শিল্পের সাতকাহন- তাঁত শিল্প ……


তাঁত কি ??



তাঁত কি ??

তাঁত হচ্ছে এক ধরণের যন্ত্র যা দিয়ে তুলা বা তুলা হতে উৎপন্ন সুতা থেকে কাপড় বানানো যায়। তাঁত বিভন্ন রকমের হতে পারে । খুব ছোট আকারের হাতে বহন যোগ্য তাঁত থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির স্থির তাঁত দেখা যায়। আধুনিক বস্ত্র কারখানা গুলোতে স্বয়ংক্রিয় তাঁত ব্যবহার করা হয়ে থাকে।সাধারণত তাঁত নামক যন্ত্রটিতে সুতা কুণ্ডলী আকারে টানটান করে ঢুকিয়ে দেয়া থাকে । যখন তাঁত চালু করা হয় তখন নির্দিষ্ট সাজ অনুসারে সুতা টেনে নেয়া হয় এবং সেলাই করা হয়। তাঁতের আকার এবং এর ভেতরের কলা কৌশল বিভিন্ন রকমের হতে পারে। বাংলা তাঁত যন্ত্রে ঝোলানো হাতল টেনে সুতো জড়ানো মাকু (spindle) আড়াআড়ি ছোটানো হয়। “তাঁত বোনা” শব্দ কটি এসেছে “তন্তু বয়ন” থেকে। তাঁত বোনা যার পেশা সে হল তন্তুবায় বা তাঁতী। আর এই তাঁতের উপর যারা বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে তাদেরকে ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ার বলা হয়।

তাঁত শিল্পের ইতিহাসঃ

তাঁত শিল্পের ইতিহাস সঠিক বলা মুশকিল ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদি বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হচ্ছে আদি তাঁতি অর্থাৎ আদিকাল থেকেই এরা তন্তুবায়ী গোত্রের লোক। এদেরকে এক শ্রেণীর যাযাবর বলা চলে- শুরুতে এরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া শাড়ির মান ভালো হচ্ছে না দেখে তারা নতুন জায়গার সন্ধানে বের হয়ে পড়েন, চলে আসেন বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানেও আবহাওয়া অনেকাংশে প্রতিকূল দেখে বসাকরা দু’দলে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্যদল ঢাকার ধামরাইয়ে। তবে এদের কিছু অংশ সিল্কের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যায়। ধামরাইয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই বসাকরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভাগ হয়ে অনেক বসাক চলে যান প্রতিবেশী দেশের চোহাট্টা অঞ্চলে। এর পর থেকে বসাক তাঁতিরা চৌহাট্টা ও ধামরাইয়া’ এ দু’গ্রুপে স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন।

তাছাড়া তাঁত শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে আরো জানা যায় যে তাঁত শিল্প মনিপুরীরা অনেক আদিকাল থেকে এই বস্ত্র তৈরি করে আসছে মনিপুরীদের বস্ত্র তৈরির তাঁতকল বা মেশিন প্রধানত তিন প্রকার যেমন, কোমরে বাঁধা তাঁত, হ্যান্ডলুম তাঁত ও থোয়াং। এই তাঁতগুলো দিয়ে সাধারণত টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, লেডিস চাদর, শাড়ি, তোয়ালে, মাফলার, গামছা, মশারী, ইত্যাদি ছোট কাপড় তৈরি হয়। প্রধানত নিজেদের তৈরি পোশাক দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই মনিপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে তাঁত শিল্পে নির্মিত সামগ্রী বাঙালি সমাজে নন্দিত ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নকশা করা ১২ হাত মনিপুরী শাড়ি, নকশি ওড়না, মনোহারী ডিজাইনের শীতের চাদর বাঙালি মহিলাদের সৌখিন পরিধেয়।

তাঁত শিল্পের বিকাশঃ

কুটির শিল্প হিসেবে হস্তচালিত তাঁত শিল্প বৃটিশ পূর্বকালে কেবল দেশেই নয় বর্হিবাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিল। বংশ পরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বয়ন উৎকর্ষতায় এ দেশে তাঁতীরা সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য স্থান। কিন্তু বৃটিশ আমলে অসম করারোপ, তাঁত ব্যবহারের উপর আরোপিত নানা বিধি নিষেধ, বৃটিশ বস্ত্রের জন্য বাজার সৃষ্টির নানা অপকৌশলের কাছে তাঁতী সমাজ তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। ক্রমান্বয়ে তাঁত শিল্পে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। স্বাধীনতার পরও সে সংকটের তেমন কোন সুরাহ হয়নি। বাজার অর্থনীতি সম্প্রসারণে তাঁতীদের সমস্যা আরো জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে মুক্ত বাজার অর্থনীতির আড়ালে হচ্ছে পরোক্ষ আগ্রাসনের শিকার নানা ধরণ, নানা রং, নানা ডিজাইনের কাপড়ের অবাধ প্রবেশের ফলে বাজার চলে গেছে সনাতনী তাঁতীদের প্রতিকূলে। মুদ্রা অর্থনীতির প্রসারের ফলে দেখা দিয়েছে পুঁজি সংকট। সে সুযোগে মহাজনের কাছে সেবাদাসে পরিণত হয়েছে অধিকাংশ প্রান্তিক তাঁতী ও তাঁত মালিক। সুতা, রং রসায়নের জন্য মহাজনের কাছে বাধা হয়ে বাধা পড়তে হচ্ছে তাঁতীদের। মহাজন ও পাইকারের পাতা জালে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধরা দিতে হচ্ছে তাদেরকে।

তাঁত শিল্পের অবনতির পেছনের কারণ !!

বস্ত্রকলে তৈরি কাপড় তাঁতবস্ত্রের বাজার সহজেই দখল করে নিয়েছে এবং এতে করে তাঁতীরা পড়ছে বিপাকে ।বৈধ ও অবৈধভাবে আমদানিকৃত কাপড় পরিকল্পিত ও সুব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে তৈরি হওয়ার ফলে সেগুলোর ডিজাইন, মান ও গুণ তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের। উন্নতমানের এ পণ্যের সাথে হস্তচালিত তাঁতে প্রস্থুত কাপড় প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার জন্য ডিজাইন ও ব্যবসায়ী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা দরকার, তার কোন ব্যবস্থা নেই। তাঁত বস্ত্রের ডিজাইন উন্নত আকর্ষণীয় ও বহুমাত্রিক করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের অভাব তাঁতীদের অবস্থান আরো দুর্বল করে দিয়েছে ।। তাঁতশিল্প এখনো সিংহভাগ মানুষের জন্য বস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে । সে প্রেক্ষিতে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জন্র পেশাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পরিবর্তিত রুচি ও পছন্দের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাঁত বস্ত্রেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগা প্রয়োজন। কিন্তু সেজন্য যে সামর্থ থাকা দরকার সাধারণ তাঁতী সমাজের তা নেই। তাই তাদেরকে সনাতনী পদ্ধতিতেই ও সনাতনী মানের বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত থাকতে হচ্ছে ।। এ অবস্থা তাঁত শিল্পের উৎকর্ষ সাধারণের পথে বড় অন্তরায় হয়ে অবস্থান করছে।

আমাদের অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকাঃ

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। হস্ত চালিত তাঁতে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদিত হয় যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪০ ভাগ মিটিয়ে থাকে। এ শিল্প থেকে মূল্য সংযোজন করের পরিমাণ প্রায় ১৫০০.০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের হস্ত চালিত তাঁত শিল্প এদেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত তাঁত শুমারী ২০০৩ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫ লক্ষাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে ।। দেশের মোট কাপড়ের চাহিদার শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ যোগান দিচ্ছে তাঁত শিল্প এবং প্রায় ৫০ লাখ লোক সরাসরি এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে । শুধুমাত্র মনিপুরীরা ২০০৯ সালে ২২ লাখ টাকার যুক্তরাজ্যে তাদের রপ্তানি শুরু করে এবং ২০১০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১ লাখ টাকায়। ২০১২ সালে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মণিপুরী কাপড় যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা হয়েছে ।।

তাঁত শিল্পের আইন সম্প্রসারণঃ

আসার কথা হচ্ছে তাঁত শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে ১৯৭৭ সালের এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বিল- পাস করেছে এই সরকার ।। দেশের বস্ত্র উত্পাদনের প্রায় ৭০ ভাগ যোগান দিচ্ছে তাঁত শিল্প। এই শিল্পে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ লোক নিয়োজিত রয়েছে। ‘বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আইন-২০১৩’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে পুর্নগঠিত বোর্ড দেশের তাঁত শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

বিশ্ববাজারে তাঁত বস্ত্রের চাহিদাঃ

আমাদের দেশের তাঁতীদের তৈরি জামদানী, বেনারসি, গরদ, টাঙ্গাইল শাড়ি, খদ্দর, লুঙ্গী, গামছা, গেঞ্জি, টুপি, সালোয়ার কামিজ, হ্যান্ডলুম, পিট লুম, ফ্র্রেমলুম, জাপানিলুম, চিত্তরঞ্জনলুম, বেনারসিলুম, জামদানিলুম বিশ্বব্যাপী যেমন কদর রয়েছে তেমনি চাহিদাও। অতীতে এবং বর্তমানে তাঁত শিল্পে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানি করা হচ্ছে বিশ্ববাজারে যা আমাদের দেশীয় অর্থনীতি বৃদ্ধিতে যথেষ্ট অবদান রাখছে তাছাড়া দেশের বাইরে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে যা আমাদের জন্য আশারবাণী ।


২০০৪ সালে রাঙামাটি গিয়েছিলাম একটা ভ্রমণে আর সেখানে গিয়ে জীবনে প্রথম তাঁত শিল্পের দেখা পেলাম ।। সত্যি বলতে আমি জানতাম না তাঁত কি জিনিস কিন্তু উনাদের সাথে কথা বলে এবং নিজ নজরে তাঁত শিল্প দেখে এই ব্যাপারে যথেষ্ট কৌতুহল তৈরি হয় আমার মাঝে ।। এরপর থেকে চেষ্টা করি কিছু তথ্য সংগ্রহ করার ।। ইণ্টারনেট থেকে সংগ্রহ এবং নিজের পরিশ্রমের ফসল দিয়ে তৈরি করলাম এই লিখাটি ।।

১৬ thoughts on “শিল্পের সাতকাহন- তাঁত শিল্প ……

    1. ধন্যবাদ শুভ দা এত্ত বড় লিখাটা
      ধন্যবাদ শুভ দা এত্ত বড় লিখাটা পড়ার জন্য …… একটা লজেন্স পাওনা রইল তোমার :বুখেআয়বাবুল: :ভালুবাশি: 😀

    1. ধন্যবাদ রাজু দা ঋণী করে দিলা
      ধন্যবাদ রাজু দা ঋণী করে দিলা প্রিয়তে নিয়ে :লইজ্জালাগে: আমার প্রচেষ্টা সফল …… ২ টা লজেন্স তোমার জন্য :ভালুবাশি: :নৃত্য: :বুখেআয়বাবুল:

  1. তাঁতশিল্প নিয়ে জানার আগ্রহ
    তাঁতশিল্প নিয়ে জানার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। অনেক কিছু জানতে পারলাম এই লিখা থেকে… এত সুন্দর একটা পোস্ট করার জন্য ধন্যবাদ

  2. চমৎকার ইনফরমেটিক পোস্ট।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার ইনফরমেটিক পোস্ট। স্টিকি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। মাস্টার সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

  3. চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট…
    চমৎকার তথ্যবহুল পোস্ট… স্টিকি করার জন্য ইস্টিশন মাষ্টারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি…

    আর আমি পাঁচ নম্বর কমেন্টকারী। আমার পাঁচটা লজেন্স… :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

    1. ধন্যবাদ ভাই আসলে একটু দেরি
      ধন্যবাদ ভাই আসলে একটু দেরি হয়ে গেলো ধন্যবাদ জানাতে অবশ্যই আপনার জন্য ৫ টা লজেন্স বরাদ্দ ……… :বুখেআয়বাবুল: 😀

  4. একটা কাছের কাজ করছেন। চমৎকার
    একটা কাছের কাজ করছেন। চমৎকার পোস্ট, তথ্যবহুল এবং আমাদের ঐতিহ্যসম্পর্কিত… মাস্টার সাব আর কত ঘুমাবেন? এইবার কিছু করেন!! স্টিকিতে দেখতে চাই…

  5. চমৎকার একটি পোস্ট। এমন সুন্দর
    চমৎকার একটি পোস্ট। এমন সুন্দর সাবলীল ভঙ্গিতে উপস্থাপিত ইনফরমেটিভ পোস্ট সটীকই হওয়ার যোগ্য । ইষ্টিশন মাস্টার এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *