এভারেস্টে গন্ডগোল

২০০৩ সালে ইনাম আল হকের নেতৃত্বে গড়ে উঠে বাংলা মাউন্টেনিয়া ট্রাকিং ক্লাব। উনাদের লক্ষ ছিলো এভারেস্ট জয়। ক্লাবের সদস্যদের ভিতর ছিলেন মুসা ইব্রাহিম, সজল খালেদ, শম্পা (সজল খালেদের সহধর্মিনী), এম এ মুহিত সহ আরো কয়েকজন। তখন ইনাম আল হক সহ টিমের সবার ধারণা ছিলো বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ কোনদিন এভারেস্ট জয় করতে পারে, তাহলে তিনি হবেন সজল খালেদ। পরবর্তীতে সজল খালেদের নেতৃত্বে মুসা ইব্রাহীমরা অনেকগুলো সামিট সম্পন্ন করেছেন। সজল খালেদও এভারেস্টের চূড়ায় লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এভারেস্টের কোলেই থেকে গেছেন।


২০০৩ সালে ইনাম আল হকের নেতৃত্বে গড়ে উঠে বাংলা মাউন্টেনিয়া ট্রাকিং ক্লাব। উনাদের লক্ষ ছিলো এভারেস্ট জয়। ক্লাবের সদস্যদের ভিতর ছিলেন মুসা ইব্রাহিম, সজল খালেদ, শম্পা (সজল খালেদের সহধর্মিনী), এম এ মুহিত সহ আরো কয়েকজন। তখন ইনাম আল হক সহ টিমের সবার ধারণা ছিলো বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ কোনদিন এভারেস্ট জয় করতে পারে, তাহলে তিনি হবেন সজল খালেদ। পরবর্তীতে সজল খালেদের নেতৃত্বে মুসা ইব্রাহীমরা অনেকগুলো সামিট সম্পন্ন করেছেন। সজল খালেদও এভারেস্টের চূড়ায় লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এভারেস্টের কোলেই থেকে গেছেন।

যুগে যুগে বহু এভারেস্ট চোর ধরা পড়ছে। এভারেস্ট জয়ী হিসেবে সার্টিফিকেট টার্টিফিকেট পাওয়ার পরও পরে ধরা পড়ছিলো তার এভারেস্টে উঠতে পারেনি। তালিকাটা অনেক বড়।

২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মুসা ইব্রাহীম এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন বলে খবর আসে। সাথে সাথে সেই খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পুরা দেশবাসী আনন্দে ভেসে গিয়েছিলো তারপরও কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সন্দেহ প্রকাশকারীদের একজন হচ্ছেন সজল খালেদ। এভারেস্ট জয়ের সার্টিফিকেট পেতে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয় শেরপার সাক্ষ্য। মুসা ইব্রাহীমের দুই শেরপার একজন ছিলেন সোম বাহাদুর তামাং। যিনি টাকা নিয়ে মিথ্যা বলার জন্য নেপালে বহুল পরিচিত। সোম বাহাদুর তামাংকে নিয়ে কেউ সামিটে গিয়েছেন শুনলে অন্য শেরপারা প্রাণ খুলে হাসে। সোম বাহাদুরেরকে নিয়ে মুসা মুহিত সজল খালেদরা তার আগেও অনেকগুলো সামিটে অংশ নিয়েছেন।

এই ফাঁকে আরেকটু তথ্য দিয়ে রাখি। এভারেস্টে উঠতে প্রায় বিশ পঁচিশ দিন সময় লাগে। বিভিন্ন উচ্চতার বেজক্যাম্প গুলোতে কিছুদিন করে থেকে উচ্চতার সাথে শরীরের খাপ খাওয়াতে হয়। এবং এডভান্স ক্যাম্প থেকে চুড়ান্ত সামিটে যায়। বেজকম্পে থাকাকালীন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম স্যাটালাইট ফোন। মুসা ইব্রাহীম এভারেস্টে উঠেছিলেন তিব্বত (নর্থ) ফেস দিয়ে। ঐ সময় একই দিক থেকে এভারেস্ট অভিযানের প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন এম এ মুহিত। তিনি দাবি করেন তিনি মুসাকে উঠতে দেখেননি। কিংবা কোন বাংলাদেশী ঐ ফেস দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে বলে শুনেননি। যদিও নিজেই এটাকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি কোন কারনে হয়তো দেখেননি বা শুনেননি।

এত ঝামেলার পরও মুসা ইব্রাহীম মিডিয়া কিংবা কোথাও তার এভারেস্ট জয়ের প্রমাণ দিয়ে কোন তথ্য হাজির করেননি। তখন একটা ব্লগে মুসা এভারেস্টে উঠেননি দাবি করে “নেভারেস্ট” সিরিজ হচ্ছিলো। অনেক প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রমাণ সহ। উনার এভারেস্ট জয়ের চারমাস পর ব্লগার আরিফ জেবতিক উনার কাছ থেকে এভারেস্ট জয়ের চারটা ছবি সংগ্রহ করেন। এভারেস্টের চূড়ার ছবিতে সাধারণত পেছনের দিগন্ত দেখা যায়। পেছনে বরফ দেখা যায়না। কারণ আপনি যখন সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকবেন তখন পেছনে দিগন্তরেখা ছাড়া অন্য কিছু দেখা যাওয়ার কোন কারণ নাই। আপনি পৃথিবীর যেকোন এভারেস্ট জয়ীর চূড়ার ছবি দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মুসা ইব্রাহিমের চারটা ছবির ভিতর দুইটা ছবিতেই পেছনে উঁচু বরফ দেখা যাচ্ছে, দিগন্ত না। অন্য যে দুইটা ছবিতে দিগন্ত দেখা যাচ্ছে সেগুলো ঝাপসা। কম রেজুলেশনের। দুষ্ট লোকরা এদুটোকে ফটোশপ বলতে চায়।

গত বছর ‘সকাল বেলার রোদ্দুর’ নামে একটা বইয়ে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাব এর ফাউন্ডার ইনাম আল হক একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। লেখার শিরোনাম ছিলো ‘বাংলাদেশের মানুষ আজ হিমালয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।’ ঐখানে প্রথম এভারেস্ট জয়ী হিসেবে এম এ মুহিতের ছবিসহ নাম উল্লেখ করা হয়। বাকি এভারেস্ট জয়ী হিসেবে নিশাত মজুমদার ওয়াসিফা নাজরীনের কথাও উল্লেখ থাকে। কিন্তু এভারেস্ট জয়ী হিসেবে মুসা ইব্রাহিমের নাম কোথাও উল্লেখ নাই। এরপর মুসা ইব্রাহিম ইতিহাস বিকৃতি এবং বইয়ের সব কপি বাজেয়াপ্ত ও বাজার থেকে তুলে নেওয়ার জন্য আদালতে মামলা করেন। মামলায় বইয়ের প্রকাশক চন্দ্রাবতী প্রকাশনী ও লেখক ইনাম আল হককে অভিযুক্ত করা হয়। একই সাথে আদালতে মুসাকে এটাও প্রমাণ করতে হবে উনার ছবিগুলো ফটোশপ নয়। মামলা এখনো বিচারাধীন। গত ১২ আগস্ট এর প্রথম শুনানী গেছে।

মুসা ইব্রাহিমের বিপক্ষে এত সন্দেহের কারণ হচ্ছে উনার বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সমৃদ্ধ অন্নপূর্ণা বিজয়ের কারণে। এটা পৃথিবীর দশম সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। ১৪ টা ৮০০০ মিটার পর্বত ক্লাবের অন্যতম শৃঙ্গ। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ পাকিস্তানের K2। এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পর্বত বিবেচনা করা হয়। প্রতি চারজন আরোহির একজনই এখানে মারা গেছেন। K2র পর অন্নপূর্ণাকেই সবচেয়ে ভয়ংকর বিবেচনা করা হয়। ২০০৯ সালে মুসা ইব্রাহিম এবং তৌহিদুল ইসলাম অন্নপূর্ণা জয় করেন। ঐ বছরের ৪ জুলাই প্রথম আলোয় বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হয়। একই বছরের ১৪ জুলাই উনাদের এ সাফল্যকে “ছুটির দিনে’ কাভার স্টোরি করে। উনাদের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে লিখেছিলেন তখনকার প্রথম আলো সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। সমস্যা হচ্ছে এর পরপরই দেশের অন্যান্য পর্বত আরোহিরা অবাক হন। কারণ মুসা ইব্রাহিমদের তথ্য অনুসারে ঐ পর্বতে উঠতে তাদের প্রায় ৪ দিন লেগেছিলো। মূসা ইব্রাহিমরা তখনো জানতেন না ৪ দিনে অন্নপূর্ণা জয় করা একটা বিশ্বরেকর্ড! তাও আবার মুসা ইব্রাহীমরা অক্সিজেন ছাড়া উঠেছেন! অন্নপূর্ণা জয় করতে সাধারণত একজন পর্বতারোহির অক্সিজেন সহ ২০ থেকে ২৪ দিন সময় লগে। পরে ঐ রিপোর্ট লেখা দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের সাথে বাংলাদেশের প্রথম উত্তর মেরু জয়ী অণু তারেকের কথা হয়। তখন দেবব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন হয়তো বিশ্বরেকর্ডই করছে। কিন্তু দেবব্রতদা জানেন না অক্সিজেন ছাড়াই দুইজন নবীন পর্বতারোহীর বিশ্বরেকর্ড করে ভয়ঙ্কর অন্নপূর্ণা জয় একটা অলৌকিক ব্যাপার। সন্দেহ হ্যাজ…

এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে বলে আমরা জতি হিসেবে গর্বিত। একই সাথে আমরা লজ্জিত এরকম একটা মহাণ ব্যাপার সুরাহার জন্য আদালতের দারস্থ হতে হয়েছে বলে। তারপরও সত্য সবার জানা উচিত। আদালতের রায় হয়তো মুসা ইব্রাহিমের পক্ষে যাবে। আমরা সারা পৃথিবীর বিশ্বাস অবিশ্বাসে মুসা ইব্রাহিমের কিচ্ছু এসে যাবেনা। একমাত্র তিনিই জানেন তিনি পর্বতে উঠেছেন কিনা। পর্বত মহান। সে কাউকে ক্ষমা করেনা।

২৮ thoughts on “এভারেস্টে গন্ডগোল

  1. ভাই এসব কি বলেন! আদালতে
    ভাই এসব কি বলেন! আদালতে যাওয়ার কথা পর্যন্ত জানি। কিন্তু মুসা ইব্রাহিম এভারেস্টে ওঠেন নাই এই বিতর্ক উঠল শেষ পর্যন্ত। এমন হলে বিষয় টা খুব দুঃখজনক হবে।

    1. ভাই এইটাতো আজকের বিতর্ক না।
      ভাই এইটাতো আজকের বিতর্ক না। উনি এভারেস্টে উঠার পরদিন থেকেই এই বিতর্ক চলে আসছে। হয়তো মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে আসে নাই। তাছাড়া এটা এমন একটা ব্যাপার পর্বত রিলেটেড কেউ ছাড়া অন্য মানুষজনের কাছে এই খুঁতগুলো খুব বেশি অস্বাভাবিক মনে হবেনা।

      1. সেটা ঠিক বলেছেন। আমরা পতাকা
        সেটা ঠিক বলেছেন। আমরা পতাকা ধরা ছবিটা দেখেছি কিন্তু পিছনে যে দিগন্ত রেখা নাই বা বরফের আস্তরণ কেন এই প্রশ্ন গুলো জাগে নাই।

  2. অন্নপূর্ণা আটহাজার মিটারী
    অন্নপূর্ণা আটহাজার মিটারী শৃঙ্গ। তো উনার কথিত অন্নপূর্ণা জয়ের মাস ছয়েক পর আনিসুল হক বিএমটিসির প্রধাণ ইনাম আল হককে ফোন করে অনুরোধ করলেন মুসা ইব্রাহিমকে যেন হিমালয় অভিযানে নিয়ে যাওয়া হয়। মুসা ইব্রাহীম আরো আগেই বিএমটিসি ছেড়ে নর্থ আলপাইনে চলে এসছিলেন। তখন ইনাম আল হক মুসা ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাস করছিলেন তার উচ্চতা অভিজ্ঞতা কতটুকু? উত্তরে মুসা ইব্রাহীম জানালেন ৬০০০ মিটার। অন্নপূর্ণা অভিযান সফল হলে ৮০০০ মিটারের বদলে ৬০০০ মিটার কেন বলবে!

  3. যদিও এটা অবিশ্বাস্য তবুও
    যদিও এটা অবিশ্বাস্য তবুও বিশ্বাস না করার মত অতটা অবিশ্বাস্য নয়। একটা সহজ প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক যে, এত সব বিতর্কের ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিলো মুসা ইব্রাহিমের। কিন্তু সে অনুযায়ী তার প্রতিক্রিয়া ছিলো খুবই কম। আবার এম এ মুহিতের সন্দেহকে অস্বীকার করার কারণ নেই। তিব্বত ফেস দিয়ে এভারেস্টে উঠা প্রায় দুঃসাধ্য। আমি নিশ্চিত নই, এডমন্ড হিলারি এই ফেস দিয়েই বোধহয় উঠেছেন। কিন্তু দুঃসাহসিক বিয়ার গ্রিলস এই ফেস দিয়ে উঠতে গিয়ে ফিরে আসেন। ধরেই নিলাম মুসা সাহেব এখান দিয়ে উঠেছেন। কিন্তু তার ছবিগুলোর ব্যাপারে আসলেই সন্দেহ লাগে। আমি ঘরে বসেই ফটোশপ দিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়ানো ছবি বানিয়ে দিতে পারি। আর ১০/১২ হাজার টাকা খরচ করে পেশাদার ফটো এডিটরের কাছ থেকে কাজটা নিঁখুতভাবে করিয়ে নেয়া যায়।

    তবে আর যাই হোক। মুসা ইব্রাহিম নিজেই ভালো জানেন তিনি কি করেছেন। চুর বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড়ে ধরে। আমি মুসার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নই, তবে যতদিন এউ বিতর্কের একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান না হচ্ছে ততদিন আমি ব্যক্তিগতভাবে এম এ মুহিতকে বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে ধরে নিবো।

    1. বিতর্কের শেষে সবাই মূসার
      বিতর্কের শেষে সবাই মূসার পক্ষে রায় দিছে। কারণ অফিসিয়ালি এটা কখনোই প্রমাণ করা সম্ভব না মূসা ইব্রাহিম এভারেস্টে উঠে নাই।

  4. এই বিষয়ে আমার ফেসবুক
    এই বিষয়ে আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে মূসা ইব্রাহিমের সাক্ষাতকার নেওয়া দেবব্রত মুখোপাধ্যায়’দা কমেণ্ট করছিলেন

    বোহেমিয়ান টিউন আমি এই প্রসঙ্গে না পারতে মন্তব্য করি না। কারণ ইতিমধ্যে আমি বিভ্রান্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট ব্যাপার স্যাপার দেখেছি। তবে ছুটির দিনেতে যে লেখাটা লিখেছিলাম, সেটা একেবারেই ওনাদের সাক্ষে। সেটাকে সত্য বলে ধরে নিয়েই লেখা হয়েছিল। তবে একটা ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার ছিল, সচলায়তনে হিমু নেভারেস্ট নামে যে সিরিজ লিখছিলেন, দীর্ঘ স্বাস্থ্যকর বিতর্ক শেষে তিনি কিন্তু সেটা ভুল বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রমান দেখে মূসা এভারেস্টে উঠেছিলেন বলেই তিনি মেনে নিয়েছিলেন বলে জানি।

  5. চোর নিজে জানে যে সে চোর। মুসা
    চোর নিজে জানে যে সে চোর। মুসা ইব্রাহীম যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকেন তাহলে নিজেই একসময় অনুতাপে দগ্ধ হবেন। আর কিছু বলবার নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *