালোবাসতাম খুব!কিভাবে থাকবো বল!’
রাতুল শব্দ করে কেঁদে ওঠে,আমি ওর মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলি,ছিঃ পাগল! এভাবে কাঁদেনা বন্ধু।সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাতুলের কান্না কাঁপা শরীর বুকে নিয়ে আমিও কাঁদি,কাঁদে আমানও।দুঃখ যেনো মূর্ত হয়ে ধরা দেয় মুহূর্তে।তিন বন্ধুর অনুভুতি একাকার হয়ে মিশে যায় একইরকমের কান্নায়।একই ধরনের অশ্রুতে।
আমান চোখের জল মুছে বলে,
‘বাবার অষুধ নেই!নতুন বই এর টাকাটা উঠে আসেনি।টিউশানি করে পুশায়না রে দোস্ত।একটা চাকরি কেউ দিতে চায়না…কতো চেষ্টাই তো করছি,বাবা কি বিনে চিকিৎসায় মারা যাবে?আমি তার অক্ষম সন্তান।’
আমানের চোখে এই প্রথম আমি জল দেখি।রাতুল চোখ মুছে উঠে বসে কিন্ত অবিরাম ধারায় বেয়ে পড়ে জল।থামতেই চায়না।
পুকুরপারে সুপুরি গাছে এক অচেনা পাখি গান গাইছিলো!আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম,ইশ!আমি যদি পাখি হতে পারতাম!উড়ে উড়ে অনেক দূরে চলে যেতাম।
দুই মাসের মেস ভাড়া বাকি।খাবারের টাকা দিতে পারছিনা…।বাকিরা প্রবলেম করছে খুব,বলেছে ১৫ দিনের ভেতরে রুম খালি করে দিতে,আমাকে রেখে ওদের পুষাবেনা।গত দুদিন ধরে সিঙাড়া আর জল খেয়ে আছি রে…।
আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয় রাতুল’কি বলছিস তুই?আমাকে বলিসনি কেনো…? ‘
আমান কাঁধ ঝাকিয়ে যোগ করে,’আমরা কি মরে গেছি?’
আমি হাসি,বাবা বলেছে আমি যেনো ওমুখো না হই।একটা চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরছি।বাবাকে বলতে ইচ্ছে করে,প্রেমের শাস্তি এতো কঠিন হয় বাবা?প্রেমই তো করেছিলাম,পাপ তো করিনি!আজ আমি যদি না খেয়ে মরে যাই?
আমি নিজেকে সামলাতে পারিনা,হু হু করে কেঁদে উঠি।
কাঁদে রাতুল আর আমানও!

এম সি কলেজে সন্ধ্যা নামে প্রতিদিনকার মতো,লোকজন আসে যায়! ভ্রুক্ষেপ নেই।আনমনে কেঁদে যায় তিনটি যুবক।স্রষ্টা জানেন,এরাও মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে,এদেরো মন আছে,এরাও সুখ চায়।কিন্ত তিনি মানুষ নিয়ে খেলেন।ভীষন মজা পান।বড় আজব এই বিধাতা, বড় অদ্ভুত তার খেল।

১৮ thoughts on “যুবক বয়সে…গল্পটা তোর আমার তোদের নিয়ে লেখা….

  1. আনমনে কেঁদে যায় তিনটি

    আনমনে কেঁদে যায় তিনটি যুবক।স্রষ্টা জানেন,এরাও মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে,এদেরো মন আছে,এরাও সুখ চায়।কিন্ত তিনি মানুষ নিয়ে খেলেন।ভীষন মজা পান।বড় আজব এই বিধাতা, বড় অদ্ভুত তার খেল। –

    চমৎকার লাগলো… :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :গোলাপ: :গোলাপ:

  2. আপনি আসলেই কবিতা থেকে গদ্যে
    আপনি আসলেই কবিতা থেকে গদ্যে অনবদ্য…
    আপনার কথোপকথনের অংশ আসলেই দুর্দান্ত!
    আপনি নিয়মিত গদ্যই লিখুন!! খুব ভাল লাগল। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. আপনার লেখার হাত তো খুবই ভালো
    আপনার লেখার হাত তো খুবই ভালো মশাই! বেশ ভালো লাগলো।
    একটাই সমস্যা পেলাম, মনে হল আসলে তিনজন না একজন মানুষকেই তিনটি ভিন্ন রুপে দেখলাম।
    বাস্তবতার কঠিন রূপ খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরতে গিয়ে হঠাৎই কিভাবে যেন ব্যাপারটা হালকা হয়ে গেল।

  4. রাজু দা অনেক ভালো লিখেছেন
    রাজু দা অনেক ভালো লিখেছেন সবার খুব ভাল লাগলেও আমার কাছে অসাধারণ, দুর্দান্ত, সুপার, অনবদ্য লেগেছে।। এককথায় কঠিন বাস্তবতা …… :বুখেআয়বাবুল: :তালিয়া: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *